নারীকে কি কোন বিশেষ একটি দিনে খোঁজা সম্ভব! প্রতিটা দিন-ই তো নারীদিবস।
ফুলকুমারী
‘রিনি তুমি কিন্তু বড় হয়ে গেলে, আজ থেকে তোমার সব কিছুই তোমার একান্ত-গোপনীয়’।
কথাটা মনে পড়তেই তার সমস্ত শরীর নেচে উঠল এক আচমকা শিহরনে। আবেশে মুদে এলো চোখের পাতা। আয়নায় নিজের শরীরটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে রিনি ফিসফিস করে বলে উঠল- ‘আমি বড় হয়ে গেছি- আমি বড় হয়ে গেছি’……
রিনি একদিনেই যেন হঠাৎ করে বড় হয়ে গেল। সেই আশ্চর্য সময়টা যেন রিনির দরজায় কড়া নেড়ে বললো- রিনি, আমি এসেছি……আমাকে বরন করে নেবেনা? আর পাঁচটা বিকেলের মত আজও সে বন্ধুদের সাথে খেলছিল তার প্রিয় খেলা। কানামাছি সাজা বন্ধুর ছোঁয়া থেকে দূরে সরবার জন্য পেছতে পেছতে রিনি তখন একটা ছোট্ট ঝোপের আড়ালে। হঠাৎ করে তার চোখ পড়ল একটা সুন্দর কালচে-সোনালী রঙের প্রজাপতির ওপর। তার একেবারে কাছে বুনোফুলের ওপর বসে প্রজাপতিটা তার পাখনা দুটো একবার মেলছে, একবার খুলছে।
রিনি হাত বাড়িয়ে ধরতে গেল প্রজাপতিটা, কিন্তু হাত পৌঁছানোর আগেই তলপেটের বাঁ দিকটা হটাৎ চিনচিন করে উঠল। সম্পূর্ণ অজানা এক অনুভুতি। রিনি একটু কুঁজো হয়ে গেল ব্যথাটাকে সামাল দিতে। সারা শরীরটা কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠল, চিনচিনে ব্যথাটাও ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল গোটা তলপেট জুড়ে। রিনি বেশ ভয় পেয়ে গেল। বাড়ি চলে যাবে কিনা ভাবছে, এমন সময় হটাৎ চোখ পড়ল বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপরের দিকে। একটা টকটকে লাল রেখা গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে নীচের দিকে। ভয়ে শিউরে উঠল সে, তারপরেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগাল বাড়ির দিকে।
সুমিতা ছাদে মেলে দেয়া জামা-কাপড়গুলো তুলছিলেন। সন্ধ্যা নামতে আর দেরি নেই। তার চোখ ছিল সামনের মাঠের দিকে, যেখানে ছেলে-মেয়েরা খেলছে। হঠাৎ পেছন থেকে রিনি এসে জাপটে ধরতেই তিনি চমকে উঠলেন, কি রে! কি হল?
রিনি তখনও থরথর করে কাঁপছে। চোখদুটো ভরে উঠেছে রূপোলী জলে। সুমিতা বিচলিত হয়ে বললেন, কেউ তোকে বকেছে, অমন করছিস কেন? রিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠল, খুব পেটব্যথা করছে, আর….আর
-কি, আর কি হচ্ছে?
রিনি জামাটা তুলে দেখাল।
সুমিতা মেয়েকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে আদর করতে করতে বললেন, কোন ভয় নেই, সব মেয়েদেরই এমন হয়। আমারও হয়েছিল। রিনি খুব অবাক হয়ে গেল। এমন কথা এর আগে ও কোনদিন শোনেনি। বলল- কেন হয় মা?
সুমিতা মেয়েকে নিয়ে নিচে নেমে এসে ঘরে বসালেন। তারপর বললেন, ‘ জানতো গাছে যখন ফল হবার সময় হয়, গাছ তখন তার দেহে ফুল ফোটায়। প্রতি মাসে চারদিন মেয়েদের দেহে ফুল ফোটে। আজ থেকে তোমার শরীরেও ফুল ফুটল রিনি’।
লজ্জা পেয়ে গেল রিনি। অস্ফুটে বললো- যা!
