বিধান চন্দ্র সান্যাল

বিধান চন্দ্র সান্যাল

\” শীতের দিনে নামল বাদল,
বসল তবু মেলা।
বিকেল বেলায় ভিড় জমেছে
ভাঙল সকাল বেলা। \”

—— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভূমিকা:
পৌষ মাস এলেই বাঙালির মনে আনন্দের ঢেউ লাগে, আর এই আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা। এটি কেবল একটি মেলা নয়, বরং বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের মিলন ও ভালোবাসার এক মহোৎসব, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদর্শকে ধারণ করে আজও প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সূচনা:
১৮৯৪ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে ব্রাহ্ম মন্দিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শান্তিনিকেতনে এই মেলার সূচনা হয়েছিল। ছোট পরিসরে শুরু হলেও, সময়ের সাথে সাথে এটি একটি আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে, যা দেশ-বিদেশের মানুষকে একত্রিত করে।
মিলনক্ষেত্রের স্বরূপ:
সাংস্কৃতিক মিলন: বাউল গান, লোকনৃত্য (যেমন ছৌ, সাঁওতালি), রবীন্দ্রসংগীত আর লোকসংগীতের সুরে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে।
শিল্প ও কারুশিল্পের সমাহার: এখানে কাঁথা স্টিচ, মাটির কাজ, বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিস, গয়না ও চামড়ার সামগ্রী সহ নানা ধরনের হস্তশিল্পের পসরা সাজানো হয়।
মানুষের মিলন: দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটক, স্থানীয় গ্রামবাসী, আদিবাসী সম্প্রদায় এবং বিশ্বভারতীর শিক্ষার্থীরা একাকার হয়ে যান এই উৎসবে, যা \’ইউনিটি ইন ডাইভারসিটি\’-র এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
গ্রাম্য জীবনের প্রতিচ্ছবি: গ্রামীণ জীবনধারার সরলতা ও লোকসংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি এই মেলাকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা, যা আধুনিকতার ভিড়েও ঐতিহ্যকে ধরে রাখে।
তাৎপর্য:
পৌষমেলা বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। এটি শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, বরং আত্মিক মিলন ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের এক কেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথের \’শিক্ষা\’র ধারণাকে বাস্তব রূপ দিয়ে এই মেলা জীবনকে প্রকৃতির সাথে ও মানুষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে।
উপসংহার:
পৌষমেলা বাঙালির হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। এটি এমন এক মিলনক্ষেত্র যেখানে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর মানুষের ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, যা আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয় এবং নতুন করে প্রাণিত করে তোলে। এই মেলা বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা চিরকাল অমলিন থাকবে।

Comment