সাহিত্যের সেকাল ও একাল
—————————————————————————
বিধান চন্দ্র সান্যাল
——————————————————————————–
সাহিত্য যুগ বা কালে বন্দী নয়, বরং এটি যুগ ও কালের প্রতিচ্ছবি যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু এর মূল আবেদন চিরন্তন; সাহিত্য যুগকে ধারণ করে আবার যুগকে প্রভাবিতও করে, যদিও বাংলা সাহিত্যে ১২০০-১৩৫০ সালের মতো কিছু ‘অন্ধকার যুগ’ বা ‘বন্ধ্যা যুগ’ ছিল যেখানে সাহিত্যচর্চা সীমিত ছিল, যা মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঘটেছিল।
সাহিত্যের সেকাল ও একাল আলোচনা করলে দেখা যায়, সাহিত্যের ধারা, বিষয়বস্তু, ভাষা ও প্রকাশের মাধ্যম—সবকিছুতেই এসেছে আমূল পরিবর্তন, যেখানে সেকালের কাব্য-নির্ভর, ধর্ম-কেন্দ্রিকতা থেকে একাল এসেছে গদ্যের প্রাধান্য, আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশাল পরিসরের সঙ্গে, তবুও সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য—জীবনবোধ ও নান্দনিকতার প্রকাশ—অক্ষুণ্ণ রয়েছে, কেবল রূপ ও উপস্থাপনায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, যেমন প্রাচীন পুথির যুগ থেকে এখন ই-বুক ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ।
বাংলা সাহিত্যকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়—প্রাচীন (৬৫০-১২০০), মধ্যযুগ (১২০০-১৮০০), ও আধুনিক (১৮০০-বর্তমান)।
সেকালে মূলত পদ্যের (কবিতা) প্রাধান্য ছিল, যেমন চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, শাক্তপদাবলি ইত্যাদি।
ধর্ম, পুরাণ, লোককথা, রাজসভার কাহিনী, প্রেম, ভক্তি ও নৈতিকতা ছিল প্রধান বিষয়। যেমন—বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, ভারতচন্দ্র, শাক্ত পদাবলী।
হাতে লেখা পুঁথি, তালপাতার ওপর লেখা, বা মৌখিক পরিবেশনা (কীর্তন, পালা) ছিল মূল মাধ্যম।
আধুনিক যুগের প্রধানতম অবদান হলো গদ্যের বিকাশ, যা 〈ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর〉, 〈বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়〉, ও 〈রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের〉 হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়েছে।
উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, সামাজিক সমস্যা, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অস্তিত্ববাদ—সাহিত্যের বিষয়বস্তু এখন অনেক ব্যাপক ও বিচিত্র।
ছাপা বই থেকে এখন ই-বুক, অনলাইন পোর্টাল, ব্লগ, সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক, ইউটিউব) হয়ে উঠেছে সাহিত্যের বড় মঞ্চ। <,সালাহউদ্দিন মাহমুদ-এর 'বাংলা সাহিত্যের একাল-সেকাল'-এর মতো বই এর দৃষ্টান্ত।
লেখক এখন আর শুধু পণ্ডিত নন, তিনি সমাজের আয়না, পর্যবেক্ষক, কখনও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
সেকালের সাধু ভাষা থেকে একালের চলিত ভাষা, যা আরও সহজবোধ্য ও গতিশীল।
সেকালের মূলত আধ্যাত্মিক বা আরোপিত সমাজ-দৃষ্টি থেকে একালের মানবতাবাদী, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
সেকালের সাহিত্য ছিল মূলত ধর্মীয় ও রাজ-অনুসারী; একালের সাহিত্য পাঠককে সরাসরি প্রভাবিত করে, সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
সেকালের সাহিত্যের উপাদানগুলো (লোককথা, ঐতিহ্য) একালের সাহিত্যেও নতুন রূপে ফিরে আসে, যেমন—অনির্বাণ ভট্টাচার্য-এর নাটক বা অনীশ দেব-এর কবিতা।
সাহিত্যের সেকাল ও একাল দুটি ভিন্ন যুগের প্রতিচ্ছবি হলেও, উভয়ই মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার নির্যাস। সেকালের মহৎ ঐতিহ্যকে পাথেয় করে একাল তার নিজস্ব গতি ও রূপ নিয়ে এগিয়ে চলেছে, যা প্রমাণ করে সাহিত্য চিরন্তন, কেবল তার প্রকাশভঙ্গী পরিবর্তনশীল।

