Syed Hridoy

Syed Hridoy

“মানুষ নামের সুবিধার প্রাণী”
-সৈয়দ হৃদয়

মানুষের অন্তর হলো একটা অদৃশ্য অর্ন্তদ্বন্দ্বের মাঠ। প্রতিটি মুহূর্তে পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং সুবিধার চকমকে আলোয় তার স্বরূপ বদলায়। কখনো তা নৈতিকতার উজ্জ্বল সাদা দীপ্তিতে জ্বলে, কখনো আবার স্বার্থের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। আমরা উদার হই, সৎ হই, নৈতিক হই—ঠিক তখন যখন তা আমাদের নিজের জন্য লাভজনক মনে হয়। সুবিধা যখন অনুপস্থিত, তখন অন্তরের অন্ধকার সেই নৈতিকতাকে হিংস্র স্বার্থে রূপান্তরিত করে। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব আমাদের মনোজগৎকে স্থির রাখে না, বরং এক অদৃশ্য ঝড়ের মতো ভারী করে তোলে। ব্যাপারটি তাই আর সাধারণ নয়, বরং অস্তিত্বগত।

নৈতিকতাকে সাধারণত আমরা পবিত্র শব্দে ঢেকে রাখি। কিন্তু সেই পবিত্রতা কি সত্যিকারার্থেই পবিত্র, নাকি তা কেবল পরিস্থিতির সঙ্গে আপস করা এক ধরনের বুদ্ধিদীপ্ত চুক্তি? মানুষ যখন নৈতিক হয়—সে কি সত্যকে ভালোবাসে, নাকি সুবিধার সাথে অাপস করে চলে? কীর্তন, কবিতা, এবং দার্শনিক চিন্তায় বহুবার স্পর্শ করা হয়েছে এই প্রশ্ন। কেননা, এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সভ্যতার কঙ্কাল।

মানুষের নৈতিকতা মূলত চামড়ার মতো পাতলা। সুবিধা থাকলে আমরা উদার হই, সহমর্মী হই, মানবিক হই। কিন্তু সুবিধা হারালে সেই মানবিকতার মুখোশ খসে যায়, ভেতরের আত্মায় তখন দেখা যায়—অশুদ্ধ, স্বার্থপর, এমসকি কখনও কখনও নিষ্ঠুরতাও। একারণে সমাজে আমরা দেখি, যখন সুবিধা আছে, তখন নৈতিকতার আলো ঝলমল করে। মানুষ তখন সহমর্মী হয়, উদার হয়, এবং সহমত প্রকাশ করে। কিন্তু যখন সুবিধা হারিয়ে যায়, তখন সেই নৈতিকতায় ভাটি পড়ে।

অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, “Virtue is a habit.” কিন্তু এই অভ্যাস কি অন্তরের, না পরিস্থিতির? অভ্যাস যদি কেবল সুবিধারই পুনরাবৃত্তি হয়, তবে তা নৈতিকতা নয়, তা হলো দক্ষতা। আমরা দক্ষ হয়ে উঠেছি ভালো দেখাতে, আমরা দক্ষ হয়ে উঠেছি সঠিক সময়ে চুপ থাকতে, প্রয়োজন হলে নৈতিকতার মুখোশ পরতে। এই মুখোশ এত নিখুঁত যে, একসময় আমরা নিজেরাই ভুলে যাই—মুখোশের আড়ালে আসল মুখটি দেখতে কেমন। দেখুন, নৈতিকতা যদি সত্যিই মানুষের স্বভাব হতো, তবে শক্তির মুখে তা এত ভঙ্গুর হতো না, ক্ষমতার কাছে গিয়ে নৈতিকতা কুঁজো হয়ে দাঁড়াতো না, সুবিধার ভাষায় কথা বলতো না। নিটশে তীব্রভাবে আঘাত করেছিলেন এই দ্বিচারিতায়।

আজকের সমাজে আমরা দেখি, সুবিধা আমাদের নৈতিকতার প্রলুব্ধি। আমরা দেখি, সত্য বলা তখনই মহৎ, যখন তা বললে ক্ষতি নেই। অন্যায় তখনই অন্যায়, যখন তা আমাদের বিরুদ্ধে যায়। আমরা সততা, সহমর্মিতা, এবং ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি দিই—যদি আমাদের লাভ হয়। কিন্তু যখন সুবিধা আসে না, তখন সেই প্রতিশ্রুতিটা কোথায় যায়? সেই প্রতিশ্রুতি কি সত্যিকারের নৈতিকতা, নাকি একটি খালি প্রতিচ্ছবি, যা শুধুই সামাজিক স্বীকৃতির জন্য আঁকা হয়েছে?

