ধোঁয়াশা
জান্নাতুল ফেরদৌসী
পর্ব : ০২
অন্ধকারে, জানালার বাইরে দাঁড়ানো সেই ছায়াটা যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। কিন্তু পেছনের উপস্থিতিটা আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। নুসরাত টের পেল, ঘরের ভেতরেও কেউ আছে।
তার চোখ বড় হয়ে গেল। এতদিন সে শুধু অনুভব করেছিল, আজ সে বুঝতে পারছে… কেউ সত্যিই এখানে আছে!
নুসরাত ধীরে ধীরে পেছন ফিরল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, তবে তার অনুভূতি তাকে স্পষ্ট করে বলে চলেছিল—কেউ দাঁড়িয়ে আছে ঘরের কোণে।
তার ঠোঁট শুকিয়ে এল, গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না। হঠাৎ করে বাতাসের চাপ একটু বেড়ে গেল, যেন কোনো ভারী উপস্থিতি ঘরের পরিবেশ দখল করে নিচ্ছে।
নুসরাত কাপতে কাপতে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তখনই একটি শীতল হাত তার কাঁধে পড়ল।
চিৎকার করে উঠতে চাইল সে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হল না।
“নুসরাত…” এবার আওয়াজটা একেবারে কাছ থেকে এলো।
সে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। মাথার ভেতর সবকিছু ঘুরপাক খাচ্ছিল।
এতদিন যেসব ঘটনা সে কেবল অনুভব করছিল, আজ তা বাস্তব হয়ে ধরা দিল তার সামনে।
বাইরে থেকে কেউ দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।
“নুসরাত! দরজা খোলো!”
এটা বাবার কণ্ঠ!
কিন্তু তার ঠিক পাশেই, ছায়ার মতো যে অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে আছে, তার গলায়ও একই রকম কণ্ঠ…
“নুসরাত… দরজা খোলো…”
নুসরাতের শরীর থরথর করে কাঁপছিল। দরজার বাইরে তার বাবার গলা, আর পাশেই ছায়ার মতো অস্তিত্বের একই রকম কণ্ঠস্বর! কোনটা সত্যি? কোনটা ভ্রান্তি?
সে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যাচ্ছে। মনে হলো, পুরো ঘরটা ধীরে ধীরে তার চারপাশে ঘুরছে। তার মাথার মধ্যে অদ্ভুত এক গুঞ্জন বাজতে থাকে, যেন অসংখ্য ফিসফিসানি তাকে ঘিরে ধরেছে।
“নুসরাত…” ছায়াটি আবার ডাকল। এবার গলাটা একটু কর্কশ শোনাল, যেন কেউ অনেক কষ্টে গলার স্বর নকল করছে। তার চারপাশের বাতাস হিম হয়ে গেল।
দরজার ধাক্কা বেড়ে গেল।
“নুসরাত! আমি বাবা বলছি! দরজা খোলো!”
নুসরাতের বুক ধুকধুক করছিল। সে কি সত্যিই তার বাবার কণ্ঠ শুনছে, নাকি ভয় তাকে বিভ্রান্ত করছে? তার মনের ভেতর এক অজানা আতঙ্ক ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
তার কাঁধে থাকা শীতল হাতের চাপ হঠাৎ শক্ত হলো। সে অনুভব করল, হাতটা ধীরে ধীরে তার গলার দিকে সরছে।
তার শ্বাস আটকে আসছিল। পুরো শরীর শক্ত হয়ে যেতে থাকে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে স্থবির করে রেখেছে।
সে প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে উঠল।
ঘরটা কেঁপে উঠল, বাতাসের মধ্যে যেন ফিসফিস শব্দ আরও জোরালো হলো। দরজায় ধাক্কা দেওয়াও থেমে গেল।
নুসরাত কাঁপতে কাঁপতে চোখ খুলল, কিন্তু সে তার সামনে যা দেখল, তাতে তার ভেতরের সমস্ত সাহস মুহূর্তেই গলে গেল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুটি অবয়ব—একটি তার বাবার, আরেকটি অন্ধকারের এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি। উভয়েই একই রকম মুখ, একই গলার স্বর। কিন্তু কোনটি তার সত্যিকারের বাবা?
নুসরাত আর্তনাদ করে উঠল, ভয়ে পেছনে সরে যেতে চাইল, কিন্তু পা যেন জমে গেল মাটিতে।
ছায়াটি তার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে। হঠাৎ করে বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে গেল, দরজার কড়া নাড়ার শব্দ থেমে গিয়ে ঘরে যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
তার মাথা ঘুরছিল। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছিল। কিন্তু তার দৃষ্টি আটকে ছিল সেই ছায়ার দিকে।
“নুসরাত…” গলাটা আরও বিকৃত হয়ে উঠল। এবার যেন চারপাশ থেকে একই কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
সে কি বাস্তবে আছে, নাকি কোনো দুঃস্বপ্নের ঘূর্ণিতে আটকে গেছে?
