#প্রবন্ধ
নারী ও বর্তমান সমাজ, ১৩/০৯/২০২৫
প্রবীর কুমার চৌধুরী
মানব সভ্যতার বিকাশের প্রারম্ভিক মুহূর্তে নারীই ছিল প্রধান। একজন নারীর অনুশাসন মেনেই চলত সেই সময়ের জন বা গোষ্ঠী। নারীই হল সৃষ্টির প্রতীক। নারী থেকেই মানবের সৃষ্টি। দেবীদূর্গা বা মাকালি হচ্ছেন তারই প্রতীক।
কিন্তু কালের বিবর্তনের ফলে সেই শক্তি পুরুষশ্রেণীর হস্তে স্থানান্তরিত হয় অথবা বলা যায় পুরুষ শ্রেণীকতৃক হস্তগত হয় । ক্রমেই নারীজাতি গৃহকোনে নিবাসিত হন।
একটা সময় নারীর কাজই হয়ে যায় সংসার পালন ও বাৎসরিক সন্তান উৎপাদন। ( একটি প্রবাদ বচন-
” সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে ” ) গত শতাব্দীতে বিবাহযোগ্য মেয়ে দেখতে এসে ছেলের বাড়ির গড়গুষ্ঠী
মেয়ের চুল টেনে, মুখ চিমটি কেটে, পায়ের কাপড় উপরে তুলে, সর্ব সমক্ষে হাঁটিয়ে মেয়ের খুঁত দেখতেন । এখানেই শেষ নয় তারপরেও সে রান্না জানে কিনা, সেলাই, ফোঁড়াই। রান্নায় কিসের সঙ্গে কোন ফোড়ন দিলে স্বাদ বেশি হবে এইসব বর্বরচিত জিজ্ঞাসা করা হতো। আজ হয়তো শিক্ষার সংস্পর্শে এসে মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে আর এইসব অসভ্যতা কিছুটা কমেছে।
আজ অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটছে শিক্ষা ও সচেতনতার ফলে। প্রতিবাদও উঠছে নানা প্রান্তরে। কিন্তু এখনও দুস্থ ও নিম্নবিত্তের মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা হলেও প্রতীয়মান হয় ।
গত শতাব্দীর প্রথমদশকেও নারী ছিলেন সংসারের বোঝা স্বরূপ। মেয়েসন্তান পরের ঘরে যাবার জন্যে জন্মায়। সুতরাং তার প্রতি একটা ছেলে সন্তানের মতো দায়িত্ব বা সচেতনতা মা – বাবা গ্রহন করতেন না। তাঁকে তখন বেশি লেখা পড়া করানোর কোন তাগিদ মা – বাবারা অনুভব করতেন না, যতটা ঘর সাজানো, রান্নাবান্না ও কাপড় জামা কাচাকাচিতে দক্ষ করতেন। তাকে বিয়ে দিতে গেলে মা -বাবাকে যৌতুক দিতেই সর্বশ্রান্ত হতে হত। আবার বিয়ের পর একজন নারীকে সেই সংসারে দাসীর সমান দায়িত্ব নিতেও হত। এমনও ঘটত যে নারী পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম হলে তিনি নিপীড়িত বা পরিত্যাক্ত হতেন। কিন্তু যে নারী পুত্র সন্তানের জন্ম দিতেন তাঁকে সবাই মাথায় করে রাখতেন।
সেই সময়ে ( আজও অনেক পরিবারে ) ধারণা ছিল পুত্র সন্তান বংশের বাতি জ্বালবে , সংসার দেখবেন, বৃদ্ধ মা -বাবার ভরণপোষণ করবেন। এই ভ্রান্ত ধারণায় ছেলেদের প্রতি বেশি দৃষ্টি দেওয়া হত।
আমাদের সমাজের মোটামুটি তিনটি ভাগ – দুস্থ – নিম্নবিত্ত /মধ্যবিত্ত / উচ্চবিত্ত। উপরিউক্ত কথাগুলো নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তের ক্ষেতেই বেশি প্রযোজ্য। মধ্যবিত্ত সমাজটা আজও জটিল।
এই বিভাজন অনুযায়ী বলা যায় দুস্থ বা নিম্নবিত্তের ঘরে বা সংসারের বধূরা বেশিরভাগ সংসারের বাইরেও কাজ করেন এবং সেই অর্জিত টাকা সংসারে ব্যাহিত করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেতেই দেখা যায় তাসত্ত্বেও তাঁরা স্বামীর দ্বারা অথবা তাঁদের কর্মক্ষেত্রেও নিগৃহীত হয়েছেন বা হচ্ছেন। অবশ্য দিন পাল্টেছে নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েরা লেখাপড়া শিখছেন। আজকাল তাঁরাও প্রতিবাদ করছেন। পরিচিত বা প্রতিবেশীরাও তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে মুখবই বিশেষ কার্যকরি ভূমিকা পালন করে।
দুর্ভাগ্য,আজও পথের ধারে কিংবা ডাস্টবিনে নবজাতক কন্যাসন্তান পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে থাকে। মা কতৃক পরিত্যাক্ত হয়ে। এ ক্ষেত্রে বলতেই হয় একজন নারী অপর একজন নারীর শত্রু।
আজও দেখা যায় শিশু পাচার ও বিক্রয় হয়। যেকোন বয়সের মেয়েই চালান হয়। এই একবিংশ শতকেও মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে কত বাবাদের জমি, বাড়ি বিক্রি করে সর্বশ্রান্ত হতে হয়। কিংবা কথামতো যৌতুকের টাকা না পেয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকের দ্বারা চরম লাঞ্ছছিত অথবা মৃত্যু বরণও করে মেয়েরা।