সুমিতা হাসলেন মেয়ের লজ্জা দেখে। বললেন, ‘লজ্জা পাবার কিছু নেই। সব মেয়ের জীবনেই এই দিনটা আসে, আমারও এসেছিল’। তারপর রিনির হাত ধরে নিয়ে এলেন শোবার ঘরে। আলমারি খুলে বার করলেন তার সবচেয়ে প্রিয় শাড়িটা। নিজের হাতে পরিয়ে দিলেন মেয়েকে। বললেন, ‘ এতদিন এটা আমার ছিল, আজ থেকে তোমার’।
সেই থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রিনি নিজেকে দেখছে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, দেখছে শাড়িটা, তার আঁচলের নকশা। ছোট্ট সুন্দর-নরম গ্রীবাটা সামান্য উঁচু করে পেলব হাত’দুটিকে দেহের দুপাশে ডানার মতো মেলে ধরে নিঃশব্দে বলে ওঠে- আমি ফুলকুমারি।
আচমকা কলিং বেল বেজে উঠতেই একছুটে দরজা খুলে দিয়ে বাবাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে রিনি বলে ওঠে- জানো বাবা, আজ থেকে আমি বড় হয়ে গেছি।
অনান্য দিনের মতোই স্বাভাবিক ভঙ্গীতে মেয়ের গাল টিপে আদর করে তমাল বলেন, ‘ঠিক, ঠিক, তুমি তো বড় হয়েই গেছ’।
মাথা নাড়তে নাড়তে রিনি বলে- না সেরকম বড় নয়, আরও অন্যরকম বড়, অনেকটা ঠিক মায়ের মতো। মানে বয়েসে নয়…… মানে…. আমি হলাম ফুলকুমারি।
তমাল আরও কাছে গিয়ে মেয়ের মুখটাকে দুহাতের মধ্যে নিয়ে আরও একটু বেশি আদর করতে যাবেন, তখনি হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সুমিতা তমালকে উদ্দেশ্য করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘হ্যাঁ মশাই, আজ থেকে রিনি ফুল ফোটাতে শিখে গেছে’।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে যেন ব্যাপারটা বোঝবার চেষ্টা করলেন। তারপর সুমিতার ঈশারা ধরতে পেরে মুখে হাসির ঝিলিক এনে মেয়েকে বুকের মাঝে নিবিড় করে জাপটে ধরে সস্নেহ কণ্ঠে তমাল বলে উঠলেন, ‘আমার ফুলকুমারি’।
ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে ঘরের সিলিং-এর দিকে উঠে যাচ্ছে। একটি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন তমাল, তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। এ রকম ভঙ্গিমায় বাবাকে বসে থাকতে দেখে খুব ভালো লাগলো রিনির। আস্তে আস্তে পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো সে, তারপর আলতো করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই চমকে উঠে ফিরে তাকালেন তমাল। রিনিকে দেখে হাসলেন। তারপর ওকে নিজের সামনে টেনে এনে বললেন, ‘দেখ রিনি, তুমি কিন্তু এখন সুন্দর এক রূপকথার জগতে এসে পড়েছ। তবে কি জানত এ জগতটা যেমন সুন্দর, তেমনি ভয়ঙ্কর। এখন থেকে তোমাকে সব দিক দেখে শুনে পা ফেলে ফেলে এগতে হবে’। রিনি খুব মন দিয়ে বাবার কথাগুলো বোঝবার চেষ্টা করছিল। তমাল আরও বললেন, ‘এই রূপকথার জগতটার নাম যৌবন। কিন্তু এই জগতটা খুব ক্ষণস্থায়ী। আজ যে জগতটাকে জীবনের সবচাইতে সুন্দর বলে মনে করা হয়, হটাৎ করেই একদিন দেখা যায় জীবনের সুন্দরতম সময়টা কখন যেন চলে গেছে, তাই খুব সাবধানে এই সময়ে…..
‘ওকে ভয় দেখাচ্ছ কেন?’
আচমকা সুমিতার কণ্ঠস্বরে অপ্রস্তুত হয়ে তমাল বললেন, ‘না,না ভয় দেখাচ্ছি না, আমি জীবনের সবচেয়ে সত্যি কথাটা ওকে বললাম। তারপর রিনির দিকে তাকিয়ে বেশ মজার ভঙ্গীতে হেসে বললেন, ‘ আচ্ছা ফুলকুমারী, আমরা তিনজন যদি এখন আইনক্সে গিয়ে সিনেমা দেখি তাহলে কেমন হয়?’ রিনির উত্তরের অপেক্ষা না করেই এক নিঃশ্বাসে তমাল মেয়েকে বলেন, আমি আর তোমার মা কিন্তু তৈরি, এখনই রেডি হতে তুমি কতক্ষন সময় নেবে?’
