Farha Oshi

#তবুও_ভালোবাসি
#ফারহা_ঐশী
#সূচনাপর্ব
জঙ্গলের গভীরে বৃষ্টি অবিরাম ঝরছে—ঝুম ঝুম শব্দে গাছের পাতা ভিজে ভারী হয়ে ঝুঁকে পড়েছে, মাটি কাদায় পরিণত হয়েছে, প্রতি পদক্ষেপে চুষে নিচ্ছে পা। রাতের আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, বিদ্যুৎ চমকালে এক মুহূর্তের জন্য জঙ্গলের ভয়ংকর রূপ উন্মোচিত হয়—বিকৃত গাছের ডাল যেন দানবের হাত, ঝোপঝাড় থেকে ঝরে পড়া জলের শব্দ যেন ফিসফিস করে মৃত্যুর নাম। বাতাসে রক্তের গন্ধ মিশে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

একটি লোক প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে—তার ফুসফুস ফেটে যাচ্ছে, পা কাদায় আটকে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে, কিন্তু সে টেনে বার করে আবার ছুটছে।

লোকটার পিছনে কালো অবয়বের একটা মানুষ দৌড়াচ্ছে—তাকে দেখতে একেবারে কালো ছায়ার মতো লাগছে, অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো। ছায়াটা কোনো পুরুষ নাকি মহিলা বোঝা দায়। ছায়াটি লোকটার পিছন পিছন দৌড়াচ্ছে, কিন্তু মনে হচ্ছে সর্বশক্তি দিয়ে নয়—কোনো একটা কারণে হয়তো ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে, অথবা শিকারকে ক্লান্ত করে মৃত্যুর আগে উপভোগ করছে।

সামনে দৌড়ানো লোকটার ঘাম আর বৃষ্টির জল মিশে তার মুখ বেয়ে নামছে, তার চোখে পাগলের মতো ভয়। সামনে রোশনাইয়ের ঝিলিক দেখল লোকটা। কিন্তু আশা জাগার আগেই চারদিক থেকে কালো SUV-এর হেডলাইট জ্বলে উঠল, আলোর তীব্রতায় লোকটার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। গাড়িগুলো ঘিরে ফেলল তাকে—কোনো পালানোর রাস্তা নেই। দরজা খুলে নামল আট-দশটা লোক—সবাই একই রকম কালো ফর্মাল স্যুট, কালো শার্ট, কালো টাই, কালো গ্লাভস। বৃষ্টিতে ভিজে তাদের পোশাক চকচক করছে, কিন্তু তাদের মুখ পাথরের মতো নির্বিকার। চোখে কোনো অনুভূতি নেই—শুধু শূন্যতা আর নির্মমতা। লোকগুলো গাড়ি থেকে নেমে লোকটাকে ঘিরে চুপচাপ দাঁড়াল।

লোকটা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার শরীর কাঁপছে অবিরাম, দাঁতে দাঁত লেগে শব্দ হচ্ছে। “কারা তোমরা… আমার পিছনে কেন পড়েছো… দয়া করো… প্লিজ… আমি কিছু করিনি… আমাকে যেতে দাও…”—তার কণ্ঠস্বর ভেঙে যাচ্ছে, অশ্রু আর বৃষ্টির জল মিশে তার মুখে লালা ঝরছে। সে হাত জোড় করে মিনতি করছে, মাটিতে মাথা ঠেকাচ্ছে। তার চোখে এমন ভয় যে, সে যেন নিজের মৃত্যু দেখতে পাচ্ছে আগে থেকেই।

পিছন থেকে আস্তে আস্তে এগিয়ে এল সেই কালো ছায়ামূর্তিটা। তার পরনে কালো হুডি, ভারী ফ্যাব্রিক যা বৃষ্টিতে ভিজে তার শরীরের লাইন আরও ধারালো করে তুলেছে। হুডির টুপি মাথায় টেনে দেওয়া, মুখে কালো ফুল-ফেস মাস্ক যা শুধু চোখ দুটো খোলা রেখেছে—চোখগুলো অতল কালো, যেন আত্মা শুষে নেওয়ার জন্য তৈরি। হুডির নীচে টাইট কালো কার্গো প্যান্ট, যার পকেটে ছুরি আর অস্ত্রের হ্যান্ডেল উঁকি দিচ্ছে। পায়ে হাই অ্যাঙ্কল কমব্যাট বুট, কাদায় মাখামাখি। তার হাতে কালো লেদার গ্লাভস, আঙুলে রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে।

