কোভিদ পরবর্তী বর্ণাশ্রম বৃত্তান্ত
কৃষ্ণা কর্মকার
নারদ ব্রহ্মাণ্ড পরিক্রমণশেষে প্রত্যাবর্তন করিলে ব্রহ্মা সবিস্তারে করোনা- উত্তর পৃথিবীর সংবাদ লইলেন ।
নারদ কহিলেন, হে দেবন্ , সবিশেষ মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুন,
—— কোভিদ 19 পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করিবার বন্দোবস্ত পাকা করিয়া লইয়াছে। ইহাতে পৃথিবীর মনুষ্যকুলে সবিশেষ যাহার প্রভাব বিস্তৃত হইবার সমূহ সম্ভাবনা, তাহা হইল, ভারতীয় বর্ণাশ্রম প্রথার অনুকরণপূর্বক পৃথিবীতে নব্যবর্ণাশ্রম প্রথার প্রবর্তন :
পিতামহ ব্রহ্মা অতীব কৌতূহলসহকারে নারদকে সবিস্তারে বর্ণনা করিবার আদেশ করিলেন। নারদ বীণাতন্ত্রে আবহরচনাপূর্বক বর্ণনা আরম্ভ করিলেন,
—– সমগ্রমনুষ্যকুল ভারতীয় বর্ণাশ্রমের ন্যায় কতিপয় বর্গে বিন্যস্ত হইবেন। যথা,
উচ্চবর্গীয় মনুষ্যকুল:
ইঁহারা পৃথিবীতে “তারঙ্গিক” নামাঙ্কিত হইবেন । উক্ত বর্গ, অঙ্গুলিসঞ্চালনে ও কোমলতরঙ্গচালনায় (ডিজিটাল এবং সফট্ওয়ার) মহাদক্ষ হইবেন। সাংখ্যমন্ত্র দ্বারা বশীভূত করিবার ক্ষমতা ইঁহাদের আয়ত্তাধীন থাকিবে। ইঁহারা এক একজন পৃথক পৃথক কক্ষে গণকযন্ত্র -সহবাসী হইয়া, আন্তর্জাল ও তরঙ্গধাতৃবর্গের (ইন্টারনেট এবং অনলাইন সাইট- প্রণেতা) জয়জয়কার ঘোষণা করিবেন এবং অন্য সকলবর্গকে পরামর্শ দান করিবার নিমিত্ত গর্বসুখ অনুভব করিবেন। ইঁহারা সামাজিক দূরত্ববিধি পুঙ্খানুপুঙ্খ মানিয়া চলিবেন । আপনকক্ষে আবদ্ধ থাকিয়া তরঙ্গবাহিত পৃথিবীর সংবাদাদি সংগ্রহ করিয়া বিবিধ অনুশাসনের উৎপত্তি ঘটাইবেন এবং অন্য সকল মনুষ্যবর্গের স্পর্শ অতি সতর্কতার সহিত বাঁচাইয়া চলিবেন। অন্যান্য বর্গের মনুষ্যসকল ইঁহাদিগকে পূজ্যপাদ বিবেচনা করিয়া সসম্ভ্রম দূরত্ব বজায় রাখিবেন।
উপরোক্ত তারঙ্গিকবর্গ দ্বারা মনোনীত ও অনুমোদিত হইয়া অপর একটি সহোদরবর্গ, “তরঙ্গধর” নামাঙ্কিত হইয়া আত্মপ্রকাশ করিবে। ইঁহারা স্বীয় অর্থবলে পার্থিব তরঙ্গাবলীর (ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড) অধীশ্বর হইবেন। নিজ নিজ তারঙ্গাধিকারে বসবাসকারী মনুষ্যকুলকে ইঁহারা প্রজারূপে প্রতিপালন করিবেন এবং তরঙ্গখাজিনা ধার্য করিবেন। প্রজারা দূর হইতে ইঁহাদের কৃপা ও দর্শনলাভ নিমিত্ত দর্শনী লইয়া অপেক্ষা করিবেন। প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হইয়া ইঁহারা আপন তরঙ্গসীমা বর্ধনে মনোনিবেশ করিবেন। তারঙ্গিকগণ সানন্দে ইঁহাদের সম্মাননীয় ঋত্বিকের আসন অলংকৃত করিয়া ইঁহাদের শক্তিবৃদ্ধির নব নব উপায় উদ্ভাবন করিবেন।
