শিরোনাম ঃ প্ল্যানচেট
কলমে ঃ শাঁওলী সরকার
(এটা একদম সত্যি ঘটনা )
ঘটনা বহুদিন আগেকার ঘটনা |তখন বার্ষিক পরীক্ষা ডিসেম্বর মাসে শেষ হলেই অফুরন্ত অবসর সময় | চুটিয়ে গল্পের বইপড়া , খেলাধুলো , হইহুল্লোড় করা আর ঠাকুমা , ছোটো পিসির কাছে তাদের দ্যাশের (দেশ)(বাংলাদেশের) নানা গল্প শোনা | সেইসময় এই ছুটিতে আমার কাকারা পরিবার সমেত বাড়ি ফিরতেন| সব ভাই বোন মিলে আমরা চুটিয়ে মজা করতাম |তবে আরেকজনের কাছে আমরা নানা ভৌতিক গল্প শুনতাম গভীর মনোযোগ সহকারে| তিনি হলেন পদা জেঠু |দেখতে অনেকটা গোপাল ভাড়ের মতন ,গায়ের রঙটা মিশকালো ,প্রকান্ড ভুড়ি ,হাসলে পড়ে সাদা দাঁত গুলো আর চোখের মনি চকচক করত | অন্ধকারে তাকে আমি কখনই খুঁজে পেতাম না | তার বিশেষত্ব ছিল তিনি ঝাঁড়ফুক করতে পারতেন __ভুত ঝাড়তে পারতেন | এককথায় যাকে ওঝা বলে! তার বাড়ি আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল | তিনি আমার ঠাকুমার বান্ধবীর ভাস্তা ছিলেন |
তারা সকলেই বাংলাদেশ থেকে আগত | আমার ঠাকুমার ন্যায় তিনিও বাঙ্গাল ভাষায় কথা কইতেন | মশলার ব্যবসা করতেন হাটে | তিনি প্রায় প্রতিদিন আমাদের বাড়িতে এসে ঠাকুমার সাথে গল্প করতেন মনের ঝোলা খুলে | তিনি এলে আমার মায়ের কাজ বেড়ে যেত| একটু পর পর হেঁড়ে গলায় হাঁক মারতেন ,ও বড়বৌমা এক বাটি মুড়ি একখান চা দ্যাও দেহি (দাও) নি ! আমার মা সবকাজ ফেলে তাকে চা এনে দিতেন | এভাবেই চলত আমাদের দিন |
সেবার বাবারা পাঁচ ভাই একত্রে হলেন| সবচেয়ে শেষে এলেন ছোটোকাকু যাকে আমি লালকাকু বলে ডাকি তিনি এলেন | তিনি তখনও বিয়ে করেন নি |তিনি একটু ফুরফুরে মেজাজেই থাকতেন | মাঝে মাঝে তার মাথায় উদ্ভট উদ্ভট খেয়াল চাপতো|তেমনি একটা খেয়াল ছিল প্ল্যানচেট করার | কিন্তু ,বাদ সাধলেন আমার বাবা |
সব শুনে তিনি নাকচ করে দিলেন|
এবার কাকু গিয়ে ধরলেন পদাজেঠুকে | জেঠু সব শুনে বললেন ,ও ভায়া এইডা তুমি কি কও ? বড়বাবু না কইরা দিলে ,আমি কি কইরা হা করি ,কও দেহি ছোটোবাবু?তিনি হুনলে (শুনলে) আমার কানখান ঝালাপালা কইরা দিবে নে ! তুমি তো বেডা আমারে বড্ড ঝামিলিতে (ঝামেলা) ফেললা | না বাপু ওতো রিক্সের কাম লইতে(নিতে) পারুম না !