আজও প্রায়ই ঘরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শাশুড়ি – বৌমার মিল নেই। সংসারের অধিকার দখলের চরম দ্বন্দ্ব। প্রায়ই ক্ষেত্রে এডজাস্টমেন্ট কথাটা উঠে আসে কিন্তু ভুলে যাই অ্যাডজাস্টমেন্ট দুতরফেই প্রয়োজন।
যেহেতু বৌ পরের বাড়ির মেয়ে তাই তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা কিন্তু কখনই নয়।
মধ্যবিত্ত সমাজটা ভীষণ জটিল ও কুহেলিকাময়। বাইরে থেকে যা দেখা যায় ভিতরটা সম্পূর্ণ আলাদা।
এ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী টিভি দেখেন, বই পড়েন আর অপেক্ষা করেন কখন বৌ কাজ থেকে বাড়ি ফিরে চা করে দেবেন। স্বামী মহারাজ জীবনে কখনও নিজের জামাকাপড় ইস্ত্রি করার সময় তাঁর স্ত্রীর ব্লাউজটা কিংবা সালোয়াড়-কামিজটা ইস্ত্রি করেননা সেটা বোধহয় তাঁর আত্মসম্মানে লাগে। মধ্যেবিত্ত সমাজে এখনও পুরুষরা নারীর উপর হুকুম করতেই বেশি পছন্দ করেন। ব্যতিক্রম তো আছে বা থাকবেই।
দেখা যায় বাড়ির মেয়ে বাইরে ঘুরলে, ছেলেদের সাথে কথা বললে বাবার চোখ লাল হয়। তাঁর চিন্তা হয় ” পাছে লোকে কিছু বলে… “। ” এই পাছে লোকে কিছু বলের ” চিন্তায় মধ্যেবিত্ত সমাজ কাহিল,তটস্থ।
এই সমাজের রক্ষনশীল বাড়িতে বৌকে হতে হবে নম্র, ভদ্র, শান্ত। আর বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়ি থাকলে তো সোনায় সোহাগা। বৌয়ের জোড়ে কথা বলা, গান গাওয়া, জোরে হাঁটা, স্বামীর মুখে, মুখে তর্ক করা বারণ। তাহলেই সে অপয়া, অলক্ষনে বৌ হয়ে যাবে।
যে সমাজের কথাটা বলা বাকি – তা হলো উচ্চবিত্ত।
এঁরা ধনী ও ক্ষমতাশালী বলেই প্রতিপন্ন হোন। এবং নারী -পুরুষ উভয় শ্রেণীই যথেষ্ট উপার্জন করেন তাই তাঁরা উভয়ই পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ভোগ করেন। গর্হিত অন্যায় না হলে কেউ কারুর কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকেন না। এই সমাজে কিছু, কিছু মানুষ বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে নিজের পছন্দ মতো মানুষের সাথে বসবাস করতে পছন্দ করেন। যেটা
” লিভ টুগেদের ” বলেই পরিগণিত।কেউ, কেউ একাধিক বিয়েতেও পিছুপা নন। এককথায় এই সম্প্রদায় কেউ কারুর উপর নির্ভরশীল নন। কারণ প্রত্যেকেই স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী। এই সমাজের প্রায়ই সবাই শিক্ষিত।
মিলিয়ে দেখলে দেখা যায় উপার্জন কম হলেও দুস্থ ও নিম্নবিত্ত সমাজের সাথে উচ্চবিত্ত সমাজের জীবনধরণের কোথাও, কোথাও বেশ মিল পাওয়া যায়।
মধ্যেবিত্ত সমাজের অন্য দুটি সমাজের কোন মিল না হওয়ার একটি প্রধান কারণ – ওঁরা ” পাছে লোকে কিছু বলে ” র ভয়ে শিটকে থাকেন।
আজকের আধুনিক নারীদের পুরুষের সাথে টক্কর দিয়ে শিক্ষায়, দীক্ষায়,কর্মে ও জীবনধারণে সমান পারদর্শী হওয়ার চেষ্টাকে কুর্নিশ জানাচ্ছি। একজন নারী তাঁর নিজের আলোয় আলোকিত হবেন এটাই আশা করবো। আজ অনেক নারী পুরুষের থেকেও বেশি এগিয়ে যাচ্ছেন এটার জন্যে দেশ গর্বিত । এটাও দেশ এগিয়ে যাওয়ার আরও একটি সোপান।
আজ নারী গাড়ি চালাচ্ছেন, এয়ারে ভাসছেন। বিদেশে গবেষণা করছেন,কলেজের প্রিন্সিপাল হয়ে সফল ছাত্রসমাজ গড়ে তুলছেন এটাই দেশকে প্রভূত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কষ্ট পাই তখন, যখন নারীরা পুরুষদের অনুকরণ করতে গিয়ে সিগারেট, মদ আরও নানা প্রকার গর্হিত কাজ করেন। দেহ উন্মুক্ত পোশাকের থেকে বোধহয় ঢাকা পোশাকে অনেক বেশি সৌন্দর্য বাড়ায়।
অপেক্ষা করবো মানুষ কবে মেয়েদের ছেলেদের সঙ্গে উপমা দেবেন না। বলবেন না সত্যি মেয়েটা একটা ছেলের সমান কাজ করল । বলবেন না মেয়েটা সংসারের ছেলের অভাব পূর্ণ করেছে। যেদিন নারী নিজ দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে সমাজকে সম্পূর্ণ আলোকিত করবেন একক প্রচেষ্টায়, সেইদিনই সত্যিকারের নারী মুক্তি ঘটবে।
( সমাপ্ত )

