জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণাই বাংলাদেশ
রবি বাঙালি *
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতটি এক ভয়াল বিভীষিকার প্রতীক। ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর “অপারেশন সার্চলাইট” নামে গণহত্যা শুরু হলে সমগ্র দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধ ও মুক্তির ডাক। এই অগ্নিঝরা প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক মঞ্চ, যেখান থেকে এক তরুণ বাঙালি সেনা অফিসার—মেজর জিয়াউর রহমান—বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ইতিহাসের সেই মুহূর্ত শুধু সামরিক ঘোষণাই নয়, বরং একটি জাতির আত্মনির্ধারণের ঘোষণা, যা নতুন রাষ্ট্রের জন্মকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে দৃশ্যমান করে।মোদ্দা কথা জিয়ার এ ঘোষণাই ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
১.১ মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা ট্যাংক, কামান ও ভারী অস্ত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে হত্যা অভিযান চালায়। এই মুহূর্তে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, ঢাকায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
চট্টগ্রামে অবস্থানরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসাররা—বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমান, ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম, মেজর রফিক, মেজর আনোয়ার—তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। চট্টগ্রাম তখন মুক্তিকামী সেনা ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসে।
১.২ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও প্রথম ঘোষণা :
চট্টগ্রামের কালুরঘাটে তখন ছিল একটি ছোট রেডিও ট্রান্সমিটার সেন্টার মাত্র। কর্মরত প্রকৌশলীদের সহায়তা—বেতার কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয় । ২৬ মার্চ ১৯৭১ কয়েক জন সেনা কর্মকর্তা সাথে আলাপ করে সেনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয় স্বাধীনতার ঘোষণা করা জরুরি মুক্তিযুদ্ধ সুসংগঠিত করার জন্য।
২৬ মার্চ সন্ধ্যায় মেজর জিয়াউর রহমান মাইক্রোফোন হাতে নেন। বেতার তরঙ্গে ভেসে আসে তাঁর ঐতিহাসিক কণ্ঠঃ
“আমি মেজর জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে।”
এই ঘোষণা মুহূর্তেই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালীসহ পূর্ববঙ্গের বৃহৎ অংশে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ জানল—বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে।
ঘোষণার এই প্রচার পাকিস্তানি সেনাদের জন্য ছিল এক মারাত্মক ধাক্কা, কারণ এটি প্রমাণ করল—বাংলাদেশের একটি সংগঠিত সামরিক নেতৃত্ব দাঁড়িয়ে গেছে।
মেজর জিয়া তাঁর অফিসারদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে মুক্তিযুদ্ধকে সার্বজনীন ও সর্বাত্মক রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে সকালে স্থানীয় নেতৃবৃন্দদের মতামতের ভিত্তিতে পূণরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন কালুর ঘাট বেতারে। ঘোষণাটি এমন ছিল –
“আমি মেজর জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে।”
এতে সামরিক বাহিনীর সাথে সকল রাজনৈতিক দল,পুলিশ ইপিআর,ককৃষক শ্রমিক, মুটেমজুর ছাত্র জনতা এক কাতারের মেলবন্ধনের ইস্পাত দৃঢ় ঐক্যের মহাশক্তি সঞ্চয় করে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
১.৩ ঘোষণার তাৎপর্য ও প্রতিক্রিয়া :
ঘোষণার পর চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়।
বাঙালি সমাজে এই ঘোষণা এক ধরনের বৈধতা দেয় সশস্ত্র সংগ্রামকে। আন্তর্জাতিকভাবে তখনই পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোতে (BBC, Reuters, The Times) ছড়িয়ে পড়ে খবর—“Major Zia of the Bangladesh Army has declared the independence of Bangladesh.”
এই ঘোষণার রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য ছিল গভীর। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের “প্রথম সামরিক কণ্ঠ” যা জাতির আত্মবিশ্বাসকে সুসংহত করেছিল।
১.৪ ঘোষণাকে ঘিরে বিতর্ক ও ইতিহাস বিশ্লেষণ :
পরবর্তীকালে স্বাধীনতার ঘোষণাকে ঘিরে নানা বিতর্ক দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন, বঙ্গবন্ধুই ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন—যা সত্য নয়।কেননা পাকিস্তানী সেনাদের হাতে বন্দীর কিছুক্ষণ পূর্বে তাজ উদ্দিন আহমেদ টেপ রেকর্ডার এনে বলেছিলেন ঘোষণা রেকর্ড করতে। প্রতিত্তোরে তিনি বলেছিলেন- ‘এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে।এর জন্য পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারে।’ ( তাজউদ্দীন নেতা ও পিতা শারমিন আহাম্মদ, পৃ- ৪৬ ) শারমিন আহাম্মদ এর মতে – মুজিব তাঁর পিতাকে বলেছিলেন – ‘ বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো,পরশুদিন (২৭ মার্চ)হরতাল ডেকেছিতাজউদ্দীন (নেতা ও পিতা শারমিন আহাম্মদ, পৃ- ৪৫ )’ শেখ কিছুক্ষণ পরে বন্দী হয় ও তসকে পাকিস্তানে নিয়ে যায়।তাহলে তাঁর দ্বারা স্বাধীনতা ঘোষণা এমন দাবী যুক্তিতে টেকে না এবং কথিত ওয়ারলেস বার্তা প্রেরণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বানানো ন্যারেটিভ অন্যদিকে মেজর জিয়ার ঘোষণা প্রামাণ্য। , জিয়াউর রহমানের ঘোষণাই প্রথম জনসমক্ষে সম্প্রচারিত ঘোষণাপত্র, যা জনগণ শুনেছিল এবং যার প্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা আরও গতিশীল হয়।
ব্রিটিশ সাংবাদিক Sir Robert Jacob তাঁর বই Witness to Surrender (1977)-এ লিখেছেন—
“It was Major Zia who first proclaimed the independence of Bangladesh over radio, bringing an organized military face to the freedom movement.”
