আজকের দিনে আমরা যে হাই-টেক ম্যাজিক দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৮৫০-এর দশকে হুদাঁ-র একটি ছোট থিয়েটারে। তার লেখা কালজয়ী বই ‘The Secrets of Stage Conjuring’ আসলে জাদুকরদের জন্য এক পবিত্র ধর্মগ্রন্থের মতো। এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় অবিশ্বাস্য জাদুর গোপন কৌশল।”
” দ্য সিক্রেটস অফ স্টেজ কনজারিং বইটির প্রথম অধ্যায়ে হুদাঁ আমাদের নিয়ে যান তার প্যারিসের সেই বিখ্যাত থিয়েটারে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, তার স্টেজ কোনো জাদুকরের ডেরার মতো অন্ধকার ছিল না। হুদাঁ জাদুকে রাস্তা থেকে তুলে এনে একটি ড্রয়িং রুমে ড্রয়িং রুমে বসিয়েছিলেন।
তিনি প্রথম জাদুকর যিনি প্রথাগত আলখাল্লা ছেড়ে কোট-প্যান্ট বা ইভিনিং ড্রেস পরে স্টেজে নামেন। তার স্টেজটি সাজানো ছিল লুই ১৫-এর স্টাইলের আসবাবপত্র দিয়ে। কিন্তু এই মার্জিত সাজের পেছনেই ছিল আসল রহস্য। কার্পেটের নিচে লুকানো থাকত ইলেকট্রিক তার এবং লিভার, যা সেই আমলে ছিল ভাবনার অতীত। হুদাঁ বলতেন, জাদুকর কেবল কৌশলী নন, তিনি একজন দক্ষ অভিনেতাও।”
“বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে হুদাঁ স্টেজের গোপন পিস্টন (Pistons) এবং মেকানিজম নিয়ে আলোচনা করেছেন। হুদাঁ মূলত একজন ঘড়ি প্রস্তুতকারক ছিলেন, তাই যান্ত্রিক বিদ্যায় তিনি ছিলেন ওস্তাদ। তার টেবিলের পায়াগুলোর ভেতর দিয়ে সরু তার বা পিস্টন চালানো হতো। স্টেজের পেছনে বসে থাকা কোনো সহকারী একটি হাতল ঘোরালে, জাদুর টেবিলের ওপর রাখা কোনো ফুল বা কাঁচের গ্লাস নিজে থেকেই নড়াচড়া করত। দর্শকরা ভাবতেন এটা অতিপ্রাকৃত কোনো ক্ষমতা, কিন্তু আসলে ছিল দুর্দান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং।
“এখন কথা বলা যাক বইটির সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশ নিয়ে—কিছু বিখ্যাত ইলিউশন।
১. The Light and Heavy Chest: একটি ছোট কাঠের বাক্স। হুদাঁ বলতেন, আমি চাইলে এই বাক্সের ওজন বাড়িয়ে দিতে পারি। একজন শক্তিশালী মানুষও সেই বাক্স মাটি থেকে তুলতে পারতেন না। রহস্যটা কী? হুদাঁ এতে ব্যবহার করেছিলেন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম (Electromagnetism)। স্টেজের নিচে একটি শক্তিশালী চুম্বক ছিল যা নির্দিষ্ট সময়ে চালু করা হতো।
২. The Indian Basket Trick: ঝুড়ির ভেতর একটি বাচ্চা ছেলেকে ঢুকিয়ে তলোয়ার দিয়ে এপাশ-ওপাশ গেঁথে দেওয়া। হুদাঁ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে ঝুড়ির বিশেষ গঠন এবং জাদুকরের নিপুণ হাতের কৌশল দর্শকদের বিভ্রান্ত করে।
৩. The Decapitated Speaking (কাটা মাথার কথা বলা): এই জাদুতে একটি টেবিলের ওপর কেবল একটি কাটা মাথা দেখা যেত যা কথা বলত। হুদাঁ এখানে ব্যবহার করেছিলেন আয়নার কারসাজি, যা টেবিলের নিচের অংশকে দর্শকদের চোখ থেকে আড়াল করে দিত।”
“এই বইটিতে হুদাঁ কেবল কৌশল নয়, জাদুর মনোবিজ্ঞান বা ‘Misdirection’ নিয়েও কথা বলেছেন। তার মতে, দর্শক সেটাই দেখে যা জাদুকর তাদের দেখাতে চান। মজার ব্যাপার হলো, সর্বকালের সেরা জাদুকর হ্যারি হুডিনি (Harry Houdini) নিজের নাম রবার্ট-হুদাঁ-র নাম থেকেই নিয়েছিলেন। যদিও পরে তাদের মধ্যে কিছু মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল, তবুও হুদাঁ-র অবদান অনস্বীকার্য।”
“রবার্ট-হুদাঁ-র ‘The Secrets of Stage Conjuring’ বইটি আমাদের শেখায় যে জাদু কেবল হাতসাফাই নয়, এটি বিজ্ঞান এবং শিল্পের এক অপূর্ব মিশ্রণ। আপনি যদি জাদুর ইতিহাসে আগ্রহী হন, তবে এই বইটি আপনার সংগ্রহে থাকা উচিত।
রবার্ট-উডাঁর থিয়েটার
Jean-Eugène Robert-Houdin (রবার্ট-উডাঁ) তাঁর বিখ্যাত থিয়েটারের নকশা ও দার্শনিক চিন্তার কথা তুলে ধরেছেন। প্যারিসের পালে-রোয়ালে অবস্থিত এই থিয়েটার নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল—যাদুকে কেবল মেলার বিনোদন থেকে তুলে এনে একটি পরিশীলিত শিল্পরূপে প্রতিষ্ঠা করা, যা সমাজের অভিজাত ও রুচিশীল দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
১. “লুই পঞ্চদশ” শৈলীর ড্রইংরুম
রবার্ট-উডাঁ মঞ্চযাদুর চিরাচরিত “জাদুকর” চেহারা পরিত্যাগ করে এক বিপ্লব ঘটান। ভারী মখমলের কাপড়ে ঢাকা টেবিল ও লুকানো থলির (গিবেসিয়ার) পরিবর্তে তিনি মঞ্চকে সাজান এক অভিজাত লুই পঞ্চদশ যুগের ড্রইংরুমের মতো করে।
