শূন্য ভিটের কথকতা…
আমি দাঁড়িয়ে এক জীর্ণ আঙিনায়, যেখানে সময়ের প্রলেপ
চুন-সুরকির বদলে মেখে নিয়েছে এক গভীর বিমর্ষতা।
মাটির দেয়ালের প্রতিটি স্তরে আজ নীরবতার স্তর জমেছে,
অথচ এই ভাঙা ফুটো বাড়ির ভগ্নস্তূপই আজ আমায় বলছে—
দালানকোঠার চেয়েও কত বেশি জরুরি ছিল ঘরের মানুষগুলো!
মানুষই তো ঘর গড়ে, আর কলহ? সে তো সুন্দরকে কুরে খায়।
এই সেই উঠোন, যেখানে একদিন ঝড়ের বেগে ছুটত অবোধ শিশু,
বাবার মজবুত কাঁধ আর মায়ের আঁচল ছিল যার পরম আশ্রয়।
অথচ আজ? কত বছর এ মাটিতে ঝাড়ুর আঘাত পড়েনি,
শুকনো পাতার মড়মড় শব্দে এখানে শুধু দীর্ঘশ্বাস হাঁটে।
লতাগুল্মে ঢেকে গেছে চেনা পথ, পরিত্যক্ত আসবাবগুলো
ধুলোর নিচে চাপা পড়া এক একটি নামহীন ইতিহাস।
একটু দূরে ওই টিউবওয়েল আর জলহীন প্রাচীন কূপ,
সামনের পুকুরটি আজ আগাছার দখলে বিষণ্ণ শুয়ে আছে।
এখানেই হয়তো কোনো নতুন কনে কলস কাঁখে জল নিতে আসত,
হয়তো এই জলেই লুকিয়ে আছে হাজারো হাসিকান্নার প্রতিচ্ছবি।
মানুষ ছাড়া প্রকৃতি আজ বড় অসহায়, বড় বেশি লক্ষ্যহীন,
সারা পৃথিবীর আয়োজন তো ছিল কেবল মানুষেরই পদচারণায়।
রবীন্দ্রনাথের সেই ‘পোড়ো বাড়ি’র মতো এ এক বিষণ্নতার প্রতীক,
যেখানে কান পাতলে শোনা যায় দেয়ালের না বলা গোপন গল্প।
এই চৌকাঠ দিয়েই কেউ এসেছিল নববধূর সাজে আলতা পায়ে,
আবার এই পথেই কারোর শেষ যাত্রা হয়েছিল খাটিয়ায় চেপে।
বাঁশ-কাঠের ওই চালের ছাউনি আজও সাক্ষ্য দিয়ে যায়—
পুরনো দিনগুলোর সুখ-দুঃখ আর সংসারের সহস্র বাঁকবদলের।
সংসারে মানুষ না থাকলে ইট-পাথরের আর কী মূল্য থাকে?
আমরা প্রায়ই মানুষের ভিড় থেকে দূরে, একলা হতে পালাই;
কিন্তু মানুষের মাঝে না থাকলে কি সত্যিই সুখ মেলে?
সেই বৃদ্ধ চাচার কথা আজ বড্ড বেশি মনে পড়ে—
“এই দুনিয়ায় মানুষ নেই!” তবে তিনি কোন মানুষের খোঁজ করেছিলেন?
হয়তো সেই মানুষের, যারা কেবল ভিড় বাড়ায় না, বরং ঘরকে আগলে রাখে।
এখানে কোনো পাখির কলতান নেই, ডানা ঝাপটানোর শব্দ নেই,
ধ্বংসের স্তূপে কেবল হাহাকার আর বিমর্ষতার এক নীরব রাজত্ব।
প্রকৃতি এখানে মুখভার করে দাঁড়িয়ে আছে একাকী,
কেননা মানুষ ছাড়া এই পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যই যে বড় অসহায়।

