MUFASSEL CHOWDHURY MANIK SHAH

MUFASSEL CHOWDHURY MANIK SHAH

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন এবং সাহসীযোদ্ধা সাংবাদিক মার্ক টালি
—————————–
মোফাচ্ছেল চৌধুরী মানিক শাহ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেকালীল বাঙালি জাতির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বিভিন্ন দেশের অগণিত সংবাদ কর্মী, সাহসী মানুষ ।
এই সাহসী মানুষগুলো রণাঙ্গনে, দেশে দেশে, শরণার্থী শিবিরে প্রতিবাদ এনং জনমত গঠনে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছিলেন সেই কঠিন সেই সময়ে। তাদের সেই ভূমিকা ছিল স্মরণকালের স্মরণাতীত। সেই বন্ধুদের মাঝে অন্যতম একজন বিবিসি’র তৎকালীন সাংবাদিক মার্ক টালি।

একাত্তরের জুনের তৃতীয় সপ্তাহ। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বিদেশি সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তান সফরের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে বিবিসি মার্ক টালিকে পাঠায় বাংলাদেশে। তিনি তখন বিবিসির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা। সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবির ও বিভিন্ন জেলা সমূহ ঘুরে তিনি বাঙালিদের প্রকৃত দূঃখ দুর্দশার চিত্র আর যুদ্ধের খবর পাঠান। রণাঙ্গনের সেসব খবর বিশ্ববাসীর বিশ্বাসের অন্যতম অবলম্বন বা প্রতীক হয়ে ওঠে।

মার্ক টালি ঢাকায় ২৫ মার্চের বর্বর হামলা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। পরে তাঁকে ঢাকা ছেড়ে যেতে হয়। ২০১১ সালে দিল্লিতে বসে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্ক টালি জানান, ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা এবং এর আশপাশের কিছু এলাকা সাংবাদিকদের ঘুরে দেখায়। সবকিছুই ঠিকঠাক আছে তা বোঝানোই ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশ্য।

মার্ক টালি বলেন, ‘অনুমোদন পেয়ে ঢাকার শাঁখারীবাজারে যাই। সেখানে ব্যাপক গোলাগুলি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম। হঠাৎ এক পাঞ্জাবি পুলিশ এসে আমাকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমার চলাচলসংক্রান্ত ফাইল দেখে আমাকে আটক করায় ওই পুলিশকে ধমক দেন। ওসি সম্ভবত বাঙালি ছিলেন। ওসির সাহস দেখে আমি মুগ্ধ হই। ওই সময় এটি ছিল অনন্যসাধারণ এক কাজ। আমি তাঁর জন্য গর্ববোধ করি।’

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মার্ক টালি ছিলেন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের আশার আলো। রেডিওতে কান পেতে সকাল-সন্ধ্যা বিবিসিতে মার্ক টালির কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত তারা, পুরো দেশ। তাঁর কণ্ঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত বাঙালির বুকেও। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মেলনে ছাড়াও মার্ক টালি ১৯৮৫ সালে ওবিই পদবীতে ভূষিত হন। ১৯৯২ সালে পদ্মশ্রী পদক লাভ করেন। ২০০২ সালে নতুন বছরের সম্মাননাস্বরূপ নাইট উপাধি লাভ করেন। ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ পদক লাভ করেন।

ভারতে অবস্থান করে তিনি ১৯৮৫ সালে তার প্রথম গ্রন্থ অমৃতসর: মিসেস গান্ধী’জ লাস্ট ব্যাটেল প্রকাশ করেন। এতে তিনি তার সহকর্মী ও বিবিসি দিল্লি’র প্রতিনিধি সতীশ জ্যাকবকে নিয়ে এ গ্রন্থটি রচনা করেন। তারা বইটিতে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সংঘটিত অপারেশন ব্লু স্টারের ঘটনাবলী, ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক শিখ বিদ্রোহীদের দমন ইত্যাদি বিষয়ের খুঁটিনাটি তুলে ধরেন। এছাড়াও, ১৯৯২ সালে টালির অন্যতম সেরা পুস্তক নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া প্রকাশিত হয়।

মার্ক টালির পুরো নাম উইলিয়াম মার্ক টালি, তিনি ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তার জন্ম হয়েছে কলকাতায়। তার পিতা ব্রিটিশ রাজের নিয়ন্ত্রণাধীন শীর্ষস্থানীয় অংশীদারী প্রতিষ্ঠানের ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ছিলেন। শৈশবের প্রথম দশকে ভারতে অবস্থান করেন। কিন্তু ভারতীয়দের সাথে সামাজিকভাবে মেলামেশার সুযোগ পেতেন না তিনি। ইংল্যান্ডের বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। টাইফোর্ড স্কুল, মার্লবোরো কলেজ এবং ট্রিনিটি হলে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি।এরপর তিনি ক্যাম্ব্রিজের চার্চ অব ইংল্যান্ডে পাদ্রী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লিঙ্কন থিওলোজিক্যাল কলেজে দুই মেয়াদে পড়াশোনার পর এ চিন্তাধারা স্থগিত করেন।

১৯৬৪ সালে তিনি বিবিসিতে যোগদান করেন। ভারতীয় সংবাদদাতা হিসেবে ১৯৬৫ সালে ভারতে চলে যান। দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থানকালীন তার কর্মজীবনে তিনি অনেকগুলো প্রধান প্রধান ঘটনাবলীর স্বাক্ষ্য বহন করে চলেছেন। তন্মধ্যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অপারেশন ব্লু স্টার ও এর ফলশ্রুতিতে সংঘটিত ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, শিখবিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে বিবিসিতে প্রেরণ করতেন।

জুলাই, ১৯৯৪ সালে মার্ক টালি বিবিসি থেকে পদত্যাগ করেন। জন বার্ট নামীয় সহকর্মীর (পরবর্তীতে মহাপরিচালক) সাথে বাদানুবাদ করাই এর মূল কারণ। তিনি বার্টকে ‘ভীত হয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো’ এবং ‘বিবিসির নিম্নমূখীতা ও সহকর্মীদেরকে নৈতিকভাবে দুর্বল করা’র দায়ে অভিযুক্ত করেন। এরপর থেকেই তিনি স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা ও নতুন দিল্লিতে উপস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন।বর্তমানে তিনি নিয়মিতভাবে বিবিসি রেডিও ৪ এর সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান সামথিং আন্ডারস্টুড উপস্থাপন করছেন।
১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর ভারতের কলকাতায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং গত ২৫ জানুয়ারি (২০২৬) নয়া দিল্লির একটি হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে তাঁর জীবন অবসান ঘটে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।
# মোফাচ্ছেল চৌধুরী মানিক শাহ, লেখক -মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাব এডিটর-দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রা, ঢাকা
E-mail : manikshah1971@gmail.com

Comment