- সজ্জা: সাদা দেয়াল, সোনালি কারুকাজ ও আয়না—সব মিলিয়ে মার্জিত ও পরিশ্রুত পরিবেশ।
- আলো: ঝাড়বাতি ও মোমদানি ব্যবহারে মঞ্চ থাকে উজ্জ্বল ও খোলা।
- আসবাব: হালকা ও সরল আসবাব—একটি কেন্দ্রীয় টেবিল, দুটি কনসোল টেবিল এবং দুটি ছোট ত্রিপদী টেবিল (গেরিদোঁ)।
এই সাজসজ্জা দর্শকের মনে স্বাভাবিকতা ও আস্থার অনুভূতি তৈরি করত।২. মঞ্চের বিন্যাস ও যান্ত্রিক কৌশল
বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে এই মঞ্চ ছিল গোপন প্রকৌশলের এক বিস্ময়।
- ভাঁজ দরজা: মঞ্চের দু’পাশে বড় ভাঁজ দরজা ছিল, যা কেবল অলংকার নয়; সেগুলো দিয়ে বড় ও জটিল যান্ত্রিক স্বয়ংক্রিয় পুতুল সহজে আনা–নেওয়া করা যেত।
- কার্পেট: মেঝেতে পাতা কার্পেটের নিচে লুকানো থাকত পিস্টন ও যান্ত্রিক সংযোগ, যার মাধ্যমে নিচতলা থেকে নানা কৌশল চালু হতো।
- পেছনের তাক: মঞ্চের পেছনে লম্বা একটি তাক ছিল, যেখানে যন্ত্রপাতি রাখা থাকত—ফলে মাঝের অংশ থাকত পরিচ্ছন্ন ও “সৎ” দেখাতে।
৩. মনস্তাত্ত্বিক নকশা: স্বাগতিক ও অতিথি
রবার্ট-উডাঁ মনে করতেন, যাদুকর যেন কোনো অতিলৌকিক জাদুকর না হয়ে একজন ভদ্র স্বাগতিক হিসেবে আবির্ভূত হন।
- পোশাক: তিনি প্রথম সারির যাদুকরদের মধ্যে যিনি আলখাল্লা ও টুপির বদলে সন্ধ্যার আনুষ্ঠানিক পোশাক (টেইলকোট ও সাদা টাই) পরে মঞ্চে উঠতেন—যা দর্শকদের পোশাকের সঙ্গেই মানানসই।
- দর্শকসভার নাম: “পিট” শব্দটি বদলে তিনি ব্যবহার করেন “অ্যাম্ফিথিয়েটার”, যাতে ভদ্রমহিলা ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত দর্শকরা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।
৪. প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন
এই অধ্যায়ে বিদ্যুৎ ও অদৃশ্য যান্ত্রিক ব্যবস্থার সূক্ষ্ম ব্যবহারও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মঞ্চে শব্দ ও গতির জন্য তারের সংযোগ ছিল, যার মাধ্যমে সহকারীরা পর্দার আড়াল থেকে লিভার বা প্যাডেল চালিয়ে নানা ভেলকি নিয়ন্ত্রণ করতেন। দর্শকদের সঙ্গে মঞ্চের দূরত্ব ছিল হিসেব করে নির্ধারিত—যাতে কৌশলগুলো একেবারে চোখের সামনেই ঘটে বলে মনে হয়।
১. “স্কেলেটন” টেবিলের বিপ্লব
রবার্ট-উডাঁর আগে জাদুকরেরা সাধারণত মোটা মখমলের কাপড়ে ঢাকা টেবিল ব্যবহার করতেন, যা মেঝে পর্যন্ত নেমে যেত। আসলে সেগুলো ছিল বড় বড় আলমারির মতো—যার ভেতরে সহকারী বা জটিল যন্ত্র লুকিয়ে রাখা যেত। রবার্ট-উডাঁ এই ধরণের টেবিলকে “অসুন্দর ও সন্দেহজনক” বলে মনে করেন।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি ব্যবহার করেন লুই পঞ্চদশ শৈলীর তিন পা-ওয়ালা টেবিল। এর পা ছিল খুবই চিকন ও সুন্দর, আর উপরের অংশ ছিল অগভীর। প্রথম দেখায় মনে হতো, এর ভেতরে কিছুই লুকানো সম্ভব নয়। কিন্তু অধ্যায়টি জানায়, এই পাতলা পাগুলো অনেক সময় ফাঁপা থাকত। তার ভেতরে লুকানো থাকত “পিস্টন”—সরু ধাতব দণ্ড—যা মঞ্চের নিচ থেকে ওপরে উঠে টেবিলের ওপর রাখা যন্ত্রের ভেতরের গোপন প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করত।
২. “পিস্টন” ও “তিরঁ”-এর যান্ত্রিক ব্যবস্থা
রবার্ট-উডাঁর মঞ্চ-ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল শিল্পী ও মঞ্চের আড়ালে থাকা সহকারীর নিখুঁত সমন্বয়।
পিস্টন:
এগুলো ছিল উল্লম্ব ধাতব দণ্ড, যা মঞ্চের নিচে থাকা লিভারের সঙ্গে যুক্ত। সহকারী যখন লিভার টানত, তখন পিস্টন মঞ্চের খুব ছোট, অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে ওপরে উঠত। এই সামান্য নড়াচড়া দিয়েই কোনো স্প্রিং সক্রিয় হতো—যেমন যান্ত্রিক পাখির গান গাওয়া বা একটি বাক্স হঠাৎ খুলে যাওয়া।
তিরঁ (টানার তার):
এগুলো ছিল সরু সুতো বা তার, যা দূর থেকে কোনো বস্তু নড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। রবার্ট-উডাঁ অত্যন্ত যত্ন নিয়ে এগুলোকে পুলি দিয়ে সাজাতেন, যাতে কখনো জড়িয়ে না যায় এবং উজ্জ্বল মঞ্চ-আলোতেও চোখে না পড়ে।
৩. “সার্ভান্ত” বা গোপন তাক
রবার্ট-উডাঁর মঞ্চশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল সার্ভান্ত—জাদুকরের প্রধান টেবিলের পেছনে লাগানো একটি গোপন তাক, যা দর্শকের দৃষ্টির বাইরে থাকত।
এর কাজ:
এটি ছিল বস্তু রাখার বা সরানোর একটি গোপন জায়গা। জাদুকর চাইলে এখান থেকে চুপিচুপি কোনো বস্তু তুলে নিতে পারতেন, কিংবা কোনো জিনিস “অদৃশ্য” করতে তাকের ওপর রাখা নরম কুশনের ওপর ফেলে দিতে পারতেন—সবই এমন ভঙ্গিতে, যেন তিনি শুধু টেবিলটা ঠিক করছেন।
নতুনত্ব:
