একটি শব্দের দুই জীবন: ‘Yahoo’—সাহিত্য, ব্যঙ্গ ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর সহাবস্থান
ইন্টারনেটের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যেগুলো শুধু একটি কোম্পানি নয়—একটি সময়ের প্রতীক। Yahoo তেমনই একটি নাম। আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো এটি অতীতের স্মৃতি, কিন্তু এক সময় এই Yahoo-ই ছিল ডিজিটাল দুনিয়ার প্রধান প্রবেশদ্বার। ই-মেইল খুলতে, খবর পড়তে, শেয়ারবাজারের তথ্য জানতে কিংবা কেবল ইন্টারনেট ঘুরে দেখতে—সব পথই যেন এসে মিলত Yahoo-তে।
কিন্তু এই বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি ব্র্যান্ডের নামটি যে জন্ম নিয়েছে প্রায় তিনশ বছর আগের সাহিত্যিক ব্যঙ্গ থেকে—সে তথ্য অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
সাহিত্য থেকে শুরু: Yahoo শব্দের প্রথম জীবন
১৭২৬ সাল। ইংরেজ সাহিত্যিক জোনাথন সুইফট প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত ব্যঙ্গধর্মী উপন্যাস Gulliver’s Travels। বইটি সাধারণভাবে ভ্রমণকাহিনি হিসেবে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজ, রাজনীতি ও মানবচরিত্রের ওপর এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক আঘাত।
এই উপন্যাসেই প্রথম আবির্ভাব ঘটে ‘Yahoo’ নামের এক শ্রেণির প্রাণীর। তারা দেখতে মানুষের মতো, কিন্তু আচরণে ছিল লোভী, হিংস্র, অসভ্য ও বিবেকহীন। যুক্তি, নৈতিকতা কিংবা আত্মসংযম—কোনোটিরই উপস্থিতি ছিল না তাদের মধ্যে।
সুইফট এই Yahoo চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড় করাতে। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—সভ্যতার দাবি করলেও মানুষ অনেক সময় আচরণে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে ওঠে। সেই পশুত্বের প্রতীকই ছিল Yahoo।
ফলে ইংরেজি ভাষায় ধীরে ধীরে ‘yahoo’ শব্দটি একটি নেতিবাচক অর্থ ধারণ করে। অভিধানে এর অর্থ দাঁড়ায়—অশালীন, বেয়াদব, রুচিহীন বা অসভ্য মানুষ। এভাবেই Yahoo শব্দের প্রথম জীবন শেষ হয়—একটি সাহিত্যিক ব্যঙ্গ ও মানবসমালোচনার প্রতীক হিসেবে।
প্রযুক্তির জগতে পুনর্জন্ম: Yahoo শব্দের দ্বিতীয় জীবন
সময় বদলায়, পৃথিবী এগোয়। বিশ শতকের শেষভাগে ইন্টারনেট ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে জায়গা করে নিতে শুরু করে। তখনো গুগল নেই, ফেসবুক নেই—ইন্টারনেট ছিল এক বিশাল কিন্তু অগোছালো তথ্যভাণ্ডার।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক জেরি ইয়াং ও ডেভিড ফাইলো নিজেদের প্রয়োজনেই তৈরি করেন একটি ওয়েব ডিরেক্টরি—যেখানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো থাকবে। ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তিগত প্রকল্পই রূপ নেয় একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে।
নাম কী হবে—এই প্রশ্নে তারা বেছে নেন একটি অদ্ভুত কিন্তু আকর্ষণীয় শব্দ: Yahoo!
নামের শেষে বিস্ময়সূচক চিহ্নটি যোগ করা হয় আলাদা পরিচয় ও উচ্ছ্বাস প্রকাশের জন্য।
প্রযুক্তি জগতে এসে Yahoo শব্দটি পায় নতুন এক ব্যাখ্যা—
Yet Another Hierarchically Organized Oracle।
অর্থাৎ, স্তরভিত্তিকভাবে সাজানো একটি তথ্যসূত্র।
এখানেই ঘটে শব্দটির সবচেয়ে নাটকীয় রূপান্তর। যে Yahoo এক সময় ছিল যুক্তিহীনতা ও অসভ্যতার প্রতীক, সেই Yahoo-ই হয়ে ওঠে তথ্য, জ্ঞান ও ডিজিটাল নেভিগেশনের প্রতিশব্দ।
Yahoo: একটি যুগের নাম
নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজারের শুরুর দিকে Yahoo ছিল ইন্টারনেটের রাজা।
Yahoo Mail, Yahoo News, Yahoo Finance, Yahoo Messenger—প্রতিটি সেবা ব্যবহারকারীদের জীবনে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। অনেকের প্রথম ই-মেইল ঠিকানাই ছিল Yahoo Mail।
এক সময় Yahoo ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভিজিট করা ওয়েবসাইটগুলোর একটি। অনলাইন সাংবাদিকতা, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ও ওয়েব পোর্টাল সংস্কৃতির বিকাশে Yahoo-এর ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু প্রযুক্তির দুনিয়ায় স্থায়িত্ব নেই। গুগলের উন্নত সার্চ অ্যালগরিদম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান এবং Yahoo-এর নিজস্ব কৌশলগত ভুল ধীরে ধীরে কোম্পানিটিকে পিছিয়ে দেয়। আজ Yahoo আর শীর্ষে নেই, কিন্তু ইতিহাসে তার অবস্থান অমলিন।
শব্দ, সংস্কৃতি ও সময়ের পাঠ
Yahoo শব্দের এই দীর্ঘ যাত্রা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—
ভাষা কখনো স্থির নয়। শব্দের অর্থ সময়ের সঙ্গে বদলায়, সমাজের সঙ্গে বদলায়, সংস্কৃতির সঙ্গে বদলায়।
একটি শব্দ কখনো হতে পারে ব্যঙ্গের হাতিয়ার, আবার কখনো প্রযুক্তির ব্র্যান্ড। সাহিত্য আর প্রযুক্তি—এই দুই বিপরীত জগতের সংযোগস্থলেই দাঁড়িয়ে আছে ‘Yahoo’।
আজ Yahoo হয়তো একটি অতীত অধ্যায়, কিন্তু শব্দ হিসেবে এটি এখনো বহন করে ইতিহাস, ব্যঙ্গ, প্রযুক্তি ও সভ্যতার উত্থান-পতনের গল্প। প্রতিটি নামের পেছনে যেমন একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত থাকে, তেমনি লুকিয়ে থাকে একটি সাংস্কৃতিক ইতিহাসও।
আর সেখানেই ‘Yahoo’ হয়ে ওঠে কেবল একটি কোম্পানির নাম নয়
একটি শব্দের দুই জীবনের দলিল।

