শেষ চিঠি
এ আর হিমু
গ্রামের শেষ মাথায় একটা পুরোনো বাড়ি। বাড়িটা সবাই এড়িয়ে চলে, শুধু রোদেলা দুপুরে জানালার পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ লোকটাকে দেখা যায়। তার নাম করিম চাচা। মানুষটা নীরব, কিন্তু চোখে যেন হাজার গল্প লুকানো।
প্রতি শুক্রবার তিনি ডাকঘরে যান। লাইনে দাঁড়িয়ে খাম কেনেন, বাড়ি ফিরে খুব যত্ন করে একটি চিঠি লেখেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—চিঠিটা কখনো পোস্ট করেন না। আলমারির ভেতর রাখা একটা লোহার বাক্সে রেখে দেন।
গ্রামের ছেলে রাহুল একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
“চাচা, আপনি কাকে এত চিঠি লেখেন?”
করিম চাচা মৃদু হাসলেন। বললেন,
“আমার ছেলেকে।”
“সে কোথায়?”
“খুব দূরে… এমন জায়গায়, যেখানে চিঠি পৌঁছায় না।”
সেদিন রাহুল কিছু বুঝতে পারেনি।
এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় হলো। করিম চাচার বাড়ির ছাদ ভেঙে পড়ল। গ্রামবাসীরা দৌড়ে এসে তাকে উদ্ধার করল, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরদিন বাড়ি পরিষ্কার করতে গিয়ে সেই লোহার বাক্সটা পাওয়া গেল।
বাক্স খুলে সবাই স্তব্ধ।
ভেতরে অসংখ্য চিঠি। প্রতিটা চিঠিতে লেখা—
“বাবা, আজ তোমার খুব কথা মনে পড়ছে।”
“বাবা, তুমি বেঁচে থাকলে হয়তো আজ ডাক্তার হতে।”
“বাবা, তোমার মায়ের চোখের পানি আজও থামেনি।”
শেষ চিঠিটা আলাদা ছিল। তাতে লেখা—
“বাবা, আজ আমি আসছি। হয়তো এবার তোমার কাছেই পৌঁছাবো।”
গ্রামের মানুষ তখন বুঝল—করিম চাচার ছেলে বহু বছর আগে এক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। তবু একজন বাবা প্রতিদিন বিশ্বাস করে গেছে, ভালোবাসা কখনো হারায় না।
সেদিন থেকে ডাকঘরের সামনে একটা ছোট বোর্ড টাঙানো আছে—
“যে ভালোবাসে, সে কখনো একা থাকে না।”
শেষ চিঠি এ আর হিমু গ্রামের শেষ মাথায়…

Comment