রবার্ট-উডাঁ জোর দিয়ে বলেন, সার্ভান্ত যত সহজে ব্যবহারযোগ্যই হোক, জাদুকরের শরীরী ভাষায় তার অস্তিত্ব ধরা পড়া চলবে না। তাঁর চোখের দৃষ্টি ও দেহভঙ্গি আসবাবের মতোই পরিকল্পিত হওয়া চাই।
৪. “কনফেডারেট”-এর সঙ্গে সমন্বয়
মঞ্চের আড়ালে থাকা সহকারীর সঙ্গে জাদুকরের মানসিক বন্ধন এখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এই সহকারী কেবল একজন শ্রমিক নন; তিনি ছিলেন সহ-শিল্পী, যাঁকে জাদুকরের সময়জ্ঞান আগেভাগেই বুঝতে হতো।
রবার্ট-উডাঁ নীরব সংকেতের একটি পদ্ধতির কথা বলেন—যেমন ছড়িতে হালকা টোকা বা কথার ফাঁকে নির্দিষ্ট শব্দ। এই সংকেতেই সহকারী বুঝে নিত, কখন যান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। এই অদৃশ্য সমন্বয়ই জাদুকে সহজ ও অতিলৌকিক মনে করাত।
৫. ফাঁদ বা “ট্র্যাপ”-এর ব্যবহার
পুরনো দিনের বড় ফ্লোর ট্র্যাপ থেকে সরে এসে রবার্ট-উডাঁ ব্যবহার করেন ছোট, সূক্ষ্ম ফাঁদ। এগুলো মঞ্চের মেঝে বা টেবিলের ওপর বসানো থাকত—স্প্রিংযুক্ত প্যানেল, যা কাঠের দানা বা কার্পেটের নকশার সঙ্গে এমনভাবে মিশে যেত যে বোঝাই যেত না। এর মাধ্যমে বস্তু মুহূর্তে অদৃশ্য বা দৃশ্যমান করা যেত।
তিনি বলেন, এসব ফাঁদের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত জরুরি। সামান্য শব্দ বা এক মুহূর্তের দেরিও “আধুনিক জাদু”-র ভ্রম ভেঙে দিতে পারে।
“উডাঁ দর্শন”-এর সারাংশ
রবার্ট-উডাঁর মতে, রুমালই হলো সর্বোত্তম জাদুর উপকরণ। কারণ এটি সহজে ভাঁজ করা যায়, গোপনে লুকানো যায়, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—প্রায় প্রত্যেক দর্শকের কাছেই একটি রুমাল থাকে। ফলে যখন জাদুকর সেই সাধারণ রুমাল ব্যবহার করেন, তখন দর্শকের মনে একধরনের বিশ্বাস জন্মায়। কিন্তু ঠিক সেই বিশ্বাসকেই ধীরে ধীরে ভেঙে দিয়ে জাদুকর তৈরি করেন বিস্ময়ের মুহূর্ত।
১. “ধার নেওয়া”র দর্শন
রবার্ট-উডাঁ জোর দিয়ে বলেন, ধার করা রুমাল দিয়ে দেখানো কৌশল, জাদুকরের নিজের রুমাল দিয়ে দেখানো কৌশলের চেয়ে দশ গুণ বেশি প্রভাব ফেলে। কারণ ধার নেওয়ার মাধ্যমে জাদুকর দর্শকের সঙ্গে একটি মানসিক সংযোগ তৈরি করেন।
যখন সেই ধার করা রুমালটি হঠাৎ করে নষ্ট হয়ে যায়, পুড়ে যায় বা অদৃশ্য হয়ে যায়—তখন দর্শকের আবেগও জড়িয়ে পড়ে। তারা অনুভব করে, যেন সত্যিই তাদের নিজের জিনিসটি বিপদের মুখে পড়েছে।
তবে এখানেই রয়েছে পেশাদার জাদুকরের কৌশলী বাস্তবতা। অধিকাংশ সময়েই ধার করা রুমালটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে “চেঞ্জ” বা অদলবদল কৌশলের মাধ্যমে একটি নকল রুমালে বদলে ফেলা হয়। দর্শক বুঝে ওঠার আগেই আসল রুমালটি নিরাপদে সরিয়ে রাখা হয়।
২. (যান্ত্রিক টান)
এই অধ্যায়ের অন্যতম অভিনব অংশ হলো “তিরঁ” বা যান্ত্রিক টান ব্যবহারের পদ্ধতি। এটি ছিল একটি সুতো বা ইলাস্টিক, যা জাদুকরের হাতার ভেতর লুকানো থাকত।
যন্ত্রের বিন্যাস:
সুতোটি কবজি থেকে শুরু হয়ে হাত বেয়ে পিঠের ওপর দিয়ে কোমরের বেল্ট বা প্যান্টের ভেতরে আটকানো থাকত।
প্রভাব:
জাদুকর যখন রুমালটি হাতে ধরে হঠাৎ ছেড়ে দিতেন, তখন সেই সুতো দ্রুত টেনে রুমালটিকে হাতার ভেতর বা কোটের নিচে নিয়ে যেত। পুরো ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটত যে মানবচোখ তা অনুসরণ করতে পারত না।
সূক্ষ্মতা:
রবার্ট-উডাঁ সতর্ক করে দেন—এই কাজের সময় কাঁধ বা শরীরে যেন কোনো ঝাঁকুনি না আসে। আসল জাদু যন্ত্রে নয়, বরং জাদুকরের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। যদি শরীর অস্বাভাবিকভাবে নড়ে ওঠে, তাহলে রহস্য ভেঙে যেতে পারে।
৩. “পোড়া এবং পুনরুদ্ধার” কৌশল
এটি এই অধ্যায়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রদর্শনী। রবার্ট-উডাঁ পুরো কৌশলটি তিনটি ধাপে ব্যাখ্যা করেছেন—
প্রথম ধাপ: বিসর্জন
ধার করা রুমালটি একটি বাক্স, পিস্তল বা বিশেষ পাত্রে রাখা হয়। মুহূর্তের মধ্যে সেটি পুড়ে গেছে বা কেটে গেছে বলে মনে হয়। দর্শক আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় ধাপ: অদলবদল
গোপন ফাঁদ বা হাতের কৌশলে আসল রুমালটি সরিয়ে রাখা হয়। কখনও সেটি একটি ফলের (যেমন লেবু) ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়, কখনও আবার মঞ্চে আগে থেকেই রাখা তালাবদ্ধ বাক্সের মধ্যে।
তৃতীয় ধাপ: পুনর্জন্ম
