Subhankar Niyogi

# নয়া দৌড় #
# শুভংকর নিয়োগী #

টীন-এজ বয়সটি এমনই যে নতুন করে কিছু ভালো কাজ করার জন্যে আনচান করে মন। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠলেই দেখা যায় খড়ের প্রাচীরে গোঁজা হালবাড়ি, মাটিতে রাখা লাঙল, জোয়াল, কোদাল, মই, ইত্যাদি। পশ্চিমের দরজা দিয়ে বের হলেই দেখা যায় গোয়াল বাড়ি, সারকুড়, ঘোষপুকুর, রাধীর গেড়ে, শালডাঙ্গা, খামারবাড়ি। দক্ষিণের দরজা দিয়ে বের হলেই দেখা যায় সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা মাঠ। মাঠের মাঝে এক বিশাল বড়ো তালপুকুর। তালপুকুরের চার পাড়ে ভরা তালগাছ। স্নানের ঘাটের দুদিকে আলসে ও বড়ো-হেঁড়ের-ঝি নামে দুটি প্রকান্ড তালগাছ। যেন তারা চব্বিশ ঘণ্টায় অতন্দ্র প্রহরীর কাজ করে, মানুষদের স্বাগত জানায়। স্নানের ঘাটের দুপাশে দুটি প্রাচীন বটগাছ। ডানদিকের বটগাছটিকে ঠাম্মা বলতেন মা-ষষ্ঠী। প্রতিদিন স্নান করার পর মা-ষষ্ঠী নামের বটগাছটির গোড়ায় এক ঘটি জল ঢেলে বিড়-বিড় করে কী সব বলতেন! তারা পাতার ছায়ার আঁচল বিছিয়ে দিয়ে, আশ্রয়হীনদের আশ্রয় দিয়ে, ক্লান্ত জন-মজুরদের স্নেহ-মাখা দূষনহীন শীতল বাতাস সারা গায়ে মাখিয়ে দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়। স্নানের ঘাটের বাম ও ডান পাশে যথাক্রমে কৃষ্ণচূড়া ও কদম ফুলের গাছ দুটি শোভা বর্ধন করে। ওদের মনোরম প্রাকৃতিক শোভায় চোখ জুড়িয়ে যায়। স্নানের ঘাটটির চারটি চাতালের দুদিকে উঁচু করে বাঁধানো যাতে পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করা যায়। তালপুকুরটির ঈশান ও বায়ু কোণে দুটি তেঁতুল গাছ। অগ্নি ও নৈর্ঋত কোনে দুটি প্রাচীন বটগাছ। নৈর্ঋত কোণের বটগাছটির ডালে দোল খাওয়া, খোলামাঠে গরু ছেড়ে দিয়ে তার তলায় আড্ডা দেওয়া, ডাং-গুলি খেলা, ছোলা, বেল, আলু, রাঙা-আলু পুড়িয়ে খাওয়া, সে এক অনির্বচনীয় মধুর স্মৃতি।
গোয়ালঘর থেকে গরু ও ছাগল বের করে তাদেরকে নির্দিষ্ট জায়গায় বেঁধে নিম কাঠিটি মুখে নিয়ে নতুন বাড়ির দক্ষিণের খোলা বারন্দায় বসে সূর্য ওঠা দেখে জিৎ। বিশেষ করে শীতের সকাল-বেলাটা। পুব দিকে তাকালেই ঘন সবুজ আলুর খেত, সরষের খেত, গম, কলাই ও বিভিন্ন সবজির খেত। এরই ফাঁকে সূর্যদেব সারা পুব-আকাশ রক্তিম আভায় রাঙিয়ে ধরিত্রী-দেবীর কোলে সোনালী কিরণ ছড়িয়ে দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনায় যেন বলেন, ‘কইগো শুনছো, জাগো, ওঠো, প্রভাত হলো!’
জিৎ মুখ হাত ধুয়ে নিজে মুড়ি খেয়ে, রাজ, হর্ষ ও মিতি নামে তিনটি ছাগলকে এবং লাল্টু নামে কুকুরটিকে মুড়ি খাইয়ে পড়তে বসে নতুন বাড়ির দক্ষিণের খোলা বারান্দায়। তার ডানপাশে পিছনের পা দুটি মুড়ে চুপটি করে বসে জিতের ক্রিয়াকলাপ লক্ষ করে লাল্টু। যেন তার মাষ্টারমশাই, পড়া বুঝিয়ে দেয় জিৎকে! খুঁটির পাশ দিয়ে সারি সারি পিঁপড়ে খাবারের খোঁজে বের হয়। ওদিকে একটি পিঁপড়ে একটি মুড়িকে বেমালুম টেনে নিয়ে যায়। অন্য একটি পিঁপড়ে একটি মুড়িকে মুখে করে কামড়িয়ে তুলে নিয়ে যায়। সে ভাবে একটি পিঁপড়ের থেকে একটি মুড়ির ওজন অনেকগুণ বেশি, অথচ কত সহজে অবলীলায় একটি মুড়িকে বেমালুম টেনে ও তুলে নিয়ে যায়। ওরকম শক্তি যদি ভগবান তাকে দিত তাহলে ধান ঝাড়ার পর ধানের বস্তাগুলিকে খামার থেকে একাই টেনে নিয়ে এসে মরায়ে ঢেলে দিত। মাঠ থেকে আলুর বস্তাগুলোকে নিয়ে আসতে পারত একাই। ভেতরের ঘর থেকে ঠাম্মার হামানদিস্তার আওয়াজ আসে পান-ছেঁচার। ওদিকে রান্নাঘরের উঠোন থেকে খ্যাসর-খ্যাসর আওয়াজ আসে মায়ের মুড়ি ভাজর। তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে আঁকা-বাঁকা পথে মাঠের মাঝে তাল পুকুরে যাবার রাস্তা। পাড়ার লোকেরা প্রাতঃকাজ, স্নান ওখানেই সারে। সে মানুষের আসাযাওয়া দেখে। ইংরাজির মানে বইটি খুলে পাঠের পড়া করার চেষ্টা করে। জিৎ-এর অন্যমনস্কতা লক্ষ করে লাল্টু কুঁই কুঁই করে এসে তার গালে ও ঠোঁটে আলতো করে জিভ বুলিয়ে চেটে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে যে পড়াশুনায় মন দিতে, যেন আরও বলে, ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে!’
বেলা বাড়ে। জিৎ স্নান সেরে খাওয়া – দাওয়ার পর্ব সেরে স্কুলে যায়। কিন্তু কী এক অজানা চিন্তায় ব্যকুল হয়ে ওঠে তার মন। ক্লাসরুমে গিয়ে বসে। বিজ্ঞান স্যার ক্লাসরুমে ঢুকলেন। তিনি বলতে লাগলেন, “আজ আমি তোমাদের পড়াব, ‘প্লবতা।’ তার আগে, আগের দিনের ক্লাসে পড়ানো বিশ্ববিখ্যাত গ্রীক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের নীতিটি আরও একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। ‘কোনও বস্তুকে স্থির তরল বা গ্যাসীয় পদার্থে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত করলে বস্তুটির ওজনের আপাতহ্রাস হয়। বস্তুটি নিমজ্জিত অবস্থায় যে ওজনের তরল বা গ্যাস অপসারণ করে, বস্তুটির ওজন ততটাই হ্রাস পায়।’ আর ‘প্লবতা’ মানে তরলের ঊর্ধ্বমুখী বল বা ঘাত। ‘কোনও বস্তুকে স্থির তরল বা গ্যাসীয় পদার্থে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত করলে বস্তুটি একটি ঊর্ধ্বমুখী বল বা ঘাত অনুভব করে। এই বল বস্তুর ওপর লম্বভাবে প্রযুক্ত হয়। একে ওই তরল বা গ্যাসের প্লবতা বলা হয়।’ প্লবতা বস্তুর তলদেশে লম্বভাবে ঊর্ধ্বমুখে ক্রিয়া করে। প্লবতা বস্তুর আয়তনের ওপর নির্ভর করে। প্লবতা তরলের গভীরতার ওপর নির্ভর করে। প্লবতা নির্ভর করে তরলের ঘনত্বের ওপর। একখণ্ড লোহাকে স্থির তরলের ওপর ছেড়ে দিলে সেটি তরলের মধ্যে ডুবে যেতে দেখা যায়। আবার সেই লোহাটিকে আগুনে লাল টকটকে গনগনে করে পুড়িয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পাতলা পাত করে একটু অবতল আকার ধারণ করিয়ে তরলের ওপর ছেড়ে দিলে ভাসতে দেখা যায়। এর কারণ হল, লোহার টুকরোটির আয়তন কম, ফলে জল অপসারণ করার ক্ষমতা কম, সেজন্যে প্লবতা কম। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে লোহার পাতটির আয়তন বেশি হওয়ায় জল অপসারণ করার ক্ষমতা বেশি, সেজন্যে প্লবতা বেশি। অর্থাৎ কোনো একটি বস্তু তখনই ভাসে যখন বস্তুর ওজনের থেকে প্লবতা বেশি হয়। এর বিপরীত হলে বস্তুটি তরলে ডুবে যায়। এই একই কারণে বড়ো বড়ো জাহাজ, নৌকা জলে ভাসতে পারে। যে তরলের ঘনত্ব যত বেশি সেই তরলের প্লবতা বা ঊর্ধ্বমুখী বলও তত বেশি। আবার তরলের গভীরতা যেখানে যত বেশি সেখানে তরলের প্লবতা বা ঊর্ধ্বমুখী বলও তত বেশি। সমুদ্রের জল লবণাক্ত তায় ঘনত্ব বেশি, মানে প্লবতা বেশি, সেজন্যে সমুদ্রের জলে কোনও বস্তুকে ভাসাতে, নিজে ভাসতে, সাঁতার কাটতে সুবিধে হয়। সমুদ্রের জলে প্লবতা বেশি বলে বড়ো বড়ো জাহাজ, নৌকা যে পরিমাণ জলের ওপর ভেসে থাকে গঙ্গা বা নদীর জলে প্লবতা কম বলে তার চেয়ে কম পরিমাণ জলের ওপর ভেসে থাকে। একটি সাধারণ উদাহরণ দিই, – একটি সুচকে তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ধরে স্থির তরলের ওপর শুইয়ে দিলে সেটিকে ভাসতে দেখা যায়, আবার সেটিকে লম্বভাবে স্থির তরলের ওপর ছাড়লে ডুবে যেতে দেখা যায়। যদিও সুচকে ভাসাতে ‘সারফেস টেনশন’ বেশি কাজ করে তবুও বলব প্লবতা সামনে হলেও কাজ করে! তোমরা বাড়ীতে এটি পরীক্ষা করে দেখতে পার,” বলে তিনি থামলেন। জিতের সারাদিনের চাঞ্চল্য কয়েক মিনিটেই কেটে যায়। স্থির পলকহীন দৃষ্টিতে ভাবতে থাকে, – একটি সুচ জলের ওপর ভাসবে! কী করে সম্ভব! পরীক্ষা করে দেখতেই হবে! স্কুল ছুটির পর বাড়িতে এসে বই-খাতা রেখে একটি সুচকে তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ধরে শুইয়ে দেয় স্থির তরলের ওপর। সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চেয়ে দেখে যে সত্যিই ভাসছে জলের ওপর। তার সিক্সথ সেন্স বিবেক তাকে নাড়া দিয়ে বলে, ‘একটি সুচ যদি জলের ওপর ভাসতে পারে তাহলে সে নিজে জলের ওপর ভাসতে পারবে না কেন?’ কিন্তু …….। একগাদা কিন্তু জিতের মাথায় জট পাকিয়ে বসে।
গ্রীষ্মকালে স্নান করার সময়ে অতবড়ো তালপুকুরটিকে সাঁতারে ওপার-এপার করে। ওটি অনেকেই করে। কিন্তু কোনও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না নেড়ে জলের ওপর ভেসে থাকা সহজ কথা নয়। তার বিবেক আমতা আমতা করে বলে, ‘কোনও কিছুই অসাধ্য নয়। সুচিন্তিত পরিকল্পনায় মনের প্রবল ইচ্ছাশক্তি, জেদ, পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় প্রয়োগ করে অনেক অসাধ্য কাজকে সহজে করা যায়।’
তার নয়া দৌড়ের ক্লাস শুরু হয়। সাঁতারে পুকুরের মাঝে গিয়ে জলের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। প্রথমে হাত দুটিকে শরীরের দু-পাশে জলের ওপর রেখে পা-দুটিকে নাড়াতে থাকে। কিন্তু মাথা ডুবে যায়। এবার পা-দুটিকে স্থির রেখে দু-হাত দিয়ে জল কাটতে শুরু করে, কিন্তু হাত-পা না নেড়ে ভেসে থাকা যায় না। এ-ভাবে কয়েকদিন চেষ্টা করার পর তার সব চেষ্টা বিফলে যায়। উপলব্ধি করে এভাবে করলে হবে না। চিন্তা করে প্রথমে দুটি হাত ও দুটি পায়ের যে কোনও একটিকে স্থির রেখে বাকী তিনটিকে জলের ওপর নাড়াতে হবে।
পুকুরের মাঝে গিয়ে প্রথমে বাম পাটিকে স্থির রেখে বাকী তিনটিকে নাড়াতে থাকে। দিব্বি ভেসে থাকা যায়। এ-ভাবে কয়েকদিন করার পর বাম এবং ডান পা স্থির রেখে শুধু হাত দুটিকে নাড়াতে থাকে। দুটি পা একসঙ্গে স্থির রেখে কিছুতেই ভেসে থাকা যায় না। পা-দুটি সোজা পুকুরের গভীর তলদেশের দিকে চলে যায়। অন্যভাবে হাত দুটি স্থির রেখে পাদুটিকে একসঙ্গে নাড়াতে থাকে, কিন্তু মাথা ডুবে যায়। কিছুতেই সুচের মতো ভেসে থাকা যায় না। কিছুতেই ব্যালেন্স আনতে পারে না।
দিন যায়, মাস যায়। জিৎ ভাবে তাহলে কি তার চিন্তা-ভাবনা ভুল! ব্যালেন্স শব্দটি মাথায় খুব ঘোরাফেরা করে। সে ঈশান কোণে তেঁতুল গাছটির তলায় ওঠে আসে। একটি ঘসিম নিয়ে মানুষ আঁকে আর মনে মনে হচ্ছে না বলে কাটে ক্রস চিহ্ন দিয়ে। আবার আঁকে, আবার কাটে। এমন সময় বিবেক বলে ওঠে, ‘ক্রস চিহ্নটিই তো ব্যালেন্স!’ সে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে আর মনে মনে বলে, ‘বোধ হয় একটি সূত্র পাওয়া গেছে!’ সে পুকুরের মাঝে গিয়ে জলের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে বাম হাত ও ডান পা স্থির রেখে ডান হাত ও বাম পা নাড়াতে থাকে। ভেসে থাকতে অসুবিধা হয় না। এভাবে দিন কয়েক অভ্যাস করার পর ডান হাত ও বাম পা স্থির রেখে বাম হাত ও ডান পা নাড়াতে থাকে। এবারেও ভেসে থাকতে অসুবিধা হয় না। এভাবে আরও কয়েক দিন অভ্যাস করার পর সব কিছু স্থির রেখে জলের ওপর ভেসে থাকার চেষ্টা করে। আগের থেকে ভালো বটে কিন্তু পুরোপুরি ভেসে থাকা যায় না। আশ্চর্য! এত করেও সম্ভব হয় না। সেও নাছোড়বান্দা, এর শেষ সে দেখে ছাড়বে! বিবেক বলে, ‘সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম চিন্তা কর আর লক্ষ কর।’ সে খুব হালকা করে হাত-পা নাড়ে, চিন্তা করে আর লক্ষ করে। প্রশ্বাস নেয় আর নিঃশ্বাস ছাড়ে। প্রাকৃতিক নিয়মে পেট ফুলে ও কমে। কিন্তু কী আশ্চর্য! সুচের মতো ভেসে থাকা যায় না। বিবেক বলে, ‘আরও নিয়মের ভিতরে ঢুকে চিন্তা কর।’ এক সময় হতাশ হয়ে দীর্ঘ-শ্বাস নিতেই সে জলে ডুবে যায়। নাকে, মুখে জল ঢুকে ফ্যাচ ফ্যাচ করে একাকার কাণ্ড। প্রথমে তার মনে হয়েছিল যে কেউ বুঝি তাকে জলে ডুবিয়েছে। পরক্ষণেই সে বুঝতে পারে যে দীর্ঘ-শ্বাস নেওয়ায় তার ডুবে যাওয়ার মূল কারণ। বেশি লম্বা করে শ্বাস নেওয়ার সময় দেখে আস্তে আস্তে শরীরটি জলে ডুবে যায়, আবার বেশি লম্বা করে শ্বাস ছাড়ার সময় শরীরটি আস্তে আস্তে একেবারে জলের ওপরতলে ভাসে। তার মনে পড়ে যে বাতাসের ওজন আছে। এখানে মুখ্য ভূমিকা নেয় শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল। যাকে এক কথায় বলে, ‘প্রাণায়াম।’
জিৎ ভাবে শ্বাস নেওয়ার সময় ও শ্বাস ছাড়ার সময় যদি একই থাকে তাহলে প্রথমে জলে ডুবে যাবে পরক্ষণেই আবার আস্তে আস্তে ভাসবে। কিন্তু এটি তার লক্ষ্য নয়। তার লক্ষ্য হল সুচের মতো জলের ওপরতলে ভাসা; একেবারে নিষ্প্রাণ দেহের মতো। এমন সময় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নাড়া দিয়ে বলে, ‘তুমি শ্বাস নেওয়ার চেয়ে শ্বাস ছাড়ার সময়টি বাড়াও। আরে এ যে ইউরেকা! সত্যিই তো। শ্বাস নেওয়ার চেয়ে শ্বাস ছাড়ার সময়টি বাড়াতেই একেবারে জলের ওপরতলে সুচের মতো ভাসতে থাকে। এমন সময় তার মেজদা ডুব সাঁতারে এসে তাকে গভীর জলে ডুবিয়ে রাখে, আর কিছুক্ষণ থাকলেই সলিল সমাধি হতো। একটি সুস্থ চিন্তার মাঝে হঠাৎ বাধা পড়লে তার সে চিন্তার কতখানি যে ব্যাঘাত হয় একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশলটি মানে প্রাণায়ামটি যতই আয়ত্তে আসতে থাকে ততই জলের ওপর শুয়ে থাকতে সুবিধে হয়। এই প্রাণায়ামটি বিভিন্ন ভাবে অভ্যাস করতে হয়। প্রথমে বাড়িতে পদ্মাসনে বসে দুই সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিয়ে চার সেকেন্ড ধরে ছাড়তে হয়। ভালোভাবে অভ্যাস হয়ে গেলে তারপর তিন সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিয়ে ছয় সেকেন্ড ধরে ছাড়তে হয়। ভালোভাবে অভ্যাস হয়ে গেলে হাঁটার সময় দুই স্টেপে শ্বাস নিয়ে চার স্টেপে ছাড়তে ছাড়তে হাঁটতে হয়। এইভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে করতে হয় অভ্যাস। বিভিন্ন হাল্কা কাজ করার সময়, রাত্রে ঘুমোবার আগে শুয়ে শুয়ে অভ্যাস করতে হয়। যাদের রাত্রে সহজে ঘুম আসে না এবং যাদের শ্বাসকষ্টের ধাত আছে তারা এই প্রাণায়ামটি অভ্যাস করলে সুফল পাবে বলে তার মনে হয়। এইভাবে অভ্যাস করতে করতে সে উপলব্ধি করে যে বাতাসের ও প্লবতা আছে। বাতাসের প্লবতা সম্বন্ধে ‘স্কিল পেজ অফ ফুটবলে জানাব।’ এখানে তার মনে আর এক কৌতূহলী প্রশ্নের উদয় হয়, সে কি সত্যিই জলের ওপর নিষ্প্রাণ দেহের মতো ভাসতে পারে?
