Dilip Kumar Dey

মিসেস ভয়ঙ্করী
(রম্য রচনা)
দিলীপ কুমার দে

আমি একজন গ্রাম্য গৃহবধূ । লোকে বলে,ছোট বেলা থেকেই আমার নাকি তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ছিল । বুদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে ছিল আমার গলা । আমার বাঁজখাই গলা শুনে কেউ আমার সাথে কেউ তর্ক করতে সাহস পেত না। ঝগড়া তো দূরের কথা। অনেকে বলে আমার যদি সামান্যতম পড়াশুনো থাকত, মায়াবতী -ছায়াবতী কেউ পাত্তা পেত না ‌। মুখ্যমন্ত্রী আমিই হতাম । অনেক জ্যোতিশীই আমার হাত দেখে বলেছেন আমি নাকি রাজরানী হবো। কোনকালেই আমাদের বাড়ির অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না, তাই বাবা ভালো ঘরে আমার বিয়ে দিতে পারেন নি। আমার বর একজন ফড়ে। সারাদিন যা রোজগার করেন , তা’দিয়ে দিনটা কোনরকমে চলে যায়। সঞ্চয়ের কথা ভাবতেও পারতাম না। বরের নিজস্ব কোন বাড়ি ও ছিল না । রেল লাইনের ধারে একটা ঝুপড়ি বানিয়ে সেটাকেই রাজপ্রাসাদ ভেবে নিয়েছেন। বরটা পুরোপুরি মানুষও ছিল না। ভেতরে ভেতরে কিছুটা সততা,ভদ্রতা কিছুটা নম্রতা ছিল। ভালো মানুষ বলে এ অঞ্চলে যথেষ্ট সুনাম ও ছিল তার । বিয়ে হয়ে আসার তিন মাসের মধ্যে ঝেঁটিয়ে পিটিয়ে ওটাকে মানুষ বানিয়েছি । এখন কারো বাড়ি গেলে আর খালি হাতে আসে না,কিছু না কিছু হাত সাফাই করে ঠিক নিয়ে আসে। ব্যাটা যখন আমাকে দেখতে গিয়েছিল তখন ভেবেছিল,এত সুন্দর দেখতে মেয়েটা, স্বভাব চরিত্র ও নিশ্চয় খুব ভালো। সংসারটা আমার সুখেরই হবে। আমি তখন মনে মনে ভেবেছিলাম, তোমাকে পথে আনতে আমার এক মাসও লাগবে না। বাড়ি নিয়ে যাও না আগে, তারপর বুঝতে পারবে কি জিনিষ নিয়ে গেলে ! ভগবান আমাকে পাঠিয়েছেনই লোককে জ্বালাতে। দারিদ্র্যের জন্য স্কুলে যেতে পারিনি। কিন্তু তা’বলে আমাকে মূর্খ ভাববেন না। অনেকেই বলে আমি নাকি প্রচন্ড বুদ্ধিমতি। দু একটা ইংরেজি ও বলতে পারি। এই তো সেদিন একটা বিয়ে তে গিয়ে বৌকে আশীর্বাদ করতে গিয়ে বললাম —বাঃ খুব সুন্দর বৌ । সুন্দর সেকেন্ড হ্যান্ড বৌ । ওমা বিয়ে বাড়ির লোক গুলো কি অশিক্ষিত! ইংরাজি ও বোঝে না । আমার ইংরাজি বুঝতে না পেরে আমাকে প্রায় মারতে আসে আরকি । আসলে আমাদের পাড়ায় একজন মাষ্টারমশাই একটি পুরোনো গাড়ী কিনেছেন,সেটা দেখে একজন বলছিল —কি সুন্দর সেকেন্ড হ্যান্ডগাড়ী, এত নুতন! কত সুন্দর ! সেটা শুনেই এখানে ইংরাজিটা প্রয়োগ করেছিলাম।
