শ্মশানযাত্রী
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় ( ভবঘুরে )
রামকিঙ্কর বাবুর বাড়িতে সকাল থেকেই ব্যস্ততা । তিনতলা বাড়ির ছাদে বিশাল ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে । একদিকে রান্নাবান্না অপর দিকে অতিথি অভ্যাগতদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা । দু’দিন ধরেই আত্মীয় স্বজনদের ভিড় । হবে নাই বা কেন ? তিন চারটে পাড়ার মধ্যে সবচেয়ে বিত্তবান ব্যক্তি । এক ডাকে সবাই চেনে । সমিতির প্রেসিডেন্ট বলে কথা । কিন্তু পাড়ার মানুষেরা অবশ্য অন্য কথা বলে । তাদের মতে রামকিঙ্কর বাবু অত্যন্ত স্বার্থপর এবং দাম্ভিক । টাকার গরমে মানুষকে মানুষই মনে করেন না । আজ পর্যন্ত কারোর কোনো উপকারে আসেন নি । তার ওপর নিজে ব্রাহ্মণ বলে অব্রাহ্মণদের ঘৃণার চোখে দেখেন । এই যেমন আজকে তার মায়ের শ্রাদ্ধে তিনশোর ওপরে নিমন্ত্রিত । তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা তিন তলায় । অব্রাহ্মণ শ্মশান যাত্রীদের জন্য ব্যবস্থা হয়েছে এক তলায় কলতলার পাশের বারান্দায় মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে ।
দোতালার বড় হলঘরে চলছে মায়ের শ্রাদ্ধের কাজ । সবটাই সাদা কাপড় আর সাদা ফুলে ঢাকা । পাশের ঘর দান সামগ্রীতে বোঝাই । আর একটি ঘরে গীতা পাঠ করছেন এক টিকিধারী পন্ডিত । সমস্ত আয়োজনই পাকা । কোথাও এত টুকু ত্রুটি নেই । যদি দৃষ্টি কটু বলেন তো শুধু ঐটুকু । শ্মশানযাত্রীরা সবাই একঘরে । মূল অনুষ্ঠানের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই ।
দেখতে দেখতে বেলা একটা বেজে গেল । কাজের বাড়ি বলে কথা । বেলা তো একটু হবেই । এই সময় আমন্ত্রিতদের ভিড় চোখে পড়ার মত । লুচি -বেগুন ভাজার গন্ধে বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে চলাই দায় । তিনতলায় টেবিলে সাদা কাগজ বিছিয়ে পাতা হয়েছে কলাপাতা । কলাপাতার ওপরে চাপা দেওয়া আছে উল্টো করে রাখা মাটির ভাড় । কলাপাতার কোনায় দেওয়া হয়েছে নুন আর লেবু । অতিথিরা বসলেই আসরে নেমে পড়বে গরম গরম লুচি ,বোটা সমেত বেগুন ভাজা , ছোলার ডাল , কুমড়োর ছক্কা প্রভৃতি ।
যথাসময়ে আমি গিয়ে হাজির । আমি একজন শ্মশানযাত্রী হিসাবে নিমন্ত্রিত । রামকিঙ্কর বাবুর মেজভাই শ্যামসুন্দর বাবু আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন । গোলগাল চেহারা । মাথা কামানো । হলুদপাড় সাদা ধুতি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরনে । পৈতের সাথে একটা চাবি বাঁধা । চাবিটা ঝুলছে গেঞ্জির তলা দিয়ে । কপালে এবং গলায় চন্দনের ফোঁটা । মোটা মানুষ । এক তলা তিন তলা করতে করতেই হাঁপিয়ে গেছেন । কোমরে গোজা রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে আমাকে বললেন , রুদ্র , তুমি একটু এদিকে এস । ম্যারাপের একদম কোনায় একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে বললেন , বসো । উনিও বসলেন । আমিও বসলাম ।
জিজ্ঞেস করলেন , তোমরা শ্মশান যাত্রীরা সবাই এসে গেছ ?
না , কেউ আসে নি । আমি বললাম ।
আঁতকে উঠে বললেন , সে কি ! এত বেলা হয়ে গেল এখনো কেউ এল না ?
বললাম ,ওরা কেউ আসবে না ।
কী বলছো কি ? কেন ?
ওরা অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেছে ।
কেন ? কেউ কিছু বলেছে ? দেখ রুদ্র , তুমি তো জান বহুবছর আমি এখানে থাকি না । মুম্বাইতেই আমার সব কিছু । মায়ের মৃত্যুতেই আসা । ছেলে মেয়েরা এখানে আসতে চায় না । শুধু ঠাকুমার শ্রাদ্ধের ব্যাপার বলে এসেছে । আমিতো কিছুই জানি না । শ্মশান যাত্রীরা না এলেতো অকল্যাণ হবে । তুমি বাবা আমাকে একটু খুলে বল একচুয়েলি কী হয়েছে ?
