Fariduzzaman

Fariduzzaman

“..বসন্ত জাগ্রত দ্বারে”। সবাইকে পহেলা ফাল্গুনের শুভেচ্ছা জানাই।

বসন্তকে নিয়ে আমার (ফরিদুজ্জামানের) এক ডজন কবিতা বন্ধুদের উদ্দেশ্যে নিম্নে তুলে দিলাম:

১।
বসন্তের পঙক্তিমালা
. . . . . .
কতো কথা কতো গান ওই শোন কলতান বাসন্তিকা এলো
স্মৃতির ঘুলঘুলি রোদ চেতনার মর্মবোধ হল এলোমেলো।
অশেষ আনন্দ রাশি ফল্গুধারা হাসি হাসি হাজার দুয়ারী
স্বচ্ছ জলে তুলে ঢেউ জলকেলী করে কেউ অচিন জুয়ারী।
মায়া টান রঙ্গ জাদু আলিঙ্গনে সঙ্গ মাধু বর্ণালী বাহার
নানা রঙে সেজে সেজে নানাসুরে বেজে বেজে মানে না সে হার।
বেহুলা বাসর ঘরে লক্ষ্যাই গরলে মরে কানামাছি কাল
আমার বসন্ত বেলা এমনি করেছে খেলা মধুর সকাল।
দীলা রাঁই মারে ঘাই পদ্যলিখে ফলে ছাই আসে না নাগর
রুমালের গিট খুলে কুহকের ফিট ভুলে হয়েছে ডাগর।
কোয়েলিয়া ডাকে বনে ভ্রমরের গুঞ্জরণে বসন্ত সঙ্গম
মনে নাচে দীপ্র চারু ক্ষিপ্র ক্লেদে দিচ্ছে ঝাড়ু রস সমাগম।
অমৃতের কবিগণ পথ চলে মৃত্যুপণ লিখছে কবিতা
অমিত আনন্দ স্মৃতি বুকে বেঁধে শিল্প প্রীতি জ্বালাচ্ছে সবিতা।

২।
ফাগুন কল্লোল

প্রেমের বন্ধনে শুষ্ক মরু বুকে
গোপনে গড়ে ওঠে সুখের উদ্যান।
পুলকে ঋতুরাজ সেজেছে বুনো ঘাস
শোভিত ফুলফলে নতুন কিশলয়।
জোয়ারে ভাসে নদী ঝর্ণা নিরবধি
সাগর সঙ্গমে হয়েছে উৎরোল।
পউষ পার্বণে স্বাদের পিঠাপুলি
স্মৃতির সোনারোদে গেয়েছে বুলবুলি।
হাসান বসরী ও তাপসী রাবেয়ায়
জেগেছে ইতিহাসে মগ্ন মাজেজায়।
লাইলী ফরহাদ চণ্ডি রজকিনী
প্রেমের ধারাপাতে নাইকো বিকিকিনি।
কালের যূপকাঠে বিজলী চমকায়
পিয়ারি যোধাবাঈ কবিকে ধমকায়।
অমৃত ঢেউ তুলে মাতালো ধরাতল
আগুন জ্বলে ওঠে ফাগুন কল্লোল।

৩।
বসন্তদিনে তৃষ্ণারা জল হয়ে যায়

উত্তরে বাতাস উল্টো বইতেই দখিনার রূপ..
প্রকৃতি লিখেছে কাব্য, আমি শুধু ডুবে যাই।
আকুলি বিকুলি ক্ষণ..আমের গুটির ফাগুন লেগে
বৃন্দাবনে কী মধুর চাষ? পরিহাস.. প্রেমাষ্পদ উচাটন
ভুলে গেছি পলাশ শিমুল ভাঙা বাউলের ঘর
পত্র পল্লবে জেগে ওঠা প্রাণ, পাখিদের কলতান
কী এক আলোতে দেখে দূর বসন্ত দিন!
হাস্যোজ্জ্বল চোখের সংকেত, কে বা তাকে জানাবে সে ক্ষেদ?
ভোমরের গুনগুন গান, কোকিলের তান..
উন্মন করে দিলো বনপাপিয়া, নাম ধরে দূর বনে ডাকে।
এলিজির কম্পোজিশন সারিন্দার সুর, বেহালা বেহাগ
শিখি নাই রাগিনীর রাগ । পাই নিকো সরস্বতী বর,
হৃদয়ে সারিন্দা ছড় ওঠে নামে রঙিলা নিসর্গ.. বাগান বাড়ি
বসন্তের সাথে আড়ি..পরান বধু পরকিয়া উড়ুউড়ু ভিন্ননদী তৃষ্ণারা জল হয়ে যায়।

