সুখী হোক সুস্মিতা

খবরটি হজম করতে কয়েক মুহূর্ত সময় লেগেছিল অভির।কিন্তু ঐটুকুই!তারপর থেকেই বেশ ঝরঝরে লাগছে তার।মনে হচ্ছে, তার মাথার উপর থেকে একটা জগদ্দল পাথর সরিয়ে নিয়েছে কেউ। অথচ,সত্যি বলতে, তার তেমন কোনো দায়ই নেই এতে।তবুও কেন যেন নিজের মনের মধ্যে সুস্মিতার জন্য একটা মায়া বোধ করতো সে।

হ্যাঁ, সুস্মিতার কথাই বলছি।বড় অভাগী মেয়ে।দেখতে সুন্দরী, চলনে-বলনে স্মার্ট।শুধু ভাগ্য তাকে বার বার আনস্মার্ট করে দেয়।বাবা-মার পছন্দে প্রথমবার বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল সে।বর প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য। নিজের আগের একটা বিয়ের কথা গোপন করে সুস্মিতাকে বিয়ে করেছিল।ব্যাপারটি ফাঁস হবার পর সুস্মিতা আর তার ঘর করেনি।

সুস্মিতাকে অভি প্রথম দেখেছিল তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।কথা হয়েছিল কিনা মনে নেই অভির।তারপর একই জায়গায় আরো বার কয়েক দেখা।হাই-হ্যালো হয়ে থাকলেও থাকতে পারে।সেই বন্ধুর কাছেই সুস্মিতার জীবনের প্রথম ঝড়ের কথা জানতে পারে অভি।ঘটনা এখানেই থেমে থাকলে ভালো হতো।এইটুকু করুণ কাহিনি নিয়ে কোনো গল্পকার গল্প ফাঁদার আগ্রহ দেখাতো না।

কিন্তু ঘটনা দিকে মোড় নেয় যখন অভির সেই বন্ধুর স্ত্রী চতুর্থ সন্তান প্রসব করতে গিয়ে টিটেনাস আক্রান্ত হয়ে তিন/চারদিনের কন্যা রেখে মারা যায়।
জাগতিক নিয়মেই যখন সেই বন্ধুর বিয়ে করার দরকার হলো,মূল সমস্যার সৃষ্টি সেখানেই। অভিই তার বন্ধুকে সুস্মিতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
সুস্মিতার বাড়ির আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং পড়ালেখায় এগিয়ে থাকার কারণে বন্ধু গড়সাহস করে।বিভিন্ন টিপস্ শিখিয়ে অভিই বন্ধুকে উসকে দিয়েছিল এবং সুস্মিতা তার বন্ধুর ঘরে ঠাঁই নিয়েছিল। ঘটনাটি এখানেই শেষ হতে পারতো কিন্তু তা হয়নি।

সুস্মিতার কোল আলো করে এক পুত্র সন্তান এলো। অভির বন্ধুটিও যার পর নাই খুশি।এখানে বলে রাখা দরকার, সুস্মিতাকে ঘরে আনার পর থেকেই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অভির বন্ধুর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। সংসারে নেমে আসে চরম অর্থ সংকট। অভি এবং তার অন্য বন্ধুরা মিলে আর্থিকভাবে সাহায্য করার পরও তার ব্যবসা আর ঘুরে দাঁড়ায়নি।এরইমাঝে সারাবিশ্বে নেমে এলো মহামারী কোভিড’১৯।অভির বন্ধু কাম সুস্মিতার বর স্বামী আক্রান্ত হয় করোনা ভাইরাসে। বিধাতার দয়ায় সে যাত্রায় বেঁচে যায় সে।

এর বছর দেড়েক পরেই আসে বড় ধাক্কাটি।সন্ধ্যাবেলায় বুকে ব্যথা নিয়ে চলে যায় জেলা সদর হাসপাতালে। অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে রেফার করা হয়,ময়মনসিংহ, সেখান থেকে ঢাকা। কিন্তু না, শেষ রক্ষা হলো না।
ভোরবেলায় অভির কাছে ফোন আসে বন্ধুর মৃত্যু সংবাদ নিয়ে।
অভি হারালো তার পরম বন্ধু আর সুস্মিতা মাথায় পড়লো বাজ।
শুধু মাথা গুঁজবার মতো ছোট্ট একটা ঘর ছাড়া সম্পদ বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
২৫/২৬ বছরের এক যুবতীর কোলে ৭/৮ বছরের এক ছেলে।একমাত্র ছেলে অবলম্বন করে অনেক মায়ের বেঁচে থাকার ইতিহাস আমার জানি।কিন্তু তাদের আর্থিক একটা ভিত্তি থাকে।অন্তত দু’বেলা পেটের ভাত আর মোটা কাপড়ের চিন্তা করতে হয় না।কিন্তু আমাদের সুস্মিতা?

সুতরাং, সুস্মিতার বিয়ের খবরে অভির খুশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।তবে, দুঃখ হচ্ছে, সুস্মিতার ছেলের কথা ভেবে।একটা ১২/১৩ বছরের ছেলে।শৈশবে পিতৃহীন, কৈশোরে মায়ের সাথে অদৃশ্য ব্যবধান।কেমন হবে তার ভবিষ্যৎ?আসুন, আমরা সবাই প্রার্থনা করি, সুখী হোক সুস্মিতা। মানুষ হোক তার কিশোর পুত্র।

Md. Golam Rabiul Alam

Comment