ধোঁয়াশা
জান্নাতুল ফেরদৌসী
পর্ব:০১
পৃথিবীর বুকে শিশুর প্রথম চিৎকারের মতোই, প্রথম স্মৃতিগুলোও কোনো এক অজানা ভয়ের ছোঁয়া নিয়ে আসে। নুসরাতের শৈশব ছিল সেইরকমই—আলো-অন্ধকারের মিশেলে তৈরি এক বিভ্রান্তিকর অধ্যায়। ছোট্ট গ্রামটির, যেখানে তার জন্ম, সবুজে ঘেরা হলেও ঘরের ভেতরকার আঁধার ছিল ঘন।
সে ছিল ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড়। বাবা ছিলেন গ্রামের স্কুল শিক্ষক, শান্ত স্বভাবের মানুষ। কিন্তু তাদের সংসারে শান্তি ছিল না। তার মা ছিলেন জ্বীন দ্বারা আচ্ছন্ন—এটাই সবাই বলত। মাঝরাতে তার মা কখনো নিঃশব্দে হাসতেন, কখনো কান্নায় ভেঙে পড়তেন, কখনোবা কারো সঙ্গে কথা বলতেন, যাকে কেউ দেখতে পেত না।
শৈশবে নুসরাত মাকে ভয় পেত, আবার ভালোবাসতও। মা যখন কোলে টেনে নিতেন, তার মনে হতো পৃথিবীর সব ভয় কেটে গেছে। কিন্তু কিছু রাত ছিল, যেগুলো অন্যরকম—ভয়ঙ্কর। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখত, মা বিছানায় নেই। রান্নাঘরের দিকে গেলে দেখত, মা কেমন যেন অচেনা স্বরে বিড়বিড় করছেন।
“মা, তুমি কী বলছ?” সে একদিন প্রশ্ন করেছিল ভয়ার্ত কণ্ঠে।
তার মা তাকিয়েছিলেন স্থির চোখে, যেন চেনেন না তাকে। তার ঠোঁট কাঁপছিল, শরীর অদ্ভুত এক কম্পনে দুলছিল। “ওরা এসেছে, নুসরাত… আমাকে নিয়ে যেতে। কিন্তু আমি যাব না!” মা ফিসফিস করে বলেছিলেন।
নুসরাত দৌড়ে বাবার কাছে যায়। বাবা মাকে ধরে বিছানায় নিয়ে আসেন, কিন্তু পরদিন সকালে এই ঘটনা নিয়ে কেউ কিছু বলে না। যেন কিছুই হয়নি। এভাবেই চলতে থাকে দিনগুলো।
নুসরাত স্কুলে ভালো ছাত্রী ছিল। শিক্ষকরা বলতেন, সে একদিন বড় কিছু করবে। কিন্তু ঘরের ভেতরকার অস্থিরতা তাকে শান্তিতে থাকতে দিত না। মায়ের আচরণ দিন দিন আরও অদ্ভুত হয়ে উঠছিল। একসময় পরিবারের লোকজনও বিশ্বাস করতে শুরু করল, এটা নিতান্তই মানসিক সমস্যা নয়—এটা কিছু অলৌকিক ! এই বিশ্বাসই তাদের জীবনে আরও ভয় নিয়ে এল।
একদিন, এক গভীর রাতে, যখন সবাই ঘুমিয়ে ছিল, হঠাৎ মায়ের চিৎকারে নুসরাত জেগে ওঠে। ছুটে গিয়ে দেখে, মা বিছানার উপর বসে কাঁপছেন, চোখ উল্টে গেছে, আর ঠোঁট দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। বাবা তাকে ধরে রেখেছেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই মা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
সেই রাতের পর থেকে নুসরাত বুঝতে পারে, তাদের পরিবারে কিছু একটা আছে—অদৃশ্য, ভয়ঙ্কর।কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা তখনও তার জানা হয়নি…
সেই রাতের পর থেকে নুসরাতের জীবন আর আগের মতো থাকেনি। মায়ের আচরণ ধীরে ধীরে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রায়ই শোনা যেত মায়ের অস্বাভাবিক হাসি অথবা ফিসফিসানি।
একদিন বিকেলে, নুসরাত উঠানে বসে স্কুলের পড়া করছিল। আচমকা অনুভব করল, কেউ যেন তাকে দেখছে। সে মাথা তুলে তাকাতেই দেখল—মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, ফাঁকা চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। শরীরে কেমন যেন অনিশ্চিত এক অনুরণন ছড়িয়ে গেল।
“মা, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?” সে দ্বিধাভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
মা কোনো উত্তর দিলেন না। তার ঠোঁটে এক অস্বাভাবিক হাসি খেলা করছিল। ধীরে ধীরে তিনি একপা, দুই পা করে এগিয়ে এলেন।
নুসরাতের গলা শুকিয়ে গেল। সে দ্রুত বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ, মায়ের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন দপদপে আগুনের শিখা।
“তারা এসে গেছে, নুসরাত…” মায়ের গলা যেন দুইটি ভিন্ন স্বরের মিশ্রণ। “তোমাকে নিতে… তোমার পালা এবার।”
নুসরাত চিৎকার করে ঘরের দিকে দৌড় দিল। বাবা তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“বাবা! মা অদ্ভুত কথা বলছে!” সে কাঁপা গলায় বলল।
বাবা ধীরস্থিরভাবে মাকে একবার দেখলেন, তারপর মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন। মা ততক্ষণে আবার স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলেন, যেন কিছুই হয়নি।
“সব ঠিক হয়ে যাবে, মা,” বাবা বললেন, কিন্তু তার কণ্ঠেও ছিল এক গভীর উদ্বেগ।
কিন্তু সত্যিই কি সব ঠিক হতে চলেছে? নাকি নুসরাতের সামনে অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর কিছু?
