অনুভব
___________
এ বছর পুজোয় ছেলের জামা কেনা হয়নি হারাণ মণ্ডলের। বৌ-এর কঠিন অসুখের চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেছে মেলা টাকা। শেষ পর্যন্ত বৌ যে প্রাণে বেঁচেছে এটাই অনেক। মিত্তির পাড়া থেকে ঢাক বাজানোর বায়না দিয়ে গেছে , কিন্তু সে টাকা সংসার চালাতে শেষ হয়ে যায়। বাকি টাকা তাঁরা পুজো শেষে দেবেন। গত চার বছর ধরে মিত্তির পাড়ার দুর্গা পুজোয় ঢাক বাজান হারাণ। পুজো ছাড়া বাকি দিন ভাগ চাষে মাঠে যেতে হয় হারাণকে। তবে সে কাজও সব সময় জোটে না। এক ছেলে আর বৌ নিয়ে অভাবের সংসার।
মিত্তির পাড়ায় চার বছর হল পুজো হচ্ছে। আগে ট্রেনে করে হারাণকে চাকদহ যেতে হত ঢাক বাজাতে। পারিশ্রমিক কম ছিল। মিত্তির পাড়ায় বেশ কিছু উঠতি ধনীদের বাস। তাঁরা বড় অঙ্কের চাঁদা দেন। বেশ ঘটা করে পুজো হয়। অষ্টমী নবমী দুদিন কাঙালী ভোজন হয়।
এবারে মিত্তির পাড়ায় ঠাকুরের সাজ সাবেকি, এক চালার মধ্যে পুত্র কন্যা ও বাহনদের নিয়ে মায়ের অবস্থান। শাড়ি, গয়না, অলংকরণের মধ্যে প্রাচীন ও আধুনিকের সমন্বয় লক্ষিত হয়। হারাণ ষষ্ঠীর দিন থেকেই ঠাকুর মণ্ডপে আছেন। সঙ্গে দশ বছরের ছেলে পাঁচু। শহরের গভ: স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে পাঁচু। লটারিতে নাম ওঠায় ভর্তি হতে পেরেছে। পাঁচুর শান্ত স্বভাব। পুজোয় বাবার কাছে তার কোন চাহিদা নেই। বাড়ির পরিস্থিতি বোঝে সে। আগের বছরের জামা পরেই পাঁচু বাবার সঙ্গে এসেছে মণ্ডপে। মিত্তির পাড়ার মণ্ডপে কাঙালী ভোজনের সময় ওই পাড়ার রায় গিন্নী তাঁর স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ান। বয়স বছর পঞ্চাশ হবে। লাল পাড় সাদা শাড়ি, লাল টিপ,এক গা গয়না পরেছেন রায় গিন্নী, বেশ অভিজাত চেহারা। আজকের কাঙালী ভোজনের টাকা এই নি:সন্তান দম্পতিই দিয়েছেন।
অষ্টমীর সন্ধি পুজো শুরু হয়েছে। ঢাক, কাঁসর, ঘন্টার আওয়াজে পুজো মণ্ডপ মুখরিত। মিত্তির পাড়ার যত মেয়ে বৌ সকলেই ভিড় করেছে। প্রদীপের আলোয় মায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এক অনির্বচনীয় স্বর্গীয় পরিবেশ। ধুনুচি নাচেরও আয়োজন হয়েছে। আরতির তালে তালে ঢাক বাজাতে বাজাতে হঠাতই হারাণ অতিরিক্ত ঘামতে শুরু করেন, শুরু হয় শ্বাস কষ্ট। কর্তা ব্যক্তিরা হারাণকে চেয়ারে এনে বসিয়ে চোখে মুখে জল দেন। পাঁচু দৌড়ে গিয়ে ঢাক তুলে নেয়। বাবার কাছে সে তালিম নিয়েছে। ছোট বয়সে ভালোই বাজায়। তাক লাগিয়ে দেয় সকলকে। সন্ধি পুজো শেষ হলে রায় গিন্নী পাঁচুকে কাছে ডাকেন। তার গাল ধরে বলেন, “তোর এই সরল সুন্দর মুখে যে কি মায়া ছড়িয়ে আছে জানিনে। আর তোর হাতে জাদু আছে। আজ যা বাজালি, মা তোকে আশীর্বাদ করবেন।”
কিছু ক্ষণ পর হারাণ একটু ভালো বোধ করায় হাত জোড় করে রায় গিন্নীর সামনে এসে দাঁড়ান।
” কিছু মনে করবেন না মা, আজ ছেলেটা না থাকলে কি যে হত! ও যেটুকু পেরেছে বাজিয়েছে, ভুল ত্রুটি মার্জনা করবেন। পুজোয় ছেলেটাকে একটা নতুন জামাও কিনে দিতে পারিনি।”
হারাণের চোখে জল দেখে রায় গিন্নীর মন দ্রবীভূত হয়। বলেন, “মায়ের আশীর্বাদে তুমি তো রত্ন ছেলে পেয়েছো হারাণ।”
পরদিন রায়বাবু দুটো নতুন জামা প্যান্টের সেট হারাণের হাতে তুলে দেন। হারাণ নিতে রাজী হন না। রায়বাবু জোর করে দেন। তিনি বলেন “ধরে নাও পাঁচু আমারও ছেলে। আজ থেকে ওর দায়িত্ব আমার। ভবিষ্যতে কোন অসুবিধা হলে, কোন অভাব ঘটলে তুমি আমায় জানাবে। সংকোচ করবে না।”
হারাণ ভাবতেও পারেনি রায়বাবু পাঁচুর জন্য জামা কিনে আনবেন। পুজো শেষে বকেয়া টাকা নিয়ে বাড়ি যেতে যেতে হারাণ অনুভব করেন,” এ জগতে দুঃখের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে সুখ !”
জনা বন্দ্যোপাধ্যায়
চুঁচুড়া, হুগলী