অবশেষে সেই অক্ষত রুমালটি আবার দর্শকদের সামনে হাজির করা হয়। রবার্ট-উডাঁ বলেন, এখানে গন্ধের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি দর্শক মনে করে রুমালটি পুড়ে গিয়েছিল, তবে পুনরুদ্ধার হওয়া রুমালটি হতে হবে সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও সতেজ—যাতে আগের “ধ্বংস” ও বর্তমান “পুনর্জন্ম”-এর মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি হয়।
৪. নিজে থেকে খুলে যাওয়া গিঁট (“আত্মিক” প্রভাব)
উনবিংশ শতাব্দীতে অনেক সময় এই কৌশলকে “আত্মিক শক্তি”র প্রভাব হিসেবে উপস্থাপন করা হতো—যেন অদৃশ্য আত্মা এসে গিঁট খুলে দিচ্ছে।
কিন্তু রবার্ট-উডাঁ ছিলেন যুক্তিবাদী। তিনি দেখান, বিশেষ ভাঁজ ও স্লিপ-নটের মাধ্যমে এমনভাবে গিঁট বাঁধা যায় যে, রুমালের প্রান্তে টান দিলেই তা নিজে থেকেই খুলে যায়।
এখানে কোনো অলৌকিকতা নেই—এটি কেবল জ্যামিতি ও টানের সুষম প্রয়োগের ফল।
৫. রঙ পরিবর্তন ও “বহুগুণ বৃদ্ধি”
এই অংশে বর্ণনা করা হয়েছে কীভাবে একটি বড় রুমালের ভেতরে একাধিক ছোট সিল্ক রুমাল লুকিয়ে রাখা যায়, অথবা নকল আঙুল বা তালুর মধ্যে লুকানো নলের সাহায্যে সেগুলো গোপন রাখা যায়।
লোডিং কৌশল:
“পাম” বা তালুতে লুকিয়ে রাখার পদ্ধতিতে রুমালটিকে হাতের বাঁকে এমনভাবে ধরে রাখা হয়, যেন হাত সম্পূর্ণ খালি মনে হয়।
প্রকাশ:
আঙুলের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে রুমাল টেনে বের করলে মনে হয় একটি রঙ অন্য রঙে রূপ নিচ্ছে, অথবা একটি রুমাল হঠাৎ বহু রুমালে পরিণত হচ্ছে।
কৌশলের সারমর্ম
এই অধ্যায়ের মূল শিক্ষা হলো—হাতের মাধ্যমে মনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা।
রবার্ট-উডাঁ শেখান, হাত কখনো চোখের চেয়ে দ্রুত চলবে না; বরং এমনভাবে চলবে, যাতে চোখকে ভুল দিকে পরিচালিত করা যায়।
যন্ত্র যতই নিখুঁত হোক, আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে ভঙ্গির সৌন্দর্যে। স্বাভাবিক, সাবলীল ও আত্মবিশ্বাসী চলাফেরা—এই গুণগুলিই যেকোনো যান্ত্রিক কৌশলকে অদৃশ্য করে দেয়।
Top of Form
Bottom of Form
হালকা ও ভারী সিন্দুক — যখন বিজ্ঞান হয়ে ওঠে জাদু
এই অধ্যায়ে Jean-Eugène Robert-Houdin তাঁর বিখ্যাত “হালকা ও ভারী সিন্দুক” কৌশলটির বর্ণনা দিয়েছেন। এটি শুধু দর্শককে আনন্দ দেওয়ার জন্য ছিল না; বরং ১৮৫৬ সালে আলজেরিয়ায় তাঁর কূটনৈতিক অভিযানে এই জাদুই হয়ে উঠেছিল ফরাসি রাষ্ট্রশক্তির এক নীরব অস্ত্র। এই অধ্যায়টি ঘড়ির যান্ত্রিক যুগ ও বিদ্যুতের নতুন যুগের মধ্যবর্তী এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করে।
১. রহস্যময় সিন্দুক
এই যন্ত্রটি দেখতে ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ছোট আকারের একটি পালিশ করা মাহোগানি কাঠের বাক্স, ওপরে একটি রুপার হাতল। রবার্ট-উডাঁ দর্শকদের মধ্য থেকে একজন সবল পুরুষকে ডেকে বাক্সটি তুলতে বলতেন। প্রথমবার সে অনায়াসেই তুলে ফেলত।
এরপর জাদুকর ঘোষণা করতেন—তিনি শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে লোকটির শক্তি কেড়ে নেবেন। মুহূর্তের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যেত। সেই একই মানুষ সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও ছোট্ট সিন্দুকটি মাটি থেকে তুলতে পারত না। পেশি ফুলে উঠত, মুখ লাল হয়ে যেত, তবুও সিন্দুক নড়ত না।
২. রহস্যের উৎস: ইলেক্ট্রোম্যাগনেটের জন্ম
দর্শকেরা ভাবত এখানে আত্মা, অলৌকিক শক্তি বা কোনো ঈশ্বরীয় হস্তক্ষেপ কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। এটি ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের এক সাহসী প্রয়োগ, এমন এক সময়ে যখন বিদ্যুৎ সাধারণ মানুষের কাছে ছিল সম্পূর্ণ রহস্যময়।
- সিন্দুকের গঠন: বাক্সের নিচে লুকানো ছিল একটি লোহার পাত।
- মঞ্চের নিচে: ঠিক যেখানে সিন্দুকটি রাখা হতো, মঞ্চের তলায় বসানো ছিল একটি শক্তিশালী ইলেক্ট্রোম্যাগনেট।
- বিদ্যুৎ সংযোগ: পর্দার আড়ালে থাকা সহকারী সংকেত পেলেই রাসায়নিক ব্যাটারির মাধ্যমে সার্কিট সম্পূর্ণ করত। তখন চুম্বকের আকর্ষণ এত প্রবল হতো যে মানুষের পক্ষে তা অতিক্রম করা অসম্ভব হয়ে পড়ত।
৩. “শক্তি কেড়ে নেওয়া”-র মনস্তত্ত্ব
রবার্ট-উডাঁ স্পষ্ট করে বোঝান—যন্ত্রই আসল জাদু নয়, জাদু তৈরি হয় কথার মাধ্যমে।
তিনি কখনো বলেননি, “সিন্দুকটি ভারী হয়ে গেছে।”
তিনি বলতেন, “আমি তোমার শক্তি কেড়ে নিচ্ছি।”
এই কথার পরিবর্তন দর্শকের মনোযোগ বস্তু থেকে সরিয়ে মানুষের নিজের শরীর ও মানসিক অবস্থার দিকে নিয়ে যেত। স্বেচ্ছাসেবক নিজেকে দুর্বল মনে করতে শুরু করত, আর সেই অনুভূতিই বিজ্ঞানকে অসম্ভব ও অলৌকিক বলে বিশ্বাস করতে বাধ্য করত।