এসমস্ত কর্মকাণ্ডের মূল সাক্ষী শোনে। সে তার থেকে পাঁচ – ছয় বছরের ছোটো। কিন্তু জিতের পিছনে সে আঠার মতো লেগে থাকে, তাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। পুকুরের মাঝে গিয়ে আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা শবাসনে শুয়ে ঘুমিয়ে নিতে অসুবিধে হয় না। ঘুমিয়ে যাবার পর জ্যান্ত মাছেরা বড়ো চারা ভেবে পিঠে খাবলিয়ে খাবার চেষ্টা করে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। মৎসাসন অনায়াসে করে।
মৎসাসন :- বাড়িতে ভালো করে অভ্যাস করার পর সাঁতারে গিয়ে গভীর জলের ওপর প্রাণায়ামের সাহায্যে মানে শ্বাস নেওয়ার চেয়ে শ্বাস ছাড়ার সময় বেশি করে শবাসনে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তে হয়। তারপর পদ্মাসনের মতো ডান পা ভাঁজ করে বাম উরুর ওপর এবং বাম পা ভাঁজ করে ডান উরুর ওপর রাখতে হয়। বুক ও পিঠ জলের তল থেকে উঁচু করে মাথার পিছন দিকটি বাঁকিয়ে জলের সঙ্গে স্পর্শ করে রাখতে হয়। পিঠ ও জলের মধ্যে যেন ফাঁকা থাকে। এরপর ডান হাত দিয়ে বাম পায়ের আঙুল এবং বাম হাত দিয়ে ডান পায়ের আঙুল ধরে পনেরো থেকে কুড়ি সেকেন্ড ধরে রাখতে হয়।
উপকারিতা : ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি, টনসিল, সর্দিকাশি, পাঁজরার গঠনের দোষ, ফেরিঞ্জাইটিস, স্বরভঙ্গ,ঘাড়ে ও পিঠে ব্যথা, কটিবাত, মস্তিষ্কের অবসাদ, মাথাধরা, অনিদ্রা ও দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতায় উপকারী।
গভীর জলের ওপর এই সমস্ত কর্মকাণ্ড দেখে কয়েকজনের মনে নানা কৌতূহলী প্রশ্ন দেখা দেয়! শবাসনে শুয়ে প্রাণায়ামের সাহায্যে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সময় পেট সামান্য হলেও ওঠানামা করে। নিষ্প্রাণ দেহের মতো ভাসতে হলে ওটি করা চলবে না। অর্থাৎ আরও সচেতন হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। জিৎ তার পরিকল্পনা মতো কাজটি চালিয়ে যায়। কিন্তু কাজটি সফল কতখানি?
আরতি-দি ও কবিতা-ভাইঝি প্রতিদিন জিতের স্নান করার আগে স্নানের ঘাটে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে খোস গল্প করে আর তার জলের ওপর বিভিন্ন কার্যকলাপ লক্ষ করে তাকে বলে, “তোর মধ্যে একটা কিছু আছে!”
তখন গ্রীষ্মকাল। মর্নিং স্কুল। জিৎদের খামার বাড়িতে একটি মিষ্টি আমগাছ আছে। স্কুল থেকে এসে ভাত খেয়ে মায়ের হেঁসেল থেকে খানিকটা নুন নিয়ে কারকের আমগাছ থেকে ঢিল ছুড়ে দুটি আম পেড়ে এক কামড় দিয়ে চলে স্নান করতে। সামনে দ্যাখে দুই অমর সঙ্গী আরতি-দি ও কবিতা-ভাইঝি দোদুল্যমান গতিতে যাচ্ছে স্নান করতে। তার মনে এক ফন্দি আসে। তাদের পিছনে গিয়ে মিষ্টি স্বাদের আম খাবার ভান করতে থাকে। “আঃ কি মিষ্টি! কি মিষ্টি!” ওরা চেয়ে বসে। সে বলে, “তাদের খামারের গাছ থেকে লুকিয়ে মাত্র দুটি আম পেড়ে নিয়ে এসেছে।” আরতি -দি একটি চেয়ে বসে। অগত্যা দিতেই হয়, – সঙ্গে একটু নুন। এক কামড় দিয়েই বলে, “বদমাশ, কারকের আম দিয়েছিস,” বলেই আমটি ছুড়ে ফেলে দেয়। বস্তুত কারকের আম মানেই ভীষণ টক। কবিতা-ভাইঝি বলে, ”এই আজকে কী কৌশল করেছিস?” জিৎ বলে, “কালকে দেখবে।”
পরের দিন সবার অলক্ষে জিৎ তালপুকুরের মাঝে গিয়ে প্রাণায়াম ও প্লবতার যুগল মিশ্রণের কৌশল অবলম্বন করে একেবারে শোলার মতো ভাসতে থাকে।
প্রতিদিনকার মতো আরতি-দি ও কবিতা-ভাইঝি স্নানের ঘাটে পা ঝুলিয়ে বসে খোশগল্প করে। শোনেকে আসতে দেখে আরতিদি জিজ্ঞেস করে, “জিৎ কই রে?” শোনে বলে, “জানি না, বাড়ির লোকেরা বলল যে সে অনেকক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছে।” একটু থেমে পুকুরের মাঝের দিকে আঙুল তুলে বলে, “ঐ তো পুকুরের মাঝে ভাসছে।” আরতি-দি ও কবিতা-ভাইঝি একসঙ্গে বলে ওঠে, ”ওভাবে তো কোনোদিন ভাসতে দেখিনি!” শোনের ও কেমন যেন সন্দেহ হয়। ইতিমধ্যে মনোজ-দা এসে হাজির, সে বলে, “ছেলেটিকে আমিও খুঁজছি, কখন যে কোথায় কী করে, বোঝা মুশকিল! “জিৎ….,” বলে একটি ডাক দেয় মনোজ-দা। কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে শোনেকে বলে, “শোনে, সাঁতারে গিয়ে দেখে আয়!”
শোনে সাঁতারে গিয়ে হাত পাঁচেক দূর থেকে লক্ষ করে জিৎকে। একটু পরে ভয়ে ভয়ে বলে, “বোধ হয় মারা গেছে!” মনোজদা স্নানের ঘাট থেকে চেঁচিয়ে বলে, “দু’ হাতে করে ঢেউ তুলে চোখে-মুখে দে।” শোনে সে রকমই করে চলে। কিন্তু তাতে জিতের কোনো অসুবিধাই হয় না। মনোজ-দা আবার বলে, “ওর হাত চেপে ধরে ডোবা!” শোনে তার যথাসাধ্য চেষ্টা করে একটুখানি ডুবিয়ে রেখে তারপর ছেড়ে দেয়। শ্বাসের ঘাটতি হেতু জিৎকে জোর করে শ্বাস নিতে হয়, ফলে পেটটি ফুলে ওঠে। শোনে সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে বলে, “ বেঁচে আছে!” বেঁচে আছে শুনে জিৎ তাড়াতাড়ি তার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করে নিতেই শোনে বলে, “না! সত্যিই মারা গেছে!”
জিৎ দের বাড়িতে দুঃসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তার ঠাম্মা বলেন, “তোদের মাথা খারাপ, তায় তোরা ওরকম ভাবছিস। খোকার কিছু হলে আমি আগে জানতে পারব।” বলা-বাহুল্য তার ঠাম্মা জিৎকে খোকা বলেই ডাকতেন। ইতিমধ্যে স্নানের ঘাট থেকে বেশ কয়েকজনের কান্নার স্বর জিৎ শুনতে পায়, কিন্তু তার হাসা, নড়াচড়া করা, জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া সবই বারণ।
মাঝ পুকুর পর্যন্ত সাঁতারে এসে খানিকক্ষণ সাঁতারে থাকা, তারপর নিজের ভর সামলে আর একজনকে ডোবানো সহজ কথা নয়। শোনেরও কেমন যেন ভয় ভয় করে! মুখ দিয়ে তার আর কথা বের হয় না। তবু একরকম জোর করে চেঁচিয়ে বলে, “ডো – ডো – ডোবানো যাচ্ছে না!” মনোজদা জোর করে চেঁচিয়ে বলে, “ওর বুকে চেপে বোস।” শোনে একরকম সাহসে ভর করে জিতের বুকে চেপে বসে। জিৎ পুরোপুরি জলে নিমজ্জিত। তার বুকে বসতে পেরে শোনের বেশ আরাম লাগে। মনে মনে বলে, ‘এবার যায় কোথায়!’
জিতের আর দম নেই। তেড়েমেড়ে ওঠে শোনেকে ধরে জলে ডুবিয়ে রেখে ছেড়ে দেয়। শোনে আর্তনাদ করে বলে ওঠে, “ওরে – বাবা – রে খেয়ে ফেললে রে!, ওরে – বাবা – রে খেয়ে ফেললে রে! জিৎ জীবদান পেয়েছে রে!” বলে যত জোরে পারে স্নানের ঘাটের দিকে ফিরে যেতে থাকে। জিৎ পিছনে পিছনে তাকে তাড়া করে নিয়ে আসে। শোনে স্নানের ঘাটের মেঝেতে উঠেই মাটিতে পড়ে বেহুশ! সবাই জিৎকে দোষারোপ করে বলে, “তোর জন্যে শোনের এই অবস্থা! ওর কিছু হলে তুই দায়ী থাকবি!” বুঝুন অবস্থাখানি! কী করতে কী হয়ে গেল! মনোজ-দা শোনের চোখে-মুখে জল দিতেই শোনে চোখ খুলে সামনে জিৎকে দেখেই আবার অজ্ঞান! মনোজ-দা শোনের সম্মুখ থেকে জিৎকে সরিয়ে নেয়। খানিক পরে শোনের জ্ঞান ফেরে। জিৎ দেখে যে দু’একজন বাদে বাকি সবারই চোখে জল। কবিতা ভাইঝির চোখে জল অথচ মুখে একগাল হাসি নিয়ে বলে, “আয় তোকে একটা প্রণাম করি।” জিৎ মনে মনে বলে, ‘তাহলে এটি সফল। হেসে মুখে বলে, “আর একটি মতলব মাথায় এসেছে।” বলেই শোনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে বলে, “তুই বেঁচে আছু?”
