এক ডজন কবিতা
বিভাষণ
নজর উল ইসলাম
যতদূর জানি, দেখি অনেক মানুষ অবিচ্ছেদ্য
তাও মানুষকে কেউ দেখে না
শ্রেণীশত্রু বনে গেছি স্বার্থক সুশোভন
কাগজেই ঝুলে আছে গভীরতম অসুখ
আমরা, আমরা খুব সংগোপনে একা হই
সরিয়ে নিই প্রাণপণ নিজেকে ফুলেরও অধম
ভালোবাসা ভুলে গেছি নাটকীয় দরাজে
সত্যিই খতম রঙহোলির অবর্ণন বিস্তার
নিরাপদে জেগে ওঠে দিন নেমে আসে রাত
ওজনদার ক্ষত ক্রমশ কৌতূহল ডুবন্ত
ভিজে শ্যাওলার চাপ সরে না কেবল ব্রেনওয়াশ
সমর্থনের মরিয়া দখলদারি মৃদু হেসে কাত
নির্লোভ জমি আছে পড়ে দূরে আরও নিরাপদহীনতা
সাহসী রোদ আসে সব আদর্শে উৎসাহিত
শেষ কথা বলে তো কিছু নেই — অজস্র ঝুরি
এখনও মানুষের দিকে চেয়ে আছি ভালবাসুন
সমাজতন্ত্রের অলেখা পাতায় ভাসে সে আকাশ
কখনও বলে না লুটেপুটে খেলে কিছুই থাকে না পাতে…
চাষ / নজর উল ইসলাম
নীল মায়া নিংড়ে মনছবিতে ফেরা
আকাশি ভরসার মত কখন যে হাওয়া কেটে বেরিয়ে যাবে
ধূসরে আটকে জীবনকে ছন্ন ও ধন্দের গহ্বরে অশরীরী
চেনা মন কেড়ে পারে না অমরতার গান
সঙ্গী চিনতে এত ধাঁধার কবলে ঘুরপাক
রাত জেগে নিঃশব্দে পড়তে হয় মনবাগান
যে জীবন শুধুই একটা নেপথ্য-নয়ন চায়
আবহমান এ প্রশ্নমালা ঘাঁটতে ঘাঁটতে লক্ষ্যহীনতায়
অস্ফূট ফুলের অনাবশ্যক চাষ-কৃতি ব্যবচ্ছিন্ন
নিজেকে আড়ালে রেখে এই হাডুডু খেলা রহস্য জনিত
জোছনার আলো মেরে মেঘেরা মজা মারে
দু’পা পিছিয়ে এসে ও দেখি নকল সিনেমা
দাঁড়কাকেরাও ভিজে মরে অভিশপ্ত দিনমানে
ভুঁইফোঁড়রা পর পর পথ পায় নিপুণ আয়োজনে
গান্ধীগিরি যারা করেছে চাঁদ ডুবেছে হাতের ভেতর…
বিস্ময় চিহ্ন / নজর উল ইসলাম
বিস্ময় চিহ্নে ঝুলে কাছে আমাদের আবহমান
অথচ চারদিক কার্নিভাল কার্নিভাল লাগছে
এত চাতুর্য কী মানুষের মানায়
ভবিষ্যপুরাণ যতই পড়ছি অতলে চিতাকাঠের জীর্ণ দিনমান
কালপুড়ে যাচ্ছে সবুজ সমারোহ ডুবছে-ভাসছে-ডুবছে
একচাদরে এমন উল্লাস ক্রোড়পত্রে কেউ সাজায় না
নিয়মের ক’টা পিঠ শেকড়ে শেকড়ে আরও অবর্ণন
ভাঙনের ছেড়ে যাওয়া যারা দেখেছে জানে আঁধার
মধ্যমণি যাপন অতিশয় সাদা, উদ্বেগেও
অনুভূতি লিখতে যাপনচিত্র উঠে আসছে—উৎখাত,
বাড়ি বাড়ি কত ছন্ন-ভিন্নতা সার্থকতার পরিহাস গুনছে