তার চোখের সামনে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলো।
নুসরাতের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছিল। বাতাস ভারী হয়ে গেছে, যেন অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি অবয়বের মধ্যে কোনটি সত্যি, কোনটি মিথ্যা—সে বুঝতে পারছিল না।
“নুসরাত, আমি তোমার বাবা! ভয় পেয়ো না, দরজা খুলে দাও!” দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর যেন মুহূর্তে তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল।
কিন্তু পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ার মতো অস্তিত্ব আবারও বলল, “নুসরাত, দরজা খুলো! আমি তোমার বাবা!”
তার মস্তিষ্ক দ্বিধায় বিভ্রান্ত হয়ে গেল। কাকে বিশ্বাস করবে? যদি ভুল করে ছায়াটিকেই সত্যি মনে করে ফেলে? যদি দরজা খুলে তার বাবাকে সত্যিই হারিয়ে ফেলে?
সে কাঁপতে কাঁপতে এক পা পিছিয়ে গেল। ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। এবার তার চোখ দুটো লালচে আভায় জ্বলজ্বল করছে।
নুসরাত প্রচণ্ড ভয় পেয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল। দরজার হাতল ধরতে যাবে, ঠিক তখনই তার পায়ের নিচের মাটি সরে যেতে লাগল!
ঘরের ভেতর যেন আকস্মিক কোনো অদৃশ্য শক্তির ঝড় বইতে শুরু করে। জানালার পর্দা প্রচণ্ড গতিতে উড়তে লাগল। বইয়ের তাকে রাখা বইগুলো নিচে পড়ে ছড়িয়ে পড়ল। বাতাসের মধ্যে এক অদ্ভুত গুঞ্জন ধ্বনিত হতে থাকল, যেন কেউ মন্ত্র উচ্চারণ করছে।
নুসরাত পাগলের মতো দরজার হাতল ধরে টান দিতে লাগল। দরজাটি যেন অদৃশ্য শক্তি দ্বারা বন্ধ হয়ে গেছে।
পেছনের ছায়াটি আরও কাছে চলে এসেছে। তার ঠোঁট বিকৃত হাসিতে বেঁকে আছে। লাল চোখদুটি জ্বলজ্বল করছে।
“নুসরাত, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না?”
তার ভয় যেন আরও বেড়ে গেল। সে বুঝতে পারল, আজ রাতে কিছু না কিছু ঘটবেই।
বাইরে থেকে আবার দরজায় আঘাত পড়ল। এবার আরও জোরে।
“নুসরাত! শোনো! দরজা খুলতে পারছ না বুঝি? আমি সাহায্য করছি!”
বাবার গলায় আতঙ্কের ছাপ।
এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু স্থির হয়ে গেল। চারপাশের বাতাস স্থবির হয়ে এল। নুসরাত অনুভব করল, পুরো ঘরটি যেন এক অদৃশ্য শক্তির কবলে আছে।
তার কানে এক ভয়ানক শব্দ ভেসে এল—
একটি বিকট, অশুভ হাসির শব্দ।
নুসরাত ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। তার চারপাশে সবকিছু ঘোলাটে হয়ে গেল।
তারপর… নিস্তব্ধতা।
নুসরাতের চোখ ধীরে ধীরে অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল, কিন্তু তার মস্তিষ্ক এখনও দ্বিধাগ্রস্ত। দরজার ওপাশে তার বাবার গলা, অথচ ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াও একই স্বরে কথা বলছে! কোনটা সত্যি? কোনটা মিথ্যা? যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার জীবনে এক ভয়ানক পরিণতি অপেক্ষা করছে।
চারপাশের বাতাস আবারও ভারী হয়ে এলো। অদৃশ্য শক্তি যেন পুরো ঘরটাকে ঘিরে ফেলেছে।
নুসরাত শক্ত করে চোখ বন্ধ করল। ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ তাকে বলছিল—নিজেকে শান্ত করো, মনোযোগ দাও।
সে গভীরভাবে শ্বাস নিল এবং আচমকা চোখ খুলে ফেলল।
ছায়ামূর্তিটির ঠোঁট বিকৃত হাসিতে কেঁপে উঠল। নুসরাত এবার তার চোখের দিকে তাকাল—সেখানে শুধুই শূন্যতা!
নুসরাত হঠাৎ অনুভব করল, তার শরীর যেন একটা শীতল তরঙ্গে ঢেকে যাচ্ছে। মাথার চুলগুলো এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে গেল।
ছায়াটি এবার ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে।
দরজার ওপাশ থেকে বাবা বারবার ধাক্কা দিতে থাকলেন।
“নুসরাত! শোনো! তুমি যাই দেখছো, বিশ্বাস কোরো না! দরজা খোলো, তাড়াতাড়ি!”
