।। ভাগ্য নয়—সুযোগই ভবিষ্যৎ গড়ে ।।
কাঞ্চন চক্রবর্তী
সেই ন্যাংটো বয়স থেকে ধনঞ্জয় ও হারাধনের বন্ধুত্ব। দুজনে এক গ্রামে একই পাড়ায় বড় হয়েছে ।হারাধন ছিল অলস আবেগ প্রবণ আর ধনঞ্জয় ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ স্থির লক্ষ্যে বিশ্বাসী। পড়াশুনা শেষ করে যে যার কর্মজীবনে প্রবেশ করে। ধনঞ্জয় সরকারি চাকরি পেয়ে শহরে চলে যায় আর হারাধন চাকরি না পেয়ে অল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করে। হারাধন কিছুতেই ব্যবসায় উন্নতি করতে পারে না। এক ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসা আবার সেই ব্যবসা ছেড়ে অন্য আর এক ব্যবসা এই ভাবে চলতে থাকে তার জীবন। কিন্তু কিছুতেই সে লাভের মুখ দেখতে পায় না। হারাধন মনে মনে ভাবে তার নামই যে হারাধন
সে ধনের দেখা পাবে কি করে? সে সবাইকে বলে তার ভাগ্যটাই খারাপ।
এদিকে ধনঞ্জয় চাকরি ক্ষেত্রে উন্নতি করতে করতে একদিন ওদের গ্রামের বি ডি ও হয়ে আসে। এসেই হারাধনের সঙ্গে দেখা করে। দুজনে ওদের সেই প্রিয় বাসস্ট্যান্ডের কাছে পুরনো আম গাছতলায় বসে অনেক সুখ দুঃখের কথাবার্তার পর নিজেদের কর্মজীবন সম্বন্ধে আলোচনা শেষ করে হারাধন আপসোসের সুরে বলে,
….. ‘দেখ ভাই তোর কপাল কত ভাল তুই গ্রামের বি ডি ও হতে পেরেছিস, তোর গাড়ি বাড়ি সম্মান প্রভাব প্রতিপত্তি সব হল। অথচ দেখ আমি কিছুই পেলাম না। আমার ভাগ্যটাই খারাপ’।
ধনঞ্জয় অনেক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
….. ‘দেখ মানুষ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে, কপাল টপাল ওসব কিছু নয় রে’।সুযোগ সবার জীবনেই আসে কিন্তু সবাই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে না। তোর মনে আছে, এই বাসস্ট্যান্ডে সেই দিনের সকালটা যা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
সেই সকালটাই কিন্তু আমাদের দুজনের জীবন আলাদা করে দিয়েছিল।
আমরা তখন সবে কলেজ পাশ করেছিলাম।
সেই সকালে খবর এলো—গ্রাম পঞ্চায়েতে ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ এর মাধ্যমে লোক নিচ্ছে। আজই শেষ দিন
আমি খবরটা শুনেই বাড়ি গিয়ে কাগজপত্র নিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম পঞ্চায়েত অফিসে আর তুই চুপচাপ বসে রইলি। বলেছিলি, হঠাৎ এ ভাবে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া যায় নাকি? ভাল জামা প্যান্ট পড়া নেই, সিভি ও ডকুমেন্টস্ গুলোও রেডি করা নেই,ভাগ্যে থাকলে এ রকম সুযোগ আবার আসবে।
আমি কিন্তু কথা না বাড়িয়ে সেদিন পঞ্চায়েত অফিসের বাস ধরার জন্য ছুটে গিয়েছিলাম।
হাতে পুরোনো ফাইল,শার্টে ভাঁজ, কিন্তু আমার চোখে ছিল তাড়া।
বাস উঠে দেখি বাস ভাড়া দেওয়ার মত টাকা আমার পকেটে নেই—একজন অচেনা লোক ইন্টারভিউ আছে শুনে আমার টিকিট কেটে দিয়েছিল।
ইন্টারভিউয়ে সব প্রশ্নের উত্তর জানতাম না, তবু চেষ্টা করেছিলাম। তিন মাস পর আমার হাতে এপয়েন্টমেন্ট লেটার এল।
ছোট পদ, কম বেতন—তবু শুরু করেছিলাম।
ইন্টারনাল পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে দশ বছর পর
আমি এখন বিডিও। শহরে একটা ফ্ল্যাটে কিনেছি, অফিসের গাড়িতে যাতায়াত করি।
হারাধন আজও বাসস্ট্যান্ডে বসে বলে—
“আমার কপালটাই খারাপ।”
কিন্তু সত্যি কি হারাধনের কপাল খারাপ ছিল?
নাকি সেই সকালের সুযোগকে ও কাজে লাগতে পারেনি ?
।। মানুষ— নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে ।।
কাঞ্চন চক্রবর্তী
রবি আর নিলয় দু’জনেই দাঁড়িয়ে ছিল একটি নোটিস বোর্ডের সামনে। যেখানে লেখা ছিল কর্মী চাই—
“আজই শেষ দিন। 12-30 মিনিটে ইন্টারভিউ।”
ঘড়িতে তখন 12টা।
রবি বলল,
“এত কম সময়ে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। আদৌ চাকরিটা হবে কিনা তার ঠিক নেই, ভাগ্যে থাকলে এরকম সুযোগ আবার আসবে।”
নিলয় ঘড়ির দিকে তাকাল।
কিছু না বলে বড়ি থেকে ওর ডকুমেন্টস্ গোছান পুরোনো ফাইলটা নিয়ে দৌড়াল।
রবি দাঁড়িয়ে রইল।
পাঁচ মিনিট দেরি হলে আর কীই বা ক্ষতি হতো?
দশ বছর পর
রবি আজও সেই পাঁচ মিনিটের কথা ভাবে।
আর নিলয়?
সে এখন ব্যস্ত—অফিস মিটিংয়ে।
ভাগ্য কারও বদলায়নি।
বদলেছিল শুধু—
একজন দৌড়েছিল,
আর একজন অপেক্ষা করেছিল।
যে পারে তারই ভাগ্য ফিরে যায়। আমরা অলসতা আর বুদ্ধির অস্থিরতায় অনেকেই সুযোগকে অবহেলা করি তাই আমাদের অনেকেরই সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যায়। তোমাদের জীবনেও নিশ্চয়ই সুযোগ এসেছিল কিন্তু সেটাকে হয়ত তোমরা কাজে লাগাতে পরোনি।