প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও দ্রুত খুশীতে ঝলমলিয়ে উঠল রিনির চোখমুখ। আনন্দে হাততালি দিয়ে বলে উঠল- আমিও রেডি বাবা, দু’মিনিটে হয়ে যাবে।
আলোর রোশনাইয়ে ঢাকা রাতের শহরটাকে আশ্চর্যরকম সুন্দর লাগছিল। চারপাশটা কেমন যেন স্বপ্নের মত মোহময় হয়ে উঠেছে রিনির কাছে। চলন্ত ট্যাক্সির জালনা দিয়ে বাইরেটা তন্ময় হয়ে দেখছে সে। একদিকে তার যেমন রাস্তা দিয়ে যেতে থাকা নানা সাজের নানা বয়েসের মানুষ, দোকানপাট, ছুটন্ত গাড়িগুলোকে দেখতে ভাল লাগছিল, তেমনই তার মনে ভিড় করে আসছে একটু আগে বলা বাবার কথাগুলো- শোন রিনি, আমি আর তোমার মা দু’পাশ থেকে তোমাকে আগলে রাখব, কিন্তু জেনে রাখো যে জগতে তুমি আজ থেকে ঢুকছো, সেখানে পা পেছলানোর হাতছানিও সবসময় পাবে। পা যাতে না পেছলায় সেটা কিন্তু তোমাকেই দেখতে হবে। এবং আমার বিশ্বাস তুমি সেটা পারবে।
গাড়ির জালনার কাঁচে নিজের নরম-ছোট্ট-সুন্দর মুখমণ্ডলের একপাশ আলতো করে হেলান দিয়ে ফিসফিস করে রিনি বলে ওঠে- পারবো বাবা, আমি পারবো, তোমার বিশ্বাস রাখতে পারবো।
হলের সামনে যখন গাড়িটা থামল সুমিতা প্রথম নামলেন এবং রিনিকেও হাত ধরে নামালেন। তারপর বললেন, ‘রিনি তুমি তো এখন বড় হয়ে গেছ, তাই চল আজ আমরা সবাই মিলে একটা বড়দের সিনেমা দেখি’।
রিনি মা’য়ের কথা শুনে বেশ অবাক হল। বড়দের সিনেমা! তাও আবার বাবা-মায়ের সাথে! রিনি মনে মনে বেশ উত্তেজিত হল। এবং বড়দের মতই বেশ খানিকটা গম্ভীর গম্ভীর ভাবভঙ্গী চোখমুখে আনার চেষ্টা করতে করতে সে মা’য়ের হাত ধরে হলে ঢুকল।
সিনেমাটা দেখতে রিনির খুবই ভাল লাগছিল। পাহাড়-ঝরনা, সমুদ্র-বেলাভুমি। কলেজে পড়াশোনা থেকে ছেলে-মেয়েদের আড্ডা-গল্পের নানা মজার দৃশ্য। ঝকঝকে গাড়ি চেপে ঘুরছে নায়ক-নায়িকা, নেচে নেচে গান গাইছে। এমন সিনেমা এই প্রথম দেখছে রিনি। তাই সে বেশ আনন্দের সাথে উপভোগ করছিল। কিন্তু শেষে যখন ছেলেটা মেয়েটার ভালবাসার দাম দিল না, তাকে অস্বীকার করল, তখন মেয়েটার কষ্ট দেখে, তার ভেঙে পড়া কান্না দেখে- রিনিও নিঃশব্দে কেঁদে ফেলল। পাশে বসা বাবা-মায়ের মুখ দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু আলো-আঁধারিতে সেভাবে দেখতে পেলনা।
সিনেমার মেয়েটি, ছেলেটিকে ভালবাসতে গিয়ে নিজের পড়াশোনা-কেরিয়ার সব বিসর্জন দিল। এমনকি নিজের বাবা-মায়ের সাথেও সম্পর্ক ত্যাগ করল। তবুও, তবুও ছেলেটি এমন করতে পারলো মেয়েটির সাথে! ঝাপসা চোখে রিনি দেখতে থাকে সিনেমার শেষ দৃশ্য- মেয়েটি তখন চারদিকে গাছপালা ঘেরা একটা নির্জন রাস্তায় একা হাঁটছে, সূর্যের আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। একটু পরেই চারপাশ ঢেকে যাবে ঘোর অন্ধকারে। কি করবে ঐ মেয়েটা? ও কোথায় যাবে? ওতো সম্পূর্ণ একা? কে ওর হাত ধরবে?
মেয়েটির দিকে নিস্পলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে উৎকণ্ঠায় অস্থির হয়ে উঠল রিনি। সিনেমার পর্দা জুড়ে তখন নামতে শুরু করেছে অন্ধকার। কান্নাভেজা চোখে মেয়েটি চারদিকে তাকাতে থাকলো…… বোধহয় সে কিছু খুঁজছে কিম্বা এই মুহূর্তে হয়তো কাউকে আশা করছে…. কিন্তু কেউ কোথাও নেই.. কেউ এলোও না। পর্দা জুড়ে তখন নিকষ কালো অন্ধকার। মেয়েটিকেও আর দেখা যাচ্ছেনা। দূরে কে যেন বুকভাঙ্গা কান্নার সূরে বাঁশি বাজাচ্ছে……
রিনির ভেতর থেকে উঠে আসা রাশি রাশি কান্না ততক্ষণে তার সরু চিকন গাল’দুটি বেয়ে নামতে শুরু করেছে। আচমকা হলের আলো জ্বলে উঠতেই সেটা লক্ষ্য করে একহাতে মেয়েকে কাছে টেনে অন্য হাতে তার চোখের জল মোছাতে মোছাতে গাঢ় কণ্ঠে তমাল বলে উঠলেন, ‘কাঁদছিস কেনরে ফুলকুমারি! এটা কি সত্যি নাকি? এটাতো সিনেমা!’
সুমিতা স্বামীর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘ এই মুহূর্তে ওর ভেতরের যন্ত্রণা সবটা তুমি বুঝতে পারবে না। ওকে কাঁদতে দাও।
পুলক মণ্ডল, কালনা, পূর্ব বর্ধমান,