৪. আলজেরিয়ায় অভিযান: জাদু যখন কূটনীতি
এই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে আলজেরিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। সেখানে স্থানীয় ধর্মীয় নেতা বা মারাবুতরা দাবি করত, তাদের অলৌকিক ক্ষমতা আছে এবং তারা চাইলে বিদ্রোহ উসকে দিতে পারে।
রবার্ট-উডাঁ এই সিন্দুক কৌশল ব্যবহার করে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন—ফরাসি “জাদু”, অর্থাৎ বিজ্ঞান, তাদের তথাকথিত অলৌকিক শক্তির চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
যখন এক প্রভাবশালী গোত্রপ্রধান সিন্দুক তুলতে ব্যর্থ হন, তখন তাঁর অপমান হয় এবং তিনি মানসিকভাবে পরাজিত বোধ করেন। এর ফলেই সম্ভাব্য এক সশস্ত্র সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। ইতিহাসে এটি বিরল এক ঘটনা, যেখানে মঞ্চের জাদু বাস্তব যুদ্ধ থামাতে সহায়ক হয়েছিল।
৫. কারিগরি সমস্যা ও গোপন তার
১৮৫০-এর দশকে বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যাটারি ছিল ভারী ও অনির্ভরযোগ্য।
রবার্ট-উডাঁ ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে তাকে এসিডভিত্তিক ব্যাটারি লুকিয়ে রাখতে হতো এবং তারগুলো নিখুঁতভাবে নিরোধক করতে হতো, যাতে আগুন না লাগে বা দর্শক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট না হয়।
সবচেয়ে কঠিন ছিল সিন্দুক বসানোর স্থান। চুম্বকের ঠিক মাঝখানে না রাখলে সামান্য বিচ্যুতিতেই পুরো কৌশল ব্যর্থ হয়ে যেত।
৬. দ্বিতীয় ধাপ: বিদ্যুৎ-আঘাত
কখনো কখনো তিনি আরও এক স্তরের প্রতারণা যোগ করতেন। যদি স্বেচ্ছাসেবক বারবার সিন্দুক তুলতে চেষ্টা করত, তবে হাতলের ভেতর দিয়ে হালকা বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। এতে লোকটি হঠাৎ চমকে পিছিয়ে যেত এবং দর্শকদের মনে আরও দৃঢ়ভাবে বসে যেত—কোনো অদৃশ্য, ঐশ্বরিক শক্তি সিন্দুকটিকে রক্ষা করছে।
পিস্তলের এক গুলিতে জ্বলে ওঠা একশোটি মোমবাতি
এই অধ্যায়ে এসে রবার্ট-উডাঁ ছোটখাটো বস্তু নিয়ে সূক্ষ্ম কারুকাজের জগৎ ছেড়ে প্রবেশ করেন এক বিশাল মঞ্চনাট্যের পরিসরে—যাকে তিনি নিজেই বলতে পারেন “গ্র্যান্ড থিয়েটার”। এখানে লক্ষ্য ছিল দর্শকের ইন্দ্রিয়কে এক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলা, যাতে তারা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় যে মঞ্চ ও পরিবেশের উপর জাদুকরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
১. নাটকীয় সূচনা
রবার্ট-উডাঁ খুব ভালোভাবেই বুঝতেন, একটি প্রদর্শনের প্রথম কয়েক সেকেন্ডই পুরো সন্ধ্যার আবহ তৈরি করে দেয়। তাই তিনি প্রায়ই অর্ধ-অন্ধকারে তার প্রদর্শনী শুরু করতেন। ঠিক সেই মুহূর্তে, তিনি আকাশের দিকে পিস্তল তাক করে গুলি ছুঁড়তেন—আর সঙ্গে সঙ্গে ঝাড়বাতি ও ক্যান্ডেলাব্রায় থাকা সব মোমবাতি একযোগে জ্বলে উঠত।
এটি শুধু একটি কৌশল ছিল না; এটি ছিল ক্ষমতার ঘোষণা। পিস্তলের প্রচণ্ড শব্দ দর্শকদের হঠাৎ চমকে দিত। এই আকস্মিক চমক বা startle response কাজে লাগিয়ে যান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষণিক দেরি সম্পূর্ণভাবে আড়াল করা হতো। দর্শক কিছু বোঝার আগেই আলোয় ভরে যেত পুরো মঞ্চ।
২. বৈজ্ঞানিক রহস্য: গ্যালভানিক স্পার্ক
এই বিস্ময়কর ঘটনার পেছনে ছিল তৎকালীন আধুনিক এক প্রযুক্তি—গ্যালভানিক ব্যাটারি, যা ছিল বিদ্যুৎ ব্যাটারির প্রাথমিক রূপ।
প্রস্তুতি:
প্রতিটি মোমবাতির সলতে বিশেষভাবে তৈরি করা হতো। সলতের কাছে অল্প পরিমাণ ফসফরাস বা অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ (প্রায়ই অ্যালকোহলজাত তরল, যাকে তখন spirit of wine বলা হতো) ব্যবহার করা হতো।
বিদ্যুৎ সংযোগ:
মোমবাতিগুলোর সলতের উপর দিয়ে খুব সূক্ষ্ম প্লাটিনামের তার টানা থাকত। এই তারগুলো ক্যান্ডেলাব্রার ভেতর দিয়ে লুকানো সার্কিটে যুক্ত থাকত এবং মঞ্চের নিচে চলে যেত।
আগুন জ্বলা:
পর্দার আড়ালে থাকা একজন সহকারী ঠিক পিস্তলের গুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সার্কিট সম্পূর্ণ করত। সঙ্গে সঙ্গে প্লাটিনামের তার সাদা-গরম হয়ে উঠত। এই তাপ রাসায়নিক পদার্থে আগুন ধরিয়ে দিত, আর সেই আগুন থেকেই জ্বলে উঠত মোমবাতি।
৩. পিস্তলের গুলি: বিভ্রান্তির কৌশল
প্রশ্ন আসতে পারে—পিস্তল ব্যবহার করার দরকারই বা কী?