আর একদিন একজন কে খুশি করার জন্য বলেছিলাম ” বাষ্টার্ড”, কি সুন্দর একটা ভারী ভারী শব্দ !ওমা! তারপর থেকে উনি আর আমার সাথে কথা বলেন না। একটা ঝগড়া থেকে ঐ সুন্দর ইংরাজিটা শিখেছিলাম। পোড়া দেশের লোকগুলো ইংরাজিও বোঝে না। সেই দুঃখে এখন আর ইংরাজি বলি টলি না।
একটা সময় খুব কষ্টে কেটেছে আমাদের । অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটত। আমি আসার পর ধীরে ধীরে অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। এখন আমাদের কি নেই ? মাথার উপর ছাদ, বাড়িতে জলের মেশিন,কাপড় ধোয়ার মেশিন , মশলা করার মেশিন,জল গরম করার মেশিন। ওয়াশিং মেশিন, ফ্রীজ এসি, সব ! ঝকঝকে মার্বেল বাঁধানো কিচেনও আছে একটা । তা সত্ত্বেও এক চিলতে উঠোনে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় শুকনো পাতা ডাল দিয়ে রান্নাটা সেরে নি । এতে দুটো লাভ আছে, ১. নিকটতম প্রতিবেশীদের ভীষণ ভাবে জ্বালানো যায়। উনুনের ছাই, ধোঁয়া গিয়ে পাশের বাড়ি নোংরা হয় । পাশের বাড়ির বাচ্চা ছেলেটা তো জন্মাবধি ঐ ধোঁয়া গিলে শ্বাসের রুগী হয়ে গেছে। এখন নাকি ইনহেলার ছাড়া চলে না। কি আনন্দ না !
২. বিভিন্ন পার্টির লোক যখন বাড়িতে তখন আসেন বাইরে ভিখারীর মতন রান্না করতে দেখে কিছু না কিছু অনুদান অনুমোদন করে যান ।
আগে আমরা যেখানে থাকতাম, সেই পাড়ার শেষ মাথায় একটা বাড়ি ছিল, বাড়িটার মালিকের তিন কুলে কেউ ছিল না। পাঁচ কাঠা জায়গার উপর বেশ পাকাপোক্ত একটি বাড়ি। হঠাৎ একদিন ঐ ভদ্রলোক আত্মহত্যা করেন। ভদ্রলোক ফাঁসি দিয়েছিলেন। পাড়ার কেউ জানতেনও না। দু’তিন দিন পর পচা দূর্গন্ধে ঐ চত্বরে কেউ যেতে পারছিলেন না। পাড়ার লোক পুলিশে খবর দেওয়ায় পুলিশ এসে পচা-গলা দেহটা নিয়ে গেছে। তারপর থেকে পারতপক্ষে কেউ ঐ চত্বরে পা মারাতেন না। অনেকেই নাকি সেখানে অশরীরী আত্মার উপস্থিতি উপলব্ধি করেছেন । বাড়িতে জঙ্গল-আগছায় ভরে গেছিল ।এই সুযোগে আমি বুদ্ধি করে ঐ বাড়িটা পরিস্কার টরিস্কার করে দখল করে নিয়েছি । বাড়ি পাওয়ার পর আমি এখন প্রচন্ড ধার্মিক হয়ে গিয়েছি, সপ্তাহের প্রতিদিন কোন না কোন পূজো করি। হিন্দু ,মুসলিম, খ্রীষ্টান কারো পূজোই বাদ দিই না। পূজোর আয়োজনে তেমন কিছু থাকে না, কিন্তু উলু-শঙ্খধ্বনি-কাসর-ঘন্টা দিয়ে সারাটাদিন এমন মাতিয়ে রাখি , পাড়ার লোক বলতে বাধ্য হয় —পূজো-আচ্চা হয় বটে ঐ বাড়িতে! অনেকে তো বাড়ি এসে জিজ্ঞাসা করে —আপনারা কি ব্রাম্হণ ? এত পূজো হয় এই বাড়িতে ! এই জন্য পাড়ার লোক খুব সমীহও করে আমাদের। কারো কাছে কিছু চাইলে আর না-টা করে না। কেউ আমার কথার উপর কথা বলে না। এমনকি কাউকে বকলে —সে ছোট হোক বা বড় হোক মাথা নিচু করে থাকে, কোন প্রতিবাদ করে না। নিন্দুকেরা বলে আমার ভয়ে নাকি কেউ কিছু বলে না। ঝগড়ায় আমি নাকি পি এইচ ডি ! সব মিথ্যা কথা। আমাকে হেয় করতে মিথ্যা অপপ্রচার । আসলে সবাই আমাকে খুব সম্মান করে, সমীহ করে। একজন গুণী মানুষের গুণের মর্যাদা দেয়।