ক’দিন ধরেই একটি কথা মাথায় ঘুরপাক খায়। তখন বাড়িতে ভাত-রান্না, ধান-সেদ্ধ, গরুর-ঘাঁটা ইত্যাদি সম্পন্ন হতো মাটির হাঁড়িতে। ভাত সমেত মাটির হাঁড়ি জ্বলন্ত উনোনের ওপর কতবার তার চোখের সামনে ভেঙেছে। সেই ভাঙ্গা অবতল খোলামকুচি জলের ওপরতলে ছুড়ে দিলে কেমন নেচে নেচে তাতা–থৈ, তাতা–থৈ করতে করতে পুকুরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে পৌঁছে যায়। কিন্তু একখণ্ড ইটের টুকরো বা শক্ত স্টোন চিপসের বেলায় তো হয় না! পরে চিন্তা করে বুঝতে পারে যে জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। তাঁর থিওরি অনুয়ায়ী ‘পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করলে বিপুল পরিমাণ শক্তির উদ্ভব হয়’। খোলামকুচিটি অবতল ও আয়তনে বেশি থাকায় প্রথমে বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করে গতিবেগ সঞ্চার করে ছুড়ে দেওয়া হয়। তখন খলামকুচিটি কিছুদূর গিয়ে পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের জন্যে নিচে নেমে জলের ওপর পড়তেই জলের প্লবতা খলামকুচিটির তলদেশে টোকা মেরে ঊর্ধ্বমুখী ঘাত প্রয়োগ করে, ফলে আবার শক্তি সঞ্চয় করে খলামকুচিটি উপরদিকে উঠে কিছুদূর যায়, আবার পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের জন্যে নিচে নেমে জলের ওপর পড়ে। এইভাবে একই কাজ বার বার অতি দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুকুরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে পৌঁছে যায়। তাহলে দেখা যায় যে গতিবেগ, পৃথিবীর অভিকর্ষ বল, জলের প্লবতা এবং সম্ভবত নিউটনের তৃতীয় সূত্রের জন্যেও খোলামকুচিটি বেমালুম পুকুর পেরিয়ে যায়। অথচ সেই খোলামকুচিটি জলের ওপর ছেড়ে দিলে আন্দোলিত হয়ে হেলে দুলে ডুবে যায়। হঠাৎ সিক্স সেন্স বলে ওঠে খোলামকুচিটি যদি জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে পুকুরের ওপারে চলে যেতে পারে তাহলে সে জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে পুকুরের ওপারে চলে যেতে পারবে না কেন? জিৎ আমতা আমতা করে চিন্তা করে নিজের মনে মনে বলে আরে বাবা খোলামকুচিটি অবতল তায় প্লবতা পায় কিন্তু সে কী করে পাবে প্লবতা! এই শরীরে দুটি পায়ের পাতার তলায় কতটুকু পাবে প্লবতা! তখন সিক্স সেন্স তাকে নাড়া দিয়ে বলে, ‘কেন তোর প্রাণায়াম ও প্লবতার যুগল মিশ্রণের কৌশল আছে! আরে বাবা চেষ্টা করে দেখ না, চেষ্টা করে দেখতে দোষ কোথায়?’
জিৎ বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেখে তার বিবেক নাড়া দিয়ে অজানা ইতিহাস বলতে থাকে। তুমি কি জানো যে প্লবতার কী অসাধারণ, অবিস্মরনীয়, অত্যাশ্চর্য্য, ‘অবিশ্বাস্য বাস্তব’ ক্ষমতা! জিৎ হাঁ করে নিশ্চুপ আছে দেখে বলতে থাকে, তখনকারদিনে বিলাসবহুল প্রমোদতরী টাইটানিক জাহাজটির ওজন ছিল ৫২৩১০ টন ; দৈর্ঘ্য: ৮৮২ ফুট ৯ ইঞ্চি (২৬৯ মিঃ) ; বিম (প্রস্থ): ৯২ ফুট ৬ ইঞ্চি (২৮ মিঃ) ; জলে নিমজ্জিত, ৩৪ ফুট ৭ ইঞ্চি (১০.৫ মিঃ). কিলের গোড়া থেকে সেতুর শীর্ষ পর্যন্ত পরিমাপ করা হয়েছিল, ১০৪ ফুট (৩২ মিটার)। ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে (৫৫০০ কিলোমিটার) যাত্রা শুরু করে টাইটানিক। সে সময় টাইটানিকে মোট যাত্রী ছিল ২২০০ জন এবং কয়েকশ কর্মী। আটলান্টিক মহাসাগরে আরএমএস ১০ তলার টাইটানিকের মৃত্যুর তাৎক্ষণিক কারণ ছিল একটি আইসবার্গের সাথে সংঘর্ষ। এই হাজার হাজার, টন টন ওজনের জাহাজ জলে ভাসতে পারে কেবলমাত্র প্লবতার জন্য। যদিও জলের তলায় অনেক ফুট ডুবে থাকে তবুও বলব যার যেমন আয়তন ও ওজন তার তেমন প্লবতা। ভালো করে ভেবে দেখ, এক টন মানে এক হাজার কেজি। কাজেই ৫২৩১০ টন মানে ৫২৩১০x১০০০কেজি,অর্থাৎ (৫২৩১০০০০) পাঁচ কোটি তেইশ লাখ দশ হাজার কেজি ওজন ছিল টাইটানিকের। প্লবতা লম্বভাবে টাইটানিকের তলদেশে ঊর্ধ্বমুখী বল প্রয়োগ করে ভাসিয়ে রাখে। কাজেই প্লবতার কী অসাধারণ, অবিশ্বাস্য বাস্তব ক্ষমতা একবার গভীরভাবে ভেবে দেখ। একটি কথা মনে রাখতে হবে যে বায়ুর মতো তরল পদার্থও সর্বমুখী চাপ দেয়। আরো বলতে থাকে যে, সাইকেলে চেপে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না কিন্তু চালিয়ে যাওয়া যায়। আরও একবার গভীরভাবে ভাব। ছোটো ছোটো স্টেপে প্রাণায়ামের সাহায্যে মানে শ্বাস নেওয়ার চেয়ে শ্বাস ছাড়ার সময় বেশি করে জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে যেতে হবে। শুধু শুনলে বা পড়লে অবাস্তব বলে মনে হবে কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সুস্থ চিন্তাভাবনা করে স্লিম ফিগারের টীন এজ বয়সের তরুণ – তরুণীরা অভ্যাস করলে মনে হতে বাধ্য যে পুরোটাই বাস্তব।
তখন জিৎ নিজের মনে মনে বলে যে হ্যাঁ, নিশ্চয়, চেষ্টা করে দেখতে হবে। এইসব দেখে, শুনে, বুঝে ও চিন্তা-ভাবনা করে তার মনে হয়েছে তাহলে সে জলের ওপর দিয়ে দৌড়োতে পারবে না কেন? মনের প্রবল ইচ্ছাশক্তি, জেদ, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও সুচিন্তিত পরিকল্পনায় তার মনে জেগে ওঠে অদম্য কৌতূহল!
পরের দিন স্নানের ঘাটে এসে হাজির হয়। শ্বাস নেওয়ার থেকে শ্বাস ছাড়ার সময়টি বেশি করতে হবে। প্রাণায়ামের এই কৌশলটিই মুখ্য অস্ত্র। ডাঙা থেকে প্রথমে জলে নামার সময় প্লবতা পাওয়া যাবে না। কাজেই দ্রুত গতিবেগে পুকুরের জলের ওপর আলতো পা ছুঁইয়ে দৌড়ে যেতে হবে। এই সময় নিজের মনের ভাবনাটিকে করে রাখতে হবে ঊর্ধ্বমুখী। শুরু হয় তার জীবনের নয়া দৌড়। পরিকল্পনা মতো শ্বাস সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে খানিকটা দূর থেকে খুব জোরে ছুটে আট-দশ পা যেতেই ভারসাম্য হারিয়ে সাঁতার জলে পড়ে যায়। স্নানের ঘাট থেকে হাঁ করে তার খেলা দ্যাখে কয়েকজন। মনোজ-দা কখন এসেছে খেয়াল করেনি। সে বলে, “জিৎ ওঠে আয়!” জিৎ সাঁতার দিয়ে ওঠে আসে পুকুর পাড়ে। আবার একই ভাবে এক থেকে দুই পদক্ষেপে শ্বাস নিয়ে তিন-চার পদক্ষেপে ছাড়তে ছাড়তে জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে মাঝ পুকুর পেরিয়ে যায়। আবার একইভাবে অভ্যাস করতে করতে উপলব্ধি করে যে প্লবতার কী দারুণ ক্ষমতা এবং এর একটি বৃহৎ জগৎ আছে। প্রাণায়াম ও প্লবতার সাহায্যে জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনো সম্ভব, অতি অবশ্যই সম্ভব। একটি অন্যটির সম্পূর্ণ পরিপূরক। দু’টির মিলিত প্রয়োগে সৃষ্টি হয় শরীরের মধ্যে এক দারুণ অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা!
টীন এজ বয়সের স্লিম ফিগারের সব তরুণ – তরুণীরা প্রাণায়ামের সাহায্যে, (মানে শ্বাস নেওয়ার থেকে শ্বাস ছাড়ার সময় বেশি করে) এক হাঁটু জলের মধ্যে দিয়ে গভীর জলে কেমন হাঁটা যায়, একবার চেষ্টা করে দেখতে পার। জীবনের নয়া দিগন্ত খুলে যাবে!
