সৈয়দ হৃদয়

সৈয়দ হৃদয়

আত্মসংলাপের মুখোমুখি মানুষ

মহাসংকট যখন চতুর্দিক থেকে কালবৈশাখীর মতো ধেয়ে আসে, নিয়তির অক্টোপাস যখন চারপাশ থেকে শ্বাসরোধ করতে চায়, তখন মানুষকে ফিরে যেতে হয় নিজের গহীনে। সেখানে কোনো ভিড় নেই, কোনো হাততালি নেই; আছে কেবল নিজের সেই নিঃসঙ্গ কণ্ঠস্বরের মুখোমুখি দাঁড়ানো।

এই নির্জনতাতেই শুরু হয় মানুষের প্রকৃত আত্মসংলাপ। সেই মুহূর্তে রক্ত-মাংসের যাবতীয় মায়া বিসর্জন দিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করতে হয়। কারণ, এই জীবন কেবল একটি বিরতিহীন মহড়া; আসল মঞ্চায়ন তো অন্য এক জগতে। প্রথম ও ক্ষণস্থায়ী জীবনটা মানুষের জন্য, আর দ্বিতীয় ও চিরস্থায়ী জীবনটা নিজের জবাবদিহির জন্য।

এই পরম সত্য উপলব্ধির মধ্য দিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে মহামানব হয়ে ওঠে তখন, যখন সে অন্যকে রক্ষা করার জন্য সত্যের পক্ষে নিজেকে নিবেদন করতে শেখে। তখনই তার ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাটা জেগে ওঠে।

কিন্তু এই উত্তরণ মোটেই সহজ নয়; বরং গভীরভাবে বেদনাদায়ক। কারণ, অন্যকে রক্ষা করার জন্য সত্যের বেদিতে নিজেকে নিবেদন করা মানে হলো, নিজের জীবন্ত সত্তার চামড়া ছাড়ানোর মতো কষ্ট সহ্য করা।

এই বেদনার উৎস কোথায়?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের অস্তিত্বের ভেতরেই।

আমাদের এই শরীরটা আসলে এক লোভাতুর মাংসের খাঁচা। এই খাঁচা ভেঙে, এর প্রতিটি শিকল দুমড়ে-মুচড়ে নিজের ‘আমি’-কে মুক্ত করে আনা এক রক্তাক্ত আধ্যাত্মিক সংগ্রাম। এই সংগ্রামেই নির্ধারিত হয়, মানুষ নিজেকে কোথায় স্থাপন করবে। নিজেকে নিয়ে মত্ত থাকার এই পৃথিবীতে তাই সবাই মহামানব হতে চায় না, কিংবা ওই দ্বিতীয় জীবনকে তারা বিশ্বাসই করে না।

আমার জীবনের একটা মোটিভ আছে। আমার ফিলোসফি হচ্ছে, আমি আমি এই নশ্বর পৃথিবীতে এসেছি ভালো মানুষগুলোকে ভালোবাসার চাদরে মুড়ে দিতে, আর খারাপ মানুষগুলোকে ঘৃণা করতে নয়, বরং তাদের ভেতরের অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক অালোকিত মশাল হয়ে দাঁড়াতে।

কত বড়ো একটা কথা বলে ফেললাম! আমার কথা শুনে মনে হতে পারে, আমি নিজেকে নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ, নিরপরাধ একটা ফেরেশতা ভাবছি। ব্যাপারটা আসলে তা নয়…..

আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি মানুষই সম্ভাবনার এক একটি আলো; শুধু কেউ আলো জ্বালাতে শেখে, আর কেউ অন্ধকারেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাই আমি ভালোবাসার পক্ষে, কিন্তু অন্ধ সমর্থনের পক্ষে নই। আমি মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই, কিন্তু অন্যায়ের সামনে মাথা নত করতে নয়।

যদি কখনো নিজেকে উৎসর্গ করতেই হয়, তবে তা হবে সত্যের জন্য, মানুষের জন্য, আর সেই চিরস্থায়ী জীবনের জন্য; যেখানে নিজের কাছে কোনো জবাবদিহি বাকি থাকবে না।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই আমাকে অপরাধের ব্যাকরণ নিয়েও ভাবায়। কিছু অপরাধ আছে, যা কেবল অপরাধীর নিজের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; আবার কিছু অপরাধ আছে, যা অন্যের অধিকারকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। প্রথমটির দায় হয়তো ব্যক্তিগত সীমায় আবদ্ধ থাকে, কিন্তু দ্বিতীয়টি সমাজের বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

আমি কোনভাবেই নিখুঁত নই। আমি প্রথম ধরণের অপরাধটা করে থাকি। কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের অপরাধ থেকে হাজারটা মাইল দূরে থাকি। কারণ, ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, পৃথিবীর বড় বড় সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাতের সবই এই দ্বিতীয় ধরনের অন্যায়ের বিস্তার থেকে জন্ম নেয়।

মানুষই বিষবৃক্ষ রোপণ করে, অথচ সমাধানের সময় সেই মানুষই ইঁদুরের মতো গর্তে লুকায়। সংকট তখন বিষাক্ত মাশরুমের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভয়, এই পলায়নপর মানসিকতাই মানুষকে ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক এক সংকীর্ণ বৃত্তের ভেতরে আবদ্ধ করে ফেলে।

আসলে অন্যের জন্য তপ্ত বালুর ওপর বুক পেতে দেওয়ার মতো কলিজা খুব কম মানুষেরই থাকে। তাই আমরা সবাই আজ ‘স্বার্থ’ নামক এক কানাগলির ভেতরে বৃত্তবন্দি হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছি।

এই বিষাক্ত বৃত্ত ভাঙতে হলে, প্রথমেই প্রয়োজন নিজের ‘লোভ’ নামক সেই উন্মত্ত ঘোড়াটার টুঁটি চেপে ধরা। তার মুখে টেনে দিতে হবে বিবেকের লাগাম। তারপর, প্রিয়জনের মায়া আর রক্ত-মাংসের ক্ষুধাগুলোকে তালাবদ্ধ করতে হবে হৃদয়ের কোনো গহীন প্রকোষ্ঠে।

এটা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। অনেকটা সাধনার মতো। একদিনে বা কয়েক বছরেও এই সাধনা শেষ হয় না। তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়; যার ওপরটা পাথর, কিন্তু সেই পাথরের ফাটল থেকেই নির্মল পানির ঝরনা বের হয়।

যখন সেই প্রস্তুতি পূর্ণ হয়, মানুষ নিজের রূপান্তর দেখে নিজেই চমকে ওঠে। সে অনুভব করে, তার পিঠে অদৃশ্য দুটো পাখা গজিয়েছে। যে পাখি একসময় বৈষয়িক চাহিদার শিকলে বন্দি ছিল, সে এখন মুক্ত নীলিমায় উড়তে শিখেছে। তার ঠোঁটে শান্তির প্রতীক এক টুকরো সবুজ পাতা। সে উড়ে বেড়ায় ডাল থেকে ডালে, পাহাড়ের চূড়ায়, মেঘের ভেলায়।

Comment