তালপুকুড়ের বাগানবাড়ি

অনাদি বাবু, তাঁর স্ত্রী রেশমি এবং মেয়ে শ্রী থাকেন সল্টলেকে।
অনাদি বাবুর একটা বাগানবাড়ির খুব শখ। একদিন খবরের কাগজে দেখলেন তালপুকুর গ্রামে খুব সস্তায় একটা একতলা বাড়ি বিক্রি আছে। দেরী না করে যোগাযোগ করে ফেললেন বাড়ির মালিকের সঙ্গে। খুব তাড়াতাড়ি কিনে ফেললেন ওই বাড়িটা।
বাড়িটা এক কাঠা জায়গার উপর “এল” আকৃতির বাড়ি। দুটো ঘর, একটা রান্না ঘর আর একটা বাথরুম। ছোট্ট সুন্দর বাড়ি।
সে বছরের বড়দিনের ছুটিতে অনাদি বাবু তাঁর পরিবার নিয়ে গাড়ি করে রওনা দিলেন বাগান বাড়ির উদ্দেশ্যে। যখন ওনারা পৌঁছলেন তখন প্রায় সন্ধ্যে। গাড়ি থেকে নেমেই ওনারা দেখতে পেলেন ওঠার সিঁড়িতে বসে রয়েছে একটা কালো বিড়াল। তাঁদের দেখতে পেয়েই সেটা উঠে গ্রীলের গেটের ভেতর দিয়ে ঘরের দিকে চলে গেলো। কিন্তু গেলো কোথায়? ভেতরের সব দরজা জানলা তো বন্ধ! অনেক খুঁজেও তাকে আর দেখা গেলো না।
ওনারা তিনজনে ঘরে ঢুকলেন। তারপর হাত পা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে তিনজনে একটু বিশ্রাম নিতে লাগলেন। অনাদি বাবু আর তাঁর স্ত্রী একটা ঘরে আর শ্রী আর একটা ঘরে রইলেন।

হঠাৎ বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। একটা বাজ পড়ল খুব কাছেই আর সঙ্গে সঙ্গে কারেন্টটা চলে গেলো। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা খুট করে শব্দ হতে শ্রী দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে শাড়ী পড়া একটা মহিলা অবয়ব। অন্ধকারে কিছু দেখা না গেলেও তার চোখ দুটো আগুনের ভাঁটার মত জ্বলছে।
শ্রী চিৎকার করে উঠতে তার বাবা মা দৌড়ে এলো টর্চ নিয়ে। টর্চের আলোয় সবাই দেখলো একটা কালো বিড়াল গ্রীলের গেট দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো বাইরে।

শ্রী বেশ ভয় পেয়ে গেছে। সে কিছুতেই একা একটা ঘরে শুতে চাইলো না। অগত্যা খাওয়া দাওয়া করে তাঁরা তিনজনেই শুয়ে পড়লেন একটা ঘরে। সারা দিনের ক্লান্তিতে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লেন সবাই।
তখন প্রায় মাঝ রাত। বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে, সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া। কারেন্ট তখনও আসে নি।
হঠাৎ শ্রী অনুভব করলো কিছু যেন তার পায়ে স্পর্শ করছে। চেয়ে উঠে অন্ধকারের মধ্যে সে দেখলো, শিলিং ফ্যান থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে এক মহিলা। আগুনে চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে তার। সে চেয়ে রয়েছে শ্রীর দিকে, আর তার ঝোলনো পা দুটি দুলে দুলে স্পর্শ করছে শ্রী এর পা দুটি।
শ্রী চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলো। অনাদি বাবু এবং রেশমি দেবী ধড়মড় করে উঠে বসলেন তার চিৎকার শুনে। টর্চ খুজতে লাগলেন কিন্তু পেলেন না। তাঁরাও প্রত্যক্ষ করলেন ওই বিভৎস দৃশ্য। ভয়ে কারো মুখ দিয়েই কোনো কথা বেরোচ্ছে না, শুধু তাঁরা ঠক ঠক করে কাঁপছেন। এমন সময় দড়ি ছিঁড়ে নিচে লাফিয়ে পড়ল সে। খনা গলায় খিল খিল করে হেসে উঠলো। তারপর হঠাৎ ঘরের একটা জানলা দুম করে খুলে গেলো একটা শীতল দমকা হাওয়ায়। সে এগিয়ে চলল জানলার দিকে। জানলার সামনে পৌঁছে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখল অনাদি বাবুদের দিকে। সে কি দৃষ্টি, যেনো চোখ দুটো দিয়ে আগুন ঝরছে।

তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গেলো সে। চারিদিক নিস্তব্ধ, শুধু বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
অনাদি বাবু ঘাড় ঘুরিয়ে চারিদিকে খুঁজতে লাগলেন তাকে। হঠাৎ একটা কালো বিড়াল লাফিয়ে জানলায় উঠে তাকালো অনাদি বাবুদের দিকে। তার চোখ দুটো ভাঁটার মত জ্বলছে। তারপর বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেলো। অনাদি বাবুরা স্থানুর মত বসে রইলেন সারা রাত। অচৈতন্য শ্রী এর জ্ঞান ফিরল পরের দিন সকালে। সে দিনই অনাদি বাবুরা ফিরে গেলেন কলকাতায়। তারপর আর কোনোদিন বাগানবাড়ীতে আসেন নি তাঁরা।

Anjan Roy Chowdhury

Comment