নুসরাতের মনে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রাতগুলো আরও দীর্ঘ আর ভয়ংকর হয়ে উঠল। সে বুঝতে পেরেছিল, কিছু একটা তার চারপাশে ছায়ার মতো ঘুরছে।
এক রাতে, ঘুম ভেঙে গেল এক অদ্ভুত আওয়াজে। ফিসফিসানি, যেন কেউ তার নাম ধরে ডাকছে। কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসলো। চারপাশ অন্ধকার, শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়েছে ঘরের মেঝেতে।
সে নিঃশব্দে দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল। কারো নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে, কিন্তু ঘরে তো আর কেউ নেই।
“কে?” নুসরাত ফিসফিস করে বলল।
কোনো উত্তর এল না। কিন্তু পরক্ষণেই দরজার পেছন থেকে মায়ের সেই পরিচিত কণ্ঠ—কিন্তু তাতে যেন অন্য কারও ছায়া মিশে আছে।
“ওরা চলে এসেছে, নুসরাত…”
শরীরের রক্ত যেন জমে গেল তার। মা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে, ছায়ার মতো নড়ছে।
সে জানত, এই ভয় তাকে ছাড়বে না।
নুসরাত জানত, এই ভয় তাকে সহজে ছাড়বে না। পরদিন সকালে সে মাকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখতে পেলেও, রাতের সেই অভিজ্ঞতা তার মনের মধ্যে স্থায়ী দাগ কেটে গেছে।
বাড়ির সবাই মায়ের অদ্ভুত আচরণকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু নুসরাত পারছিল না। সে অনুভব করছিল, এই অস্বাভাবিকতা শুধু তার মায়ের নয়, পুরো বাড়িটাই যেন ধীরে ধীরে ছায়ার রাজ্যে ঢুকে যাচ্ছে। অন্ধকারে যেন কেউ ঘুরে বেড়ায়, নিঃশব্দে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করে।
এক রাতে, পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। হঠাৎ কানে এলো পায়ের শব্দ, ধীর, ভারী, যেন কেউ তার ঘরের সামনে দিয়ে হাঁটছে। ভয়ে জমে গেল সে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগল। হৃদপিণ্ডের ধুকধুকানি যেন সমগ্র ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
হঠাৎ দরজায় ধাক্কা! একবার… দুইবার… তিনবার…
তার গলা শুকিয়ে এল। উঠে দাঁড়াতে পারল না। দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই পরিচিত কণ্ঠ, এবার আরও স্পষ্ট,
“নুসরাত… দরজা খোলো…”
মায়ের কণ্ঠ হলেও, তাতে ছিল অদ্ভুত শীতলতা। সেই কণ্ঠ যেন তার মায়ের নয়, বরং কারো সঙ্গে মিশে যাওয়া ভয়ংকর এক অস্তিত্বের। নুসরাতের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ের আগের সেই রাতগুলোর দৃশ্য—যখন তিনি একা বিড়বিড় করতেন, অন্ধকারে চেয়ে থাকতেন, কিংবা এমন কারো সঙ্গে কথা বলতেন, যাকে কেউ দেখতে পেত না।
দরজার নিচ দিয়ে হালকা ছায়া দেখা গেল। কেউ দাঁড়িয়ে আছে!