জিৎ তখন প্রাণায়াম ও প্লবতার যুগল মিশ্রণের কৌশলটি অনেকটা আয়ত্ব করে ফেলেছে। দম ভরে শ্বাস নিয়ে কতক্ষণ জলে ডুবে থাকা যায় তার অভ্যাস করছে। এইরকম অভ্যাস করাকালীন একদিন মেজদা তার অলক্ষ্যে ডুবসাঁতারে এসে তাকে তালপুকুরের জলের মধ্যে পা ধরে টেনে ডুবিয়ে রাখল। সে প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও পরে বুঝতে পেরে নড়াচড়া বন্ধ করে চুপচাপ ডুবে রইল। জিতের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যেতেই বোধকরি মেজদা বিপদের আশঙ্কা করে ছেড়ে দিল জিতের পা। আর জিৎ সেই সুযোগে তার পা ধরে তাকে জলের মধ্যে গভীর জলে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। জিৎ বুঝতে পারছিল যে আর দম নেই মেজদার। অবস্থা যাতে বেশি বাড়াবাড়ি না হয় সেজন্যে তাকে ছেড়ে দিয়ে ডুব সাঁতারে যেতে লাগল অতবড়ো তালপুকুরের অপরপাড়ে। অতক্ষণ ডুব সাঁতার দিয়ে যাওয়া যায় সে নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। চুপিচুপি জল থেকে ওঠে তালপুকুরের পূর্বপাড় ধরে ঘুরে উত্তর পাড় হয়ে পশ্চিমপাড়ে গিয়ে ঝোপের আড়াল থেকে দেখতে লাগল তাদের ক্রিয়াকলাপ। তালপুকুরের পশ্চিম পাড়ে শবদাহ করা হয়। জিৎ বুঝতে পারল যে সেই শ্মশানের নিচে মেজদারা দু – তিন জন মিলে পাশের জোলোদলের মধ্যে খুব খোঁজাখুঁজি করছে তাকে। সামনের দুটি বড়ো বড়ো দাঁত বের করা অবস্থায় একগলা জলের মধ্যেও মেজদার মুখ দেখল শুকিয়ে কেমন চুপসে গেছে! তার মনে যে বিশাল সাইক্লোন বয়ে যাচ্ছে দেখে বুঝতে পেরে একটুপরে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল জিৎ। জিতের গায়ের রং একে তো কালো তার ওপর শুটকে চেহারা। গৌরবে শ্যামবর্ণ বলা যেতে পারে। সে চুপিচুপি শ্মশানের ওপর দাঁড়িয়ে সাদা দাঁত বের করে হেসেহেসে খনা গলায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী খুঁজছিস রে ওখানে?’ এই কিম্ভুতকিমাকার চেহারায় সাদা দাঁত বের করা অবস্থায় কালো মুখের খনা গলার কন্ঠস্বর শুনে বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে ভয়ে ও বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে ভূতের মতো দেখতে জিতের কালো হাসির দিকে তাকিয়ে রইল তারা!
সেদিনটি ছিল অরন্ধন। শ্রাবণ মাসের শেষ। পুরো তালপুকুরটি জলে টইটুম্বুর। এই সময়ে তালপুকুরের জলে ছিপ ও সুঁত ফেলে পুকুরের ভাগিদারদের কর্ণধার মাছ ধরার ছাড়পত্র দিত। জলের ওপরে বিভিন্ন ক্রীড়া কৌশল দেখে জিতকে তখন পাড়ার দু – চারজন কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে দেখতে আরম্ভ করেছে। বড়দা কটাক্ষ করে জিৎকে বলল, ‘যা-দেখি, কেমন পারিস! একেবারে তালপুকুরের মাঝে গিয়ে জলে ডুবে জলের নিচে পাঁক সরিয়ে পলিথিন বিছিয়ে তার ওপর সুঁতটি রেখে আয়!’ মাছধরার কাঁটার ওপর চারার মন্ড ভালো করে চেপে চেপে ধরে তিন – চারটি ওরকম বানিয়ে জিতের হাতে দিয়ে আদেশ করল। জিৎ সাঁতারে যাবে দেখে পাড়ার দু – চারজনও সুঁত নিয়ে যাবার জন্য অনুনয় করল। জিৎ মনে মনে বলল, যাচ্ছি যখন তখন নিয়ে যেতে অসুবিধা নেই, মুখে বলল, ‘পুকুরের মাঝখানে সে শুধু সুঁত ছেড়ে দিতে পারে।’ দেখল তাতেই তারা খুশি। নিজেদের সুঁতটিকে একটি পলিথিনের মধ্যে রেখে সুতো দিয়ে আলগা করে ফাঁস দিয়ে বেঁধে দিল বড়দা, জিৎকে দেখিয়ে মুখে বলল, ‘সুতোটি আলগা করে টান দিলেই ফাঁস খুলে যাবে, পলিথিন সমেত চারাগুলি রাখতে সুবিধা হবে যাতে একটুও পাঁক চারার খাবারের মধ্যে না আসে’। অতগুলি সুঁত সমেত নিজেদেরটি ডানহাতে নিয়ে তুলে ধরে সাঁতার কেটে যেতে লাগল। পুকুরের মাঝের একটু আগে আগু – পেছু করে ছেড়ে দিল ওদের সুঁতগুলি। বড়দা জোর করে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ‘আর একটু যা, আর একটু, হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে, ডুব দে।’ জিৎ দম ভরে শ্বাস নিয়ে তাদের সুঁতটি নিয়ে ডুব দিল। যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। স্থল যেন মনে হচ্ছে আজকে আরো বেশি নিচে। খানিকপরে স্থল ছুঁয়ে দেখল শুধু পাঁক আর পাঁক। যাইহোক সুঁতের দড়িটিকে দাঁতে চেপে ধরে দুহাত দিয়ে আরম্ভ করল পাঁক সরাতে। তারপর সেই স্থানে সুঁতের পলিথিনের সুতোটি খুলে ঠিক ভাবে রেখে যখন জলের ওপরে ওঠল আর দম নেই তখন। লম্বাকরে দম ভরে শ্বাস নিয়ে সাঁতারে ফিরে আসতে লাগল।
ভিজে প্যান্টটি ছেড়ে লুঙ্গি পরে স্নানের ঘাটে পা ঝুলিয়ে বসেছে জিৎ। খানিকপরে দেখতে পেল তাদের সুঁতটি খুব জোরে জোরে টান মারছে। পাড়ার দু – চারজন যারা ছিল তারা জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ‘ওই দ্যাখ, তোদের সুঁতে মাছ খেয়েছে!’ জিৎ চারদিকে তাকিয়ে দেখল, বড়দা নেই। কাজেই তাড়াতাড়ি করে গিয়ে তাদের সুঁতের দড়িটি ধরে টান মেরে নিয়ে আসতে লাগল ডাঙার দিকে। বুঝতে পারছিল দড়ির টানটি বেশ জোর লাগছে। সে আরো জোরে দড়িটি টেনে ডাঙায় তুলতেই একেবারে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল সকলের। দেখল তাদের সুঁতটির চারটি কাঁটার মধ্যে দুটি কাঁটায় দুটি বড়ো রুইমাছ গাঁথা আছে এবং তারা ডাঙায় লাফালাফি শুরু করেছে। তাদের সুঁতটির সঙ্গে লেগে আরো দুটি সুঁত চলে এসেছে। পাশে যারা ছিল তারা বলল, ‘এখন মাছের মুখ থেকে কাঁটা যেন না খোলা হয়!’ বুঝতে পারল কথাটি সকলে ঠিক বলেছে। যাতে কারো মনে সন্দেহ না থাকে তাই দু – চারজন সবাই মিলে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখে নিয়ে মাছের মুখ থেকে খোলা হলো কাঁটা।
একদিন কথায় কথায় মনোজদা বলল, ‘ পুকুরের মাঝে গভীর তলদেশে যেখানে জাট পোঁতা আছে সেখানে বড়ো বড়ো মাছেরা খেলা করে। ওখান থেকে অনেকে খালি হাতে মাছ ধরে আনতে পারে। বিষয়টি জিতের একেবারে কানে ঢুকে গেঁথে গেল মনে ও মাথায়। সাঁতারে গিয়ে দম ভর্তি করে শ্বাস নিয়ে মারল টেনে ডুব। জাট ধরে ধরে নিচে নেমে দেখল যে সত্যিই অনেক বড়ো বড়ো মাছ খেলা করছে সেখানে। তা দেখে তার তো বেশ আনন্দই হচ্ছিল। সে মাছের গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আদর করতে লাগল। দেখল তারা বেশ আদর খেতে খেতে বড়ো বড়ো চোখ করে আড় চোখে দেখছে জিৎকে। জিৎ বেশ পরখ করে দেখছিল মাছগুলি কেমন হা করে মুখে জল নিয়ে মুখের ভিতরে ফুলকার সাহায্যে মুখ বন্ধ করে জল বের করে শ্বাস ছেড়ে চালাচ্ছে শ্বাসকার্য। তা দেখে জিতও একঘোট জল মুখে নিয়ে মাছের মতো করে গলায় চালান করে দিয়ে মুখ বন্ধ করে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে নাক দিয়ে জল বের করার চেষ্টা করল। মনে হল যেন জল পেটে যায়নি। এরকম অনেক বার করল। বুঝতে পারল যেন অক্সিজেন পাচ্ছে। শ্বাসের ঘাটতি যেন কমতে শুরু করেছে। মনে মনে মনকে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে কি মাছের মতো তার গলাতেও ফুলকা আছে?’ হঠাৎ দেখল কেমন যেন আন্দোলিত হচ্ছে জল। মাছগুলি সব দ্রুতবেগে চলে গেল। আরো দেখল কে একজন হাত – পা নেড়ে সাঁতার কেটে চলে গেল! ভূত দেখার মতো মনে হলো তার! ভাবল, এখানে জলভূত আছে নাকি! ভাবতেই তার মনে জেগে গেল শিহরণ। কিন্তু জিতের মন ভয় – ডর হীন। কাজেই এসবে তার কিছুই যায় আসে না। কিছুক্ষণ পরে আবার মাছেরা এক এক করে ফিরে আসতে লাগল। আবার মাছের গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আদর করতে লাগল। যাইহোক পৃথিবীর সব প্রাণীই যে আদর খেতে ভালোবাসে সেটি আরো একবার বুঝতে পারল। কোনো মাছ কিন্তু তাদের মাথার কাছে আঙুল নিয়ে যেতে দিচ্ছে না। অনেক আদর করার পর একটি বড়ো মাছের মাথা ঝাপটে ধরল ডান হাতের মুঠোর মধ্যে। যাক তাহলে সত্যিই খালি হাতে একেবারে পুকুরের গভীর জলের কেন্দ্রে ধরা যায় মাছ। এই ভেবে মনটা আনন্দে ও গরবে ভরে গেল। জিৎ উপর দিকে ওঠতে লাগল। মাছটির নড়াচড়া নেই দেখে জিৎ একটু আলগা করে ধরে জলের ওপরে ওঠে তার বীরত্বের পরিচয় দিয়ে সবাইকে দেখাবে বলে মাছ সমেত ডানহাতটি ওপরদিকে তুলতে যাবে এমন সময় খুব জোরে তার হাত ঝটকিয়ে মাছটি অদৃশ্য হয়ে গেল পুকুরের জলের মধ্যে। জিৎ হতবাক হয়ে ভাবতে লাগল, ’বেটা মাছটি তার কৌশলটি আয়ত্ত করল কীভাবে?’ পাড়ে উঠে এসে নিজের পেট পরীক্ষা করে দেখল যে একটুও জল পেটে যায়নি। তার মানে মাছের মতো জিৎও ফুলকার সাহায্যে জলের মধ্যে শ্বাসকার্য চালাতে পারে! জিৎ তার নিজের গলার ভিতরে আঙুল গলিয়ে স্পর্শ করে বুঝতে পারল যে একেবারে গলার শেষ প্রান্তে মাছের ফুলকার মতো তার গলাতেও ফুলকার মতো লাগছে। এটি ব্যতিক্রম বলেই মনে হলো। হঠাৎ দেখল, মনোজদা হা করে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে!