৪।
বসন্ত বন্দনা

হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্র-সঙ্গীতে যতো আছে,
হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে
বনের কুসুমগুলি ঘিরে। আকাশে মেলিয়া আঁখি
তবুও ফুটেছে জবা, দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে,
তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্ত-পথিক।
এলিয়ে পড়েছে হাওয়া, ত্বকে কী চঞ্চল শিহরণ!
মন যেন দুপুরের ঘূর্ণি-পাওয়া পাতা, ভালোবেসে
অনন্ত সঙ্গীত স্রোতে পাক খেয়ে মৃত্তিকার বুকে
নিমজ্জিত হতে চায়। হায় কী আনন্দ জাগানিয়া।
এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতোই ফেরাই চোখ,
যতোই এড়াতে চাই তাকে দেখি সে অনতিক্রম্য।
বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্য খানি
নবীন পল্লবে, ফুলে-ফুলে। বুঝি আমাকেও শেষে
গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে।
আমি তাই লঘুচালে বন্দিলাম স্বরূপ তাহার,
সহজ অক্ষরবৃত্তে বাঙলার বসন্ত বাহার।

৫।
বসন্ত

ঋতুরাজ বারে বারে দ্বারে কড়া নাড়ে
পরাণে পরশ পেতে কাউকে না ছাড়ে।
বসন্তে গান গায় শত শত পাখি
বাঁধবে সুখেতে আজ মিলনের রাখী।
ক্লেদ গ্লানি সকলেরে সঙ্গোপনে ঢাকি
অভিষেকে আর নেই তিলসম ফাঁকি।
নানা ফুল ফোটে শাখে বনে বনে আজ
কোকিল পাপিয়া সাথে মিলেছে যে বাজ।
ভাবুকের মন আজ খুব উচাটন
বয়ে যায় বাউড়ির বসন্ত ক্ষণ।
বর্ণিল বনে কাঁড়ে সব দু’নয়ন
মাঠে মাঠে পল্লব বাড়ে অগণন।
বাজে ভোমরের গুনগুন ধ্বনি
উবে যায় সব দুখ জীবন অশনি।
মনে মনে খুন হই বন্ধুর লাগি
ফুল পাখি প্রজাপতি সাথে রয় জাগি।
পলাশ শিমুল সাজে তরুণের মন
শন শন বায়ু বয় রাঙে মহাজন।
বউ কথা কয় লাজে নিসর্গের গান
ফাল্গুন চৈত্রের বিহঙ্গ দান।

৬।
বসন্ত

দরজায় কড়া নাড়ে ঋতুরাজ সেজে অপরূপ
রূপের মাধুরী তলে ডুব দিয়ে আমি থাকি চুপ।
নতুন পাতার ভয়ে ফুল স্পর্শে টুটেছে অশনি
মধুর বসন্তদিনে নিসর্গের মিলনের ধ্বনি।
মৌ মৌ গন্ধে বাসন্তীকা প্রাণে জাগিয়েছে সুর
রঙের দুনিয়া দেখি রঙে রঙে নেমেছে কী হুর!
শিমুল পলাশ ফোটে রক্তরাঙা নেচেছে ফুল্লরা
বাসন্তী রঙের শাড়ি পাঞ্জাবীতে যুগলের জোড়া।
থেকে থেকে শােনা যায় অন্তর্ভেদী কোকিলের ডাক
প্রাণ জুড়ে প্রেমাষ্পদ বিরহিণী চলেছে নির্বাক।
রুদ্র পলাশের থেকে বিচ্ছুরিত ভাষা গান তান
একটি জাতির মুখ বন্ধের আখ্যানে মন খান খান।
তবুও বসন্ত আসে মধুর মিলনে জাগে ধরা
রসিক ভোমর চলে মহানন্দে ভরে সব ঘরা।