রবার্ট-উডাঁ বলেন, এর ছিল দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
শব্দের আড়াল:
বিদ্যুৎ সুইচের ক্ষুদ্র শব্দ বা রাসায়নিক জ্বলার সামান্য ‘হিসহিস’ শব্দ—সবই পিস্তলের বিস্ফোরণে ঢাকা পড়ে যেত।
মানসিক সংযোগ:
দর্শকের মনে একটি কারণ-ফলাফলের সম্পর্ক তৈরি হতো। তারা ভাবত, গুলির আগুনই যেন মোমবাতিগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। বাস্তবে কোনো সরাসরি সংযোগ না থাকলেও মস্তিষ্ক নিজেই এই ভ্রান্ত যুক্তি তৈরি করে নিত। এটি ছিল দর্শকের মনে মিথ্যা কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি বসিয়ে দেওয়ার এক অসাধারণ উদাহরণ।
৪. নিখুঁত কারিগরি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ
এই অধ্যায়ে রবার্ট-উডাঁর পরিশ্রমী ও নিখুঁত মানসিকতার পরিচয় স্পষ্ট হয়। ১৮৫০-এর দশকে বিদ্যুৎ দিয়ে একশোটি মোমবাতি জ্বালানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
সংযোগের সমস্যা:
যদি তারের একটিও ছিঁড়ে যেত, পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ত। তখন মঞ্চ অন্ধকারে ডুবে যেত এবং জাদুকরকে পড়তে হতো চরম বিব্রতকর অবস্থায়।
পরিষ্কারের নিয়ম:
প্রতিটি প্রদর্শনের পর যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক ছিল। তারে জমে থাকা কার্বনের স্তর হাত দিয়ে সরাতে হতো। সূক্ষ্ম প্লাটিনামের তার এতটাই নাজুক ছিল যে ঘড়ি মেরামতকারীর মতো ধৈর্য ও নিখুঁততা নিয়ে প্রতিবার সেট করতে হতো।
৫. গ্যাস আলো থেকে বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ
ইতিহাসের দিক থেকে এই অধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তখনকার বেশিরভাগ থিয়েটারেই গ্যাসের আলো ব্যবহৃত হতো, যা হাতে জ্বালাতে হতো এবং ছিল বিপজ্জনক। সেই সময়ে রবার্ট-উডাঁ বিদ্যুতের মাধ্যমে আলো জ্বালিয়ে দর্শকদের সামনে ভবিষ্যতের এক ঝলক তুলে ধরেন।
তিনি যেন এক প্রযুক্তিগত ভবিষ্যদ্বক্তা—যিনি জাদুর আড়ালে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন বিদ্যুৎ যুগের সম্ভাবনা ও বিস্ময়।
দ্য ঘোস্ট ইল্যুশন – সময়ের আগেই জন্ম নেওয়া এক ‘সিনেমা’
এই অধ্যায়ে জঁ-ইউজেন রবার্ট-উদাঁ (Jean-Eugène Robert-Houdin) ছোটখাটো যন্ত্র বা হাতসাফাইয়ের কৌশল থেকে সরে এসে পুরো মঞ্চ-পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করার বিস্ময়কর এক পদ্ধতির কথা বলেন। “ঘোস্ট ইল্যুশন” বা ভূতের বিভ্রম কেবল একটি জাদু কৌশল নয়—এটি আধুনিক অর্থে বিশেষ প্রভাব (special effects)-এর সূচনা। আলো ও কাচের সাহায্যে এমন এক দৃশ্যমান বাস্তবতা তৈরি করা হয়, যা মঞ্চের ত্রিমাত্রিক জগতে আসলে অস্তিত্বই রাখে না।
১. স্বচ্ছতা ও প্রতিফলনের পদার্থবিদ্যা
এই ইল্যুশনের ভিত্তি হলো কাচের দ্বৈত স্বভাব। রবার্ট-উদাঁ ব্যাখ্যা করেন, উন্নত মানের, রুপালি প্রলেপবিহীন (unsilvered) বড় প্লেট-গ্লাস একই সঙ্গে জানালা এবং আয়নার মতো আচরণ করতে পারে।
স্বচ্ছতা (Transparency):
যখন কাচের পেছনের মঞ্চভাগে তীব্র আলো ফেলা হয়, দর্শক কাচের অস্তিত্ব বুঝতেই পারে না। তারা সরাসরি অভিনেতা ও সাজসজ্জা দেখতে পায়।
প্রতিফলন (Reflection):
কিন্তু কাচের সামনে থাকা কোনো বস্তুতে আলো ফেললে, তার প্রতিফলন দর্শকের চোখে এমনভাবে ধরা পড়ে যেন সেটি কাচের পেছনে অবস্থান করছে—ঠিক যত দূরত্বে আসল বস্তুটি কাচের সামনে রয়েছে।
এই দুই বৈশিষ্ট্যের সূক্ষ্ম ব্যবহারের মাধ্যমেই “অদৃশ্যকে দৃশ্যমান” করে তোলা সম্ভব হয়।
২. ‘হিডেন ওয়েল’ – মঞ্চের গোপন বিন্যাস
এই ইল্যুশন সফল করতে প্রয়োজন ছিল বিশেষ মঞ্চ-গঠন, যাকে বলা যায় বিভক্ত মঞ্চ (split stage)।
দৃশ্যমান মঞ্চ:
এখানে মূল অভিনেতারা অভিনয় করতেন—যা দর্শকের সামনে সরাসরি দৃশ্যমান।
ঘোস্ট ওয়েল:
এটি ছিল গোপন একটি অংশ, সাধারণত অর্কেস্ট্রা পিটে বা মঞ্চের সামনের কিনারার নিচে। দর্শকের দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকা এই স্থানে “ভূত” চরিত্রের অভিনেতা অবস্থান করতেন।
কাচের বিভাজন:
দর্শক ও মঞ্চের মাঝখানে ৪৫ ডিগ্রি কোণে স্থাপন করা হতো বিশাল এক প্লেট-গ্লাস। এটি এতটাই পরিষ্কার ও নিখুঁতভাবে বসানো থাকত যে দর্শক বুঝতেই পারত না এর অস্তিত্ব।
এই গঠনই ছিল পুরো কৌশলের স্থাপত্যভিত্তি।
৩. আসল রহস্য: আলোর নিয়ন্ত্রণ
রবার্ট-উদাঁ স্পষ্ট করে বলেন—জাদু কাচে নয়, জাদু লুকিয়ে আছে আলোয়। আলোই ছিল বাস্তবতার “ডিমার সুইচ”।
ভূতের আবির্ভাব (Fading In):
গোপন অংশে থাকা অভিনেতার ওপর ধীরে ধীরে লাইট বাড়ানো হতো। আলো যত বাড়ত, কাচে তার প্রতিফলন তত স্পষ্ট হয়ে উঠত। ফলে দর্শকের চোখে ধীরে ধীরে একটি “ভূত” উপস্থিত হতে দেখা যেত।
স্বচ্ছতার নিয়ন্ত্রণ:
মূল মঞ্চ ও গোপন অংশের আলোর ভারসাম্য বদলে দিয়ে জাদুকর ভূতকে কখনো দৃঢ় ও বাস্তব, কখনো আধা-স্বচ্ছ করে তুলতে পারতেন। এমনকি কখনো দর্শক ভূতের শরীর ভেদ করে মঞ্চের পেছনের দেয়াল পর্যন্ত দেখতে পেত।
এ যেন আলোর ভাষায় লেখা এক নাটক।
৪. কোরিওগ্রাফি ও পারস্পরিক সমন্বয়