লালকাকু বললেন ,আরে দাদা , কিছু হবে না | বাড়িতে করব না |চিনিদির(পিসি) বাড়িতে কান্ডটি ঘটাব |এখন আপনি মিডিয়াম হয়ে প্ল্যানচেটটা করুন |
ওনারা যখন কথা বলছিলেন তখন আমরা সবাই হাঁ করে তাদের কথা গিলছিলাম |
পরদিন দেখি ,বাবা অফিসেই গেলেন না | কি করে যেন টের পেয়ে গিয়েছিলেন কাকুদের প্ল্যানচেটের কথা | সারাদিন বাড়িতে বসেই অফিসের কাজ সারলেন |বিকেলে তার মা এবং আমার মাকে ডেকে বললেন ,আজ রাতে বাড়ি ফিরতে পারব না ,পার্টির কাজ আছে| এই বলে সন্ধ্যেবেলায় বেড়িয়ে গেলেন | লালকাকু প্রায় নাচতে নাচতে তার এক বন্ধু সমেত বাড়িতে খাওয়া দাওয়া সেরে পদা জেঠুকে বগলদাবা করে তার দিদির বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলেন |
এদিকে বাবা সব কিছু টের পেয়ে রাত বারোটার সময় উপস্থিত হলেন চিনিপিসির বাড়িতে |শুনেছিলাম ,তারা মাত্র প্ল্যানচেটে বসেছিলেন | বাবার হাঁকডাকে সব ভন্ডুল |
শেষে তাল ও নিম গাছের তলা দিয়ে রামনাম করতে করতে আর বাবার প্রবচন শুনতে শুনতে যে যার বাড়ি ফিরেছিলেন |
পদা জেঠু বাবার ভয়ে সাতদিন আমাদের বাড়ির দিকে আসেন নি|
পরের দিন আমাদের হুল্লোড় বাহিনীর ইচ্ছে হল প্ল্যানচেট করবার |
কিন্তু ফাঁকা ঘর পাই কোথায় ?
দুদিন পর সেই ব্যবস্থাও হয়ে গেল|
বাবা অফিসের কাজে দুদিনের জন্য কলকাতায় রওনা দিলেন |
মা ,দুই কাকিমা ,পাশের বাড়ির কাকিমারা গেলেন সিনেমা দেখতে |
প্ল্যানচেট তো হবে গুদড়ি ভাইবোন গুলোর কি হবে? এখানে বলে রাখি আমাদের হুল্লোড় বাহিনীতে আমাদের পাশের বাড়ির তিন ভাই বোনও ছিল __তাদের নাম রাখী ,দেবু ও মনি |
আমি একটু ভয় পেয়ে বললাম , যদি কোন দুর্ঘটনা হয় তখন কি করবি ? পাশের বাড়ির দেবু আর আমার খুড়তুতো ভাই জয় বলল , আরে দিদিভাই ভয় পাচ্ছো কেন ? কিছু হবে না, নো ফিকর !
নো ফিকর তো বল্লি ,কিন্তু কিভাবে করবি , কাকে ডাকবি ,কি জিজ্ঞাসা করবি ? তারপর যদি ঘাড়ে চেপে বসে সেই আত্মা তখন য আমাদেরই আত্মারাম খাঁচা হয়ে যাবে ! আমাদের সবার বয়স কম ,বড়রা কেউ বাড়িতে নেই, তারা বাড়ি ফিরলে ,শুনলে পিঠে আস্ত বেত ভাঙ্গবে _ আমি আমতা আমতা করে বললাম |
সবার বয়স গড়ে তখন ১১ কিংবা |আমি সেভেনে উঠব ,জয় আর দেবু সিক্স |দেবুর দিদি রাখী সেও আমার সঙ্গে পড়ে | আর বাকি গুলো ওয়ান , টুতে পড়ে |
কিছুতেই মানল না বিচ্ছু দুটো |
ওরাই ঠিক করল ,রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরকে ডাকবে| কি কি প্রশ্ন করবে,কে মিডিয়াম হবে ইত্যাদি|
যেদিন আমরা প্ল্যানচেট করব সেদিন মা কাকিমাদের দল গেল সিনেমা |বড় কাকা তার সায়েন্সের বই নিয়ে সন্ধ্যে থেকে বিড়বিড় শুরু করেছেন |বাকি তিন কাকা আড্ডা মারতে বেড়িয়ে গেলেন| ঠাকুমার তখন ঝিমোনোর সময়|তার কাছে আমার এক বছর বয়স্ক বোন ,খুড়তুতো চার বছরের বোন , আরেক খুড়তুতো ভাই ও পাশের বাড়ির বোন মনিকে গছিয়ে দিয়ে প্ল্যানচেটে বসলাম আমার ঘরে আমার পড়ার টেবিলে | দরজা জানালা বন্ধ করে | ঘরের লাইট অফ করে টেবিলের মাঝখানে মোমবাতি জ্বালিয়ে বসা হল |
আমার ভয়ে গা ছমছম করতে লাগল|
যাইহোক ,দেবু মিডিয়াম হল| জয় প্রশ্ন করবে |শুরু হল আমাদের ভুত পরিচর্চা |আমরা রবী ঠাকুরকে স্মরন করা শুরু করলাম |
প্রায় আধঘন্টা কেটে গিয়েছে রবী ঠাকুরের আসার কোন হেলদোল নেই | জয় একটু পর পর বলছে ,মহাশয় আপনি কি আসিয়াছেন ?