৭।
বসন্ত রঙিলা বধু

এতোরাতে কেনো ডাক দিলে প্রাণ কোকিলা আমায়
জীবন ইটের ভাটা পুড়ে পুড়ে ঠিকানা ঝামার।
বনের কোকিল ডাকে কানে বাজে অন্তর্ভেদী সুর
অন্তরাটা না শুনিয়ে বৈষ্ণবী তো গিয়েছে সুদূর।
শামুক তো নেই কানে তবু শুনি সমুদ্র গর্জন
ঝিনুকে বালুকা মুক্তো জলে ফলে একাকী নির্জন।
হৃত্কলমে মধু জমে পঙক্তি নাচে ঝর্ণা মসী নিবে
সে খোঁজ কি আর পাবে তারাযারা জড়ত্বে ও ক্লিবে?
বসন্ত বাতাসে আসে ভিন্নবানী উজ্জয়িনী স্রোত
সৃষ্টি গানে বিন্দু মধ্যেসিন্ধু লেখে কবি ওত্প্রোত।
অনন্দকে আবাহনে প্রেমিকেরা অলি হয়ে আসে
দুখের আগুন নেভে সুখস্রোতে ফাল্গুন উচ্ছ্বাসে।
পলাশ শিমুল বনে বিচ্ছুরণে রঙ ব্রজ বুলি
বসন্ত রঙিলা বধু বিহঙ্গের আকুলি বিকুলি।

৮।
বসন্ত বিদায়

মহিষ যুগল জল দেখে নামে পুকুরের হাঁটুজলে
মইষাল মিলে দাবদাহ নাশে তৃপ্তি গোসল গলে ।
সব ভুলে পাখি ডুব দেয় সুখে ঠাণ্ডা জলের স্নানে
রাখালিয়া বাঁশি ভিন সুরে বেজে অনুনাদ তোলে প্রাণে।
অবিরাম ঘুঘু ডেকে যায় বনে অলস দুপুর বেলা
ঘুঘু দিয়ে ঘুঘু ধরছে শিকারি ফাঁদের করুণ খেলা।
কুটুম পাখির বোল শিখে ডাকে হরবোলা কিশোরেরা
পোষা টিয়ে ঠোঁট কাটতে ব্যর্থ লোহার খাঁচার বেড়া।
বনটিয়া কবে মনবালা হবে তার পথ চেয়ে চেয়ে
বনবালা হতে টিয়ার আকুতি বিষাদ দিয়েছে ছেয়ে।
তিল ক্ষেতে এক মাকড় জালেতে আটকানো যৌবন
হিজল বনের লাল ফড়িংয়ে শ্রান্তির বিনোদন।
রাজ্যির ফুল দুলে দুলে বলে বসন্ত চলে যায়
তাপনি:শ্বাসে বৈশাখ এসে বরণমাল্য পায়।

৯.
বৃষ্টি

দিগন্ত জোড়া মাঠের মধ্যে বিল
পেরিয়ে যখন আমরা গাঁয়ের কাছে
অমনি বৃষ্টি, দু’জনেই কাক ভেজা
লাজুক তুমিতো পরিণাম ভেবে সারা।
আমি বললাম- ‘প্রকৃতিই সাজিয়েছে
সরিসা ফুলের গায়ে হলুদের দিন।
হলুদ শাড়ির মস্ত গালিচা দেখো,
হলুদিয়া পাখি ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায়।
শত বাঁধা শেষে আমাদের এই হাঁটা
দু’জনই পরাগ মাখলাম সারা গায়।
আমাদের স্নান করানোর দায় ভার
মেঘ বালিকারা সানন্দে কাঁধে নিলো।‘
তুমিই বললে ‘চৈত্রের শেষভাগে
খরতাপ জরা জীর্ণ ঘুচিয়ে দিয়ে
এই বৃষ্টিই আনলো নতুন দিন
অঙ্কুর উৎগমে নব কিশলয়
নতুন জল ও আলোর বীক্ষা নিয়ে
সুশোভিত হবে পত্র ও পল্লবে।“
আমি বললাম-‘তার আগে আমাদের
বেছন বোনার পালা, শেষ করা চাই
এসো দুইজন মিলি, সৃজনের গানে
বিরল পঙক্তি বাঁধি সৃষ্টির জলে।
তারপর সব কবিই নীরব থাকে
পরস্পরের অবাধ্য পথ চলা
ভেতরে বাইরে সৃষ্টি জলের স্রোত
বৃষ্টি নেমেই স্বর্গ সুখের ধারা।

