যোগ্যতা নেই বলেই গ্রামের নিলু আজ শহরে। সবাই বলে যোগ্যতা নেই।কেউ তো বলে নি তখনো, যোগ্য হয়ে উঠবে আমাদের নিলু।ভারী চাপা মেয়ে, তাই তো ঘাড় বাকিয়ে বলে প্রতিবেশিদের, যোগ্য হয়ে ফিরবে গো, যোগ্য হয়ে ফিরবো।শহরে যাচ্ছি, দেখে নিও একদিন যোগ্য তা হবে আমার।
কত কথাই না শুনতে হয় নিলুর,- কোন কলেজে পড়তে যাচ্ছিস বিয়ে হবো তো,শুনলাম এই কলেজে মেয়েরা পড়লে; বিয়ে হয় না।গ্রামের মেয়ের চাপা,এর চেয়ে বিষ হরির আজ্ঞাই ভালো।কারো রক্তে এমন ত্যাজ নাই,যে বিষ হরির আজ্ঞাকে বর্ষনা করে বেঁচে ফিরবে।
গ্রামের মেয়ের চাপা যে তার থেকে ধারালো,সে কি না যোগ্য হয়ে ফিরবে।ভার্সিটিতে টিকে নাই, বড় বড় কথা।এই কলেজে মেয়েদের বিয়ে হয় কিভাবে,টিএসসিতে দিন-রাত ঘুরে।সে কি না বলে,যোগ্য হয়ে ফিরবো গো যোগ্য হয়ে ফিরবো।
তুমি দেখে নিও আয়েশার মা,মেয়েটার এখন ভালো ঘরে বিয়ে হতো,চেহারা গঠনেও বেশ।যেই কলেজে ভর্তি হচ্ছে ,বিয়েই দিতে পারবে না।
আয়েশার তো ভালো ঘরে বিয়ে দিলা। নিলুর মারে কত করে বল্লাম, মেয়ের কথা শুইনো না।পাঠাইয়েন না এই কলেজে মেয়েরে,নষ্ট হইয়া যাইবো।দেইখো আমার কথাই ঠিক হইবো আয়েশার মা,নিলুর বিয়াই হইবো না।
বিয়ে হবে না জেনেও বালিকার মধ্যে এত ত্যাজ।বিয়ের দেবতার নজরে বিষয়টি পড়লে উপর থেকে তিনি নিজেও হাত তালি দিতেন।নিলুর সাহস দেখে প্রনামিও তখন পাঠাইতেন।সে মুসলিম বালিকা, প্রনামি যদি গ্রহন না করে। তখন কি বিয়ের দেবতার প্রতি তা বেয়াদবি নয়।তাহা মনে করিয়া হয়তো দেবতা প্রণামি পাঠান নাই।
কল্পনার ফেরেস্তা -দেবতাদের কথা বাদ ই দিলাম,বাস্তব প্রতিবেশীরাই তো নিলুকে আটকাতে পারে নাই।তাই তো গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা নিলুর।
কানে এখনে বাজতেছে প্রতিবেশির কথা,-ভার্সিটিতে টিকতে পারে না যে মেয়ে,শহরে গিয়া যোগ্য হইয়া ফিরবো। পড়ার নজর তাইতো অন্যদের চেয়ে বাড়তি নিলুর।কারো প্রশ্ন না থাকলেও নিলু হাত তুলে দাড়িয়ে যায় ক্লাসে,- স্যার প্রশ্ন ছিলো যে।
এতো আগ্রহ দেখে স্যার তো একদিন বলেই দিলোন-সুন্দর বন থেকে যে এলি, বাঘের সাথে কোলা কোলি তো রোজই করিস।এত বোকা প্রশ্ন বাঘকে গিয়ে করিস।
তোর বাড়ি সুন্দর বন না?