সবিনয়ে জিজ্ঞেস করল জিৎ, ‘এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেনো মনোজদা ?’
মনোজদা হতচকিত হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘ তুই অতক্ষণ শ্বাস না নিয়ে জলের মধ্যে ডুবে ছিলি কী করে?’
তা কতক্ষণ হবে!
ঘড়ি তো নাই! তবে, তুই জলে ডুব দেবার পর ওপরে উঠছিস না দেখে শোনেকে পাঠালাম। এখান থেকে সাঁতরে মাঝপুকুর পর্যন্ত যেতে সময় লাগবে প্রায় পাঁচ মিনিট! শোনে ওখানে গিয়ে ডুব দিয়ে তোকে খোঁজার চেষ্টা করেও তোকে খুঁজে পায়নি! তারপর সে সাঁতারে স্নানের ঘাটে ফিরে এসেছে তখনও তুই জলের ভিতরে! মানে কমপক্ষে পনেরো মিনিট তো হবেই!
ও, তাহলে আমি যাকে জলভূত বলে মনে করেছিলাম আসলে সে শোনে ছিল!
জলভূত!
আসলে আমি যখন একটি মাছকে ধরার জন্যে তার গায়ে হাত বোলাচ্ছিলাম ঠিক সেই সময় কে একজন জলের ভিতরে সাঁতার কেটে হাত পা নেড়ে পেরিয়ে গেল দেখলাম। আমার তাকে জলভূত বলে মনে হয়েছিল। এখন বুঝলাম সেই জলভূত ছিল শোনে। মাছেরা যখন ফুলকার সাহায্যে শ্বাসকার্য চালাচ্ছিল তা দেখে আমিও মাছেদের মতো মুখে জল নিয়ে ঘিটে কান ও নাক দিয়ে জল বের করে শ্বাসকার্য চালাবার চেষ্টা করছিলাম। আমার মনে হয়েছে মাছেদের মতো আমার গলায়ও ফুলকা আছে। কারণ পেটে জল যায়নি এমনকি শ্বাসের ঘাটতি অনেক কম হয়েছে আমি বুঝতে পেরেছি!
শোনে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘ আমি জলের ওপরে ভুড়ভুড়ি দেখে আমি ডুব দিয়ে তোকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু খুঁজে পায়নি!
****
প্রায় চোদ্দো বছর পরের ঘটনা। ধর্মতলার কাছে চাকরি করে একটি কোম্পানিতে জিৎ। জীবন সংগ্রামে চলার পথে বাধা, বিঘ্ন, দুর্যোগ ও বিপর্যয়ে জর্জরিত হয়ে একরকম ভেঙে পড়ে তার শরীর। অফিসের এক কলিগকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যায় পুরী। নীল দিগন্ত রেখায় শুধু জল আর জল। প্রথম দুদিন ভোরবেলা উঠে সমুদ্রের তীরে বেড়াতেই একরকম চাঙ্গা হয়ে যায় তার শরীর। মনের মধ্যে উপলব্ধি করে অন্য এক উদ্যম। বেলা বাড়তেই জিৎ স্নান করতে যায়। লক্ষ করে সমুদ্রের ঢেউগুলি সব আসছে তীরের দিকে। মনে মনে ভাবে তাহলে তো সমুদ্রে হারাবার কিছু নেই! ডুবে যাওয়ার ভয় নেই! শুনেছে কিছুটা জলে নেমে কাত হয়ে সামলাতে হয় ঢেউগুলিকে। এ-আর এমন কী! পুকুরের জলে নেমে আগের অভ্যাসমতো দু’হাতে করে এক গণ্ডূষ জল নিয়ে মুখে দিতেই অনুভব করে যে জল নোনতা। নিজের মনে মনেই বলে, ‘নোনতা কেন? নোনতা কেন?’ সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে যায় যে, সমুদ্রের জল নোনতা মানে ঘনত্ব বেশি, ঘনত্ব বেশি মানে প্লবতা বেশি, প্লবতা বেশি মানে তরলের ঊর্ধ্বমুখী ঘাত বেশি, আর তরলের ঊর্ধ্বমুখী ঘাত বেশি মানে সেই তরলের ওপর কোনো বস্তুকে ভাসাতে, নিজে ভাসতে, সাঁতার কাটতে, শবাসনে শুয়ে বিশ্রাম নিতে, এমনকি ঘুমোতেও সুবিধে হয়, সুবিধে হয় মৎসাসন করতে। একে একে তার সব মনে পড়ে। মনে পড়ে প্রাণায়াম ও প্লবতার যুগল মিশ্রণে সেই তালপুকুরে গভীর সাঁতার জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনোর এক অসামান্য দক্ষতার কৌশল।
জিৎ তীরে ওঠে আসে। লক্ষ করে মাঝে মাঝে কয়েকটি দুরন্ত ঢেউ এসে আছড়ে ফেলছে স্নানরত ভ্রমণকারীদের। একটি ঢেউ তীরে এসে যখন ফিরে যায় তখন আগত ঢেউয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে নীল জলরাশি ভেঙ্গে পরিণত হয় সাদা ফেনায়। সে ভাবে সামনের ঢেউ গুলিকে অতিক্রম করে গেলেই ওদিকের আর কোনও চিন্তা নেই। যতদূর পারে সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে যাবে তারপর একসময় জলের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়বে প্রাণায়ামের সাহায্যে। সমুদ্রের জলের ঢেউ যখন তীরের দিকে আসে তখন ঢেউয়ে ভেসে ফিরে আসবে তীরে আপনাআপনি। চিন্তা মতো দেবাদিদেব-মহাদেবকে ‘ওম নমঃ শিবায়’ বলে একবার স্মরণ করতেই কল্পনার মানস-চোখে এক অন্তর্যামী দেবী হাত তুলে আশীর্বাদ করে দেখা দিয়েই কেমন যেন বিলীন হয়ে গেলেন! তাঁর শ্রীচরণে শতকোটি প্রণাম নিবেদন করে সে তার মনের অন্তস্তল থেকে প্রার্থনা করে বলে, ‘আমার মনোবাসনা পূর্ণ কর মা!’
জিৎ সমুদ্রতীর থেকে নিশ্বাস ছেড়ে দৌড়ে প্রথম ঢেউয়ের কাছে যেতেই দুরন্ত ঢেউয়ে বেসামাল হয়ে জলে পড়ে যায়, তারপর তিন-পাক খাইয়ে আছড়ে তীরে ছুড়ে যেন বলে, ‘ভাগ এখান থেকে!’ সেও নাছোড়বান্দা! এত সহজে সে ছাড়ার পাত্র নয়, এর শেষ সে দেখে ছাড়বে! তাকে এত সহজে দমন করে কার সাধ্য!