ছায়ামূর্তিটি মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার সামনে আসতেই একজন এগিয়ে এসে একটা চেয়ার এনে দিল।

ছায়ামানবটি চেয়ারে বসে বলল, “Motherfucker-টার পিছে দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে গেছি। দে ভাই, কোনো বাল আছোস? একটু পানি দে।” এই বলে ছায়ামানব হাত তুলে আরাম করে ভাঙল আলসেমি ভঙ্গিতে।

মাটিতে পড়ে থাকা লোকটি এবার ওই চেয়ারে বসে থাকা মানুষটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কে তুমি? কেন আমার পিছনে কেন পড়েছো?”—লোকটা চিৎকার করে উঠল, তার গলা ফেটে যাচ্ছে।

ছায়ামানবটির কণ্ঠ বেরোল—ঠান্ডা, বিষাক্ত স্বরে বলল, “Crazy bastard, আমি কানে কম শুনি না। আস্তে কথা বল।”

লোকটি আবারো বলল, “কে তুমি? আমার পিছনে কেন পড়েছো?”

ছায়ামানবটি ঘাড় এপাশ-ওপাশ করে আরাম করে ভেঙে বলল, “খুব শখ না তোর ছোট ছোট বাচ্চা মেয়েদের সাথে রাত কাটানোর? তারই ব্যবস্থা করতে এসেছি। তোকে মেরে যেই খানে বাচ্চা শিশুদের কবর দেওয়া হয়, তোর শরীরের এক একটা অংশ কেটে প্রত্যেকটা মেয়ে শিশুর পাশে কবর দেবো। তোর শখ পূরণ করবো।”

মাটিতে থাকা লোকটার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল ওই মানবটির কথায়।

মানবটির কথা শেষ হতেই একটি লোক একটা পানির বোতল নিয়ে আসল। মানবটি তার থেকে সেটা হাতে নেবার সাথে সাথে সব কয়টা গাড়ির হেডলাইট অফ হয়ে গেলো। চারিদিক আবারো কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। কিছু দেখা গেলো না। শুধু শোনা গেলো কারো পানি পান করার শব্দ। শব্দ থেমে যাবার সাথে সাথে আবারো গাড়ির হেডলাইটগুলো জ্বলে উঠলো।

মাটিতে পড়ে থাকা লোকটি আবারো বলল, “কে তুমি? আর আমার ব্যাপারে কীভাবে জানো?”

ছায়ামানবটা নিজের দুই পা চেয়ারে তুলে আসন ঘুরিয়ে বসে বলল, “লোকে তো কেয়ামত বলেই চেনে। কিন্তু তুই আমাকে Wish Fulfiller বলতে পারিস। তোর ইচ্ছা যেহেতু পূরণ করছি।”

লোকটার শরীরে যেন বজ্রপাত হল। তার চোখ বিস্ফারিত, মুখ ফ্যাকাশে। “কেয়ামত…”—ব্যক্তিটি ফিসফিস করে আওড়ালো নামটি, তার গলা শুকিয়ে গেছে।

মুম্বাইয়ের অন্ধকার জগতে এই নামটা একটা অভিশাপ। কেয়ামত মানেই শেষ—কোনো দয়া নেই, কোনো ক্ষমা নেই। শহরের সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকারী, যে শুধু মারে না, মানুষকে জীবিত অবস্থায় ছিঁড়ে ফেলে। তার নাম শুনলেই গ্যাংস্টাররা লুকিয়ে যায়, পুলিশ চুপ করে, বড়ো বড়ো ডনরা রাতে ঘুমায় না। কেয়ামত এলে লাশ থাকে না পুরো—থাকে শুধু টুকরো, আর পোড়া চামড়ায় লেখা “KEYAMAT”।
কেউ চেনে না তাকে। আজ পর্যন্ত কেউ দেখেনি তার মুখ। এমনকি এটাও জানে না যে কেয়ামত আসলে মেয়ে নাকি ছেলে।