এই অধ্যায়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ হলো মঞ্চ-নির্দেশনা সম্পর্কিত পরামর্শ। ইল্যুশনটি সফল করতে দৃশ্যমান অভিনেতা ও গোপন “ভূত” অভিনেতার চলাফেরা হতে হতো নিখুঁত সমন্বিত।
কারণ দৃশ্যমান অভিনেতা আসলে ভূতকে দেখতে পেতেন না—প্রতিফলনটি কেবল দর্শকের দিকেই দৃশ্যমান ছিল। তাই অভিনেতাকে আগে থেকেই নির্দিষ্ট জায়গা মুখস্থ করে নিতে হতো—কোথায় তাকাতে হবে, কোথায় তলোয়ার চালাতে হবে।
রবার্ট-উদাঁ উল্লেখ করেন, যখন একজন অভিনেতা তলোয়ার দিয়ে সেই জায়গায় আঘাত করতেন যেখানে দর্শকের চোখে ভূতটি দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হতো, তখন তলোয়ারটি যেন ধোঁয়ার মানুষের শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে—এই দৃশ্যই ভিক্টোরীয় যুগের দর্শকদের কাছে অতিপ্রাকৃত প্রমাণের চূড়ান্ত মুহূর্ত হয়ে উঠত।
৫. বাস্তব চ্যালেঞ্জ: দাগ ও দ্বৈত প্রতিবিম্ব
এই বিশাল মাপের জাদুতে নানা বাস্তব সমস্যা ছিল।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা:
কাচে যদি একটি আঙুলের ছাপ বা সামান্য ধুলো জমে থাকত, তাতে আলো পড়ে কাচের উপস্থিতি ফাঁস হয়ে যেত। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ত বিভ্রম।
দ্বৈত প্রতিবিম্ব (Double Image):
কাচ বেশি পুরু হলে সামনের ও পেছনের পৃষ্ঠ থেকে দুটি প্রতিবিম্ব তৈরি হতে পারত—যেন “ভূতেরও ভূত”! তাই সবচেয়ে উন্নত ও পাতলা প্লেট-গ্লাস নির্বাচন ছিল অত্যন্ত জরুরি।
অভিনেতার নিরাপত্তা:
“ভূত” অভিনেতাকে অনেক সময় ঢালু বোর্ডে শুয়ে বা অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে অভিনয় করতে হতো, যাতে তার প্রতিফলন মঞ্চে সোজা ও সঠিক উচ্চতায় দেখা যায়। এতে শারীরিক ঝুঁকিও ছিল।
৬. কাহিনির নতুন দিগন্ত
রবার্ট-উদাঁ শেষাংশে বলেন, এই ইল্যুশন জাদুশিল্পের চরিত্রই বদলে দেয়। এটি কেবল ধাঁধা বা হাতসাফাই নয়—এটি হয়ে ওঠে বিশাল দৃশ্য-নির্ভর নাট্যময়তা। এর মাধ্যমে ভৌতিক কাহিনি, শেক্সপিয়রের নাটকের দৃশ্য, কিংবা ভয়াল অলৌকিক গল্প মঞ্চস্থ করা সম্ভব হয়—যা দর্শকের কাছে তাসের খেলার চেয়ে অনেক বেশি স্বপ্নময় ও গভীর অভিজ্ঞতা তৈরি করত।
ইন্ডিয়ান বাস্কেট ট্রিক – জ্যামিতি ও আতঙ্কের নন্দনকৌশল
এই অধ্যায়ে Jean-Eugène Robert-Houdin এমন এক কৌশলের বিশ্লেষণ করেন, যার উৎপত্তি ভারতের ভ্রাম্যমাণ ফকিরদের হাতে। একটি সাধারণ বেতের ঝুড়ি, একটি কাপড় এবং একটি তলোয়ার—এই সামান্য উপকরণ দিয়েই কীভাবে দর্শকদের মনে চরম ভয় ও বিস্ময়ের সঞ্চার করা যায়, তা তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। আধুনিক মঞ্চে এই কৌশল শুধু দৃষ্টিবিভ্রম নয়, বরং আবেগের এক নাটকীয় উত্থান-পতনের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
১. “নিষ্ঠুর জাদুকর”-এর নাটকীয় কাহিনি
রবার্ট-উডাঁ লক্ষ্য করেন, এই কৌশলটি তাঁর অন্যান্য ভদ্র, ড্রয়িংরুম-কেন্দ্রিক জাদু প্রদর্শনীর থেকে ভিন্ন। এখানে জাদুকর নিজেকে একপ্রকার প্রতিপক্ষ বা খলচরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন।
পরিবেশনা: একটি ছোট শিশু বা ক্ষীণকায় সহকারীকে এমন একটি বেতের ঝুড়িতে বসানো হয়, যা দেখতে খুবই ছোট—মনে হয় যেন সেখানে কারও স্থানই হবে না।
সংঘাত: জাদুকর হঠাৎ রাগান্বিত হয়ে ওঠেন বা বিরক্তির ভান করেন। ক্রমে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন—এমন ভাব সৃষ্টি করে ঝুড়ির ভেতর তলোয়ার ঢুকিয়ে দেন একের পর এক। দর্শক স্তম্ভিত হয়ে যায়।
সমাধান: নাটকের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, তথাকথিত “শিকার” সম্পূর্ণ অক্ষত। কখনও সে ঝুড়ি থেকেই বেরিয়ে আসে, কখনও মঞ্চের পেছন দিক থেকে উপস্থিত হয়। মুহূর্তেই আতঙ্ক রূপ নেয় স্বস্তি ও উল্লাসে।
২. গোপন রহস্য: শরীরের “কুণ্ডলী” কৌশল
রবার্ট-উডাঁ ব্যাখ্যা করেন, এই কৌশলের আসল শক্তি লুকানো ফাঁদ বা গোপন দরজায় নয় (যদিও কিছু মঞ্চ সংস্করণে সেগুলি ব্যবহার করা হয়েছে)। এর আসল রহস্য মানুষের শরীরের নমনীয়তা।
ঝুড়ির গঠন: ঝুড়িটি মাঝখানে সামান্য ফোলা এবং উপর-নিচে সরু। এই বিশেষ আকৃতিই কৌশলের ভিত্তি।
অবস্থান গ্রহণ: ঢাকনা বন্ধ হওয়ার পর এবং কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সহকারী নিচে বসে থাকে না। সে পিঠটি ঝুড়ির বাঁকানো অংশে ঠেকিয়ে শরীরটিকে বৃত্তাকারে গুটিয়ে নেয়। হাত-পা দেয়ালের ভেতরের অংশ জড়িয়ে ধরে।
শূন্যস্থান: এভাবে ঝুড়ির মাঝখানে একটি ফাঁকা স্থান তৈরি হয়। ফলে জাদুকর বিভিন্ন কোণ থেকে তলোয়ার ঢুকিয়েও মাঝের সেই ফাঁকা জায়গা দিয়ে সহজেই পার করে দিতে পারেন—ভেতরের ব্যক্তির গায়ে স্পর্শ না করেই।
এই কৌশলটি মূলত জ্যামিতিক উপলব্ধির এক সূক্ষ্ম প্রয়োগ—কোন জায়গায় কতটা স্থান ফাঁকা রাখা যায়, সেটিই এখানে মুখ্য।
৩. ইন্দ্রিয়ের প্রতারণা: চিৎকার ও রক্তের ভান
রবার্ট-উডাঁ দেখিয়েছেন, কৌশলটির বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় সংবেদনশীল উপাদানের মাধ্যমে।
শব্দ: তলোয়ার ঢোকার মুহূর্তে সহকারী মৃদু আর্তনাদ বা চিৎকার করে। এই শব্দের সময়নির্ধারণ অত্যন্ত নিখুঁত হতে হয়, যাতে দর্শকের মনে বাস্তব আঘাতের অনুভূতি জন্মায়।