তীরে ফিরে এসে চিন্তা করে যে ঢেউ ভাঙার আগেই তাকে অতিক্রম করে যেতে হবে। কয়েকটি ঢেউ দেখে মনে মনে সময়টি ঠিক করে নেয়। তারপর সময় বুঝে সমুদ্রতীর থেকে আবার দৌড়ে সমস্ত ঢেউগুলিকে অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। সমুদ্রতীর থেকে গেল গেল রব উঠে আসে। সে প্রাণায়ামের সাহায্যে দু’ স্টেপে শ্বাস নিয়ে চার স্টেপে ছাড়তে ছাড়তে সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে চলে। দু’টি ডলফিন তার সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকে সাঁতারে চলে। সে গতিবেগ কমিয়ে দিতেই ডলফিন-দু’টি কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে তাকে দেখতে না পেয়ে জলের ওপর ওঠে ডানা নেড়ে একরকম শব্দ করে ডাকে! মানে ডলফিন-দু’টি তাদের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে যেতে বলে। দু’জন সঙ্গী আছে জেনে জিতের মনে খুব আনন্দ হয়! সে আবার জোরে দৌড়োয়। তার বেশ মজা লাগে। অনুভব করে যে প্রাণায়ামের সাহায্যে সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনো কত সহজ। সমুদ্রের জলের ঘনত্ব অনেক বেশি হওয়ায় দৌড়োনোর সময় পায়ের পাতার তলায় প্লবতা স্প্রিংয়ের মতো এমন ভাবে টোকা মেরে ঊর্ধ্বমুখী বল বা ঘাত প্রয়োগ করে যে তাতে মনের মধ্যে অতিরিক্ত বলের সঞ্চার হয়, দৌড়োতে খুব সুবিধে হয়, শক্তি অনেক কম নষ্ট হয়, দৌড়োনোর সময় গতিবেগ বাড়ে, ক্ষিপ্রতা বাড়ে, ফলে অনেকক্ষণ দৌড়োনোর ক্ষমতা বজায় থাকে। মাঠে দৌড়োনোর সময় ঘর্ষণ বলের বাধা প্রদানের জন্যে অনেক বেশি পরিশ্রম হয়। ফলে নষ্ট হয় অনেক বেশি শক্তি। প্রাণায়ামের সাহায্যে সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়োলে কোন ঘর্ষণ বল বাধা প্রদান করে না বললেই মনে হয়! অনেক বেশি শক্তিও নষ্ট হয় না। এইসময় তার মনে অফুরন্ত প্রাণ-শক্তির সঞ্চার হয়। সে ভাবে দৌড়ে সমুদ্র পেরিয়ে যেতে পারে! হঠাৎ খেয়াল হয় যে সমুদ্রের জলের স্রোত মাঝ সমুদ্রের দিকে যায়! সে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে চিন্তা করেছিল এক আর বাস্তবে হল আর এক! সে মনে মনে ভাবে, ভুল দেখছে না তো! তার মাথায় যেন বাজ পড়ে! সে জলের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু একি! প্লবতা ও প্রবল স্রোতের টান এত বেশি যে জলের স্রোতে সে শোলার মতো মাঝ-সমুদ্রের দিকে তীব্র গতিবেগে ভেসে যেতে থাকে! সাঁতারে তীরে ফিরে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু তার গতিবেগের চেয়ে স্রোতের গতিবেগ অনেক বেশি। তার মনে পড়ে, নৌকাকে স্রোতের প্রতিকূলে বিপরীত অভিমুখে বেয়ে তীরে ফিরে আসতে হলে স্রোতের গতিবেগের চেয়ে বেশি করতে হবে নৌকার গতিবেগ। দুটির গতিবেগ সমান হলে নৌকা যেখানে আছে সেখানেই থাকবে। আর স্রোতের গতিবেগ নৌকার গতিবেগের চেয়ে বেশি হলে নৌকা কোনোদিনই তীরে ফিরে আসতে পারবে না বরং ক্রমশ মাঝ সমুদ্রের দিকে পিছিয়ে যেতে থাকবে। ভাবে, ডুব সাঁতারে ফিরে যাবে! কিন্তু সমুদ্রে ডুব দেওয়া সহজ কথা নয়! শ্বাস ছেড়ে ডুব দিতেই পারে না। দম ভর্তি করে পুরো শ্বাস নিয়ে সমুদ্রে ডুব দিয়ে দেখে যে ভিতরে স্রোত আরও বেশি। ডুব দিতেই সমুদ্রের জলের স্রোত তাকে কুন্ডলি পাকিয়ে পাক খাইয়ে খাইয়ে দ্রুতবেগে টেনে নিয়ে চলে মাঝ-সমুদ্রের দিকে। কিংক্তব্যবিমূঢ় হয়ে শ্বাস ছেড়ে জলের ওপরে ওঠে সে সামনে দেখে শুধু জল আর জল। সে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে। পিছন ফিরে দেখতে পায় অনেক দূরে কয়েকটি বাড়ির মাথা। বুঝতে পারে তীর অনেক দূরে। সে এত বড়ো বিপদ থেকে কী করে নিজেকে রক্ষা করে বুঝতে পারে না! জিৎ দেখেছে যে বিপদের সময়ে তার বিবেক হঠাৎ হঠাৎ উবে যায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে, কিন্তু কী যেন কী এক অজ্ঞাত-কারণে সেই সময়ে অনুভব করে ঠিক আছে। অদেখা, অজানা, অচেনা আশঙ্কায় ভয় পায়! হঠাৎ বিবেক বলে উঠে, ‘বিপদের সময়ে সুফল পাওয়া যায় মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ করলে, মন শক্ত করে ইষ্ট-দেবতাকে স্মরণ করে সাঁতারে সমুদ্রের তীরের দিকে ফিরে যা!’ সে তায় করে। চোখ বুজে মা অন্তর্যামী দেবীকে স্মরণ করে তার প্রাণশক্তি উজাড় করে ফিরে আসার চেষ্টা করে তীরের দিকে। খানিকটা আসার পর হঠাৎ দেখে স্রোতটি আর নেই! বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সামনে তাকিয়ে দেখে প্রায় দশ-বারো গজ দূরে এক প্রকাণ্ড হাঙর তার পথ আগলে আছে। শুধু দেখা যায় তার পিঠের ফিনটি। বোঝা গেল যে পুরো স্রোতটি তার গায়ে ধাক্কা লেগে আটকে আছে। স্রোত বিহীন সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে সাঁতার কাটা কত সহজ। আবার স্রোতের অনুকুলে সাঁতার কাটা আরো সহজ। সমুদ্রে সাঁতার কাটার থেকেও জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনো আরও সহজ। সে সাঁতারে গিয়ে তার পিঠের ফিনটি ধরে তার ওপর শুয়ে বিশ্রাম নেয়। ভাবে আর একটু বিশ্রাম নিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে আবার প্রাণায়ামের সাহায্যে দৌড়ে ফিরে যাবে তীরে। লম্বা লম্বা করে কয়েকটি শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়। এমন সময় হাঙরটি হঠাৎ জলে ডুবে অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার সেই তীব্র স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কেটে তীরে ফিরে আসার আপ্রাণ প্রয়াস। সমুদ্রতীর থেকে ভেসে আসে কণ্ঠস্বর, ‘আর একটু এস, আর একটু এস।’ আজ তার চরম পরীক্ষা, এই পরীক্ষায় তাকে জিততেই হবে, – এই তার পণ। তার শরীর অসাড় হয়ে আসে, প্রাণশক্তি যেন শেষ। শেষ অস্ত্র হিসাবে তার অবচেতন মনের হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে করুণ স্বরে বেরিয়ে আসে, “হে মা অন্তর্যামী! আমায় বাঁচাও মা! আমায় রক্ষা কর মা! আমায় ক্ষমা কর মা!” এমন সময়ে কে যেন তার কানে কানে বলে উঠেন, “এই তো এসে গেছিস, এই তো এসে গেছিস।” সে যেন মনে সাহস পায়, মিনতি করে বলে, “আমায় একটু টেনে তুল না মা হাত ধরে।” অন্তর্যামী মা তেমনি ফিস ফিস করে তার কানে কানে বলেন, যে তাঁরা কাউকে হাত ধরে টেনে তোলেন না বিপদ থেকে। হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে ডাকলে সাহায্য করে মাত্র। জিৎ চোখ বুজে সাঁতারে ফিরে আসতে আসতে বলে, “আমি আর পারছি না মা!” মা বলেন, “ওরে পাগল, আমি তো তোর সাথে আছি, তোর ভয় কি! আর একটু এগিয়ে চল, আর একটু এগিয়ে চল, তোর সাথে কত লোক আছে, একবার সামনে তাকিয়ে দেখ! কত লোক তোর জন্যে অপেক্ষা করছে। আরও জোরে হাতদুটোকে নাড়া, আরও জোরে, আরও জোরে, এইতো এসে গেছিস, এইতো এসে গেছিস, ব্যস, ব্যস, পা নামিয়ে দেখ, এসে গেছিস।” জিৎ পা নামাতেই মাটির স্পর্শ পায় এবং সম্বিত ফিরে পায়। অন্তর্যামী মা এক পলকে তাকে দেখা দিয়েই চলে গেলেন। সেখানে তার একগলা জল আর ঠিক তার পর থেকেই সৃষ্টি হয় সমুদ্রের ঢেউগুলি। সেখানে সে দাঁড়িয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। তার বুক অসম্ভব ধড়পড় করে। হাঁ করে নির্মল তাজা শ্বাস নেয়। তারপর আস্তে আস্তে ফিরে আসে তীরে।
ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ এক সুন্দরী তন্বী তরুণী সামনে এসে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলে, “আপনাকে আমার ঠাকুমা একবার ডাকছেন!”
জিৎ একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় আপনার ঠাকুমা? কেন ডাকছেন?”
তরুণী অস্ফুষ্ট স্বরে অদূরে তর্জনী তুলে দেখিয়ে বলে, “ওই যে বসে আছেন, হাঁটুতে ব্যথা, আসতে পারছেন না তায়! কেন ডাকছেন জানিনা!”
