মায়ের সাথে সিনেমা দেখা
আমার মায়ের নামটি খুবই অর্থবহ। তবে বর্তমান সময়ে তেমন আধুনিক নয়। আল্লাহপাক তাঁকে যদি আজকের দিন পর্যন্ত পৃথিবীর আলোবাতাসে বিচরণ করার সনদটি বহাল রাখতেন তাহলে তাঁর বয়স এসে দাঁড়াতো হয়ত ৯৩ বছর ! কিন্তু সেটাতো হলো না ! হতেতো পারতো ? কোথায় গেলেন তিনি ? কেন চলে গেলেন ? পৃথিবীর কোথাও গিয়ে কী তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ? মা ছিলেন আমার সমস্ত মনোজগত জুড়ে।
আমার মায়ের জন্ম আজ থেকে ৯৩ বছর আগে রক্ষণশীল বাঙ্গালী মুসলিম পরিবারে বিক্রমপুরের কামারগাঁও গ্রামে। মাজেদা বেগম নামটা রেখেছিলেন আমার নানা ভাইয়া। ‘মাজেদা’ আরবী শব্দ এর অর্থ প্রশংসনীয়, মহিমান্বিত। আমার মায়ের বেলায় অর্থটি চমৎকারভাবে খেটে যায়। আমার মায়ের সারাটা জীবন প্রশংসায় ভাস্বর ছিল। তিনি ছিলেন একজন মহিমান্বিত মানুষ। একজন সুবিবেচক গৃহিনী।
মা আমার মানসিকতার দিক থেকে বেশ আধুনিক ছিলেন। প্রচুর বাংলা বই আর ম্যাগাজিন পড়তেন। মূলত এসবের সবই কলকাতা কেন্দ্রীক। নিয়মিত দুই বাংলার বেতার নাটক শুনতেন। সে সময়ের জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্রগুলো দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেতে পিছুপা হতেন না। আব্বার সাথে বিয়ে হয়ে যাবার জন্য মেট্রিক পরীক্ষাটা দেয়া হয়নি। ভাগ্যকুল হরেন্দ্র লাল উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর ক্লাসে তিনিই একমাত্র মুসলমান ছাত্রী ছিলেন। ১৯৭৩ সাল তখন আমি তৃতীয় শ্রেণির একজন ছাত্র।
পুরনো ঢাকার বাড়িতে দেখতাম পরিবারের সব গৃহস্হালী কাজকর্ম শেষ করে অথবা অবসরে সকালে কিংবা বিকেলের দিকে মা আমার প্রতিদিন সমরেশ বসু, বিমল মিত্র, বিমল কর, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নিহাররঞ্জন গুপ্ত, নিমাই ভট্টচার্য, আশাপূর্ণা দেবী, মহাশ্বেতা দেবী এদের কারো না কারো উপন্যাস তন্ময় হয়ে পড়ছেন। পড়াকালীন সময়ে মাঝেমধ্যে মুচকি মুচকি হাসতেন।
হঠাৎ করে ঘোষণা দিয়ে যেকোনো দিন আমাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। মনে পড়ে ১৯৭২ সালে রাজ্জাক-শাবানা অভিনীত ‘অবুঝ মন’ চলচ্চিত্রটি সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের কাছাকাছি ‘রুপমহল’ প্রেক্ষাগৃহে তাঁর সাথে উপভোগ করেছিলাম। সে সময়ে সিনেমাটি সবার মাঝে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। জনপ্রিয়তাও ছিল তুঙ্গে। পরে আরও কয়েকবার মায়ের সঙ্গী হয়েছিলাম। এখন সে সব মনের দুয়ারে তুমুল শব্দে কড়া নাড়ছে। স্মৃতির অতলে চেতনার অক্সিজেন নিয়ে ডুব দিলে হয়ত মনের জমাঘরে অনেক কিছু তুলে আনা যাবে। এই পৃথিবীটা আসলে অনেক ছোট কিন্তু আমার মায়ের ভাবনার আকাশটা ছিল অনেক বড়।
মাজেদা বেগম আমার মায়ের নাম। এখনকার যুগে নিছক একটা আটপৌরে, সাদামাটা নাম। হোকনা তাতে কী ? তিনিতো চিন্তা-চেতনা-চৈতন্যে আজন্ম আধুনিকই ছিলেন। এই প্রশংসনীয়, মহিমান্বিত নারী অমর হয়ে আছেন আমার একরাশ কষ্টের মধ্যে। আছেন আমার অফুরন্ত ভালবাসার মধ্যে। বলছি মায়ার আধার আমার মা কী আর ফিরে আসবে না ? কোন দিনও না ?
