Tanvir Ahmed Hridoy

নির্বাচন কেবল ভোট নয়, আস্থারও পরীক্ষা

তানভীর আহমেদ হৃদয়

আজকের নির্বাচনকে আমি শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি না; আমি এটিকে দেখি আস্থার পরীক্ষা হিসেবে। ব্যালট বাক্সে সিল মারা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—মানুষ কতটা বিশ্বাস নিয়ে সেই সিলটি মারছে। গণতন্ত্র কাগজে লেখা কোনো শব্দ নয়, এটি মানুষের অংশগ্রহণ, সাহস এবং প্রত্যাশার সমষ্টি। আজকের দিনটি তাই কেবল রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং পুরো জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সকালের শুরু থেকেই বিভিন্ন স্থানে ভোটারদের উপস্থিতির খবর আশাব্যঞ্জক। তরুণদের দীর্ঘ সারি, প্রবীণদের ধীর পায়ে কেন্দ্রে যাওয়া—এই দৃশ্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মধ্যে এখনো ভোটের প্রতি আগ্রহ আছে। বহু আলোচনার, বিতর্কের, অনাস্থার এবং উত্তেজনার মধ্যেও মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছে—এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষ যদি ভোট দিতে চায়, তবে গণতন্ত্র বেঁচে থাকে।
তবে একই সঙ্গে কিছু প্রশ্নও রয়ে যায়। নির্বাচন কি সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে? প্রতিটি প্রার্থী কি সমানভাবে প্রচার করতে পেরেছেন? ভোটাররা কি নির্ভয়ে ভোট দিতে পারছেন? একটি নির্বাচনকে সফল বলতে হলে কেবল ভোটের হার দিয়ে বিচার করলে চলবে না; দেখতে হবে পরিবেশ কতটা নিরপেক্ষ ছিল। কারণ ভয় বা সন্দেহের ছায়ায় দেওয়া ভোট গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না, বরং দুর্বল করে।
আমার মতে, আজকের নির্বাচনের বড় একটি দিক হলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি। এটি একদিকে স্বচ্ছতার বার্তা দেয়, অন্যদিকে আমাদের নিজেদের ব্যবস্থার ওপর আস্থার প্রশ্নও তোলে। আমরা কি এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, যেখানে বাইরের নজরদারি ছাড়াই সবাই নিঃসন্দেহ থাকবে? অবশ্যই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ খারাপ কিছু নয়, বরং এটি জবাবদিহিতা বাড়ায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেগুলোর প্রতি জনগণের পূর্ণ আস্থা থাকবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদার উপস্থিতিও লক্ষণীয়। এটি শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তা যেন কখনোই ভয়ের পরিবেশ তৈরি না করে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের সময় একজন সাধারণ নাগরিক যেন মনে না করেন তিনি কোনো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি, বরং যেন মনে করেন এটি তার অধিকার প্রয়োগের একটি স্বাভাবিক দিন।
আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, আজকের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ফলাফল নয়—বরং ফলাফলকে ঘিরে সবার প্রতিক্রিয়া। বিজয়ী দল কি উদারতা দেখাবে? পরাজিত দল কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করবে? সমর্থকেরা কি সংযম রাখবে? গণতন্ত্র কেবল জেতা-হারার খেলা নয়; এটি পরস্পরের মতের প্রতি সহনশীলতার চর্চা।
আমরা প্রায়ই বলি, নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব। কিন্তু একটি উৎসব তখনই অর্থবহ হয়, যখন সবাই অংশ নিতে পারে এবং আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে। যদি কোনো অংশ নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে, তবে সেই উৎসব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংলাপ, সমঝোতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রয়োজন আরও বেশি।
আজকের দিনটি আমাদের জন্য আত্মসমালোচনারও সুযোগ। আমরা কি কেবল ভোটের দিনটিকে গুরুত্ব দিই, নাকি পাঁচ বছর জুড়ে নাগরিক হিসেবে সক্রিয় থাকি? গণতন্ত্র কেবল ব্যালট পেপারে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতিদিনের লড়াই। নির্বাচন সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মাত্র।
সবশেষে আমি বলব, আজকের নির্বাচন নিয়ে আশাবাদ ও সতর্কতা—দুটোই থাকা প্রয়োজন। আশাবাদ, কারণ মানুষ ভোট দিতে আগ্রহী; সতর্কতা, কারণ গণতন্ত্রের মান রক্ষা করতে আমাদের প্রতিনিয়ত সচেতন থাকতে হবে। একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে।
আমরা হয়তো আজকের ফলাফল জানব অল্প সময়ের মধ্যেই। কিন্তু ইতিহাস বিচার করবে—এই নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছিল, নাকি সত্যিকার অর্থে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। আমার প্রত্যাশা, এটি হোক আস্থা পুনর্গঠনের সূচনা; এমন এক রাজনীতির শুরু, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু শত্রুতা নয়; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়; এবং সর্বোপরি, জনগণের ইচ্ছাই হবে চূড়ান্ত শক্তি।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের সবার উপর। আজ আমরা যে ভোট দিচ্ছি, সেটি কেবল সরকার গঠনের জন্য নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনেরও অংশ।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Comment