কিন্তু মাটিতে পড়ে থাকা লোকটি এতক্ষণের কথাবার্তায় বুঝলো এটি একটি মেয়ে। একজন মেয়ের এত ক্ষমতা ভাবতেই তার আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে।
কেয়ামত তার গান বের করল—সাইলেন্সার লাগানো, চকচকে কালো। মাটিতে পড়ে থাকা লোকটি কিছু বোঝার আগেই লোকটার কপালে ঠেকিয়ে একটা গুলি করল। গুলির শব্দ মৃদু, কিন্তু লোকটার কপাল ফুটো হয়ে রক্তের ফোয়ারা বেরোল। লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু এখনো জীবিত—চোখ দুটো বিস্ফারিত, শ্বাস নিচ্ছে কষ্টে।

কেয়ামত হাসতে লাগল—উন্মাদের মতো।
তারপর উঠে একটা ছুরি বের করল—লম্বা, ধারালো সার্জিক্যাল ব্লেড। প্রথমে লোকটার বুক চিরে ফেলল—হাড় কেটে, মাংস ছিঁড়ে। লোকটা চিৎকার করছে—এমন চিৎকার যে জঙ্গলের পশুরাও চুপ করে গেল। তার হাত-পা ছটফট করছে, কিন্তু কেয়ামতের লোকেরা তাকে চেপে ধরেছে। কেয়ামত হাত ঢুকিয়ে জীবিত হৃদয়টা ধরে টেনে বের করল—রক্ত গরম, ধুকধুক করছে এখনো। লোকটার চোখে অসহ্য যন্ত্রণা, সে দেখছে নিজের হৃদয় কেয়ামতের হাতে। তারপর কিডনি—একটা একটা করে কেটে বের করল, প্রতিটা কাটায় লোকটার শরীর কুঁকড়ে উঠছে। রক্তে মাটি লাল, বৃষ্টি ধুয়ে নিচ্ছে না—বরং আরও গাঢ় করছে।

কেয়ামত ছুরি দিয়ে তার পেট চিরল, অন্ত্র বের করে টানল—লম্বা, রক্তাক্ত। লোকটা এখনো জীবিত, দুর্বল শ্বাস নিচ্ছে, চোখে শুধু ভয় আর যন্ত্রণা।

তারপর কেয়ামত তার লোকেদের বলল, “ওর পুরো শরীর টুকরো টুকরো করে কেটে এই খানেই ফেলে যাবে। আর ওর গোপনাঙ্গ কেটে কুকুরকে খাওয়াবে।” ওর লোকেরা সম্মতি জানাল। কেয়ামত পিছন ঘুরতেই হাত-পা—হাড় ভাঙার শব্দ ক্র্যাক ক্র্যাক করে উঠল, তারপর কেটে আলাদা করল লোকটার। মাথার চামড়া তুলে ফেলল, চোখ দুটো আলতো করে কেটে বের করল—এখনো চোখে ভয় জমে আছে। শেষে শরীরের বাকি অংশ টুকরো টুকরো করল—ছোট ছোট, যেন কসাইয়ের দোকান। রক্তের গন্ধে জঙ্গল ভারী হয়ে উঠল।

সব শেষে, লোকগুলো লেজার বার্নার বের করল। টুকরোগুলো এক জায়গায় সাজিয়ে, পোড়া চামড়া আর হাড়ে ধীরে ধীরে লিখল—“KEYAMAT”। অক্ষরগুলো জ্বলছে, ধোঁয়া উঠছে বৃষ্টির মধ্যেও। লোকটার শেষ চিৎকার বৃষ্টিতে মিশে গেল।
কেয়ামত দুই কদম এগোতেই ওর সামনে দুটো বাইকে এসে থামল। প্রথম বাইকে একটা মেয়ে আর অন্যটায় একটা ছেলে। তাদের পিছে পিছে আরো একটা লোক আসল Kawasaki Ninja H2R-এ। কেয়ামতের সামনে দিয়ে গেল তারপর ওরা তিনজন সেই খান ছেড়ে বেরিয়ে গেলো তিনটে বাইকে নিয়ে।
________________________