এতেও কোন সাড়া শব্দ নেই |
এমন সময় দরজায় খটখট আওয়াজ | আমার ঘরের পাশে মা বাবার ঘর |দুইঘরের মাঝে ছিটকিনিটা ছিল একটু আলগা | একটু আলগা ধাক্কা মারলেই খুলে যেত ||
এদিকে এমশঃ খটখট আওয়াজটা বেড়ে যেতে লাগল |হঠাৎ দরাম করে মাঝখানের দরজাটা খুলে গেল |সবাই তাকিয়ে দেখি লম্বা সাদা কাপড়ে কে দাড়িয়ে আছে |সবাই এক ঝলক দেখে, না বুঝেই তারস্বরে চিৎকার করা শুরু করলাম |
আমাদের চিৎকার শুনে ঠাকুমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে কি জানি তিনি কি অনুমান করলেন এবং চিৎকার করা শুরু করলেন, বাঁচাও গো ,কে কুথায় আছো গো বাঁচাও |বাড়িতে ডাকাত পইরছে গো |
একটু থেমে (বোধহয় তখন ঘুমের রেশটা কেটেছে) আবার চিৎকার শুরু করলেন আমার নাম ধরে ,ও মৌ ,তোরা চিল্লাস ক্যান ? কি হইছে তোদের |
ঠাকুমার চিৎকার শুনে বড়কাকা তার মাকে ধমকে বলে উঠলেন ,ডাকাত দেখছো কোথায় ? তারা তোমার ঘুমের মধ্যে হামলা করছে না কি ?
শীতের সন্ধ্যেতে ঠাকুমা কম্বল মুরি দিয়ে ছোট দুই নাতনিকে নিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন |
আর এদিকে আমাদের অবস্থা শোচনীয় |একে অপরকে জড়িয়ে বসে আছি| উঠে যে লাইট জ্বালাবো সেই কথাটাও কারো মাথাতেই আসেনি |সবাই চিল্লিয়ে যাচ্ছি |
এদিকে সাদা ভুত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে |ব্যাটা নড়েও না চড়েও না | কোন কথাও বলে না |
এর মধ্যে সব সিনেমা দেখনেবালীরা অর্থাৎ মা কাকিমারা সিনেমা দেখে ফিরে এসেছেন |
বাইরে থেকে আমাদের চিৎকার ,ঠাকুমার চিৎকার ,বড় কাকুর হুঙ্কার সব শুনে পড়ি মড়ি করে বাড়িতে বিভিন্ন প্রতিবেশী সহ বাড়িতে ঢুকেছেন | সবাই গেটের কাছে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছেন আর দরজার কড়া নাড়ছেন |কেউ দরজা খুলছে না |
কিন্তু ,কিভাবে ঘরে ঢুকবেন ?দরজা খুলবে কে?
সবাই তো চিল্লাতেই ব্যস্ত |
বড় কাকু তিনি সবসময় নিজের মুডেই থাকেন | হঠাৎ তার মনে হল গেটে তো তালা দেওয়া ,বন্ধ | বাইরের লোক গুলো ঢুকবে কি করে | তিনি লেপের তলা থেকে ঠাকুমাকে বললেন , না চিল্লিয়ে দরজাটা খোলো !