সত্যি কথা বলতে আমি আজকে এখানে এসেছি শুধুমাত্র সে কথাটাই বলতে । বলা হয়ে গেলে আমি চলে যাবো । খাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই নেই । শুনুন , আপনি জেঠুকে পরে বলে দেবেন ।
সেদিন ছিল সোমবার । আমার কলেজে পরীক্ষা চলছিল । সেদিন কোনো পরীক্ষা ছিল না । আমি বাড়িতে পড়ছিলাম । বেলা তখন বারোটা সাড়ে বারোটা হবে । বাবা অফিসে । দাদারা কাজে বেরিয়ে গেছে ।বাড়িতে শুধু আমি আর মা । দরজায় কলিং বেলের শব্দ । রান্না ঘর থেকে মা বলল , রুদ্র , দেখতো কে এল ? দরজা খুলে দেখি । উস্কো-খুসকো চেহারায় জেঠু দাঁড়িয়ে ।
বললাম , ভেতরে আসুন ।
জেঠু বলল , না ভেতরে আসবো না । আজ সকালে আমার মা সজ্ঞানে পরলোক গমন করেছেন । ডাক্তারের কাজ মিটে গেছে । এখন শ্মশানের কাজ । তোমাকেই আমার এই বিপদের সময় পাশে দাঁড়াতে হবে । তুমি আমার সন্তান তুল্য ।
কিন্তু জেঠু , দাদারা আর ওদের সব বন্ধু-বান্ধবেরা তো কাজে বেরিয়ে গেছে । এখনতো কাউকেই পাবো না । আমি তো এই ব্যাপারটা খুব ভালো বুঝি না । তা ছাড়া , কালকে আমার অনার্স পরীক্ষা ।
সে আমি জানি না । তোমাকেই উদ্ধার করতে হবে আমাকে । এই সামান্যটুকু কষ্ট জেঠুর জন্য তোমাকে করতেই হবে ।
দরজার পেছনে মা দাঁড়িয়ে সব শুনেছে । আমাকে ডেকে বলল , রুদ্র , তুমি জেঠুকে বলে দাও চিন্তা না করতে । এই সময়ে না বলতে নেই । মানুষ বিপদে পড়ে সাহায্য চাইলে তাকে সাহায্য করাটাই মানুষের ধর্ম ।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে জেঠুকে বললাম , আপনি বাড়ি যান । আমি আমার বন্ধুদের ডেকে আনছি । অনেক খোঁজাখুঁজি করে সাত আট জনকে জোগাড় করে আনলাম ।
ফিরে এসে জেঠুকে বললাম , বাঁশ , খাটিয়া থেকে শুরু করে খৈ ,অগরু ,ধূপকাঠি প্রভৃতি অনেক কিছু কিনতে হবে ।
জেঠু বলল , তোমরা ছেলে ছোকড়া , ঠিক মত দরদাম করে কিনতে পারবে না । ঠকিয়ে দেবে । আমি বরঞ্চ আমার এক আত্মীয়কে তোমাদের সাথে পাঠিয়ে দিচ্ছি টাকা পয়সা সমেত । দোকান -বাজার করার ব্যাপারে একদম চৌখস । এক পয়সা এদিক -ওদিক হবে না ।
আমাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে উনি আমাদের বিশ্বাস করছেন না । আমরা হয়তো উনার টাকা চুরি করবো । বন্ধুরা তো প্রচুর রেগে গেল । বাড়ি চলে যেতে চায় । এরকম মানুষের কোনো রকম উপকার করতে নেই । আমি ওদের বোঝালাম । যাইহোক , আপনার মায়ের ডেডবডি যখন খাটিয়ায় তোলা হবে , জেঠু আমাকে আলাদা করে ডাকলেন । বললেন , রুদ্র , মায়ের শেষ দুটো ইচ্ছা তোমাকে পালন করতে হবে । এক নম্বর , কোনো অব্রাহ্মণ যেন মায়ের শরীর বা খাটিয়া স্পর্শ না করে । দুই , বাড়ি থেকে শ্মশান যাত্রা পুরোটাই হবে পদব্রজে । খালি পায়ে হলে ভালো , তা না হলে হাওয়াই চটি পড়া যেতে পারে ।
জেঠুর এইসব জাত -পাতের কথা শুনে আমার প্রচন্ড রাগ হলো । কিন্তু , মায়ের কথা মনে পড়ায় নিজেকে সংযত করলাম । জেঠুকে পুরো মিথ্যা কথা বললাম । বললাম , আমি তো আপনাকে জানি , সেইজন্য বেছে বেছে ব্রাহ্মণদেরই এনেছি । আপনি একদম নিশ্চিন্ত থাকুন । ওদিকে বন্ধুদের বলে এলাম কেউ জানতে চাইলে বলবি ব্রাহ্মণ । যদিও পরে অবশ্য জেঠু কি ভাবে জানি জেনে গেছিল আমার নিয়ে আসা বন্ধুদের মধ্যে পাঁচ জনই অব্রাহ্মণ । সে যাই হোক , ওই গরমে খাটিয়া