অপেক্ষার উল্টো দিক
গল্পকারের কাছে প্রেম কখনো উচ্চারিত শব্দ নয়—বরং শব্দের ফাঁকে ফাঁকে জন্ম নেওয়া নৈঃশব্দ্যের দীর্ঘ অনুরণন। আজকের গল্পটি সেই অনুরণনের, পাহাড়ি এক নিস্তব্ধ মফস্বল স্টেশনের গোপন রাতের।
শীতের শেষ প্রহর। স্টেশনের পুরনো বেঞ্চে বসে ছিল অরণ্য। তার কাঁধে বছরের ধুলো ধরা একটি ঝোলা ব্যাগ—ভেতরে রয়েছে অসংখ্য অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি, যেন তারই মতো ঘুরে বেড়ানো নিঃশব্দ প্রাণ। অরণ্য পেশায় লেখক নয়; সে ভবঘুরে। শহর থেকে শহরে ঘুরে মানুষের মুখ থেকে নেমে গড়া দীর্ঘশ্বাস, চিরে যাওয়া আশা, আর অচেনা ব্যথাকে কুড়িয়েই সে গল্প লেখে।ঠিক তখনই প্ল্যাটফর্মের ধূসর কুয়াশা চিরে একটুকরো কম্পমান আলো এগিয়ে এল। হাতে একটি পুরনো লণ্ঠন। আলোটা কাছে আসতেই ছায়ামূর্তিটা স্পষ্ট হলো। মেয়েটির নাম লাবণ্য—স্টেশনের মাস্টারমশাইয়ের মেয়ে, আর অরণ্যের অঘোষিত অপেক্ষা।
লাবণ্য অরণ্যের সামনে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল,
“আবার চলে যাবেন?”
শব্দের ভেতর ক্ষীণ অভিমানের থিরথিরে কম্পন।
অরণ্য হালকা হাসল, কিন্তু চোখের কোণে জমে থাকা বিষাদ সেই হাসিকে টিকিয়ে রাখতে পারল না।
“গল্পকার তো জঙ্গলপাখির মতো, লাবণ্য,” সে বলল। “এক জায়গায় বেশিদিন থাকলে ওদের ডানা শক্তি হারায়। শিকড় গজালে উড়তে ভুলে যায়।”লাবণ্য লণ্ঠনটা মাটিতে রাখল। আলোটা নরম হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কুয়াশার ভেতর দুই মানুষের ছায়া ধীরে ধীরে মিলেমিশে এক চিকন রেখা হয়ে উঠল।
“সব গল্প কি শেষ করতে হয় অরণ্য?” —লাবণ্য ফিসফিস করল। “অনেক গল্পই তো অসমাপ্ত থেকেও বেঁচে থাকে… ঠিক মানুষের ভিতরের দীর্ঘশ্বাসের মতো।”
অরণ্য কোনো উত্তর দিল না। ডায়েরি খুলে একটি সাদা পাতা ছিঁড়ে নিল। পাতায় সে একটিমাত্র শব্দ লিখল—
“অপেক্ষা।”পাতাটা লাবণ্যের হাতে দিয়ে বলল,
“এই গল্পের শেষ লাইনটা তুমি লিখবে। যেদিন ফিরব—সেদিন তুমি এই শব্দের পর যোগ করবে তোমার উত্তর।”
ট্রেনের সিটি ভেসে এল। লোহার চাকা ঠান্ডা রেলের উপর গড়িয়ে আসতে থাকল। অরণ্য কামরায় উঠে জানালার ধারে বসে বাইরে তাকিয়ে রইল। ট্রেন চলতে শুরু করলে কুয়াশার ভেতর ম্লান আলোয় সে দেখল—লাবণ্য দাঁড়িয়ে আছে, লণ্ঠনটা দুলছে, আর তার চোখে একই সঙ্গে ভয় আর অদ্ভুত নিশ্চয়তার আভা।
অরণ্য জানত না—লাবণ্য তার দেওয়া পাতাটার উল্টো পিঠে আগেই লিখে রেখেছে—
“ফিরে আসাকেই যদি প্রেম বলে, তবে আমি এই স্টেশনের বেঞ্চে বসে অনন্তকাল তোমার জন্য গল্প হয়ে থাকব।”ট্রেনটি টানেলের অন্ধকারে ঢুকে গেলে আলো নিভে গেল, কিন্তু সেই রাতে এক অসমাপ্ত গল্প নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতির উষ্ণতায় পূর্ণতা পেল।
কিছু প্রেম চিঠির উত্তরে জন্ম নেয়, আর কিছু প্রেম চিরকাল বেঁচে থাকে সেই উত্তরের অপেক্ষায়।