-না স্যার,খুলনা।
তো একই কথা।
এক না স্যার,সুন্দর বনের চেয়ে ঢাকায় আসা সহজ আমাদের ।
স্যারও বুঝে গেলেন , মেয়েটির চাপা বেশ।বেশ দূর যাবে এই মেয়ে। স্যারের মন যেন এমনটাই সাই দিল।যদিও অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছে এই মেয়ে।প্রতিবেশীদের কুটুক্তুির কারনে না নিজ যোগ্যতাই তা বুঝা বড়ই মুশকিল।
অনার্স জীবনে কলেজটিতে সফল্য দেখিয়েছে।যেহেতু লক্ষ্য ছিলো বিসিএস,তাই তিব্র মনোযোগী ছিলো প্রথম বর্ষ থেকেই। গ্রামের সংগ্রামী মেয়ে তাইতো জীবনকে সংগ্রামী ভাষাই দেখে।
একদিন মায়ের চিঠি আসে, চিঠি খুলতেই চোখে ভেসে ওঠলো দোয়াত কালির লেখা-চলে আই না নিলু।বড় ঘর থেকে পাত্র এসেছে।তুই চুপ চাপ খুলনা চলে আই।বলবো তখন, মেয়ে ইন্টের পর আর লেখা পড়া করেনি,প্রতিবেশিদের, সামলে নিব তখন।তুই দেড়ি করিস না,অল্প কাপড় চোপড়ে রাতের ট্রেন চেপে চলে আই।
নিলু চিঠির প্রতি উত্তরে লেখে,মা তোমাদের নিলু বাড়ি আসবে না এখন।বিসিএস দেবে।আমি ভালো আছি,তোমাদের শরীলের প্রতি খেয়াল রাখবে। বাবার স্বাস্থের দিকে নজর রেখো, ইতি নিলু।
আজতো শুনতেও হচ্ছে না নিলুর,ভার্সিটিতে টিকোনি। কে আজ শুনাবে তাকে এই কথা। যারা ভার্সিটিতে টিকেনি তাদের গন্তব্যই তো এই কলেজ।পুরো দেশেই যার নাম ডাক।তবে গৌরবের চেয়ে নিন্দাটায় দেশে ছড়াছড়ি।
তবে কিছুই কাবু করতে পারে না নিলুকে।বিসিএসের জন্য জীবন মরণ সংগ্রাম। পুরো রাত কখনো না খেয়ে কাটায়, কখনো বা দিনে।দুবেলার বেশি তো খাবাই তো খাচ্ছে না সে।রোগা চিকন কাঠির মতো দেহ দেখাচ্ছে শরীল যার,কে বিশ্বাস করবে মানুষ গুন কীর্তন করতো রুপে তার।
কৃতিত্বের সাথে অনার্স জীবনটা শেষ করলো নিলু।ভর্তি হয় না কোচিং সেন্টারে, বাড়তি টাকা নেই যে হাতে।বাড়ি থেকেই অল্প কিছু টাকা পাঠাই,তা দিয়েই মাস চলে যাই।
কে দিবে টিউশনি তারে, কলেজের মেয়ে যে।আশে পাশে এতো ভার্সিটি আর মেডিকেল,ইনজিনিয়ার শিক্ষার্থী থাকতে ; তাকে বলবে পড়াও না আমার ছেলে- মেয়েরে। এক মাথা খারাপ তো হয় নাই তাদের। কলেজের মেয়েকে বলবে পড়াও না, যেখানে ভার্সিটির মেয়েরাই বেকার ঘুরে।
আজ তো রুপ দেখার সময় নেই,তা যে জীবন যুদ্ধ।এই যুদ্ধে হেরে গেলে হেরে যাবে ঘাড় বাকিয়ে বলা সেই মেয়েটি। যে বলেছিলো প্রতিবেশীকে; দেখে নিও একদিন যোগ্য হবে আমার।
বিসিএস দিন আসলো প্রিলি দিল, রিটেট লিখলো ভাইবা হলো তার।নিলু ভাবে আমাকে নিবে ভাইবা বোর্ড,আমি যে কলেজ ছাত্রী। নিলু মনে মনে ভাবে আমায় যদি বলে কেউ কলেজ ছাত্রী নিব না, ভার্সিটি। আমি তো অবশ্যই ভার্নিটি ছাত্রীর কথা বলবো, তারা যে মেধাবী।কিন্তু নিলু ভাইবা দিয়ে আসে।
কিছু মাস পর ফলাফল আসে ভাইবার,নিলু বিসিএস ক্যাডার হয়েছে।নিলু চিঠিতে জানিয়ে দিল,মা বিসিএস ক্যাডার হয়েছি, তাই ছেলে দেখতো পারো।
এলাকায় প্রচার হয়ে গেল নিলু বিসিএস ক্যাডার হয়েছে।প্রতিবেশিদের মুখে খড়া নামলো।বলেছিলো যারা বিয়ে হবে না নিলুর,তারাই আজ বড় বড় পাত্রের সন্ধান দিচ্ছে।
ইতিমধ্যে শহরের বড় কলেজটিতে নিলু লেকচেরার পদে ঢুকলো। সেখানে প্রফেসর আর অ্যাসিনটেনদের ঠেলা ঠেলি।গুটি খানিক রয়েছে পিইজডিও।
নিলুর সঙ্গি নেই সেখানে,সবাই বড় বড় ভার্সিটির।বড় ডিগ্রিধারী ব্যক্তি।কলেজের মেয়ে বলে,কেউ তেমন কাছে ঘেষে না।কারো কারো তো এমনই ভাব, মেধাবী হলে তো ভার্সিটিতেই টিকতো নিলু।
ছবি তোলার সময়ও বলে না মন থেকে,আমাদের সাথে ফ্রেমে আসো না নিলু।হাতে ক্যামেরা দিয়ে বলে তুলে দাও আমাদের সকল প্রফেসরদের ছবি।সকল প্রফেসর কিংবা বড় ডিগ্রিধারীদের ছবি তুলে দেয় নিজ হাতে।হয় তো নিলুর ছবিই জাইগা হয় না সেই ফ্রেমে।
তবে নিলুর কি এখনো যোগ্যতা হয়নি,ঘাড় বাকিয়ে বলে আসা প্রতিবেশিকে-”দেখে নিও একদিন যোগ্য তা হবে আমার”।