কাঁধে হেঁটে হেঁটে চললাম শ্মশানে । শ্মশান কি এখানে ? পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে । ভর দুপুরে ঝাঝা রোদে আমরা আট বন্ধু কাঁধ পাল্টাপাল্টি করে চলেছি । পিচ তেতে গেছে । পা ফেলা যাচ্ছে না । গলা শুকিয়ে কাঠ । হঠাৎ নজরে এল আপনার ছেলে এবং আরও কয়েকজন পেছনে দুটো আম্বাসাডরে আসছিল । স্টেশনে লেভেল ক্রসিংয়ের সামনে দাঁড়িয়েছি , দেখি আপনার ছেলে একটা ক্যামেরা বের করে ছুটে এল শ্যুট করতে । বলল , দারুন সিন । ব্যাকগ্রাউন্ডটা অসাধারন । আপনারা একটু মুখগুলো স্যাড করুন । চুলগুলো এলোমেলো করে দিন । একদম ন্যাচারাল ভিউ হবে । ভাবতে পারেন । একে তো কাঁধের ওপর ভারি ডেডবডি , তারপর প্রখর সূর্য্যের তাপে আমাদের নাভিশ্বাস । উনি এসেছেন গাড়ি থেকে নেমে ন্যাচারাল ভিউ নিতে । রাগে জ্বলে গেল সমস্ত শরীর । বার বার মাঝে এসে যাচ্ছে আমার মা । মায়ের নির্দেশে মুখ বুঝে সব সহ্য করলাম । শ্মশান ঘাটে পৌঁছে আমরা আটজন গঙ্গার ধারে বসলাম একটা গাছের ছাওয়ায় । একসময় সৎকার হলো । সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ডুববো ডুববো করছে । তার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে নদীর জলে । মাঝখান দিয়ে ভেসে চলেছে এক ডিঙি নৌকো । আমাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আপনার ছেলে বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গেল সিঁড়ির শেষ ধাপে । মুখে বলল , মার্ভেলাস । শ্মশানে না এলে খুব মিস করতাম । পটাপট তুলতে লাগলো ছবি । এবার ঘরে ফেরার পালা । আপনাদের নিজেদের লোকজনদের নিয়ে আপনার দাদা দুটো গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন । একবারও জিজ্ঞেস করলেন না যে আমরা কী ভাবে ফিরবো অতটা রাস্তা । গাড়িতে ওঠার আগে আমাকে একবার ডাকলেন । ডেকে বললেন , তোমার শ্মশানযাত্রীদের নামের একটা লিস্ট দিও আমাকে । আর হ্যাঁ , লিস্টে আবার জল মিশিও না । আট জনের বেশি যেন কেউ না থাকে ।
দেখ রুদ্র , আমিতো এই সব কিছুই জানতাম না । শুনে খুব খারাপ লাগছে । যা হবার তাতো হয়ে গেছে । আমার হয়ে তুমি ওদের সবাইকে নিয়ে এস । আমি দেখবো ওদের যেন কোনো রকম অসম্মান না হয় । ওরাও তো মানুষ ।
আমি হেসে ফেললাম ।
কী ব্যাপার , তুমি হাসলে কেন ?
আপনার কথা শুনে । কী মনে করেন আমাদের ? হ্যাংলা না ভিখারি ? তর্কের জন্য মেনে নিলাম যে আপনি এসব কিছুই জানতেন না । আজকে শ্মশানযাত্রীদের জন্য ব্যবস্থা নিচতলায় কলতলার পাশের বারান্দায় কেন ? বলুন , ওটাও আপনি জানতেন না ? প্রয়োজনের সময়ে পাড়ার ছেলেদের বাবা বাছা বলে কাজ উদ্ধার । কাজ যেই মিটে গেল অমনি তাদের দূরছাই । আমি নিজে ব্রাহ্মণ । কিন্তু আমার বন্ধুরা সব ধর্মের এবং জাতের আছে । আমরা একসাথে মিলেমিশে থাকি । আমাদের কোনো সমস্যা নেই । কারন , আমাদের একটাই পরিচয় । আমরা বন্ধু । শধু মাত্র মায়ের নির্দেশে আপনাদের বিপদের দিনে পাশে থেকে সাহায্য করে গেলাম । শ্মশানযাত্রীদের আপনাদের আর কোনো প্রয়োজন নেই । তাদেরও আপনাদের নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই । নমস্কার । আর একটা কথা , পারলে মানুষকে মানুষ ভাবতে শিখুন আর আপনার ছেলেদেরও শেখান । চলি । ভুল কিছু বলে থাকলে মার্জনা করবেন ।