নারদ এই পর্যন্ত বর্ণনা করিয়া ব্রহ্মার চতুর্বদন নিরীক্ষণ করিলেন। ব্রহ্মা কৌতূহলোদ্দীপনায় উত্তেজনাবশততঃ নিজ আসন হইতে বিঘৎখানেক লাফাইয়া উঠিয়া নারদকে না থামিয়া পূর্বাপর বর্ণনার নির্দেশ দিলেন।
নারদ হৃষ্টচিত্তে পৃথিবীর নব্য বর্ণাশ্রমের দ্বিতীয় বর্গের ইতিবৃত্ত শুনাইতে লাগিলেন —-
জটিলবর্গীয় মনুষ্যকুল:
ব্রহ্মা সবিশেষ উৎসাহিত হইয়া এইপ্রকার মনুষ্যকুলের গুণকীর্তন শ্রবণ করিবার নিমিত্ত উৎকর্ণ হইলেন এবং নারদের মুখের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলেন।
নারদ ব্রহ্মার উৎকণ্ঠা অনুমান করিয়া ধীরে ধীরে ইঁহাদের দশরূপ উন্মোচনে প্রবৃত্ত হইলেন। কহিলেন,
—— হে ভগবন্, ধৈর্যসহকারে শ্রবণ করুন।
তরঙ্গবিষয়ে অল্পবিস্তর জ্ঞানভক্ষণ করিয়া যাঁহারা উচ্চবর্গীয় ‘তারঙ্গিক’ এবং ‘তরঙ্গধর’ এর পদলেহনে সুখী হইবেন, সমগোত্রসান্নিধ্যে ঈর্ষান্বিত হইবেন, নিম্নগোত্রসান্নিধ্য ঘৃণাভরে পরিহার করিবেন, অতারঙ্গবর্গের নিকট জ্ঞানবর্ষণে গর্বিত হইবেন, কদাচ জ্ঞানশ্রবণে কিংবা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করিবেন, নিজমত প্রসারের নিমিত্ত ভক্তকুল সৃষ্টিতে তৎপর হইবেন, অন্যথায় ক্রোধিত হইবেন, আপন সীমিত ক্ষমতার কথা বিস্মৃত হইয়া অপরক্ষমতার হ্রাসবৃদ্ধি লইয়া সমালোচনায় মুখর হইবেন, নিজপৃষ্ঠে চপেটাঘাত করিতে দক্ষ হইবেন, কাহারো প্রশংসা করা হইতে বিরত থাকিবেন, তাঁহারাই জটিলবর্গীয় হইবেন।
ব্রহ্মা উৎকণ্ঠা ধরিয়া রাখিতে না পারিয়া কহিলেন,
—– দেবর্ষি নারদ, দৃষ্টান্তসহকারে ইঁহাদের জীবনচর্যা শুনিবার কৌতূহল দমন করিতে পারিতেছি না।
নারদ মৃদু হাস্যসহকারে আনুপূর্বিক বর্ণনা আরম্ভ করিলেন,
—— হে ভগবন্ , ইঁহারা প্রয়োজনসাপেক্ষে বহুধাবিভক্ত হইবেন। যথা, বাজারধর —– হাটেবাজারে ইঁহারা ক্রেতারূপে বিক্রেতার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া দরদস্তুর করিবেন, দুইটা আলুপটল, ডিম্ব, মৎস্য, নিজহস্তে তুলিয়া লইয়া পরীক্ষা করিবেন, তদুপরি স্বাস্থ্যবিধি না মানিয়া চলিবার কারণে দরিদ্র বিক্রেতার উপর ধুনুরী – আক্রমণ করিয়া বাজারের সমবেত জনগণের কর্ণে পুলকিত চিত্তে গুগলপ্রদত্ত করোনাজ্ঞান বর্ষণ করিবেন। তথাপি আপন স্বাস্থ্যবিধি সম্পাদনে উক্ত জ্ঞান উপেক্ষা করিবেন। আবার ইঁহারাই বিক্রেতারূপে ক্রেতাশোষণের বিচিত্র মন্ত্র জপ করিয়া সিদ্ধিলাভ করিবেন।
