Smita Dhar

Smita Dhar

অমাবস্যার সেই অসমাপ্ত সুর
​লেখিকা: স্মিতা ধর
শহরের শেষ সীমানায় যেখানে সভ্যতার কোলাহল ক্লান্ত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে, ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে এক জরাজীর্ণ মহীরুহ—একটি পরিত্যক্ত বিদ্যালয়। আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে এই ইমারতের প্রতিটি কোণ মুখরিত থাকত শত শত শিশুর কলকাকলিতে। সেই সময় স্কুলের লম্বা করিডরগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের ছুটোছুটি, টিফিনের ঘণ্টায় আনন্দধ্বনি আর সমবেত প্রার্থনার সুর বাতাসের সাথে মিতালি করত। কিন্তু বর্তমানে সেই জৌলুস এক হাড়হিম করা নিস্তব্ধতায় রূপান্তরিত হয়েছে। নোনা ধরা দেওয়াল, ভাঙা কাঁচের জানলা আর আগাছায় ঘেরা প্রবেশদ্বারটি দেখলে মনে হয় কোনো এক অভিশপ্ত দানব হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়রা এই এলাকাটিকে ‘বিষবৎ’ এড়িয়ে চলে। দিনের আলোতেও কেউ ওদিকে তাকাতে সাহস পায় না, কারণ লোকমুখে প্রচলিত আছে এক নিদারুণ করুণ কাহিনী। শোনা যায়, প্রতি অমাবস্যার রাতে যখন পৃথিবী নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে যায়, তখন এই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ভেসে আসে এক শিশুর অতিপ্রাকৃত কিন্তু মিষ্ট সুর। সেই সুরে কোনো ছন্দ নেই, আছে এক গভীর আর্তি এবং কয়েক দশকের জমাট বাঁধা অব্যক্ত বেদনা, যা বাতাসকে ভারী করে তোলে।
গ্রীষ্মের ছুটিতে নীলাঞ্জনা যখন তার মামার বাড়িতে বেড়াতে আসে, তখন তার শান্ত এবং বুদ্ধিমতী স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গোয়েন্দা মনটি বারবার সেই রহস্যময় স্কুলের দিকে ছুটে যেত। তার মামাতো বোন মীরা, যে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ভীতু প্রকৃতির, সেই প্রথম নীলাঞ্জনাকে স্কুলের অলৌকিকতার কথা জানায়। মীরা কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিল, “জানিস দিদি, ওই মৃত স্কুলটা থেকে আজও এক অতৃপ্ত আত্মার গান ভেসে আসে। আজ ষাট বছর হতে চলল, কিন্তু সেই সুর থামেনি।” নীলাঞ্জনার চোখের মণি কৌতূহলে জ্বলে ওঠে। সে বুঝতে পারে, এই ভয়ের আড়ালে কোনো এক বড় সত্য লুকিয়ে আছে। তার মামা যখন অত্যন্ত কঠোরভাবে সেই স্কুলে যেতে বারণ করেন, তখন নীলাঞ্জনার জেদ আরও বেড়ে যায়। সে স্থির করে, অলৌকিক হোক বা মানসিক বিভ্রম—এই রহস্যের মূলে তাকে পৌঁছাতেই হবে। অমাবস্যার এক নিকষ কালো রাতে, যখন সারা গ্রাম গভীর ঘুমে মগ্ন, নীলাঞ্জনা ভীত মীরাকে একপ্রকার জোর করেই সাথে নিয়ে টর্চ হাতে সেই অভিশপ্ত প্রাসাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
স্কুলের সেই মরচে ধরা গেট অতিক্রম করার সময় এক শীতল বাতাস তাদের অভ্যর্থনা জানায়। পা রাখামাত্রই হঠাৎ এক অদৃশ্য শক্তিতে পেছনের গেটটি সজোরে বন্ধ হয়ে যায়, যা মীরাকে আতঙ্কে কুঁকড়ে দেয়। চারদিকে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ আর ভ্যাপসা গন্ধের মাঝে হঠাৎ সেই বহু প্রতিক্ষিত সুরটি ভেসে আসে। এক শিশুর ভাঙা, কাঁপা কিন্তু অপার্থিব মায়াবী কণ্ঠ। সুরটি অনুসরণ করতে করতে তারা যখন পুরনো শৌচাগারের সামনে পৌঁছাল, তখন নীলাঞ্জনা হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। তার চেতনা যেন বর্তমান জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ষাট বছর আগের এক অতীতে হারিয়ে যায়। তার চোখের সামনে সিনেমার পর্দার মতো ভেসে ওঠে সেই করুণ দৃশ্য। সে দেখতে পায় এক ছোট্ট মেয়েকে—গুনগুন, যার কণ্ঠ ছিল ঈশ্বরের দান। স্কুলের ছুটির আগের দিন এক মর্মান্তিক অবহেলার শিকার হয়ে সে অন্ধকার শৌচাগারে আটকা পড়ে যায়। তিন দিন ধরে ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর আতঙ্কে ধুঁকে ধুঁকে সেই নিষ্পাপ প্রাণটি ওখানেই ঝরে