আজ চৌধুরী বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেছে। পাঁচ বছর পর বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরছে বাড়ির দুই প্রিয় সন্তান—ফাতিমা চৌধুরী নিশিতা এবং তার ভাই ফারহান চৌধুরী ফারুক। এই খুশিতে পুরো বাড়ি উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। রান্নাঘরে চলছে ব্যাপক আয়োজন—ছেলেমেয়ে দুটির প্রিয় সব খাবার তৈরি হচ্ছে। বাড়ির কর্তারা—আরিফ হাসান চৌধুরী এবং ইয়াসিন শহজাদ চৌধুরী—ইতিমধ্যে এয়ারপোর্টে গেছেন তাদের রিসিভ করতে।

মুম্বাইয়ের হাই-সোসাইটির মধ্যে চৌধুরী বাড়ির নামডাক আছে। এই পরিবারের বড় কর্তা আরিফ হাসান চৌধুরী এবং তার স্ত্রী ফাতেমা রফিকা চৌধুরী। তাদেরই সন্তান নিশিতা এবং ফারুক। একসময় তাদের আরেকটি ছেলে ছিল, কিন্তু প্রায় ছয় বছর আগে সে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে মারা যায়।

বাড়ির ছোট কর্তা ইয়াসিন শহজাদ চৌধুরী। তার স্ত্রী লিসা চৌধুরী অ্যাডেল আজ থেকে ষোলো বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। সেই একই দুর্ঘটনায় তাদের বড় মেয়ে ফিজা মাইরা চৌধুরীও প্রাণ হারায়। ইয়াসিন সাহেবের ছোট মেয়ে মিসা চৌধুরী ডেলিসা বর্তমানে মুম্বাই ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ারে পড়াশোনা করছে, সাইকোলজি নিয়ে।

চৌধুরী বাড়িতে আরও তিনজন সদস্য রয়েছেন—আরিফ সাহেব ও ইয়াসিন সাহেবের একমাত্র ছোট বোন জারা চৌধুরী জাহিদা এবং তার দুই সন্তান আরহাম রায়হান খান ও নাদিয়া আফসানা খান। জারার স্বামী সালমান ফারাজ খান প্রায় তিন বছর আগে মারা যান। তারপর ভাইয়েরা বোনকে বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। শশুরবাড়ির লোকেরা তাকে কষ্ট দিত না, তবুও ভাইয়েরা বোনের অসহায়ত্ব দেখতে পারেননি। তাই তাকে এই বাড়িতেই রেখেছেন।
আজ বাড়িতে লোকজনের ভিড়। রফিকা চৌধুরীর বাপের বাড়ি থেকে অনেকে এসেছেন—তার ভাইয়েরা, তাদের ছেলেমেয়েরা এবং তার বোনরাও। আজকের দিনটি শুধু নিশিতা ও ফারুকের ফেরার খুশি নয়, একটি ছোটখাটো দাওয়াতেরও দিন। জারা চৌধুরীর মেয়ে নাদিয়াকে দেখতে আসছেন রফিকা চৌধুরীর একমাত্র ভাই নাসির শেখের বড় ছেলে তন্ময় শেখের জন্য।
________________________
দোতলার একটি কক্ষে ডেলিসা নাদিয়াকে সাজাচ্ছে। নাদিয়ার পরনে একটি লাল ঢাকাই জামদানি শাড়ি। ফর্সা গায়ের রঙে শাড়িটি বেশ মানিয়েছে। মুখে হালকা প্রসাধনীর ছোঁয়া—হালকা লিপস্টিক, চোখে গাঢ় কাজল। এতে সে আরও সুন্দর লাগছে। ডেলিসা টিপের পাতা থেকে একটি ছোট্ট কালো টিপ তুলে নাদিয়ার কপালে পরিয়ে দিয়ে বলল, “পারফেক্ট লাগছে। এবার আমার নাদিয়া আপু একেবারে পুতুল-পুতুল লাগছে।”

নাদিয়া একটি মিষ্টি হাসি দিল।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। ডেলিসা দরজা খুলতেই দেখল তার পিমনি , জারা চৌধুরী। ব্যাকুল কণ্ঠে জারা বললেন, “তোদের হয়েছে? আর কত সময় লাগবে? ছেলের বাড়ির লোকেরা চলে এসেছে। ওদিকে নাদিয়ার বাবার বাড়ি, মানে খান বাড়ির লোকেরাও এসে গেছেন। ও ডেলিসা মা, তুই একটু নিচে গিয়ে দেখ না। ভাবি একা সামলাতে পারবে না। তুই একটু যা, আমি নাদিয়াকে নিয়ে আসছি।”

ডেলিসা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর চোখের চশমাটা আঙুল দিয়ে একটু উপরে ঠেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “পিমনি , নিশিতা আপু আর আদনান ভাই এখনো আসেনি?”