আমি একটা কাজে খুব পারদর্শী। পাড়ার যে বাড়িতে শান্তি দেখি সেখানে গিয়ে পরিবারের লোকেদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে এমন অশান্তির পরিবেশ তৈরি করে দি, যে কাকপাখীও ঐ বাড়িতে বসতে ভয় পায়। শাশুড়ি -বৌমার মধ্যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, মা-ছেলের মধ্যে বিভাজন তৈরি আমার কাছে জলভাত। এখন পর্যন্ত আমার পৌরহিত্যে তিনটি বিবাহ বিচ্ছেদ ও চারটে বৃদ্ধাশ্রম যাত্রা হয়েছে । আর ভাড়াটে তাড়ানোর ঘটনা তো অগুনতি ।এখানেই আমার কৃতিত্ব। এটাই আমার জয় । ভাড়াটে তাড়ানোতে আমার থেকে আমার সেজো বৌমা অনেক বেশি পারদর্শী। সেজো বৌমা আর একটা খুব মজার কাজ করে। আমাদের বাড়িতে সারাদিন যে এঁটো কাঁটা হয়, তা সকলের অগোচরে কারো বাড়ির সামনে রেখে আসে । পাড়ার লোক এসে যখন ঐ বাড়ির লোককে বকা-ঝকা শুরু করে, তখন কি মজাই না হয় । একদিন তো একটা ছেলে পাশের বাড়ির লোককে “শুয়োরের বাচ্চা -কুকুরের বাচ্চা” বলে বকে গেছে। আমরা শাশুড়ি-বৌমা খুব উপভোগ করেছি ঘটনাটা ‌।
আমার পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। খুবই দুঃখের বিষয় এদের মধ্যে একমাত্র মেজো ছেলেকেই আমার মনের মত করে মানুষ বানাতে পেরেছি। ওকে দিয়ে বড় বড় হাত সাফাই নিমেষে করাতে পারি। গলাবাজিতেও ও আমাকে ছাড়িয়ে গেছে। ও আমার গর্ব, আমার অহংকার। ওকে দেখে বোঝা যায় আমি শিক্ষিকা হিসাবেও খারাপ না।
বড় ছেলেটা আস্ত একটা অমানুষ তৈরি হয়েছে। স্মিতভাষী সৎ ও পরিশ্রমী। ও বলে ,পরিশ্রম করেই উন্নতি করব। ব্যাটা এমন সৎ হয়েছে যে, ওর জন্য সমাজে মুখ দেখানো দায় হয়ে উঠছে । আজকের দিনে সৎ হয়ে পেটে গামছা বেঁধে থাকা ছাড়া আর কিছু হবে না। ছিঃ! বোকারাই সৎ হয়। পরিশ্রমী হয়।
পাঁচ পাঁচটি বৌমার মধ্যে একমাত্র সেজো বৌমাকে মনের মতো করে মানুষ করতে পেরেছি । আসলে ওর পেটে বিদ্যা নেই তো! তাই, নমনীয় । যা বলি তাই শোনে । একেবারে আমার প্রতিচ্ছবি আমার সেজো বৌমা। পরিবারের মধ্যে ভাঙ্গণ ধরাতে আমার চাইতেও অনেক বেশি এক্সপার্ট ও। সেজো বৌমা আমার আদর্শ ছাত্রী । আমার পাড়ার ও গর্ব। বাকি চার বৌমা আমার কলঙ্ক, আমার ব্যর্থতা। শত চেষ্টা করেও তাদের মানুষ করতে পারিনি। আসলে লোকে বলে “শিক্ষা মানুষকে মহান/মহীয়সী করে, বিনয়ী করে। এটাই হল কাল। তিন বৌমাই কম বেশি শিক্ষিতা তাই, তাদের শত চেষ্টাতেও তাদের আর মানুষ করা গেল না। তাছাড়া, ওদের প্রত্যেকের মা-বাবাও খুব একটা ভালো মানুষ নন। পাড়ায় ওঁদের খুব সুনাম। সবাই বলে, ওনাদের মতো মানুষ হয়না। মেজোবৌমার বাবাকে তো ওদের পাড়ার লোকেরা দেবতার মত মানে। আমার মা-বাবা এই রকম হলে মুখ দেখাতে পারতাম না। ছিঃ ছিঃ,কি লজ্জার কথা! মেজো বৌমা কি করে মুখ দেখায়—-কে জানে !লোকে প্রসংশা করলে কেমন যেন গাটা ঘিনঘিন করে। প্রসংশার দ্বারা ততটা প্রচার পাওয়া যায় না যতটা পাওয়া যায় নিন্দা থেকে।
সৎ পথে থেকে কি উন্নতি করা যায়? পৃথিবীর কেউ কোন দিন সৎ পথে থেকে জীবনে উন্নতি করতে পেরেছে ? দুনম্বরী ছাড়া বড়লোক হওয়া যায় না, আর টাকা না থাকলে উন্নতি ? —-কাঁঠালের আমসত্ত্ব !
সেদিন সন্ধ্যায় নাতি নাতনীদের ঘুম পাড়াতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সারাজীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসেব করছিলাম। বাচ্চা বয়স থেকেই সবার মুখ থেকে ‘রাজরানী হব ‘ শুনে আমার ও মনে একটা সুপ্ত বাসনা জন্মেছিল। কিন্তু তা আর হল কই ? আসলে এ পোড়া দেশ একজন গুণী মানুষকে চিনল না। গুণী মানুষ চেনার জন্য যে শিক্ষা দরকার তা-ই নেই মানুষের। এমন সময় বাইরে কোলাহল কানে এলো। একজন বাঁজখাই গলায় ডাকছিল —-শরৎবাবু , বাড়ি আছেন ? বলতে বলতেই আট-দশ জন বয়স্ক লোক ঘরে ঢুকে পরলেন। বললেন —- আমরা লোকাল কমিটি থেকে এসেছি । শরৎ কোথায়?
এনাদের দেখেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বললাম, আমারা একটু সমস্যায় আছি, চাঁদা টাদা কিন্তু দিতে পারব না।
—–না না, আজ চাঁদা নিতে আমরা আসিনি। এসেছি একটা প্রস্তাব নিয়ে। আমরা লোকাল বডিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনাকে মুখ্যমন্ত্রী বানাব। আমরা এই সিদ্ধান্ত রাজ্য কমিটিতে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছিলাম। আজই সেই অনুমোদন এসেছে। আপনি ভোটে দাঁড়াবেন, আপনাকে জেতানোর দায়িত্ব আমাদের । আপনার এই বিষয়ে আপত্তি নেই তো?
ওরা চলে গেলেন। বাড়িতে খুশির ঢল নামল। আমি সেজ বৌমাকে বললাম, —-বৌমা, তোমাকে আমি বলেছিলাম না ? মিথ্যার জয় হবেই। মিথ্যা কোনদিন চেপে রাখা যায় না, একদিন প্রকাশ পাবেই। সত্যের প্রকাশ শতষ্ফুর্ত ,আর মিথ্যার প্রকাশ অপচেষ্টায় । অপচেষ্টা অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী।

দিলীপ কুমার দে
ধূপগুড়ি, জলপাইগুড়ি।

Comment