অস্ফুট দীর্ঘশ্বাস পুষে যাব কেবল বৈষম্যের খাতায়…
শিল্পী / নজর উল ইসলাম
তোমাকে দেখি আর ভাবি ডুবে যাওয়া চাঁদের কারুকৃতি
সব ফর্মাটে জীবন বুঝি এভাবেই গড়ে ওঠে
রাঙে,নেভে পূজার পাত্র সেই অঞ্জলীতেই
আড়াল হলে বিমোহিত টান প্রাগাঢ় হয়
এই পাখির ভুবন এই বিস্মৃতির মন-উঠোন
মেঘের আত্মপরিচয় খুঁজি বেহায়া হয়ে পাড়ি
লুকিয়ে লুকনোর ভান এ গ্লাস ও গ্লাস করি
রোদ্দুরে মেলা কাপড় থেকে বাষ্প শুকানোর নিয়মে
এই তো ক’দিন আগেও ভাবতরঙ্গ জুড়তাম তোমার
ইতিহাস থেকে বিজ্ঞান থেকে ভূগোল ঠুকরে
চেনা-অচেনাকে জিজ্ঞাসা করেছি মন-রাগিনীকে
এখন বুঝি ডানা একটা স্বারস্বত অভিযোজন, কামিনী স্রোত
দুঃখের সঙ্গে মিলেমিশে ঘর করছে স্বভাব
নাম নিয়েছি প্রণয় প্রতিটি স্তবকে নতুন পাতার গান
বিজ্ঞাপনে বলা যায় না মাপা যায় না মায়াভূমি
কেবল ভালোবাসার আশ্রয়-প্রশ্রয় ভাঙি
আমি এক আকাশ তুমি গড়নের তারাপুঞ্জ মুদ্রণশিল্পী…
মিশ্রবৃত্ত / নজর উল ইসলাম
বিন্যাস চিনিনা অনুষঙ্গের আকাশ পেড়ে দেখি
নিখুঁত সংহারে কীভাবে বাজে বাজনার বাঁশি
ছিনিয়ে আনে বিরুদ্ধ শিকারে ম-ম সংসারী
মিশ্রবৃত্তের জলন্ত আবহে যেন অসাধারণ পরকীয়ায়
মন নির্ধারিত গ্রহণ টেনে বরাবরই সামরিক
রোদ্দুর ঘেঁষা অথচ অনালোকিত ছন্দবোধ পাওয়া
কবিতার মত ভেতরের নারীকে নির্মাণ করি
কালক্রমে সেও গভীরের চেনা কোন আসক্ত মুখ
খোলসী সে ঘরে বিষাদ কে বসাতে চায় না জীবন
যখনই পাতার বিপ্লব আসে বর্ণাঢ্য ছায়া ফেলে
অনাস্বাদের ইতিহাস উঠে আসে পৃথিবীর বাগানে
এতদিন কার জড়ানো আঁকাগুলির ভিত্তি লিখি
মন থেকে পরম যত্নে পড়ি উপলদ্ধির আকাশ
যেখানে বিষন্নতা নেই সে আবাস আমি পাব না
যেখানে আলো নেই সে আমার পৃথিবী না
শুধু মুহূর্তের দাসত্বে শিকার মুখর দুনিয়া…
রূপকথার কথকথা / নজর উল ইসলাম
প্রতিটি মানুষের ভেতরের আয়নায় কত আঁকিবুঁকি
কত ঝোরা ইতিহাস
প্রতিটি চোখে ও নিরলস বিষাদের রক্ত মোহ-আগুন
নদীর মত ঠিকরে ওঠা অবর্ণন ঢেউ
যা আজও আবাদি অথচ খোলসে মুখোশ বন্দি
নিরিবিলি মনঘর কাঁদে
রূপকথার কথা হয়ে অন্তহীন দিশেহারা মেঘপুঞ্জ
সাহসী রোদ্দুর আকাশি পেয়ালায় বসে আছে
এহেন ঘনক ধারাপাত পড়ে শেষ করতে পারিনা
