উপন্যাস
ময়ূরাক্ষীর মিলনগাথা
সুদীপ ঘোষাল
Change Is the only constant in the world. ”
প্রথম কথা
আমরা চার বন্ধু। রমেন, জীবন, বিশু আর আমি। ময়ূরাক্ষী নদীর পাড়ের মানুষ আমরা। মথুরাপুর,সাঁকিরের পাড়,সাঁইথিয়ার বিস্তীর্ণ লাল মাটির আদরে আমরা বড় হয়েছি।ময়ূরাক্ষী নদীর বাঁধের পাশে গ্রীষ্মকালে আমরা ফুটবল খেলতাম। সোনা,অপু,রণু,ভূমা,নিরু,হিরু,চিন্তা,পরেশ আমার ভাই,কেয়া আর পুটু আমার দিদি।কেয়ার বৈদ্যবাটীতে বিয়ে হয়েছে আর পুটু আছে কুন্ডলা গ্রামে। সাঁইথিয়া শহরে একটা সতীপীঠ আছে। মায়ের কেশ পতিত হয়েছিলো এখানে। তাই সতীপীঠের নাম কেশেশ্বরী।
যেখানেই যেতাম একসাথে থাকতাম। বিশু ছিলো আমাদের দলের অলিখিত নেতা। নেতা তো এমনি এমনি হয় না। তার কাজ,দল চালানোর কৌশল তাকে নেতা বানিয়েছিলো। একদিন দুপুর বেলায় সে আমাদের ডাক দিলো তার বাঁশি বাজিয়ে। বাঁশির ডাক শুনেই মন চঞ্চল হয়ে উঠতো। ঠিক যেন, রাধার পোড়া বাঁশির ডাক। চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বটতলায়। আমাদের মিলন অফিস ছিলো এই বটতলা। চারজন ছুটে চলে যেতাম মাঠে। সেখানে বিশুবলতো, দাঁড়া কয়েকটো তাল কাঁকড়া ধরে নি আগে । ভেজে খাওয়া যাবে রেঁ,কি বলিস পরেশ?
পরেশকে কথাটো বলেই হাত ভরে দিলো সোজা ধানের জমির গর্তে। একটা মাগুর ধরেছি, বলেই মাথা টিপে হাত বের করতেই দেখা গেলো মাছ নয়একটা বড় কালো কেউটে সাপ। বিশু সাপটাকে সাঁ সাঁ করে ঘুরিয়ে সহজেই ছুঁড়ে দিলো দূরে। তারপর তাল কাঁকড়া ধরে ভেজে খাওয়া হলো মাঠে। ভাজার সমস্ত সরঞ্জাম বিশু লুকিয়ে রাখতো একটা পোড়ো বাড়িতে। সাঁতার কাটতে যেতাম নতুন পুকুরে। একবার ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলাম তার প্রখর বুদ্ধির জোরে। মাথার চুল ধরে টেনে তুলেছিলো ডাঙায়।
গ্রীষ্ম অবকাশে বট গাছের ডালে পা ভাঁজ করে বাদুড়ঝোলা খেলতাম বিশুর নেতৃত্বে।তারপর ঝোল ঝাপটি। উঁচু ডাল থেকে লাফিয়ে পড়তাম খড়ের গাদায়। এসব খেলা বিশুর আবিষ্কার। তারপর সন্ধ্যা হলেই গ্রামের বদমাশ লোকটিকে ভয় দেখাত বিশু। সুদখোর সুরেশ মহাজন বটগাছের ডাল থেকে শুনলো, কি রে বেটা খুব তো চলেছিস হনহনিয়ে। আয় তোকে গাছে ঝোলাই। সুদখোর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো। তারপর থেকে ও পথে যেত না মহাজন। সাদা চুলো গান্ধিবুড়িকে রোজ সন্ধ্যাবেলা নিজের মুড়ি খাইয়ে আসতো অতি আদরে। বিশু বলতো, আমি তো রাতে খাবো। বুড়ির কেউ নেই, আমি আছি তো। শ্রদ্ধায় মাথা নত হত নেতার হাসিতে।
একবার ময়ূরাক্ষী নদীর বন্যার সময় স্কুল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের নেতা। কোথাও সাঁতার জল কোথাও বুক অবধি জল। একটা সাপ বিশুর হাতে জড়িয়ে ধরেছে।