নুসরাতের চোখে পানি চলে এল। বাবার কণ্ঠস্বর সত্যি না কি ভ্রান্তি, তা বোঝা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ করেই, ছায়ামূর্তিটির হাত তার কাঁধ ছুঁয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই এক দুঃসহ শীতলতা তার সারা শরীর জড়িয়ে ধরল। বুকের মধ্যে কিছু একটা চেপে ধরেছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে।
সে তীব্র আর্তনাদ করে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজাটা প্রবল এক ধাক্কায় খুলে গেল। বাইরে থেকে প্রবল আলো ঘরে প্রবেশ করল। বাতাসের তীব্র ঝাপটায় ছায়ামূর্তিটি হঠাৎ এক বিকট গর্জন করে ছিটকে গেল।
নুসরাত মাটিতে পড়ে গেল, শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে। বাবার শক্ত হাত তাকে জড়িয়ে ধরল।
“তোমাকে বলেছিলাম না, কিছুতেই ভয় পেতে নেই?” বাবার কণ্ঠ উদ্বেগে কাঁপতে থাকে।
নুসরাতের ঠোঁট নড়ে ওঠে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হল না।
সে জানত, এই রাতের শেষ এখানেই নয়।
পরদিন সকালে, নুসরাত বিছানায় শুয়ে ছিল। তার সারা শরীর অবসন্ন। বাবা চুপচাপ তার পাশে বসে ছিলেন।
“তোমার মা… এই জিনিসগুলোকে ছোটবেলা থেকেই সামলাতে শিখেছিল,” বাবা ধীরে ধীরে বললেন।
নুসরাত বাবার মুখের দিকে তাকাল। “কিন্তু মা তো সবসময় অশান্তির মধ্যে থাকতেন।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তুমি জানো না, তোমার মাকে কতটা সংগ্রাম করতে হয়েছিল।”
নুসরাত চুপ হয়ে গেল।
তার মায়ের চোখের সেই উদাসীন দৃষ্টি, বারবার নিজেই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করা, কখনও চুপচাপ বসে থাকা, আবার হঠাৎ করেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠা—এই সবকিছু মনে পড়ে গেল।
বাবা আবার বললেন, “তোমার রক্তেই আছে এই শক্তি। তুমি যদি ভয় পেয়ে বসে থাকো, তাহলে সেটাই তোমাকে গ্রাস করবে।”
নুসরাতের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সে জানত, তার জীবনে এই ঘটনাগুলো আরও ঘটতে থাকবে। কিন্তু সে কি পারবে এই ছায়াদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে?
বাইরে বাতাসের এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো।
নুসরাত জানত, সে এক মুহূর্তের জন্য নিরাপদ, কিন্তু কতদিন?
ঘরের জানালার পর্দা হঠাৎ অদৃশ্য বাতাসে দুলে ওঠে, যেন কেউ সেখানে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। নুসরাতের গলা শুকিয়ে গেল। সে জানত, তার সামনে আরও গভীর অন্ধকার অপেক্ষা করছে।
রাতে যখন ঘরের সব আলো নিভে গেল, নুসরাত একা বিছানায় শুয়ে রইল। তার মাথার মধ্যে হাজারও প্রশ্ন ঘুরতে থাকে।
তার মায়ের মতো কি সেও এই অশুভ শক্তির শিকার হতে চলেছে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সত্য?
কিছুক্ষণ পর, জানালার বাইরে এক অদ্ভুত শব্দ হল। যেন কেউ ধীরে ধীরে তার ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রথমে ধীর, তারপর একটু দ্রুত, যেন অজানা কোনো ছায়া তাকে ঘিরে ধরতে চায়।
নুসরাত নিজের শ্বাস আটকে রাখল।
তার বুকের মধ্যে দমচাপা ভয় কাজ করছিল, কিন্তু সে এবার পালাবে না। সে জানতে চায়, এই ছায়াগুলো তাকে কেন তাড়া করছে।
আচমকা দরজার ফাঁক দিয়ে ধোঁয়ার মতো একটা কুয়াশা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। বাতাসের মধ্যে এক অদ্ভুত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল, যেন পোড়া কাঠ বা ধূপের গন্ধ। সেই গন্ধ নাকে আসতেই তার শ্বাস ভারী হয়ে এলো, গলার মধ্যে যেন কিছু একটা আটকে গেল।
নুসরাত ধীরে ধীরে উঠে বসলো।
তার চোখ বড় হয়ে গেল—সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াগুলো এবার ধীরে ধীরে আকার নিতে লাগল। অন্ধকারের মধ্যে তারা যেন কাঁপছে, কুয়াশার মতো সরে যাচ্ছে, আবার এক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এগুলো শুধু ছায়া নয়—এগুলো তার অতীতের কিছু অব্যক্ত স্মৃতি, যা ধীরে ধীরে তার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে।
তার মায়ের অশ্রুসিক্ত মুখ, তার বাবার ভয়ার্ত দৃষ্টি, ছোটবেলার কোনো এক গভীর রাতের এক ভয়ঙ্কর স্মৃতি—সব মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় রূপ নিচ্ছে।
তার ঘরের কোণ থেকে শীষ বাজানোর মতো একটা বিকট শব্দ ভেসে এলো। যেন কেউ ফিসফিস করে বলছে, “তুমি জানো না, নুসরাত… কিন্তু আমরা জানি…”
নুসরাতের হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গেল। সে অনুভব করল, অন্ধকার এখন শুধু বাইরের নয়, তার ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ছে।
jannatul-ferdausi
