জন্মদিনের কেক
সৌমেন্দ্র নাথ গোস্বামী
সম্প্রীতি নাম তার। নামের সাথে মিলও চমৎকার। সম্প্রীতি অর্থ সদ্ভাব, সৌহার্দ্য । সকলের সাথেই তার ভাব। সকলের সাথে বন্ধুত্ব গড়তে তার জুড়ি মেলা ভার। সেখানে ছেলে মেয়ে, ধনী, গরীব, বড়,ছোট কোন ভেদাভেদ নেই। তার কথা বন্ধুত্ব সবার সাথেই হতে পারে। ছোট হলে সেখানে থাকবে স্নেহ, ভালোবাসা বড় হলে শ্রদ্ধা, ভক্তি। সমবয়সী হলে সে তো প্রকৃত বন্ধু।
সবার সাথে বন্ধুত্বে মনোনিবেশ করলেও তার একটা খারাপ গুণ আছে তা হলো জেদ। জেদ খুব বেশি। যেমন খাবো না বললে খাবে না, কোথাও বেড়াতে যাবো বললে যেতেই হবে,কোনকিছু প্রয়োজন হলে কিনতেই হবে। সত্যিই তার জেদের সীমা নেই। তবে জেদ কখনও কখনও ভালোর জন্যও হয়। এজন্য তার বাবা তার জেদ মেটাতে তৎপর থাকেন এমনকি তিনি যদি সমস্যায়ও থাকেন!
একদিন বায়না ধরলো বেড়াতে যাবো। কোথায়? শিশুপার্কে। বাবার সময় নেই। কিন্তু তিনি তো মেয়ের জেদ সম্পর্কে অবগত আছেন। অনেক কষ্টে সময় বের করে মেয়েকে নিয়ে গেলেন শিশুপার্কে। সেখানে সে খেলাধুলা করলো,দোলনায় দোলনা খেলো। হঠাৎ করে বাবাকে বললো “বাবা তুমিও আমার সাথে দোল খাও।” কি আর করা বাবাও রাজি হলেন না হলেই তো সমস্যা। দোলনা খেতে-খেতে ভাজা ওয়ালাকে দেখে ভাজা খাবার ইচ্ছে। বাবা বললো “মারে ভাজা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তার থেকে পেয়ারা খাও।” না আমি ভাজা খাবোই মেয়ে বলে। তারপর বাবা ভাজা কিনে দিলেন। এরপর বাবাকে বললো “তুমিও খাও।” ইচ্ছে না থাকলেও বাবার খাওয়া লাগলো। হঠাৎ দেখতে পেলো একটি ছোট্ট ছেলের পরনে ছেঁড়া জামা।। দেখে মনে হচ্ছে খুব ক্ষুধার্ত। মেয়ে বললো “বাবা ছেলেটিকে কিছু কিনে দাওনা খাবার কিছু আর কিছু টাকা দাও জামা কেনার জন্য। ” বাবা ছেলেটির সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলো ছেলেটি এতিম দেখার কেউ নেই। পরে ছেলেটিকে পাউরুটি, কলা কিনে দিলেন খাবার জন্য আর ফোন নম্বরটা দিয়ে দিলেন তার সাথে যোগাযোগ করতে,বাড়ির ঠিকানাও দিয়ে দিলেন।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসার পর হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসলো সম্প্রীতি। খাবার সময় মা ডেকে ডেকে অস্থির খেতে আয়,খেতে আয়! হঠাৎ জেদ ধরলো বাবা খাইয়ে না দিলে খাবে না। সবার খাওয়া শেষ। পরে বাবা মেয়েকে খাইয়ে দিলেন কারণ মেয়ে যে অভুক্ত থাকবে। এটা তার সইবে কেমনে? সে যে আদরের ধণ, দুই নয়নের মণি! তারপর ঘুমাবার পালা। এবার শুরু হলো বাবার কাছে ঘুমাবে। বাবার রাজ্যের কাজ পড়ে আছে এদিকে মেয়ে তাকে ছাড়া ঘুমাবে না। তাই বাধ্য হয়ে আগে মেয়েকে ঘুম পারিয়ে হাতের কাজ সারলেন। অর্থাৎ সকালে ঘুম থেকে উঠে রাত্রে শোবার সময় পর্যন্ত সম্প্রীতির জেদ চলতেই থাকে কোন না কোন কিছু নিয়ে।
একদিন ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলো যে তার জন্মদিন। বাবাও বুঝতে পারলো আবার শুরু হবে। যথারীতি মেয়ে বললো “বাবা আমার আজ জন্মদিন।” বাবা বললেন “শুভ জন্মদিন মা। অনেক বড় হও। ” মেয়ে বললো যে তার জন্য কেক কেনা লাগবে। বাবা বললেন “মারে জন্মদিনে আবার কেক কিসের এগুলো বিলাসিতা। ধান দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করবো আর পরমান্ন খাওয়াবো। এটাই জন্মদিনের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা। ঐসব কেক কাটা তো পশ্চিমা দেশগুলোর রীতি। তাছাড়া কেকের কত দাম!”
মেয়ে বললো” বাবা তুমি কেক নিয়ে আসবে আমি আমার বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করবো।” তার বন্ধু মানে তো সবাই! আরো বললো “বাবা আমি বাড়ির পাশে কিছু গরীব লোকেদের নিমন্ত্রণ করবো, তারা কোনদিন জন্মদিন পালন করেনা, ভালো কিছু খেতে পারেনা। ” বাবা বললো “ঠিক আছে মা, তোর যা ইচ্ছে। ” বিকেলে ঘরোয়া পরিবেশে ধান দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে ঘিয়ের প্রদীপ দেখিয়ে পরমান্ন খাইয়ে জন্মদিন পালিত হলো।আর সন্ধ্যাবেলায় ঘটা করে জন্মদিনের কেক দিয়ে আশেপাশের সবাইকে নিয়ে আধুনিক জন্মদিন উদযাপিত হলো। সবাই খুব খুশি। মেয়ের মুখেও হাসি! আর মেয়ের মুখে হাসি দেখে বাবাও খুব খুশি। কারণ মেয়ের সুখতো বাবারই সুখ!
সৌমেন্দ্র নাথ গোস্বামী
শিক্ষক ও লেখক
লোচনগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
নাটোর সদর, নাটোর।
মোবাইল নম্বর -০১৭১৯ -৬৭০২৭২
Soumendra Nath Goswami