পড়ে। স্কুল কর্তৃপক্ষ বা দপ্তরী কেউ খেয়াল করেনি যে ভেতরে একটি প্রাণ রয়ে গেছে। সেই অবহেলার স্মৃতিই আজ ষাট বছর ধরে এক অতৃপ্ত গান হয়ে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বাস্তবে ফিরে এসে নীলাঞ্জনা নিজেকে চোখের জলে ভাসতে দেখল। সে বুঝতে পারল গুনগুনের এই গান কোনো ভয়ের নয়, বরং এক চরম একাকীত্বের প্রকাশ। ঠিক তখনই সিঁড়ির ধারের ছায়ায় সে দেখতে পায় সাদা পোশাকে ছোট্ট গুনগুনকে। গুনগুন প্রথমে ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে চাইলেও নীলাঞ্জনার মমতাভরা ডাক তাকে থামিয়ে দেয়। গুনগুন করুণ গলায় জানায় যে সে কাউকে ভয় দেখাতে চায় না, সে শুধু চায় তার সেই অসমাপ্ত গানটি পৃথিবীর মানুষকে শোনাতে। তার স্বপ্ন ছিল বড় মঞ্চে গান গেয়ে সবার হাততালি পাবে, অনেক বন্ধু বানাবে। কিন্তু নিয়তি তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। গুনগুনের এই করুণ আর্তি শুনে নীলাঞ্জনার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। সে অনুভব করে যে এই নিষ্পাপ আত্মাটির মুক্তি কেবল তার স্বপ্ন পূরণের মাধ্যমেই সম্ভব। নীলাঞ্জনা হাত জোড় করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে যেন গুনগুনকে অন্তত একবারের জন্য মর্ত্যে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে সে তার এই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে শান্তিতে বিদায় নিতে পারে।
নীলাঞ্জনার প্রার্থনা এবং মমত্ববোধ অলৌকিকতাকেও হার মানায়। পরদিন গুনগুন এক জীবন্ত শিশু হিসেবে নীলাঞ্জনার সামনে আবির্ভূত হয়। নীলাঞ্জনা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে মামার বাড়িতে তাকে আশ্রয় দেয় এবং গ্রামবাসীর জন্য এক গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। একটি ছোট কাঠের মঞ্চে যখন সেই ষাট বছরের পুরনো অসমাপ্ত সুর গুনগুন পুনরায় ধরল, তখন সমস্ত প্রকৃতি যেন নিস্তব্ধ হয়ে সেই স্বর্গীয় আবেশ উপভোগ করতে লাগল। উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখ সজল হয়ে উঠল। গান শেষ হওয়ার পর চারদিক প্রবল করতালিতে ফেটে পড়ল। গুনগুনের দুই চোখে আজ কোনো ভয় নেই, বরং সেখানে খেলা করছে এক অনাবিল তৃপ্তির হাসি। সে আজ আর একাকী নয়, সে আজ জয়ী। অনুষ্ঠান শেষে বিকেলের ম্লান আলোর সাথে মিশে গিয়ে গুনগুন চিরতরে বিদায় নেয়। নীলাঞ্জনা জানত, গুনগুন আজ আর অভিশপ্ত স্কুলের অন্ধকারে ফিরবে না, সে ফিরে গেছে তার আসল ঠিকানায়—যেখানে কোনো অবহেলা নেই।
দশ বছর পর, সেই পরিত্যক্ত স্কুলটি আজ এক আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। সেখানে আর কোনো অন্ধকার নেই, কোনো ভয় নেই। মীরা এখন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, যে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখে যাতে আর কোনো গুনগুনকে অকালে ঝরে যেতে না হয়। নীলাঞ্জনা এখন এক প্রখ্যাত লেখিকা, তার নতুন বই ‘গুনগুন’ আজ সেই স্কুলের প্রাঙ্গণে উন্মোচিত হলো। সে প্রতিটি শিশুর হাতে তার বই তুলে দিয়ে এই শিক্ষাই দিল যে, অবহেলা একটি জীবন কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা ও সহমর্মিতা একটি অতৃপ্ত আত্মাকেও মুক্তি দিতে পারে। আকাশের বাতাসে আজ আর কোনো করুণ সুর ভেসে আসে না, বরং ভেসে আসে শিশুদের প্রাণোচ্ছল হাসির আওয়াজ। গুনগুনের সেই অসমাপ্ত সুর আজ পূর্ণতা পেয়েছে মানুষের ভালোবাসায়। শিল্পের জয়গান আর সহমর্মিতার আলোয় অভিশপ্ত অতীত এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্ম দিয়েছে।

নীতিবাক্য: অবহেলা এবং উদাসীনতা একটি জীবন কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু সহমর্মিতা এবং ভালোবাসা একটি অতৃপ্ত আত্মাকেও মুক্তি দিতে পারে। শিল্পের কোনো মৃত্যু নেই, তা সময়ের সীমানা পেরিয়ে অমর হয়ে থাকে।

Comment