ঠাকুমা একটু থেমে বললেন ,তুই যা না ক্যান দরজাটা খুলবার ল্যাইগ্যা |
বড় কাকা বললেন ,আমি পারুম না |
ঠাকুমা বাতের বেদনায় কাতর | না উঠতে পেরে আবার চিৎকার শুরু করলেন ওগো কে কুথায় আছো গো আমাগো বাঁচাও |আমার নাতি পুতিগুলারে কেজান মাইরা ফেলালো!
এদিরে তার পাশে তার দুই পুচকে নাতনি আচমকা ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে না বুঝেই রাম চিল্লানি শুরু করল ,বিশেষ করে ছোটোটা |ওটা ছোটো থেকেই চিৎকার করতে বিশেষ পারদর্শী ছিল |
ওদিকে বাড়ির গেটের সামনে কোলাহল আর ঠাকুমা চিৎকার আর আমাদের কলতানে দরজার সামনে সাদা কাপড় পরিহিত প্ল্যানচেটের ভুত কিছুটা যেন নড়ে উঠল ! তবু একটুও সরল না দরজার সামনে থেকে |
এই সবের মধ্যে বড়কাকু কি মনে করে বিছানা থেকে উঠে বাড়ির সদর দরজা খুলে দিল | বাড়িতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লেন প্রতিবেশি সহ মা কাকিমারা | তারা ঢুকেই পটাপট লাইট জ্বালাতেই ধড়ে যেন প্রান এল |তবে আমাদের ঘর তখনওঅন্ধকার |মায়ের ঘর থেকে আলো কিছুটা এ ঘরে এসে পড়ছে |
বাইরে যাব কিভাবে ভাবছি ,কিন্তু ,যাব কিভাবে? সামনে যে প্ল্যানচেটের ভুত !
মা আর পাশের বাড়ি চাঁপা কাকিমা , কে রে বলে একটা লাঠি দিয়ে দিল ভুতকে খোঁচা |
খোচা দিতেই সমস্বরে ভুত বলে উঠল ,বম্মা মেরো না আমরা পাপান ও মনি |
মা কাপড় সরাতেই দেখি ,মনির ঘাড়ের ওপর রোগা সোগা আমার খুড়তুতো ভাইটি দাঁড়িয়ে আছে |
মা বলল, তোরা এটা কি খেলছিলি ?
মনি ভয়ে কাচুমাচু মুখে বলল ,কি করব , আমরা ছোটো বলে আমাদের ওরা প্ল্যানচেটে নিল না |আমাদের লুডো খেলতে বসিয়ে দিল|তাই পাপান বলল,চল আমরা ঠাকুমার সাদা শাড়ি পরে ওদের ভয় দেখাই |তাই তো ওদের ভয় দেখাছিলাম |আমরা কি জানি ঠাকুমাও ভয় পেয়ে যাবে ?
মা বলে উঠল ,দাঁড়া কি বললি ,কি বললি ? কি চেট ?
পাপান বলল ,তুমি জানো না ? ঐ যে পদা জেঠু অন্ধকার ঘরে বসে ভুতদের ডাকে ? তাকে বলে প্ল্যানচেট|
এই শুনে সবাই বকবে কি ,হাসতে শুরু করল |
এদিকে দুই বীর পুরুষ জয় আর দেবু আলো দেখে ,মায়েদের কথাবার্তা শুনে অজ্ঞান অবস্থা থেকে সজ্ঞানে ফিরে এসে মনি আর পাপুকে এই মারে তো সেই মারে !
সব মিটলে ,বাবা কলকাতা থেকে ফিরলে আমাদের হুল্লোড় বাহিনীকে ডাক পাড়লেন |
ভয়ে ভয়ে সবাই গিয়ে হাজির হলাম |সুপ্রীম কোর্টের রায় শুনবার জন্য |
কিন্তু ,পিঠ থাপড়ে একটু হেসে এই রকম কাজ আর করতে বারন করলেন |
SHAONLI SARKAR

Comment