বাজারধরের পাশাপাশি, গৃহচর নামে এই বর্গের ভিতর অপর একটি উপবর্গের উদ্ভব হইবে। প্রধানত ইঁহারা কোভিদ ঊনিশ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিবার নিমিত্ত গৃহবন্দী হইবেন এবং বহিরাঙ্গনের কর্মবিরতিতে সিদ্ধবুদ্ধি হইয়া কর্মক্ষেত্রে স্বীয় কর্তব্যহরণে করোনার অজুহাত খাড়া করিবেন। আপিস কাছারি পাঠক্ষেত্র সর্বত্রই ইঁহাদের অদর্শন ঘটিবে। ইঁহাদের দর্শনাভিলাষী হইয়া যাঁহারা উক্ত কর্মক্ষেত্রে আগমণ করিবেন ও ইঁহাদের অনুসন্ধান করিবেন, তাঁহাদিগকে শত্রু ঠাওরাইবেন। গৃহ-অভ্যন্তরে সচতুরভাবে আত্মগোপন করিয়া চোখা চোখা ভাইরাসজ্ঞানে সমাজমাধ্যম সরগরম করিয়া অস্তিত্বপ্রতিষ্ঠার সমরে অবতীর্ণ হইবেন।
ইঁহাদের বিপরীতে পথচর নামাঙ্কিত একটি উপবর্গ স্বাস্থ্যচিন্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া অতিভ্রমণপূর্বক জনমানসে ভীতিসঞ্চার করিয়া আপনাতে আপনি মগ্ন থাকিবেন ও গৃহচরবর্গের আচরণে উপহাস নিক্ষিপ্ত করিয়া স্বয়ং করোনাকে আহ্বান করিবার যজ্ঞে পৌরোহিত্য করিবেন।
এতাবৎ বৃত্তান্ত শ্রবণে ব্রহ্মার অতীব বিস্ময়াবৃত চতুরানন বিচিত্র ভঙ্গিতে ব্যাদিত হইল। ইহা নিরীক্ষণ করিয়া ক্ষণকাল বিরতি লইয়া, নারদ পুনরায় বীণাতন্ত্রে সুরযোজনা করিয়া কহিলেন,
—– হে দেবন্, নব্য বর্ণাশ্রমের উদ্ভাবনে কতিপয় জটিলবর্গের অবস্থান ও উপাধি বদল হইবে। যেমন, শিক্ষককুল করোনার দাপটে গাইডকুলে পদান্তরিত হইবেন। শিক্ষার্থীবর্গ পদান্তরে হইবেন ট্রেনিবর্গ। দুই বর্গের অভ্যন্তরে গুরুশিষ্যপরাম্পরার ঐতিহ্য বিলুপ্ত হইয়া পেশাদারি পরামর্শদাতা – পরামর্শগ্রহিতার সম্পর্ক নির্মিত হইবে। দুই বর্গই পরস্পরের স্পর্শ ও সম্মান বাঁচাইতে তৎপর থাকিবেন ; অন্যথায় দুইপক্ষই যুযুধান হইয়া ক্ষমতা প্রদর্শনে তৎপর হইবেন। ইঁহাদের দ্বন্দ্বকবলিত হইয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কেবলমাত্র সূচীসম্বলিত পাঠ ক্রয়বিক্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত হইবে। শিক্ষকসান্নিধ্যে শিক্ষার্থীর সহবত শিক্ষা বিলুপ্ত হইবে। পারস্পরিক সান্নিধ্যবর্জিত তারঙ্গিক শিক্ষার দ্বারা পাঠবিক্রেতা এবং পাঠক্রেতা দুই পক্ষই সহমর্মিতাহীন বিপরীতমুখী দূরত্ববর্ধন করিয়া চলিবে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির গালভরা শিরোনাম হইবে “তরঙ্গভিত্তিক শিক্ষা” (অনলাইন এডুকেশন) । সকলেই বিশ্বাস করিবে ইহাই বিশ্বজ্ঞান আহরণের সর্বোত্তম ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা দ্বারা শিক্ষককুলের কার্যপরিধি বহুলাংশে বিস্তৃত হইবে । তথাপি সরকারি বেতনভূক্ত শিক্ষককুলের বেতনক্রমের প্রতি সমগ্র সমাজ অপাঙ্গে কটাক্ষপাত করিয়া