বিশু এক ঝটকায় ঝেরে ফেলে দিলো সাপটা। স্কুল আমাদের যেতেই হবে। সাঁতার কাটতে কাটতে আমাদের সে কি উল্লাস। যে কোনো কঠিন কাজের সামনাসামনি বুক চিতিয়ে সমাধান করার মতো মানসিকতা বিশুর ছিলো। সে সামনে আর আমরা চলেছি তার পিছুপিছু। শেষ অবধি পৌঁছে গেলাম স্কুল। হেড মাষ্টারমশাই খুব বাহবা দিলেন স্কুলে আসার জন্য। তিনি বললেন, ইচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।
টিফিনের সময় ছুটি হয়ে গেলো। আসার সময় একটা নৌকো পাওয়া গেলো। মাঝি বললেন, আমার বয়স হয়েছে আমি একা অতদূর নৌকা বাইতে পারবো নি বাবু। তাছাড়া আমার এখনও খাওয়া হয় নি।
বিশু সঙ্গে সঙ্গে নিজের টিফিন বের করে দিলো। আমরাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিফিন বের করে দিলাম। মাঝি ভাই বললেন, এসো সবাই এক হয়ে খেয়ে লি। তারপর নৌকার কান্ডারি হলো বিশু। আর আমরা সবাই মুড়ি মাখিয়ে খেতে শুরু করলাম। মাঝি ভাই ও বিশু খেলো। ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলাম গ্রামে। মাঝি ভাইকে পারিশ্রমিক দিয়ে বিদায় জানালাম।পরেশ বলছে আমাদের সকলকে,ঝাড়খন্ডে ব্যাপক বৃষ্টির পাতের জের ঝাড়খন্ডের ম্যাসানজোj থেকে ময়ূরাক্ষী নদীতে জল ছাড়া হয়েছে ১৭ হাজার কিউসেক অন্য দিকে তিলপাড়া ব্যারেজ থেকে ময়ূরাক্ষী নদীতে ১৫৮১০ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে ময়ূরাক্ষী নদীতে। জানা গিয়েছে তিলপাড়ার জল ছাড়ার পরিমাণ আরো বাড়বে। প্রশাসন নজর রাখছে নদীতে জলস্তরের দিকে। ঝাড়খণ্ডের ত্রিকুট পাহাড় থেকে এই ময়ূরাক্ষী নদীর উৎপত্তি। সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে ম্যাসানজোর জলাধার। ম্যাসানজোর জলাধার থেকে তিলপাড়া হয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে গিয়েছে ময়ূরাক্ষী নদী। ম্যাসাঞ্জোর জলাধার থেকে তিলপাড়া জলাধার পর্যন্ত আসার পথে ময়ূরাক্ষী নদীতে মিশেছে ঝাড়খণ্ডের সিদ্ধেশ্বরী নদীর জল। এত জলের চাপে ফুসছে ময়ূরাক্ষী নদী।
সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রাধীন ম্যাসানজোর জলাধার থেকে ও সিউড়ির তিলপাড়া জলাধার থেকে জল ছাড়া হয়েছে। প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ময়ূরাক্ষী নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোর। মোর প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে মুর্শিদাবাদের কিছু অংশের। তবে প্রশাসনের তরফে এখনও কোনো সর্তকতা জারি করা হয়নি। বীরভূমের জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা জানিয়েছেন নদীগুলির জলস্তরের উপর নজর রয়েছে প্রশাসনের। অন্যদিকে বীরভূমের মহম্মদবাজারে ময়ূরাক্ষী নদীর চরে ঢাকা বেশ কয়েকটি গ্রামের যাতায়াতের ভরসা ছিল নৌকা। নদীতে জল বাড়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় আপাতত নৌকা চলাচল বন্ধ রেখেছে প্রশাসন ওই গ্রামের মানুষ গুলি বর্তমানে জল বন্দি অবস্থায়।
আমরা বীরভূমের লোক।আর অংশুমান বর্ধমানের কাটোয়ার লোক। সে আসে মাঝে মাঝে মাসির বাড়ি। পরেশ তার মাসির ছেলে।
#চলবে ……..

