ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর কপোতাক্ষের তীরে এক সাধক জনপদের গল্প: কোটচাঁদপুর
বৃহত্তর যশোর জেলার একটি প্রাচীন থানা শহর কোঁটচাদপুর—কপোতাক্ষ নদীর স্নিগ্ধ জলধারায় বিধৌত এক ছোট, শান্ত ও মনোরম জনপদ। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই জনপদের গোড়াপত্তন হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার শতাব্দী আগে। ১৫৭৬ সালে কামেলে দ্বীন, কামিল ব্যক্তি সরদার চাঁদ খাঁ এই জনপদ প্রতিষ্ঠা করেন।
লোককথা ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, ইসলাম প্রচারের মহান উদ্দেশ্যে সরদার চাঁদ খাঁ সুদূর পশ্চিমের কোনো এক দেশ থেকে এ অঞ্চলে আগমন করেন। কপোতাক্ষ নদীর তীরে এসে তিনি আস্তানা গাড়েন এবং ধীরে ধীরে এই অঞ্চল হয়ে ওঠে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ এক কেন্দ্র। তাঁর ব্যক্তিত্ব, আধ্যাত্মিক প্রভাব ও মানবপ্রেমে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয় মানুষ তাঁকে আপন করে নেয়। তাঁর নামানুসারেই তখন এই জনপদের নামকরণ হয় ‘চাঁদপুর’।
সময়ের প্রবাহে চাঁদপুরে প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এখানে আদালত বা কোর্ট স্থাপিত হলে নামের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন পরিচয়—‘কোর্টচাঁদপুর’। পরবর্তীকালে ভাষাগত রূপান্তর ও ব্যবহারের ধারায় এটি পরিচিতি পায় ‘কোটচাঁদপুর’ নামে। ১৮৮৩ সালে এই জনপদ পৌরসভার মর্যাদা লাভ করে, যা এর নাগরিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বকে আরও সুসংহত করে।
সরদার চাঁদ খাঁ ছিলেন এক আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তাঁর বংশধারায় জন্ম নিয়েছেন বহু গুণীজন। কামেলে দ্বীন হযরত চাঁদ খাঁর অধঃস্তন সপ্তম পুরুষ ছিলেন মরহুম কবি সামসুদ্দীন আহমদ (১৯১০–১৯৮৫), যিনি সাহিত্যাঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
১৬৫৬ সালে এই বুজর্গ নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে কোটচাঁদপুর শহর। বর্তমান কোটচাঁদপুর বাজারের পশ্চিম দিকে, রূপালী ব্যাংকের সামনে যে বাঁধানো কবরটি চোখে পড়ে, সেটিই সরদার চাঁদ খাঁর সমাধি। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সেই সমাধির পাশ দিয়ে যাতায়াত করেন—অনেকে জানেন, অনেকে না জেনেই—তবু ইতিহাস নীরবে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
তাই একটি সাধকের স্মৃতি, একটি জনপদের আত্মপরিচয়। কপোতাক্ষের ঢেউ যেমন নদীর গল্প বলে যায় যুগের পর যুগ, তেমনি এই শহরও বয়ে নিয়ে চলেছে সরদার চাঁদ খাঁর আলোয় গড়া এক দীর্ঘ মানবিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
RAM JOARDER

Comment