হাতপাতি জীবন যুদ্ধের কাছে সে তো বেবাক
শুধু নিঃশব্দে যখন রাত আসে একাকীত্বের ভুবনে
জোছনার রঙ সবুজ অহংকার তখনও আমরা দাঁড়কাক…
ফুলঘর / নজর উল ইসলাম
আমি বেশ ছিলাম বেশ যাচ্ছিল আবহমান
একটা ফুল উড়ে এল কী বৈচিত্র্যময়
কিছুই বোঝা যাচ্ছে না তার শূন্যের গান
অস্পষ্ট কলস্বরের মনজমিন শুধু এইটুকুই
জানি সে মানুষ সভ্যতার সম্পদ— ধরুন মোমবাতি
পৃথিবী দেখছে আকাশি কতরঙের মূর্ত-বিমূর্ত রকমফের
গাছগাছালির ভেতরও এত সন্নিবেশের অপরিচয়
ডানাঝাপটানো গণসংগীত ভাসছে, শিরদাঁড়া ভাসছে
হাত ছেড়ে যাব না ভেবেছিলাম সেই নিয়ে আছি
আমার পেছনে শকুন ছিল একবারও দেখিনি
আমি তো ফুলঘরের বাসিন্দা জেনেও
শূন্যের গতানুগতিকতা পড়ি লাস্যভূমির ওপর
জমিন কাঁদে সমগ্র জীবনদর্শন চিরকালীন
মানুষ নামের ভূতুড়ে দরগায় এসেছি আমি
এমন স্বীকারোক্তি বরাবরই মনবাহনে থেকে যাবে…
কারসাজি / নজর উল ইসলাম
নমস্য ভাষ্য লিখি ভাব লিখি সুলগ্ন গর্ভবাস
ফসিল পরাগ ওড়ে যোজনার আয়োজন
মহার্ঘ্য উপহার জীবন আঁকড়ে সময়নীয় সখা
আপন মনপাড়ায় দু’আঁজলায় তুলে নেয় প্রণিপাত
সব অভিমুখে হাজার ও বাঁশির চটক আভূমি
সুদক্ষ আলো ডাকে ভোরের আকাঙ্খা প্রাপক
একযোগে আঁধার অন্ধ দশায় বিশ্রী
খচ্চরের মুন্ডুপাত—স্লোগান লাগে না
দিশার অভিব্যক্তি ফুটন্ত ঘটনাক্রম
বিদেশি মজমায় আকুল কারসাজির কোম্পানি…
উন্মোচন / নজর উল ইসলাম
পৃথিবী লুকিয়ে রাখেনি কিছু, গোপন ঘোমটায়
সারারাত ভিজে যায় মোহ-মুকুরে অশ্রুত
স্ফূট ভুবন আঁকন কৌতুহল ভরে সময়সিদ্ধ
সঞ্চারী ঠোঁটে অঙ্গন জুড়ে যায় স্মৃতিমন্থনে
সুচারু মন ভাসে, ভাসে এক ঔপনিবেশিক জন্ম
সব কথার ভেতর চোরাবালির পরিচিত অভিমত
আলোর আর আসে না নীরব পল্লী যেন
ফিরেও ফেরে না সৃষ্টিশীল ভুবন বিস্ময়—
মননে মেখেছিলাম যে অভিনব স্নায়ু-প্রীতি
নিভু নিভু আজ কাঁপনের মুখে চোখমুখ
দাসত্বের কবলে প্রকৃতি-সংষ্কৃতি সংলাপ সার
চমকে রেখেছে বেঁধে সবকিছুই আমলাতন্ত্রে
ভাসমান চোখে ওড়ে পরাজিত মায়াফাঁদ
ফুলকির পাথেয় রসদ বাস্তবিক নিষিদ্ধতায়
যাপন ম্লান-ক্ষয়-লয় প্রতিকৃতি অধরা স্বপ্নযুগ
বেলাগাম পড়ে যাচ্ছে নাব্যতার দিকে সমীকরণ
উন্মোচন সীমার অনন্তে অনুবাদ হয়ে যায় খন্ডে…