ঈর্ষাস্ফীত হইবেন। ইহাতে শিক্ষক হইতে গাইড এ রূপান্তরিত শিক্ষককুল আপন যুক্তি-অস্ত্রে শাণিত হইয়া ভার্চুয়াল রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইবেন । সম্ভ্রম রক্ষার নিমিত্ত নিজ নিজ তরঙ্গদেয়ালে কুবাক্য অভ্যাস করিবেন। শিক্ষার্থীকুল ট্রেনি হিসাবে অধৈর্য, অসহবত, ঔদ্ধত্য প্রমুখ গুণ উত্তম রূপে আয়ত্ত করিয়া জনমানসে ভীতিসঞ্চারপূর্বক সমাজকে অভূতপূর্ব উজ্জ্বলকৃষ্ণ তমসায় নিমজ্জিত করিবেন।
শিক্ষককুলের ন্যায় চিকিৎসককুলের গাত্র হইতেও “রোগীর ভগবান” উপাধি খুলিয়া লইয়া বিভ্রান্ত রোগী ও তাহার পরিচিতবর্গ “শালার ডাক্তার” তকমা চড়াইয়া প্রতিপদে চিকিৎসা বিদ্যার অসারতা প্রমাণ করিতে খড়্গহস্ত হইয়া নৃত্য করিবেন। চিকিৎসককুলেও কতিপয় চিকিৎসক ব্যতীত সকলেই রোগীশোষণযন্ত্রের অংশবিশেষ হইয়া উঠিবেন। কেহ কেহ স্পর্শদর্শী হইতে উন্নীত হইয়া দূরদর্শীতে রূপান্তরিত হইবেন এবং দূরচিত্রে অথবা দূরভাষে রোগীবর্গের শুশ্রূষা করিয়া অর্থস্ফীতিতে দ্বিগুণ বলীয়ান হইয়া উঠিবেন। তথাপি যে কতিপয় চিকিৎসক করোনা- পূর্ববর্তী চিকিৎসাধারার অনুবর্তী হইয়া করোনা – পরবর্তী রোগীদের “ধন্বন্তরি” হইবেন, তাঁহারা দূরদর্শীবর্গের ব্যঙ্গোক্তি পরিপাক করিতে বাধ্য থাকিবেন।
ইহা ব্যতীত, করোনা- পূর্ববর্তী মনুষ্যসমাজের “মধ্যবিত্ত” নামাঙ্কিত বর্গসমূহ, করোনাপরবর্তী সময়ে জটিলবর্গীয় মনুষ্যরূপে, বিচিত্রবর্ণী হইয়া বিচিত্র স্তরে শোভিত হইবেন ও অস্তিত্বসংকটের লজ্জা ঢাকিবার নিমিত্ত গৃহবিবাদ স্বরূপ বিচিত্র ক্রিয়াকর্মের দ্বারা আপন ক্ষমতা প্রকাশ করিবেন। ইঁহারা ক্রমশ উচ্চবর্গীয় ও সরলবর্গীয়ের মধ্যবর্তী হইয়া যৎপরোনাস্তি পিষ্ট ও অদৃশ্য হইতে থাকিবেন।
ব্রহ্মার মুখব্যাদান ক্রমশ বর্ধিত ও দীর্ঘস্থায়ী হইতেছে দেখিয়া নারদ জটিলবর্গের বর্ণনায় মধ্যপথেই ইতি টানিলেন এবং পরবর্তী বর্গের বর্ণনায় প্রবেশ করিলেন,
—— হে ভগবন্, এতদ্ব্যতীত নব্যবর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় তৃতীয় আরেকপ্রকার বর্গের উদ্ভব হইবে, যাহার স্বরূপ অনুধাবন করা কিছুটা সহজ হইবে।
ব্রহ্মা আশ্বস্ত হইয়া ওষ্ঠাধর নির্দিষ্ট স্থানে ফিরাইয়া আনিলেন এবং এই বর্গের পরিচয় শুনিতে উদগ্রীব হইলেন।
সরলবর্গীয় মনুষ্যকুল :
নারদ হৃষ্টচিত্তে কণ্ডনীপৃষ্ঠে হস্তসঞ্চালন করিয়া এই বর্গের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যায় মনোনিবেশ করিলেন,