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সরকারি নথি “মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র” (খণ্ড ১, সম্পা. হাসান হাফিজুর রহমান) উল্লেখ করে—
“চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।”
আগেই বলা হয়েছে এটা ছিল পরের দিনের পূণ ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক রূপদানের নিমিত্তে। কেননা জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন রাজনৈতিক রূপ না দিলে বহির্বিশ্বের সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হতে পারে।ঐ সময় শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতা তাই দূরদর্শী মেজর জিয়াউর রহমান- শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ২৭ মার্চে পুণরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
অতএব, ঐতিহাসিকভাবে এই ঘোষণার ভূমিকা অস্বীকারযোগ্য নয়; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সূচনা বিন্দু।
১.৫ কালুরঘাটের বাংকার ও যুদ্ধকৌশল :
ঘোষণার পর মেজর জিয়া চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণে পাটিয়া ও বোয়ালখালী অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কালুরঘাট বাংকারে ছিল তাঁর সামরিক কমান্ড সেন্টার। এখান থেকেই প্রথম বাঙালি সৈন্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ যুদ্ধ পরিচালনা করে।জিয়া ও তাঁর সহযোদ্ধারা বেতারের মাধ্যমে বার্তা পাঠান:
“সব মুক্তিকামী সেনা, পুলিশ, ইপিআর ও নাগরিকগণ প্রতিরোধে যোগ দিন।”
এই আহ্বান ছিল বাংলাদেশের সশস্ত্র বিপ্লবের সূচনা।
১.৬ ইতিহাসে স্থান ও উত্তরাধিকার :
কালুরঘাট ঘোষণার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে জায়গা করে নেন স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের অন্যতম স্থপতি হিসেবে। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং পরবর্তীতে “জেড ফোর্স”-এর নেতৃত্ব দেন।
এই ঘোষণাকে ঘিরে আজও যে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, তা ইতিহাসের স্বাভাবিক পরিণতি—কিন্তু ইতিহাসবিদরা একমত যে, জিয়াউর রহমানের কণ্ঠেই প্রথম স্বাধীনতার বার্তা জনতার কানে পৌঁছেছিল।
কালুরঘাটের রেডিও ট্রান্সমিটার থেকে দেওয়া সেই ঘোষণা শুধু একটি সামরিক উদ্যোগ নয়; এটি ছিল বাঙালি জাতীয় চেতনার সশব্দ উন্মোচন। একদল মুক্তিকামী সেনা ও তরুণ অফিসার তখন ইতিহাসের দায়ে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বাজি রেখে নতুন রাষ্ট্রের জন্মের আহ্বান জানায়।
মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়—যেখানে ইতিহাস ও আত্মত্যাগ মিলেমিশে একাকার। পরিশেষে বললে অত্ত্যুক্তি হবে না যে-মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণাই বাংলাদেশ।
রেফারেন্স :
১.Hasan Hafizur Rahman (ed.), Muktijuddher Dalilpatra, Vol. 1, Government of Bangladesh, 1982.
২.Sir Robert Jacob, Witness to Surrender, Oxford University Press, 1977.
৩.Major Rafiqul Islam, Bangladesh at War, Dhaka: Academic Press, 1990.
৪.Syed Shamsul Haq, Zia: Shomoy o Manush, 1995.
৫.Daily Ittefaq Archives, March 1971.
৬.BBC Radio Archive Reports on Bangladesh, 1971.
৭.Mahbubul Alam Chowdhury, Chattogramer Kalurghate Swadhinatar Ghoshona, 1998.
৮.আহাম্মদ শারমিন, শহিদ তাজউদ্দীন নেতা ও পিতা,ঐতিহ্য (২০১৪)
* সহযোগী অধ্যাপক
আব্দুলপুর সরকারি কলেজ, লালপুর, নাটোর।
মুঠোফোন : ০১৭১৪২৫৮৯৮৮