জারা ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, “না, তারা রাস্তায় আছে। এখনই চলে আসবে। তুই যা, আর দেরি করিস না।”

ডেলিসা আর কথা না বলে মাথা নেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার ধূসর রঙের চোখগুলো কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের মতো শান্ত। ওড়নাটা ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে সোজা কিচেনে চলে গেল।
কিচেনে রফিকা চৌধুরী প্রায় হিমশিম খাচ্ছেন। সবাই এসে গেছেন, কিন্তু এখনো কাউকে কিছু খেতে দেওয়া হয়নি। ডেলিসা পিছন থেকে বলে উঠল, “বড়োম্মু, আমাকে দাও। আমি কিছু করে দিই।”

রফিকা চৌধুরী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। পরনে তার একটি চাপা সুতির কাপড়, ঘামে কপাল-গলা ভিজে গেছে। তিনি বিরক্তি মাখা সরে বললেন, “না না, নবাবজাদি, আপনাকে কিছু করতে হবে না। আপনি যান, নিজের ঘরে গিয়ে সাজগোজ করুন। যাতে আমার ভাইয়ের ছেলে এসে আপনাকে পছন্দ করে।”

চৌধুরী বাড়ির সবথেকে অবহেলিত সদস্য হলো ডেলিশা, ডেলিসা, যার শান্ত স্বভাব নীরব শান্ত নদী —কোনো কথায় প্রতিবাদ করে না, শুধু মাথা নিচু করে সহ্য করে যায়। তার ভীতু মন সবসময় আশঙ্কায় ভরা থাকে, যেন কোনো ছোট ভুলেই সে পুরো পরিবারের ক্রোধের শিকার হবে। বাড়ির প্রায় সবাই শুধু টার পিমনি আর নদিয়া আপু বাদে বাকি রা সবাই তার প্রতি অবহেলা করে, যেন সে একটি অদৃশ্য অতিথি, যার অস্তিত্ব কেউ গুরুত্ব দেয় না—তার বাবা তাকে দেখলেও চোখ ফিরিয়ে নেন, অন্যরা তার কথা শুনলেও উত্তর দেন না, যেন তার অসহায়ত্বই তার সবচেয়ে বড় অপরাধ।

ডেলিসা মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে বলল, “আসলে বড়োম্মু, আমি নাদিয়া দিদিকে সাজিয়ে দিচ্ছিলাম। তাই আসতে দেরি হয়েছে।”

রফিকা চৌধুরী বিরক্তির সুরে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, নিজে তো সাজতে পারিস না। সব সময় চোখে ওই চশমা ছাড়া আর কিছু দেখতে পারিস না। তুই আবার অন্যকে কী সাজাবি শুনি? সব তোর কাজ না করার ধান্দা। আমি বুঝি না?”

ডেলিসা এখনো মাথা নিচু রেখে বলল, “বড়োম্মু, আমি সত্যি নাদিয়া আপুকে সাজাচ্ছিলাম।”

রফিকা একটি বড় ট্রে-তে মিষ্টির প্লেটগুলো তুলতে তুলতে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, জানি জানি। তুমি কত সাজিয়েছ নাদিয়াকে। যত সব আমার জ্বালা-আপদগুলো আমার কপালে জোটে। নিজের মা আর বোনকে তো খেয়েছিস, এখন আমাদের হারামাস জ্বালিয়ে খাচ্ছিস। বাপ তো ফিরেও তাকায় না। যত জ্বালা সব আমার ঘাড়ে এসে ঝুলে।”
এসব বলতে বলতে ট্রেটা ডেলিসার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “নিন, এগুলো ওদের দিয়ে এসে আমাকে একটু উদ্ধার করুন দেখি।”

ডেলিসা শান্তভাবে ট্রেটা হাতে নিল। বড়োম্মুর এত কথার পরও কিছু না বলে চুপচাপ কিচেন থেকে বেরিয়ে গেল। কী আর বলবে? বড়োম্মু তো ভুল কিছু বলেননি। তার জন্যই তো তার মা আর বোন মারা গেছে। বাবাও একই কথা বলেন। তাই বাড়ির সব ভাই-বোনদের আদর করলেও তাকে করেন না।
এসব ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডেলিসা ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল।