মূলত, সুবিধা বদলালে নৈতিকতার সংজ্ঞাও বদলে যায়। তিক্ত হলেও সত্য, নৈতিকতা কোনো চিরন্তন মানদণ্ড নয়, বরং এক ধরনের চলমান মুদ্রা—যেখানে বিনিময়ের হার সময় ও ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ইমানুয়েল কান্ট এই জায়গাতেই আমাদের সামনে আয়না ধরেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন—তুমি যা করছ, তা কি সর্বজনীন নীতি হতে পারে? সুবিধাভিত্তিক নৈতিকতা এই পরীক্ষায় টেকে না। কারণ সুবিধা কখনো সর্বজনীন হয় না; তা ব্যক্তিক, পক্ষপাতদুষ্ট, স্বার্থান্ধ। এইখানেই মানুষ ও প্রাণীর পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়। প্রাণী সুবিধা বোঝে, টিকে থাকার অঙ্ক কষে। কিন্তু মানুষ? মানুষের বোঝার কথা ছিল ন্যায়, সত্য, বিবেক; কিন্তু যখন মানুষ কেবল সুবিধার মানচিত্র দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে কি প্রাণীত্বের উন্নত সংস্করণ ছাড়া আর কিছু? প্রশ্নটা হয়তো নিষ্ঠুর, কিন্তু প্রয়োজনীয়।

নৈতিক সুবিধাবাদ সবচেয়ে বিপজ্জনক হয় সমাজে। কারণ তখন অন্যায় আর অন্যায় থাকে না—তা হয় “পরিস্থিতিগত প্রয়োজন”। অবিচার হয় “বাস্তবতা”, নিপীড়ন হয় “কৌশল”। এই ভাষাগত রূপান্তর নৈতিকতার মৃতদেহকে সাজিয়ে রাখে, যাতে আমরা গন্ধ না পাই। কিন্তু পচন থামে না। আমরা যদি কেবল সুবিধা থাকলেই নৈতিক হই, তবে আমরা নৈতিক নই—আমরা হিসাবি। এই হিসাব আমাদের সমাজকে ঠান্ডা করে দেয়, সম্পর্ককে করে চুক্তিভিত্তিক, মানবিকতাকে করে শর্তাধীন। তখন সহমর্মিতা আর স্বতঃস্ফূর্ত থাকে না; তা হয় নির্বাচিত, সীমাবদ্ধ।

নৈতিকতা শুধুই সুবিধার জন্য হলে, আমরা মানুষ নই। মানুষ হওয়া মানে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ন্যায়, সততা, ও সহমর্মিতার সঙ্গে দাঁড়ানো—সেখানে সুবিধা থাকুক বা না থাকুক। সত্যিকারের নৈতিকতা চায় তীক্ষ্ম বোধ, অন্তরের গভীর চিন্তাশক্তি এবং সাহস। সেই নৈতিকতা আমাদের প্রতিদিনের কাজের মাঝে, ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তে, আর বিপদের মুহূর্তে প্রকাশ পায়। আমরা যদি শুধুই সুবিধার জন্য নৈতিক হই, তাহলে আমাদের মানবতা শুধুই একটি নিঃসঙ্গ মুখোশ, একটি খালি আবরণ। আর যখন সেই আবরণ ছিঁড়ে যায়, তখন আমরা দেখতে পাই, আমাদের ভেতরে প্রকৃত মানুষটি নেই।

এই লেখার সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য হলো—আমরা সবাই এই সুবিধাবাদের অংশীদার। আমরা নৈতিকতার গল্প বলি, কিন্তু নিজের সুবিধার দরজাটা খোলা রাখি। আমরা অন্যের অন্যায়ের ক্ষেত্রে বিচারক, কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে উকিল। এই দ্বিচারিতাই সমাজের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

Comment