দীর্ঘশ্বাস ✍️ কৌস্তুভ দে সরকার
যে বৃদ্ধটি ভাঙা চশমা চোখে, স্ট্রেচারে করে এসে
বসে আছে বিডিও অফিসের বারান্দায়
একটুখানি আলোর আশায়,
তার কানে কানে খুব নরম সুরে গাও –
“জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা।”
যে তরুণটি এস.আই.আর-এর জটিল ফর্মার ভাঁজে নিজের ভিটেমাটির প্রমাণ খুঁজে পাচ্ছেনা,
যার বাবার নামের একটি অক্ষরের ভুলে আজ সে নিজভূমে পরবাসী,
বিভিন্ন অফিসের বাবুদের পায়ে ধরছে একটু সংশোধনের আশায়,
তার কানে কানে মায়াবী গলায় গেয়ে ওঠো –
“ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম….!”
যে মেয়েটি গ্রামবাংলার শ্যাওলা ধরা মাটির দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে
চোখের জল মুছছে গোপনে, কারণ তার বিয়ের শংসাপত্র নেই;
যাকে বলা হচ্ছে, “কাগজ নেই তো তুমি এ দেশের নও”,
যার রেশন কার্ড ঠিক করতে চটির তলা ক্ষয় হলো,
অথচ ঘরে উনুন জ্বলেনি চারদিন, চাল বাড়ন্ত,
তার কানের কাছে মধুর সুরে গেয়ে ওঠো –
“ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা।”
নিঝুম দুপুরে শ্মশানের ধারের খাটাল থেকে যে মা
ছেঁড়া আঁচল গায়ে দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে,
যিনি জানেন না ৫১ কিংবা ৭১-এর হিসেব কী,
যিনি জানেন না ২০০২ আর ২০২৫ কী,
যিনি শুধু জানেন এই মাটির গন্ধে তার নাড়ি পোঁতা,
অথচ লোকমুখে শুনছেন তাকে নাকি চলে যেতে হবে অচেনা কোথাও, সেই আতঙ্কিত জননীর কানে কানে
খুব সাহস দিয়ে গাও –
“সারে জাহা সে আচ্ছা হিন্দুস্থান হামারা…!”
সবাইকে সব মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়া শেষ হলে, যাও
গ্রামের সেই পুরনো অশ্বত্থ গাছের তলায়, যেখানে
একলা দাঁড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা এক শহিদ মিনার,
সেখানে রাতের অন্ধকারে বাতাসের কান্নায় কান পাতো;
শুনতে পাবে সেইসব লড়াই করা পূর্বপুরুষের আর্তনাদ
“আমরা রক্ত দিয়েছিলাম
এই মাটির অধিকার রক্ষার জন্য,
আমরা মাটি চেয়েছিলাম, কাগজের টুকরো নয়।
আমরা জীবন দিয়েছি তোমরা হাসবে বলে,
আর তোমরা আজ মাটির ছেলেকে
কাগজের দোহাই দিয়ে তাড়াচ্ছ?
তোমরা এ কী করলে? – তোমরা এ কী করছো?”
