Ziaur Rahaman Shilon

Ziaur Rahaman Shilon

দূরত্বের ওপারে তুমি
বিকেলের আকাশে তখন শেষ রোদের সোনালি রেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো অশ্বত্থ গাছের নিচে বসেই প্রথম কথা হয়েছিল অনিরুদ্ধ আর তিথির। তিথি কবিতা লিখত, অনিরুদ্ধ শুনতে ভালোবাসত। কথা বলতে বলতে কখন যে দু’জনের মাঝখানে এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হলো, কেউ টের পায়নি।
দিনগুলো ছিল সহজ। ক্লাস শেষে একসঙ্গে হাঁটা, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা। অনিরুদ্ধ বলত, “একদিন অনেক দূরে যাব, নিজের একটা জায়গা বানাব।” তিথি হেসে বলত, “আমি থাকব তোমার পাশেই।” তখন ‘দূরত্ব’ শব্দটা তাদের অভিধানে ছিল না।
হঠাৎ একদিন বিদেশে গবেষণার সুযোগ এলো অনিরুদ্ধের জীবনে। আনন্দের সঙ্গে লুকোনো ছিল বিচ্ছেদের আশঙ্কা। যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় তিথি শুধু বলেছিল, “ভুলে যেও না।” অনিরুদ্ধ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—“দূরত্ব আমাদের হারাতে পারবে না।”
প্রথম দিকে প্রতিদিন কথা হতো। সময়ের ব্যবধানও মানিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যস্ততা বেড়ে গেল, কল কমে এলো, বার্তাগুলো ছোট হতে লাগল। একদিন তিথি বুঝল, অনিরুদ্ধের কণ্ঠে আর আগের উষ্ণতা নেই। তারপর নেমে এলো এক দীর্ঘ নীরবতা—অজুহাতহীন, ব্যাখ্যাহীন।
বছর কেটে গেল। তিথি তার লেখা প্রথম বইয়ের প্রথম পাতায় লিখল—“দূরত্বের ওপারে তুমি।” সে জানে, অনিরুদ্ধ হয়তো আর কোনোদিন ফিরবে না। তবু ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না; তা রয়ে যায় গভীর কোনো স্থানে, যেখানে সময়েরও পৌঁছনো কঠিন।
রাতের আকাশে তারা দেখলে তিথির মনে হয়, পৃথিবী যত বড়ই হোক, কোথাও না কোথাও অনিরুদ্ধও হয়তো একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পথ আজ আলাদা, জীবন আলাদা, তবু যে অনুভূতি একদিন নীরবে জন্মেছিল, তা আজও নিভে যায়নি। মিলন না হলেও সেই ভালোবাসাই তাদের গল্পকে অর্থ দিয়েছে।
কারণ কিছু মানুষ জীবনে পাশে থাকে না, কিন্তু হৃদয়ে থেকে যায় চিরকাল—দূরত্বের ওপারে, তবু একেবারে অন্তরের কাছাকাছি।

Comment