সময়-ধাঁধার মৃতদেহ
Ritisha Mittra Reu
থিম : গল্পটির মূল থিম হলো সময় এবং বাস্তবতার সীমা পরীক্ষা। এখানে দেখানো হয়েছে যে প্রযুক্তি বা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এমন ক্ষমতা দিতে পারে যা মানুষকে সময়ের নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম করে। ড. রৌনকের দুই দেহের ঘটনা দেখায় যে ভবিষ্যত ও অতীতের মধ্যে সংযোগ মানে মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের সীমারেখা অদৃশ্য। কিউবের মাধ্যমে সময়ের ঝলক দেখানো হয়েছে, যা মানুষের দৃষ্টিকোণকে এবং অস্তিত্বের ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। গল্পে গোয়েন্দা শৈলেশকে যিনি তদন্ত করেন, শেষ পর্যন্ত নিজেই সময়ের খপ্পরে পড়ে যান, যা দেখায় যে জ্ঞান ও অনুসন্ধানও বিপদজনক হতে পারে। ছদ্ম-দেহের ব্যবহার ভ্রান্তি ও ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে, অর্থাৎ বাস্তবতার প্রতি আমাদের ধারণা সবসময় বিশ্বাসযোগ্য নয়। সবশেষে, গল্প বলছে যে সময়কে বোঝা বা দখল করা সহজ নয়; এটি সবসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে।
সূচনা:
রাত ২টা ৪৩ মিনিট। ঢাকার মেট্রো পুলিশের টাইম-অ্যানোমালি ইউনিটে এক আতঙ্কভরা কল আসে। বাড্ডার একটি উচ্চ ভবনের ১৭ তলায় এক ফ্ল্যাটে একজন মৃত। কিন্তু টুইস্ট হলো—মৃতদেহ নাকি এক ব্যক্তিরই দুই ভিন্ন বয়সের প্রতিরূপ। অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক, অথচ অবিশ্বাস্যভাবে সত্য।
গোয়েন্দা শৈলেশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোরের প্রথম আলো ফুটেছে। ফ্ল্যাটের দরজা অটো-লকড, ভিতর থেকে সুরক্ষিত। কোড কেবল ভুক্তভোগীর। তবুও ঘরে দু’টি দেহ—একটি যুবক, আরেকটি প্রবীণ। চেহারা এক, ডিএনএ এক, কিন্তু বয়সের ব্যবধানে প্রায় দুই যুগ। দুটি মৃতদেহ একই ব্যক্তির অথচ কোনো লজিকে দুই সময়ের দুই সংস্করণ একসাথে মরে ফেলে—এটা তো বৈজ্ঞানিক অসম্ভবেরও বাইরে।
ক্যামেরা ফুটেজ ঘেঁটে দেখা গেল—কেউ ঢোকেনি, কেউ বেরও হননি। ক্যামেরা ব্ল্যাকআউটও হয়নি। কিন্তু দুটো দেহ সেখানে পড়ে আছে। এটাই সবচেয়ে ভয়ের জায়গা—অদৃশ্য প্রবেশের চিহ্ন পর্যন্ত নেই।
২৩ বছরের দেহটির হাতে শক্তভাবে চেপে থাকা ছোট এক কালো কিউব শৈলেশের চোখে পড়ল। কিউবটির উপর খোদাই করা ছিল জ্বলজ্বলে লেজার-লেখা—“সময় ধার নিলে, সুদও ফেরত দিতে হয়।”
শৈলেশ কিউবটি তুলতেই কিউব এক নিঃশব্দ তাপে তার আঙুল কামড়ে ধরলো যেন। মুহূর্তেই তার মাথার ভিতর এক অতি-সংক্ষিপ্ত, অস্বাভাবিক দৃশ্য ঝলসে উঠল—সামান্য ভবিষ্যৎ। সব মিলিয়ে আধা সেকেন্ড। এতটাই তীব্র যে সে কিউবটা টেবিলে ফেলে দিল। কিউব ম্লান আলোয় শুয়ে রইল, যেন অন্ধকারে তাকিয়ে আছে।
গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা গেল—কিউবের ভেতরে কোনো সার্কিট নেই। কোনো শক্তির উৎস নেই। কিন্তু এটা টাইম-ডেটা সঞ্চয় ও প্রেরণ করতে পারে—যেন সময়ের ভিতর দিয়ে বার্তা পাঠানো যায়। বর্তমানের প্রযুক্তির বহু স্তর ছাড়িয়ে থাকা এক ভিন-যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা।
পরিচয় পাওয়া গেল মৃত ব্যক্তির—ড. রৌনক গুহ, পাগল প্রতিভা হিসেবে খ্যাত কোয়ান্টাম টাইম রিসার্চার। গুজব ছিল—তিনি কিউবের মাধ্যমে নিজের দুই মিনিট পরের ভবিষ্যৎ ঝলক দেখতে পারতেন। খুব সামান্যই, কিন্তু ভবিষ্যৎ তো ভবিষ্যৎই। সেই শক্তি ভুল হাতে গেলে পৃথিবীই বদলে যাবে।