—— এই মনুষ্যকুল করোনাপূর্ববর্তী জীবনশৈলীর অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই করোনাপরবর্তী জীবনশৈলীর উপর আরোপ করিবেন। ভূতপূর্ব ধ্যানধারণা দ্বারা অভূতপূর্ব চিন্তা চেতনা ক্রোধ ভীতি ও বেদনাকে নস্যাৎ করিবার নিমিত্ত “দেব -দানো -বেহ্মদত্যি -ভূতপ্রেত প্রভৃতিদের সৈন্যরূপে নিয়োগ করিবেন। তন্ত্র,মন্ত্র, মল, মূত্র, ভক্তি, ভীতি, গুজব, গজব, নামক অস্ত্রসকল উক্ত সৈন্যের ক্ষমতাপ্রদর্শনের উৎস হিসাবে বিবেচনা করিবেন।
ব্রহ্মা সবিশেষ আনন্দিত হইয়া নারদকে কহিলেন,
—– ইহাদের সুরক্ষিত রাখিবার বন্দোবস্ত করিতে হইবে, কারণ ইহারাই হইল আমাদের আদি ও অকৃত্রিম ভক্তকুল।
নারদ কৌতুকপূর্ণ হাসি নিক্ষিপ্ত করিয়া কহিলেন,
—– তাহা সিতাদিবক্ষে বালুকাচূর্ণ স্বরূপ। ইহাদিগকে সুরক্ষা দিবার ক্ষমতা প্রাচীন স্বর্গাধিপতির হস্তে নাই।
—– স্বচ্ছার্থ করিয়া বর্ণনা করুন দেবর্ষি ঢেঁকি—- থুরি, কণ্ডনীবাহ!
নারদ ব্রহ্মার হৃদয়সঙ্কট জীয়মান রাখিয়া কহিলেন,
—– পৃথিবীতে বর্তমানে নব নব দেবতার উদ্ভবকাল চলিতেছে, নিত্যনূতন দেবতা গজাইয়া উঠিয়া আপন আপন ভক্তবৃন্দ গড়িয়া লইয়া সানন্দে পেশি প্রদর্শন করিতেছেন এবং পার্থিব মনুষ্যের অনুবর্তী হইয়া, ‘লাইক’, ‘ডিসলাইক’ এর সংখ্যা কষিয়া, কষি আঁটিয়া ভোটক্ষেত্রে অবতরণ করিতেছেন। নব্যগজিত দেবগণের মধ্যে অধুনা সংযোজিত “করোনা ঠাকুর”। সরলবর্গীয়েরা ইঁহার সন্তোষপ্রদান নিমিত্ত ঢাকঢোলাদি বাদ্যসহকারে নৃত্যগীতদ্বারা সমাজমাধ্যম কম্পিত করিতেছেন। ব্যতিক্রমীরা গালি খাইতেছেন, বঞ্চিতরা হা হুতাশ করিতেছেন, তরুণ সরলবর্গ হাঁকাহাঁকি, ডাকাডাকি, কাড়াকাড়ি, মারামারি করিয়া নিজবর্গের নামোজ্জ্বল করিতেছে। এমতাবস্থায় আপনি, আমি মায় বিষ্ণু আর মহেশ্বরও পিছিয়ে পড়া সমাজের অংশী হইয়া উঠিয়াছি।
এতাবৎ বৃত্তান্তে নিতান্ত বিচলিত হইয়া ব্রহ্মা স্ব-আসনে স্থির থাকিতে না পারিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং তীব্র গতিতে পদচারণা করিবেন কি না, চিন্তা করিয়া নারদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইতেই, নারদ কোভিদ ঊনিশের ধর্ম বুঝাইতে পিতামহ হইতে দূরত্ব রচনা করিলেন এবং পৃথিবীপ্রত্যাবর্তিত উপহারস্বরূপ চতুর্মুখের নিমিত্ত চারিটি এন ৯৫ মুখোশ প্রদান করিলেন।
ব্রহ্মাণ্ডবিজ্ঞ হইয়াও মুখোশের ব্যবহার-অজ্ঞ ব্রহ্মা হতচকিত হইয়া মুখোশহস্তে সিংহাসনপ্রান্তে অর্ধশয়ানে ঝুলিতে লাগিলেন।
নারদ তাহা অবলোকনপূর্বক বৃত্তান্ত সমাপ্ত করিয়া মুখোশের অন্তরালে মিটিমিটি হাসিতে লাগিলেন।
পরিচিতি :
নাম : কৃষ্ণা কর্মকার ( ফেসবুকে কৃষ্ণা মঞ্চমিতা মানবী নামে আছি)
পেশা : শিক্ষকতা