টান /নজর উল ইসলাম
পৃথিবীর সব বৃষ্টি ফোঁটার সাথে
মানুষের কথা হয়ে যাক
একটোপ না-পাক পানি
যদি ধরে রাখে আজন্ম টান
কোথায় ভাসাচ্ছ তবে মৃত্যুভেলা,কলাকুশলীরা
এ তো চরের উঠোন, অনিবার্য ঘোলের ঘর
ছেপে যাবে ঋতু-গান স্বপ্নের হাত ধরে
সহস্র ভিক্ষের ঝুলি, বিষাদ-ব্যথা,স্বরলিপি
পেয়ে যাবে একদিন—ইতিহাস ঠুনকো তারা
কতই তো মন ভেঙে পড়ে আছে কথিত আলো
নিরাশার ছায়াতলে চেনা মিথ পাথরের কান্না
জোড়ের ময়না-মনি জোগাল মন-কীর্তনে
আবহমান আগুনের জ্বালা
পাথরে শিলার গান,শোনা যায় ঝন ঝন
মনে বাজে সময়ের বাঁশি…
অনুভব / নজর উল ইসলাম
দুঃখ গায়ে মেখে পার করি দিন
গাছের ছালবাকল ওঠা পয়ার যেন
রোদ্দুরে। কত শিস কত গোপন আয়োজন
সাধনার বিবেকী মুক্তিসূর্য দরাজ ভীষণ
আজ ঘর ঘর উত্তাল শুধু শব্দহীন ভবিষ্যৎ
আমাদের ফেরা না ফেরা হয়রানি বিষাদ
এত আলো চারিদিকে এত ঝলমল ফোটা শিহরণ
কেন লুকিয়ে লুকনো রাস্তার মনকামিনী দেখি
সবিনয় রাখি মর্মগানের ঝুলি ভরি— জীবন
কিনারে এসে সেই একই নৌকাডুবির মতন
বিচ্ছেদে আলোগুলো নিভে যায়, চারাগাছ
আকাশ তাকিয়ে বহুদূর কী যে বলে যায়
আসলে প্রেম নয় প্রীতিছিন্ন লজ্জার অন্ধকার
বুকফাটা কান্নার রঙগুলো বিমোহিত মনপাড়ায়
সঞ্চারী ঠোঁটে ঠোঁটে দক্ষ চরিত্র বদলে টানটান
মিলনদিনেও সাজঘর রাস্তার দিকশূন্যতায়…
মধ্যরাতের ঘোষণা / নজর উল ইসলাম
মাতাল হাওয়ার খেলায় একটাই দাবি ওঠে রক্তকুসুম
সে যেন শেষকৃত্য করতে এসেছে এই পৃথিবীর
আদিঅনাদি খবর করা পাখির কায়দায় সব শালগ্রাম
সত্যের ভেতর সত্য রক্তলেখা অমোঘ শরীর স্বাক্ষর
মধ্যরাতের ঘোষণা যদি ছন্দ ভাঙে ঘুম উড়ে যায়
চাঁদে নেমে যায় চাঁদ,পথের পথ সব উপপথ
ডাঁড়াস চোখগুলো রোদ্দুর গুটিয়ে জড়ো হয় চেনামুখে
সাঁতরানো পাতা-সন্ধি মোহনা দেখা আঙুল বন্ধে
জল-কোহল পোষা গন্ধরাজ মেঘ ফেটে মিউজিক রুম
হ্যান্ডসাম দোকান খুলে বসে গণ্য পাঁচতারা পিপাসা
লোকচক্ষু বুঝি কিচ্ছু বোঝে না,খিদেরা উপুড়
ধাঙড়েরা অবুঝ নিলামে লাটে তুলে দেয় গা-জামা…
নজর উল ইসলাম
পশ্চিম বিবিপুর, বেগমপুর, বসিরহাট, উত্তর ২৪ পরগণা, পিন:৭৪৩৪৩৭, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