কিন্তু কেন একই লোকের দুই বয়সের মৃতদেহ? শৈলেশ কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না। সে আবার কিউবটি হাতে নিল। এবার কিউব আর কোনো সংযম দেখাল না। সরাসরি তার মাথায় ঝড়ের মতো তথ্য প্রবাহিত হতে লাগল—শব্দ নয়, দৃশ্য নয়—শুদ্ধ সময়-ডেটা। শৈলেশ চোখ বন্ধ করেও দেখতে পেল—যেন ‘সময়’ তার মাথায় প্রজেক্টর চালাচ্ছে।
সে দেখল—ড. রৌনক ভবিষ্যতের নিজের সংস্করণকে ডেকে এনেছে। অতীত-রৌনক গবেষণার শেষ ধাপে আটকে গিয়েছিল। তাই ভবিষ্যৎ-রৌনক অতীতে এসে তাকে সাহায্য করেছিল। কিন্তু তাদের দু’জন একই সময়ে একই স্থানে এসে পড়ায় টাইম-ফিল্ড দুইটি ভিন্ন বয়সের দেহে বিভক্ত করে উভয়কেই ধ্বংস করে দেয়।
কিন্তু হঠাৎ দৃশ্য বদলে গেল। কিউব দেখাল—দু’টি মৃতদেহই আসল রৌনক নয়।
এ দুটোই নিখুঁত সময়-শেল—সময়ের তৈরি নকল প্রতিরূপ। সত্যিকারের রৌনক তো তখনো জীবিত। এবং সেই সত্যি লুকিয়ে আছে এমন এক স্তরে যেখানে সাধারণ সময় পৌঁছাতে পারে না।
কিউবের গায়ে লেখা ফুটে উঠতে লাগল—“তুমি যাকে খুঁজছ, সে এখনো বেঁচে আছে।”
শৈলেশের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। “মানে? দু’জনই নকল?”
কিউবের ভেতরে অদ্ভুত ক্র্যাক দেখা দিল। আরেকটি দৃশ্য তার চোখে চাপিয়ে দিল—একজন মানুষ ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। বয়স ৩৪। সম্পূর্ণ সুস্থ, কোনো চাপ নেই। মুখে অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। দরজার কাছে এসে তিনি হঠাৎ কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেলেন—দরজা না খোলার পরও।
কেন ক্যামেরায় ধরা পড়েননি? কারণ রৌনক ‘ফুটেজ রেকর্ড হওয়ার আগেই’ বেরিয়ে গেছে।
সে সময়ের আগে নড়ে।
এযাবৎকালের বিজ্ঞান যেখানে পৌঁছাতে পারেনি, রৌনক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দু’টি মৃতদেহ কেবল তার ফেলে যাওয়া বিভ্রম—সময়কে ধোঁকা দেওয়ার জন্য।
কিউবের উপর নতুন লেখাও ফুটে উঠল—“সে এখন তদন্তকারীকেও দেখছে।”
কিউব এবার বিস্ফোরিত না হয়ে অদ্ভুতভাবে বাষ্প হয়ে গেল—মানুষের চোখে ধরা পড়ার আগেই নিজেকে সময় থেকে মুছে ফেলল।
শৈলেশ বুঝে গেল—অপরাধীকে ধরতে চাইলে তাকে শুধু খুঁজে পেলেই হবে না। তাকে যে সময়ে ধরা যায়, সেখানে পৌঁছাতে হবে। অথচ সে সময় সাধারণ মানুষের জন্য অস্তিত্বই রাখে না।
কিন্তু গল্পে আসল অন্ধকার শুরু হলো এখান থেকে।
কিউবের অল্প ঝলকের কারণে শৈলেশ এখন নিজের ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা পেয়েছে। এবং সে প্রথম যে জিনিসটি দেখল—তা হলো তার নিজের দুটো ছায়া। একটি তরুণ, একটি বৃদ্ধ। দুজনই তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে, আর তাদের চোখে একই শীতল রঙ—যতটা শীতল হলে মনে হয় ভবিষ্যতে তার অস্তিত্বই কোনো ভুল ছিল।
বৃদ্ধ ছায়াটি খুব ধীরে ফিসফিস করে বলল—“তুমি বুঝেছ। তাই তুমি এখন তালিকায়।”
শৈলেশ মাথা ঘুরে দাঁত চেপে ফেলল। তালিকা মানে? কাদের তালিকা?
ছায়া দুটো মিলিয়ে গেল যেন বাতাস চুষে নিল তাদের। ঘরের আলোও অদ্ভুতভাবে নিভে উঠল। চারপাশের সব শব্দ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যেন সময়ের চলা হঠাৎ খুব নিঃশব্দ হয়ে গেছে।
ঘরের এক কোণে হঠাৎ টক টক শব্দ। অন্ধকারের গভীরে কেউ দাঁড়িয়ে। কারো সিলুয়েট নেই, মুখ নেই—কিন্তু উপস্থিতি আছে। আর তার হাসিটা যেন সময়ের মধ্য দিয়ে কেঁপে কেঁপে আসছে।
শৈলেশ বুঝল—রহস্য শেষ। তদন্ত শেষ।
কিন্তু তার নিজের সময়—এখনই শেষ নয়।
তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
কারণ মানুষ নয়… সময় এখন তাকে লক্ষ্য করেছে।