ডেলিসা আসতেই সোফায় বসা সবার দৃষ্টি তার দিকে গেল। মেয়েটির পরনে সস্তা একটা থ্রি-পিস। লম্বা চুল বেণি করে রাখা। চোখে কালো সরু ফ্রেমের চশমা, যার কাচ ভেদ করে দেখা যাচ্ছে তার ধূসর রঙের চোখজোড়া।

সোফায় বসে আছেন রফিকা চৌধুরীর ভাই নাসির শেখ, তার স্ত্রী এবং তাদের বড় ছেলে তন্ময়।

অন্যদিকে জারা চৌধুরীর শশুরবাড়ির লোকেরা—জারার ভাসুর মুহাম্মদ আমিন খান ও তার স্ত্রী আফরিন সুলতানা খান। তাদের তিন সন্তান: বড় ছেলে মুহাম্মদ আজলান খান ও তার স্ত্রী আয়েশা জিমাল খান, ছোট ছেলে মুহাম্মদ হুজাইফা খান এবং একমাত্র মেয়ে আয়েশা জিমাল খান।

আর আছেন জারার দেবর মুহাম্মদ আশফাক খান, তার স্ত্রী ফিজা রাবিয়া খান এবং তাদের দুই সন্তান—মেয়ে ইনায়া খান ইয়াসমিন ও ছেলে ফাইজান আফতাব খান।

সবাই ডেলিসার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজেদের কথায় মগ্ন হলেন। ঠিক তখনই সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন চৌধুরী বাড়ির দুই কর্তা—আরিফ সাহেব ও ইয়াসিন সাহেব। তাদের সঙ্গে আরিফ সাহেবের দুই সন্তান—নিশিতা এবং আদনান।

সবার দৃষ্টি সদর দরজার দিকে ঘুরতেই হঠাৎ সশব্দে কিছু পড়ার এবং ভাঙার শব্দ হল। সবাই তাকিয়ে দেখলেন—ডেলিসা মুখথুবড়ে মেঝেতে পড়ে আছে। ট্রে এবং প্লেটগুলো সব ভেঙে গেছে। সমস্ত মিষ্টি মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

রফিকা চৌধুরী ভাঙা প্লেটের শব্দ শুনেই রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে রাগে তাঁর চোখ দুটো লাল হয়ে গেল। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মিষ্টি, ভাঙা কাচ, আর তার মাঝে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা ডেলিসা।

তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ডেলিসার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে টেনে তুললেন। দাঁতে দাঁত চেপে, রাগে কাঁপা গলায় বললেন, “হারামজাদি! কাজ করার কথা বলেছি বলে আমাদের এভাবে মেহমানদের সামনে অসম্মান করবি? কাজ করতে চাস না বললেই হতো, আমি নিজেই করে নিতাম। তাই বলে তুই খাবারগুলো এভাবে ফেলে নষ্ট করবি?”

এরপর তিনি ঘুরে ইয়াসিন সাহেবের দিকে তাকালেন। কণ্ঠে অভিযোগ আর তিক্ততা মিশিয়ে বললেন,
“ইয়াসিন ভাই, কিছু বলবেন না? আপনার মেয়েকে দেখছেন একটু বোকা বিয়েছি বলে কেমন খাবারগুলো নষ্ট করেছে। এখন মানুষগুলো কী দিয়ে নাস্তা করবে?”

রফিকা চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই সদর দরজার দিক থেকে ইয়াসিন সাহেব ছুটে এলেন। তিনি কোনো কথা না বলে সোজা ডেলিসার গালে সজোরে একটা থাপ্পড় মেরে দিলেন।

তাল সামলাতে না পেরে ডেলিসা কয়েক হাত দূরে ছিটকে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেল। কপালের একপাশ সামান্য কেটে গেল, চোখের চশমাটা দূরে ছিটকে গিয়ে ভেঙে গেল। ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল এত জোরে চর মারার কারণে।

কিন্তু মেয়েটা কোনো রকম কান্নাকাটি করল না। একই শান্ত, নিঃস্পন্দ ভঙ্গিতে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল নিজের আব্বুর সামনে। ধীর কণ্ঠে বলতে চাই তো “আব্বু আসলে আমার পা স্লিপ…”

