নিবন্ধ: ”মানব মন : ভুলবুঝাবুঝির বাস্কেটে আবদ্ধ এক জটিল বাস্তবতা”

মানব মন এক বিস্ময়কর জগত। অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি আর কল্পনার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই মন অনেক সময় সত্যকে যেমন গ্রহণ করে, তেমনি ভুলকেও সত্য ভেবে আঁকড়ে ধরে। এই কারণেই বলা যায়—মানব মন অনেকটা ভুলবুঝাবুঝির বাস্কেটে আবদ্ধ।

আমরা যা দেখি, শুনি বা অনুভব করি—তার সবটাই যে নির্ভুল, তা নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, শৈশবের শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ এবং মানসিক অবস্থার প্রভাব আমাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। ফলে একই ঘটনা দুইজন মানুষের কাছে দুই রকম অর্থ বহন করতে পারে। এখান থেকেই শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি।

মানুষ প্রায়ই নিজের ধারণাকে চূড়ান্ত সত্য মনে করে। অন্যের কথা শোনার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। এতে করে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, বিশ্বাসে ফাটল ধরে। অনেক সময় সামান্য কথার ভুল ব্যাখ্যা বড় দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। অথচ একটু ধৈর্য, একটু শোনার মানসিকতা থাকলে সেই ভুলবুঝাবুঝি সহজেই এড়ানো যেত।

আরেকটি বড় কারণ হলো অনুমান। আমরা না জেনেই ধরে নিই—অন্যজন কী ভাবছে, কেন এমন বলছে বা কেন এমন করছে। এই অনুমানগুলো বেশিরভাগ সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কিন্তু মন সেই অনুমানকেই সত্য ধরে নিয়ে আবেগ তৈরি করে ফেলে। ফলে মন নিজেই নিজের জন্য একটি ভুলের খাঁচা বানিয়ে নেয়।

আধুনিক সময়ে দ্রুতগতির জীবন, অতিরিক্ত তথ্য আর তুলনার প্রবণতা মানব মনকে আরও অস্থির করে তুলেছে। মনোযোগ কমে যাওয়ায় আমরা গভীরভাবে বোঝার সময় দিই না। অল্প জানাকে পূর্ণ জ্ঞান ভেবে সিদ্ধান্ত নিই। এতে করে ভুলবুঝাবুঝির বাস্কেট আরও ভারী হয়ে ওঠে।

তবে এই বাস্কেট থেকে বেরিয়ে আসার পথও আছে। নিজের ভুল হতে পারে—এই সত্য মেনে নেওয়া, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা, প্রশ্ন করা এবং অনুভূতির আগে যুক্তিকে জায়গা দেওয়া—এই অভ্যাসগুলো মানব মনকে ধীরে ধীরে মুক্ত করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সহানুভূতি। অন্যের অবস্থানে নিজেকে কল্পনা করতে পারলে অনেক ভুল আপনা থেকেই ভেঙে যায়।

মানব মন নিখুঁত নয়, কিন্তু সচেতন হলে উন্নত হতে পারে। ভুলবুঝাবুঝির বাস্কেটে বন্দি মনকে মুক্ত করতে হলে দরকার বোঝার ইচ্ছা, শেখার মানসিকতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই মন হবে ভারমুক্ত, সম্পর্ক হবে স্বচ্ছ, আর সমাজ হবে আরও সুন্দর।

Jannatul Ferdausi

Comment