রম্য গল্প “এলাচি আলাপ”
সপ্তাহখানেক কিংবা সত্যি বলতে দিন পনেরো ধরে আমাদের গাঁয়ে এর প্রস্তুতি চলতো। ছোট্ট একটা গ্রাম, নাম দিগৈ।এই নামের ইতিহাস একেকজন একেকরকম বলে।তো আমাদের গাঁয়ে পয়সাওয়ালা লোক হাতে গোনা কজন। কিন্তু আমার বাবা আমার ছোট বেলায় মরে যাওয়ায় আমরা মোটামুটি ভালো চললেও ভেতরে ভেতরে অভাব তাজা ছিল। কিন্তু এই প্রস্তুতি ধনী গরিব সকলের সমান ছিল।এই জায়গায় সবাই সমান। মাটির ঘর বলতে ভিটেটা মাটির কিন্তু বেশিরভাগ টিনের বেড়া। সেই ঘর লেপেপুছে, ঘরের যা কিছু আছে সবই ধুয়ে মুছে চকচকা করা হতো। এমনকি উঠোনে গোবর দিয়ে লেপে দেওয়া হতো।আর আমি বসে থাকতাম মেন্দি হাতে পড়বো বলে। ছোট ভাইয়া খাবারের লোভে বসে থাকতো আর মা ঐদিন শত ব্যস্ততার মাঝেও ইবাদত করে রাত্রি যাপন করতেন। এটা ছিল শব-ই-বরাতের জন্য প্রস্তুতি। কি সুন্দর ছিল সেই সব দিন! শুধু একটা ব্যাপার ছাড়া,সেটা”এলাচ”। আমাদের গাঁয়ে চাচী জেঠিরা বলতেন এলাচি। অনেক রকম হালুয়া, পায়েস, হাতে গড়া চালের গুঁড়ার রুটি, হাতে বানানো সেমাই, পোলাও মাংস।বাহারি সব রান্না আর তাতে অবধারিত সেই আতঙ্ক “এলাচি”। মা সেদিন বাটি ভরে এসব সুন্দর একটা কূশিবোনা ঝালর দেয়া কাপড়ে ঢাকা দিয়ে আমাদের ঘরে ঘরে পাঠাতেন। সবাই পাঠাতেন সবার ঘরে। আমি আর আপা হাতে মেহেদি পরতাম।তাও শিল নোড়ায় বাটা মেহেদি পাতা। যারা বাটতেন তাদের কি ভাব! সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকতাম। বলতো – হ্যাঁ হ্যাঁ দিব সবাইকে, ধৈর্য্য ধরে বসে থাক। গাঁয়ে তুই করেই বলতো ছেলে বেলায় সকলে।কার মেন্দি কতটা গাঢ় হয় তাই নিয়ে কি কম্পিটিশন! নখে পঁচা সাবান নামে ক্ষারীয় একটা সাবান ছিল, আচ্ছা করে ঘষে দিতাম নখে।আপা গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে নকশা করতো হাতে। কিন্তু খেতে গেলে ই বিপত্তি। হয়তো খুব আয়েশ করে পায়েসটা খাচ্ছি ওমনি দাঁতের নিচে। আমরা সব ভাই বোন মিলে একজনের পর একজন বাইরে যেতাম মুখের খাবার ফেলতে। ছোট ভাইয়া খুব চিৎকার দিতো, মা অপরাধীর মতো মুখ করে বসে থাকতেন আর বলতেন – আরে দু তিন টা দিয়েছি। ছোট ভাইয়া বিদ্রোহী জবাব দিত- আপনি খান, আমাদের জোর করে খাওয়ান কেন? মা ও কম যান না, বলতেন এলাচ ছাড়া রান্না করলে পোলাও হয় নাকি সে তো ভাত।আর হালুয়ায় তো দিইনি।আসলে গুঁড়া দিতেন, আমরা ঠিক বুঝতে পারতাম। আবার খুব যত্ন নিয়ে ঐসব মশলা রোদে দিতেন মাঝে মাঝে। আমাদেরকে পাহারায় বসিয়ে দিতেন যেন মুরগি এসে ঘেঁটে না দেয়। সাথে আরও কতো কিছু দিতেন রোদে। আজকে ভাবি আমরা কত ভালো ছিলাম, ফেলতে ও তো পারতাম কিন্তু তা করিনি। শুধু আচার রোদে দিলে ভাইয়ারা চুরি করে খেতো, ভাইয়াদের চুরি করার গল্প আরেকদিন বলব। আমাকে বলতো- নিলা একটা কুটনীবুড়ি।ও মা কে সব বলে দেবে। মাঝে মধ্যে বলতাম না ওদের কাছে সৎ থাকতে। কত শব ই বরাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি – আল্লাহ আজকে যেন মুখে এলাচ না পড়ে।আর ভাবতাম আমার ছেলে মেয়ে হলে ওদের কে এলাচি অত্যাচার করবো না। কিন্তু এতো বছর পর শব ই বরাতে মায়ের আঁচলের মতো সুগন্ধি ময় মনে হয় এলাচ কে।
Rayhana yeasmin

Comment