ফর্সা, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা, দীর্ঘাঙ্গী তরুণীর পরনে গোলাপীর ওপর নীল ডোরাকাটা সালোয়ার কামিজ, নীল ওড়নাটি বাম কাঁধ থেকে বুক হয়ে ডান হাতের ভাঁজ করা কনুয়ের ওপর ঝোলানো। সমুদ্রের নির্মল বাতাস তার ঘন, কালো, লম্বা, এলোকেশী খোলা চুলে খেলা করতে ব্যস্ত! দুই চোখের ওপরে হালকা ঘন ভ্রু, দুই ভ্রুর মাঝখানে গোলাপী গোল টিপ। টানা টানা দুই চোখের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসেছে টিকালো নাক। দুই কানে সোনার ঝুমকোর দুল। টুসটুসে রসে ভরা গোলাপী রঙের অধর পল্লব দুটির ভিতরে সারিবদ্ধভাবে সাজানো দুই সাদা দন্তের মালা। পায়ে ডিজাইন করা মানানসই হিল জুতো। এহেন আধুনিকা, শৌখিন বিশিষ্টা, সুন্দরী তরুণীর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে থাকা যায়! যেন ভরা শ্রাবণে উন্মত্ত কল্লোলিনী শিলাবতী মিলনের নেশায় তার দুই কূল প্লাবিত করে কুলু কুলু শব্দে ছুটে চলেছে সমুদ্র-সঙ্গমে।
সাদা ধবধবে নতুন থান পরিহিতা, শুভ্র পক্ককেশ বিশিষ্টা, ফর্সা টকটকে গায়ের রঙে বিভূষিতা, নগ্ন পায়ে তপ্ত বালির ওপর বসে আছেন ঠাকুমা। নমস্কার করে, পরিচয় দিয়ে, কাছে যেতেই তিনি বলতে শুরু করলেন, “তোমার এই সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে অসাধারণ দৌড়োনোর দক্ষতা দেখে আমি বিস্ময়ে হতবাক! অবিশ্বাস্য, আমি জন্ম – জন্মান্তরেও ভুলব না! আজ যা দেখলাম তা আমার স্বপ্নেরও অতীত! এ-তো সাধারণ মানুষের কর্ম নয় বাবা,” বলেই তিনি জিৎ – এর দু’পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন! জিৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে ওঠে, “একি করছেন ঠাকুমা! আমারও ঠাকুমা আছেন! তিনিও আপনার বয়সীই হবেন!” বলে, জিৎ তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। তারপর বলতে শুরু করে, “এই জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনোর কাজটি শুরু করেছিল সে যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ত। অনেক কষ্টে দৌড়োনোর কাজটি সম্পন্ন করার পর তার মনে হয়েছিল যে, সে যখন এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করতে পেরেছে তখন পৃথিবীর অনেকেই এই কাজটি করতে পারবে, কাজেই এ-নিয়ে সে আর মাথা ঘামায়নি। “
জিৎ আরও বলে, “সে তো ভুলেই গিয়েছিল জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনোর কথা! সমুদ্রের জলে নেমে এক গণ্ডুষ জল মুখে নিয়ে নোনতা অনুভব করতেই পুরোনো দিনের সব ঘটনা তরতর করে মনে পড়ে যায়! এটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত। প্রাণায়াম ও প্লবতার যুগল মিশ্রণে এই অবিশ্বাস্য বাস্তব কাজটি করা সম্ভব হয়,” বলে, নমস্কার করে, ফিরে আসতে উদ্যত হতেই সঙ্গে সঙ্গে এক ফটো-গ্রাফর ও দুটি ছেলে তার সামনে হাজির। তারা বলে যে এত বড়ো একটা ভালো কাজ করলেন, তাদের আগে থেকে জানা থাকলে পুরো ভিডিওটি তোলার ব্যবস্থা করত। খানিকটা তোলা হয়েছে অবশ্য। তাদের একজনের হাতে একটি ‘শিবলিঙ্গ’ অপরজনের হাতে এক ঘটি জল। ফটোগ্রাফর জিৎকে একটু ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে পরিষ্কার বালির ওপর শিবলিঙ্গটি স্থাপন করে বলে, “অত্যন্ত আনন্দ চিত্তে, শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে, ‘ওম নমঃ শিবায়’, ‘ওম নমঃ শিবায়,’ বলতে বলতে শিব-ঠাকুরের মাথায় জল ঢালুন।” সে তায় করে। পরবর্তীকালে এই ভিডিওর খানিক অংশ দেখানো হয় কুমারটুলি পার্কে দুর্গা পূজোর সময়ে। দুর্ভাগ্যবশত এই ভিডিওটি সে সংগ্রহ করতে পারেনি মূলত অর্থনৈতিক কারণে। পরে শোনা যায় যে ওড়িশা সরকার মূল ভিডিও ক্লিপটি ব্যান করে দেয়।
জিৎ নিজে দৌড়ে ও দেখে বুঝেছে যে প্রাণায়ামের সাহায্যে মাঠে দৌড়োনোর চেয়ে সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনো কত সহজ। আবার সাঁতার কেটে ইংলিশ চ্যানেল পার হওযার চেয়ে সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়া আরো অনেক বেশি সহজ! শুধু শ্বাস নেওয়ার চেয়ে শ্বাস ছাড়ার সময় বেশি করতে হবে। দুই বা তিন স্টেপে শ্বাস নিয়ে চার বা পাঁচ স্টেপে ছাড়তে ছাড়তে দৌড়োতে হবে এবং দৌড়োনোর সময় দুটি পায়ের মধ্যে দূরত্ব এক ফুট থেকে দেড় ফুটের কম হলেই প্রাণায়াম ও প্লবতার সাহায্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনো যাবে!
প্রাণায়াম আর বিশ্ববিখ্যাত গ্রীক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের নীতি ও প্লবতার সাহায্যে অনেক ব্যক্তি ইংলিশ চ্যানেল দৌড়ে পার হতে পারবে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলি অবলম্বন করলে। প্রাণায়াম ও প্লবতা একটি অন্যটির সম্পূর্ণ পরিপূরক। দু’টির যুগল মিশ্রণে সৃষ্টি হয় শরীরের মধ্যে এক দারুণ অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা! আর এই অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার বলেই গভীর সাঁতার জলে এক হাঁটু জলের মধ্যে দিয়ে হাঁটা যায়, শবাসনে শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া যায়, ঘুমানো যায়, মৎসাসন করা যায়, সবশেষে জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনো যায়। ইংল্যান্ডের ‘ডোভার’ (DOVER) থেকে ফ্রান্সের ‘কেপ গ্রিস নেজ’ (CAP GRIS NEZ) এর দূরত্ব চৌত্রিশ কিলোমিটার বা একুশ মাইল। যেটি ইংলিশ চ্যানেল নামে পরিচিত। যাঁরা অ্যাথলেটিক্স (ATHLETICS), যাঁরা ম্যারাথন রেস(MARATHON RACE) বা দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করেন, যাঁরা ইংলিশ চ্যানেল সাঁতারে পার হয়েছেন, যাঁরা ইংলিশ চ্যানেল সাঁতারে পার হওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছেন, যাঁরা নিয়মিত দৌড়োন, নিয়মিত জগিং করেন, যাঁদের বয়স অল্প, ওজন কম তাঁদের সকলকে সবিনয়ে বলি, আপনারা একবার চেষ্টা করে দেখুন যে, ইংলিশ চ্যানেল দৌড়ে পার হওয়া যায় কিনা! আমি বলছি সম্ভব। অতি অবশ্যই সম্ভব। ঘণ্টায় এগারো কিলোমিটার বেগে দৌড়োলে তিন থেকে সওয়া তিন ঘণ্টার বেশি সময় লাগা উচিত নয়। আরও জোরে দৌড়োলে সময় কম লাগবে। তাহলে শুরু করা যাক নয়া দৌড়!
১। নিজের মনের জেদ, আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা, পরিশ্রম, কঠোর অনুশীলন ও অধ্যবসায় একান্ত জরুরী।
২। অল্প বয়স ও স্লিম ফিগার হতে হবে, বেশি মোটা হলে বা ওজন বেশি হলে চলবে না।
৩। আর্কিমিডিসের নীতি ও প্লবতা (ARCHIMEDES’ PRINCIPLE AND BUOYANCY) খুব ভালো করে জানতে হবে।
৪। শ্বাস নেওয়ার চেয়ে শ্বাস ছাড়ার সময় বেশি করতে হবে, যাকে এক কথায় বলে প্রাণায়াম। (Exhaling should be done more than inhaling which is called pranayama in a word.)
৫। সাঁতার খুব ভালো করে জানতে হবে। প্রাণায়ামের সাহায্যে রোজ পুকুরের জলের ওপর শবাসনে শুয়ে বিশ্রাম নিতে হবে।
৬। প্রাণায়ামের সাহায্যে রোজ বড়ো ও গভীর-জলের পুকুরের ওপর দিয়ে অথবা নদীর জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনো অভ্যাস করতে হবে।
৭। প্রাণায়ামের সাহায্যে রোজ মাঠে দৌড়োতে হবে।
৮। জলের ওপর দিয়ে দৌড়ানোর সময় দুটি পায়ের মধ্যে দূরত্ব এক ফুট থেকে দেড় ফুটের কম হলেই ভালো হয়।
প্রাণায়ামের সাহায্যে মাঠে দৌড়োনোর চেয়ে সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনো অনেক বেশি সহজ আবার ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার কেটে পার হওয়ার চেয়ে দৌড়ে পার হওয়া আরো অনেক বেশি সহজ!
কারণঃ-
১। মাঠে দৌড়োনোর সময় ঘর্ষণ বলের বাধা প্রদানের জন্যে অনেক বেশি পরিশ্রম হয়। ফলে শক্তি অনেক বেশি নষ্ট হয়। প্রাণায়ামের সাহায্যে সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়োলে কোনো ঘর্ষণ বল বাধা প্রদান করে না বলেই মনে হয়! বরং সমুদ্রের জলের ঘনত্ব অনেক বেশি হওয়ায় দৌড়োনোর সময় পায়ের পাতার তলায় প্লবতা এমন ভাবে স্প্রিংয়ের মতো টোকা মেরে ঊর্ধ্বমুখী বল বা ঘাত প্রয়োগ করে যে তাতে মনের মধ্যে অতিরিক্ত বলের সঞ্চার হয়, দৌড়োতে খুব সুবিধে হয়, শক্তি অনেক কম নষ্ট হয়, দৌড়োনোর সময় গতিবেগ বেড়ে যায়, ক্ষিপ্রতা বেড়ে যায়, ফলে অনেকক্ষণ দৌড়োনোর ক্ষমতা বজায় থাকে।
২। মাঠ উঁচু নিচু থাকলে দৌড়োনোর সময় গোড়ালিতে চোট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে দৌড়োলে কোনো চোট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
উপরোক্ত পদ্ধতিগুলি অবলম্বন করে নয়া দৌড়ের মাধ্যমে ইংলিশ চ্যানেল দৌড়ে পার হতে পারলে সারা পৃথিবীতে নয়া দিগন্ত খুলে যাবে বলে তার মনে হয়!
তাহলে শুরু করা যাক নয়া দৌড়!
আমি জিৎ অনেক বছর ধরে সেই আগত সুদিনের দিকে তাকিয়ে আছি।
_________
ঠিকানা:
শুভংকর নিয়োগী, 6G/1B, গোপাল চন্দ্র বোস লেন, কলকাতা- ৭০০০৫০, মোবাইল নং. +৯১ ৯৮৭৪৬১২৭০৪, E mail : subhankarn61@gmail.com
গ্রামের ঠিকানা:- (যেখানে প্র্যাকটিস করেছি।)
গ্রাম +পোস্ট – কাদড়া,
ভায়া – বদনগঞ্জ,
থানা – গড়বেতা।
জেলা – মেদিনীপুর, অধুনা – পশ্চিম মেদিনীপুর।
বর্তমান বয়স : ৬৩ বছর।
মোবাইল নং -+৯১ ৯৮৭৪৬১২৭০৪

Comment