১০।
বরমাল্য
. . . ……
তোমাকে দেখেছি যত
আনন্দ বেড়েছে তত
দেখবার সাধ তাই করিনা দমন
সুখঝাঁপি ভরে রাখি সারাদিনক্ষণ
মনে মনে ছিল শুধু ব্রত
তোমাকেই দেখি যেন রাজহংসীর মত
বসন ছাপিয়ে শুধু তুমি
বিকিরিত সৌন্দর্যের ভূমি
চলেছ মহাঐশ্বর্যের পানে
আমি শুধু মগ্ন হই মুখরিত গানে
লাবণ্যপ্রভা ছড়ায় মাথার মুকুট
বসন্তবাহারে নাচে পুষ্প কালকূট
কবরীতে চন্দ্রমল্লিকার মালা
পুলকে রাঙাও বনবালা
রাঙারাজকন্যা আগুন লাগাও মনোবনে
সেই স্মৃতি জেগে ওঠে প্রতি ক্ষণেক্ষণে
শতাব্দীর জাগরী এ চঞ্চলচোখ
আমি শুধু লিখে চলি অসীম শ্লোক
পোড়ামন আনন্দেই উদ্বেলিত হয়ে ওঠে
বসন্ত কিশলয় ফোটে
সূর্যকে না পাওয়া সূর্যমুখী সমাচার
আমি শুধু মানি নাই হার
পতঙ্গের আত্মহুতি দেয়ার কোরাস
এইভাবে জমে ওঠে বিরহের চাষ
মরতে মরতে লিখি বুলি
অনিবার্য কাব্যের ঝুলি
কুহকের পিছে ছুটি অক্লান্তকর
আঁকড়িয়ে ধরি যত কুটো আর খড়
দাঁতে দাঁত রেখে করি দীর্ণ
কবিতার সংসার হয় শুধু জীর্ণ
আশার বসতি গড়ি রিক্ততায়
ময়ূর সিংহাসন যদি করি সঞ্চয়
বরমাল্য পাইবার সাধ
বারে বারে হয় যে শুধু ধূলিস্যাৎ

১১।
টীকার গান
………..
কালরাতে গেরাম গঞ্জ উজাড় হতো এই দেশে
হুকিং কাশি ধনুষ্টংকার ম্যালেরিয়া যম বেশে।
লক্ষ জনকে কেঁড়ে নিতো উলাওঠা বসন্ত
টিকাদারের কল্যাণে তা অবিরাম নয় অনন্ত।
এক মুঠো গুড় একটু লবন গুলিয়ে পানীয় জলে
কলেরাকে জয় করে ঠিক বিশ্ববাসী নেয় পলে।
পেঁচা পেঁচির গল্প বলে টাকা কামায় হাতুড়ে
আঙুল ফুলে কলাগাছে মজা লোটে চাতুরে!
তেল পড়া আর পানি পড়ায় পকেট হাতায় মৌলোবী
প্যাঁচে ফেলে ধন লুটে নেয় বেনিয়ার পূত মৌ-লোভী।
পোলিওকে বিদায় জানায় বিজ্ঞানেরই দান টিকা
কূপমণ্ডূক ভীরু মনের বিশ্বাসটা না হয় ফিকা।
অমানবিক মড়ক কালে প্রতিষেধক টিকা
বিজ্ঞানেরই আশির্বাদে প্রাপ্ত মানবিকা।
এই নয় অনামিকা এ নয় অভ্র মিকা
সাত রাজধন মাণিক আমার এই করোনা টিকা।
টিপ্পনী নয় টিকা প্রিয়ার মঞ্জুলিকা
অমূল্য ধন সঞ্জিবনী পেয়ে বলি ইউরিকা।

১২।
বসন্তরং

মায়ের চোখের মনি ছিল আমার ছোট বোন
বাবার সোহাগ খনি বোনের কেমনে পাই যে মন।
বাবা মাতো বাঁধন কেটে চলে গেছে দূরে
সাধ না মিটে আশ না পুরে কান্না বাজে সুরে।
বড় হবে দেখবে না বোন পৃথিবী সুন্দর
তাকে খুশি করার আশা বাজে নিরন্তর।
ঘরকুনো তার জ্ঞান বাড়াতেভ্রমণ আয়োজন
তাকে সনয়ে দেশ বিদেশে সুথের আলোড়ন।
সীম মটরের নীল ফুলে তার নীল ভোমরার গান
কলের গানের সুর শুনে বোন করে কলতান।
সর্ষে ফুলের হলদে মেলা বসন্তরং শাড়ি
শিমুল বনের লাল জামাটা পেতেই বোনের আড়ি।
জারুল বনের নীল ফুলে সাজ খোপার কারুকাজ
অঙ্গ ভরা বিবিধ সাজে বোনের অভিলাষ।
লাল গালিচা সবুজ চাদর নক্সা লাউয়ের লতা
দোয়েল কোয়েল ঘুঘুর গানে চায় সে অমরতা।
পাখির সাথে সখ্য গড়ার বোন ধরেছে বায়না
মন ভরে দেয় মেলায় কেনা চুড়ি ফিতা আয়না।
ছোট্ট বোনের ছোট্ট দাবি পুরণে সুখ ভরে
আনন্দেতে চোখ ভেসে যায় স্বর্গ নামে ঘরে।

Comment