সে এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল যে চিৎকার করে উঠতে পারল না। ধীরে ধীরে ছায়াটি সরে গেল, নিঃশব্দে মিলিয়ে গেল অন্ধকারের গহ্বরে।
নুসরাত বিছানায় বসে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু একটা তাকে দেখছে, তার দিকে এগিয়ে আসছে।
ভোর হলে নুসরাত উঠে বাইরে গেল। উঠোনে দাঁড়িয়ে গায়ে রোদের উষ্ণতা নিতে চাইল, যেন রাতের আতঙ্ক কিছুটা কমে। কিন্তু তখনই সে দেখতে পেল দরজার সামনে ছোপ ছোপ কাদামাখা পায়ের ছাপ।
সে থমকে গেল। রাতের বৃষ্টিতে উঠোনের মাটি ভিজে ছিল, কিন্তু প্রশ্ন ছিল—এই ছাপ কার?
নুসরাতের মাথায় প্রশ্ন গিজগিজ করছিল। কেউ কি সত্যিই এসেছিল, নাকি সে নিজেই ধোঁয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে?
নুসরাত কাদামাখা পায়ের ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। একবার নয়, বারবার নিজের চোখের দেখাকে প্রশ্ন করতে লাগল। এগুলো কি সত্যিই সেখানে ছিল, নাকি তার মনের ভুল? কিন্তু না, ছাপগুলো স্পষ্ট, গভীর। যেন কেউ ভেজা মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে এসেছে এবং হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেছে।
সে ধীরে ধীরে পায়ের ছাপ অনুসরণ করে উঠোনের মাঝামাঝি গিয়ে থামল। এখানেই শেষ হয়ে গেছে! কিন্তু কেউ যদি হেঁটে এসে থাকে, তবে সে গেল কোথায়?
গা ছমছম করে উঠল তার। বাতাসটা একটু আগের চেয়ে ঠান্ডা লাগছিল, শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তাকে দেখছে। চারপাশে তাকাল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না।
“নুসরাত! এত সকালে বাইরে কেন?”
বাবার কণ্ঠ শুনেই সে চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল। বাবাকে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেল, কিন্তু মনে হল, তাকে কীভাবে বলা যায় রাতের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা? বাবা তো সবসময় বলে এসেছেন, এসব আসলে তার কল্পনা।
“কিছু না বাবা, আমি একটু হেঁটে নিচ্ছিলাম।” মিথ্যা বলল সে, কারণ সত্যি বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না।
বাবা খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর ঘরে চলে গেলেন। কিন্তু নুসরাত বুঝতে পারল, তার বাবার চোখেও উদ্বেগের ছাপ ছিল।
রাত নামল, নুসরাতের ভেতর আতঙ্ক আবার ফিরে এলো। সারাদিন সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছে, কিন্তু রাতে সেই ছায়ার অস্তিত্ব আরও প্রকট হয়ে উঠবে, এটা সে জানত।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে রইল। কাঁটা এগিয়ে চলেছে, রাত গভীর হচ্ছে। হঠাৎ জানালার পর্দা নড়ল, যেন বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় দেখতে পেল, জানালার ওপাশে একজোড়া চোখ! অস্বাভাবিক লালচে আভায় জ্বলছে।
তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না, হাত-পা অবশ হয়ে এল। চোখের সামনে ধীরে ধীরে ছায়ামূর্তিটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে, আর নুসরাত অনুভব করল, এবার সে সত্যিই ধোঁয়াশার অতল গহ্বরে ডুবে যাচ্ছে…
নুসরাতের নিঃশ্বাস আটকে আসতে থাকে। চোখের সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেই ছায়ামূর্তি। তার হৃদস্পন্দন এত জোরে চলছিল যে মনে হচ্ছিল, পুরো ঘরেই তার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই কি ভয় শেষ হয়ে যায়? বরং আরও গাঢ় হয়ে আসে। ফিসফিস শব্দ কানে এল, যেন কেউ জানালার ওপাশ থেকে তাকে ডাকছে।
“নুসরাত…”
চোখ খুলতে সাহস পেল না। কিন্তু অনুভব করল, কিছু একটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। জানালার পর্দা ধীরে ধীরে দুলে উঠল, হাওয়ার তোড়ে নয়—বরং যেন কেউ ইচ্ছে করে সরাচ্ছে।
তার হাতের আঙুল জমে আসছিল। শরীর অবশ হয়ে গেছে। শব্দ বের করার চেষ্টা করেও পারল না।
হঠাৎ পেছন থেকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। পায়ের শব্দও শোনা গেল, যেন কেউ ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে।
কেউ কি ঘরে ঢুকে পড়েছে ?
https://khoborjal25.blogspot.com
https://fliphtml5.com/dashboard/public-profile/uxwda?lang=en