পুরোটা শেষ করার আগেই ইয়াসিন সাহেব আবার তার গালে আরেকটা চড় বসালেন। দাঁতে দাঁত পিষে, ক্রোধে ফেটে পড়া গলায় বললেন,
“কী চাস তুই? নিজের বিয়ে হচ্ছে না বলে কি এখন আমার বোনের মেয়ের বিয়েটাও ভাঙতে চাস? বাইশ বছর বয়সে এখনো আমাদের ঘাড়ে বসে খাচ্ছিস, আবার আমাদের সম্মান নিয়ে খেলছিস? এত সাহস তোর?”

আরেকবার চড় তুললেন তিনি ডেলিসার গালের দিকে। কিন্তু সেই হাত মাঝপথেই থেমে গেল।
সদর দরজা থেকে ছুটে এসে আদনান চাচুর হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। নরম কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“চাচ্চু, কী করছেন? বাড়ি ভর্তি মেহমান। তারা কী ভাববে? এই মেয়ের নাহয় মান-সম্মান নেই, কিন্তু আমাদের তো আছে। ছেড়ে দিন ওকে।”

ইয়াসিন সাহেব আর কিছু না বলে, গভীর রাগ আর অপমান নিয়ে চোখ পাকিয়ে নিজের কক্ষের দিকে চলে গেলেন।

রফিকা চৌধুরী তখনো ডেলিসার চুলের মুঠি ছাড়েননি। তাকে আবার টেনে ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন,
“এইখান থেকে সবকিছু পরিষ্কার করবি। তারপর যাবি। তোর জন্য চাকর রাখিনি যে তাদের দিয়ে পরিষ্কার করাব।”
এই বলে তিনিও সেখান থেকে চলে গেলেন।

ডেলিসা তখনো মেঝেতে। তার চশমা দূরে গিয়ে ভেঙে পড়েছে। চশমা ছাড়া সবকিছু ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। তবুও সে হাত বাড়িয়ে এলোমেলোভাবে কাচের টুকরোগুলো তুলতে লাগল। কখনো কখনো ঠিকমতো দেখতে না পাওয়ায় কাচের টুকরো হাতে ফুটে গেল। রক্ত বেরোল।

এতক্ষণের এই সমস্ত ঘটনা সবাই দেখল। কিন্তু কেউ একটা টু-শব্দও করল না। সবাই জানে—চৌধুরী বাড়ির লোকেরা পারিবারিক ব্যাপারে বাইরের কাউকে কথা বলতে পছন্দ করে না। আর কী-ই বা বলবে, যেখানে মেয়েটার বাবা নিজেই এমন করে।
তাই সবাই আবার নিজেদের কথায় ফিরে গেল। ডেলিসার দিকে আর কেউ তাকালও না। শান্ত মনে নিজেদের আলাপ চালিয়ে গেল।

কিন্তু সবাই শান্ত হলেও, সেখানে উপস্থিত একজন মানুষের মন কিছুতেই শান্ত হচ্ছিল না। তার চোখে অনবরত আগুন জ্বলছে। রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ। তার দৃষ্টি একটিমাত্র জায়গায়—ডেলিসার হাতের দিকে।

ঝাপসা চোখে ডেলিসা কাচের টুকরো তুলছে। দেখতে না পাওয়ায় কখনো কখনো সেগুলো হাতে ফুটে যাচ্ছে। রক্ত বেরোচ্ছে। প্রতিটি আঘাত যেন তার হাতে নয়, সেই মানুষটির বুকেই হচ্ছে। ডেলিসার হাতের প্রতিটি ক্ষত তার বুককে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।
সে দৃষ্টি ডেলিসার ওপর রেখেই মনে মনে আওড়াল,
‘আমার সাদা বিলাইকে যে যে কষ্ট দেবে, তাদের কাউকে আমি ছাড়ব না। কাউকে না। হোক না সেটা ওর বাবা।’
সাদা বিলাই, তুই চিন্তা করিস না। আমি খুব তাড়াতাড়ি তোকে আমার কাছে নিয়ে আসব। তখন তোকে কেউ কষ্ট দিতে পারবে না। কেউ না।

#চলবে…..

Comment