Damini Sudipa Banerjee

মরু ফুল

ওরা যখন ব্যঙ্গ হাসি হেসে আমায় জিজ্ঞেস করবে – “ফুল ফুটিয়েছিলে?”

আমি তখন মৃদু হেসে তোমার দিকে আঙুল দেখিয়ে ওদের জিজ্ঞাসার মুখে জবাবের ঢাকনা বসিয়ে বলব – ঐ তো,দ্যাখো;আমার নিজের হাতে ফোটানো মরুফুল; আমার হৃদয় মরুতে ফুটে তরতাজা হয়ে মাথা দোলাচ্ছে কেমন!

ওরা অবাক চোখে তোমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমায় জিজ্ঞেস করবে – “কী করে ফোটালে এই মরুতে ফুল!”

আমি তখন বলব- কী করে আবার; আমার চোখের সবটুকু কান্না ঢেলে দিয়ে।

ওরা বলবে – “এটাও সম্ভব!”
আমি বলব – কেন নয়?
ওকে ফোটানোর জন্য আমি যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। আমিও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম দু’চোখের কান্না ঢেলে ওকে আমি এই মরু-বালিতেই ফুটিয়ে সতেজ করে তুলব।

ও যে ফুটতে চায়নি। আমায় হারিয়ে দিয়ে হারিয়ে যেতে চেয়েছিল মরুঝরে।
আমি কিন্তু হার মানিনি। আমি ওর গভীর রাতের লেখা আত্মহত্যার চিঠি কুঁচিয়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম- কেন ফুটতে চাও না তুমি? আমি যে দায়বদ্ধ তোমায় ফোটাতে। দোহাই তোমার , আমায় এভাবে হারিয়ে দিও না।

কী বললে তুমি?
এই মরু-বালিতে ফোটা সম্ভব না? সরস আবেগ শুকিয়ে গেছে?
কিন্তু তোমাকে যে ফুটতেই হবে, আমার জন্য।
আমি আমার এক জনমের সব কান্না তোমার পায়ে ঢেলে দেব। তোমার বার বার লেখা আত্মহত্যার চিঠি আমি এমনি করেই বারবার ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দেব।
তাও তুমি ফুটবে না!
একটা চলে যাওয়া অবিশ্বাসী
হাত, একটা তীব্র মাথা যন্ত্রণার ঝড় ,আর রাতের পর রাত আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত যদি তোমার না ফোটার কারণ হয়ে থাকে ,তবে আমি কথা দিলাম।
তোমার এই হতাশার চাঙর ভেঙে গুঁড়িয়ে আমি জৈব সার বানিয়ে তোমাকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলব।
শুধু একটা সুযোগ দাও আমায় ; কেবল একটা সুযোগ।

ও আমায় বলল – ” কে তুমি? আমায় ফোটানোর জন্য এত দায় বদ্ধতা কেন তোমার? আমি তো হারিয়ে যেতে চাই। আমি ফুটতে চাই না আর।
মরুতে কি ফুল ফোটানো যায় ? এ তোমার নিছক ছেলেমানুষি।”

আমি বলেছিলাম – যায় বৈকি,খুব যায়। আমায় একবার ভরসা করে দেখতে পারো না?
ও বলল – ” বেশ, করলাম ভরসা। ফুটিয়ে দেখাও আমায় এই মরুতে।”

তারপর;
আমার চোখের ফোঁটা ফোঁটা কান্না দিয়ে ওর আত্মহত্যার চিঠি কুঁচিয়ে আর হতাশার স্তূপ ভেঙে গুঁড়ো করে সার বানিয়ে ওকে যত্ন করে ফুটিয়ে তুললাম।
ও ধন্য ধন্য করল আমায়।
বলল – তুমি পেরেছ, সত্যিই তুমি পেরেছ!
আমায় তুমি হারিয়ে দিয়ে জিতে নিলে কেমন করে!”

আমি বললাম ঐ যে ,প্রথম বার বলেছিলাম এ আমার দায় বদ্ধতা। ”

এসব কাহিনী শুনে ওরা আমায় ধন্য ধন্য করে যখন তোমায় ছুঁতে চাইবে,তখন আমি তোমায় নাজরকাঠি পরিয়ে দিয়ে বুকে আগলে রেখে বলব – এ শুধু আমার সম্বল,আমার অধিকার ,আমার কষ্টের,আমার সবুরের মিঠা। ওকে নজর দিয়ে ছুঁয়ে দেখো না কেউ। ও যে খুব স্পর্শকাতর! ও শুধু আমার স্পর্শ বোঝে। রুক্ষ হাতের স্পর্শ ও সইতে পারে না।
চোখের জল ঢেলে ফুটিয়ে তোলা এই মরুফুল শুধু আমার। শুধুই আমার।
আমার জীবন যৌবনের মরু-বালির জমিটুকু উর্বর আর অনুকূল করে কান্না ঢেলে আমি ওকে ফুটিয়েছি।

আনন্দে আত্মহারা, বিষাদ ভোলা,আত্মহত্যার চিঠি ছিঁড়ে ফেলা মরুফুল এখন শুধুই আমার জন্য ফোটে।

আমি প্রমাণ করেছি , যত্ন পেলে মরুতেও ফুল ফোটে।

🖋️ দামিনী

Comment