তলোয়ারের গতি: তলোয়ারটি এমনভাবে চালানো হয় যেন সেটি কোনো কঠিন বস্তুর ভেতর দিয়ে যাচ্ছে—প্রথমে বাধা, তারপর হঠাৎ ঢিলে হয়ে যাওয়া। এই অভিনয় দর্শকের মনে “বাস্তবতার” ছাপ ফেলে।
উন্মোচন: কখনও জাদুকর ঝুড়ির ভেতর নিজেই দাঁড়িয়ে দেখান যে সেটি ফাঁকা। সহকারী যেহেতু পাশের ফোলা অংশে গুটিয়ে থাকে, মাঝখানে জায়গা অবশিষ্ট থাকে।
৪. ইউরোপীয় মঞ্চে অভিযোজন
ভারতীয় পথ-জাদুকরেরা সাধারণত বড় কাপড় দিয়ে নড়াচড়া আড়াল করতেন। কিন্তু রবার্ট-উডাঁ তাঁর থিয়েটারে অধিক স্বচ্ছ ও পরিশীলিত রূপ দিতে চেয়েছিলেন।
তিনি ঝুড়িটিকে সাধারণ লাগেজের মতো করে নকশা করেন, যাতে সেটি সন্দেহজনক না লাগে।
আলোকসজ্জা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন যাতে বেতের সামান্য নড়াচড়াও দর্শকের চোখে না পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি জোর দেন পরিচ্ছন্নতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক দক্ষতার ওপর—যেন আধুনিক জাদুকর অন্ধকার শক্তির আশ্রয় নেন না, বরং যুক্তি ও কৌশলের মাধ্যমে বিস্ময় সৃষ্টি করেন।
৫. মানসিক মুক্তি: ভয়ের পর স্বস্তি
এই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো দর্শকের আবেগীয় টানাপোড়েন। দর্শক জানে এটি একটি কৌশল, তবু তলোয়ার ঢোকার মুহূর্তে শরীর কেঁপে ওঠে। এই ক্ষণিক ভয়ই কৌশলটির প্রাণ। শেষে যখন সহকারী অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসে, তখন এক গভীর স্বস্তি ও আনন্দ সৃষ্টি হয়।
জাদুর প্রকৃত শক্তি তাই ঝুড়ির ফাঁকা জায়গায় নয়—বরং সেই নাটকীয় রূপান্তরে, যেখানে জাদুকর সম্ভাব্য হত্যাকারী থেকে মুহূর্তেই রূপ নেন নিরীহ বিনোদনকারীতে। এই আবেগের দোলাচলই কৌশলটিকে চিরকালীন করে রেখেছে।
আত্মিক প্রকাশভঙ্গি: সংশয়বাদী জাদুকর
এই অধ্যায়ে রবার্ট-উডাঁ নিজেকে এক ধরনের বৈজ্ঞানিক গোয়েন্দা হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি দেখান, উনিশ শতকে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা Spiritualism বা আত্মাবাদ কীভাবে মঞ্চ/sdk_prof հավել্য হিসেবে জাদুর কৌশল ব্যবহার করে শোকাহত ও কৌতূহলী মানুষদের বিভ্রান্ত করত। এই অধ্যায়ের মূল লক্ষ্য একটিই—所谓 “আত্মিক প্রকাশ”-এর প্রতিটিই যে আসলে পার্থিব ও শারীরিক কারণের ফল, তা যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করা।
১. “স্পিরিট র্যাপিং” – মৃতদের বর্ণমালা
তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে পরিচিত আত্মিক প্রকাশ ছিল টেবিল বা দেয়ালে রহস্যময় টোকা বা শব্দ, যা নাকি প্রশ্নের উত্তরে দেওয়া হতো। রবার্ট-উডাঁ এগুলোকে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেন।
শারীরিক কৌশল:
কিছু মাধ্যম তাদের পায়ের আঙুলের জয়েন্ট বা পেশি এমনভাবে নাড়াতে পারত যে মেঝেতে একটি জোরালো শব্দ সৃষ্টি হতো। বাইরে থেকে তারা সম্পূর্ণ স্থির মনে হলেও, এই কৌশলে দর্শকরা বিশ্বাস করত—অদৃশ্য কোনো শক্তি সাড়া দিচ্ছে।
বিদ্যুৎচালিত টোকা:
বিদ্যুৎ বিষয়ে নিজের জ্ঞান ব্যবহার করে উডাঁ দেখান, কীভাবে টেবিলের পা বা দেয়ালের ভেতরে লুকানো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক যন্ত্র বসানো হতো। অন্য ঘরে থাকা এক সহযোগী এই যন্ত্র চালিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে টোকা দিত। ফলে “আত্মা”-র উত্তরগুলো অস্বাভাবিকভাবে বুদ্ধিদীপ্ত ও নিখুঁত মনে হতো।
২. টেবিল ঘোরা ও “ফ্লুইডিক শক্তি”
১৮৫০-এর দশকে সারা বিশ্বে “টেবিল ঘোরা” নিয়ে প্রবল উন্মাদনা দেখা যায়। কয়েকজন মানুষ টেবিল ঘিরে বসে থাকত, আর কিছুক্ষণ পর টেবিল নিজে থেকেই নড়তে বা ঘুরতে শুরু করত—এমনটাই বিশ্বাস করা হতো।
অচেতন পেশি-চাপ:
আধুনিক বিজ্ঞানে যাকে Ideomotor Effect বলা হয়, উডাঁ একে ব্যাখ্যা করেন “অজান্তে সৃষ্ট পেশির চাপ” হিসেবে। মানুষ যখন আশা করে টেবিল নড়বে, তখন তাদের অজান্তেই সামান্য চাপ সৃষ্টি হয়, যা একত্রে টেবিলকে কাত বা সরিয়ে দেয়।
যান্ত্রিক সহায়তা:
যেসব ক্ষেত্রে টেবিল পুরোপুরি মাটি ছেড়ে উঠত, সেখানে লুকানো হুক, আংটি বা বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। এগুলো টেবিলের নিচে আটকে দিয়ে মাধ্যম খুব সামান্য হাত তুলেই টেবিল তুলে ফেলতে পারত।
৩. সিয়াঁস কক্ষের মনস্তত্ত্ব
রবার্ট-উডাঁ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন—মানুষ কেন এসব ঘটনায় বিশ্বাস করে। তাঁর মতে, অন্ধকারই মাধ্যমের সবচেয়ে বড় সহায়ক।
অল্প আলোয় চোখ সহজেই বিভ্রান্ত হয়। তেল মাখানো ফিতা বা রঙ করা বস্তু অন্ধকারে “জ্যোতির্ময় ধোঁয়া” বলে মনে হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অন্ধকারে মানুষের কল্পনা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। গালে একটি পালকের হালকা ছোঁয়াও তখন মনে হয় যেন কোনো প্রেতাত্মার স্পর্শ।
৪. “মাধ্যম” বনাম “জাদুকর”
এই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মাধ্যমদের চরিত্র নিয়ে উডাঁর সমালোচনা। একজন জাদুকর তার কৌশলের কৃতিত্ব নিজেই নেন। কিন্তু মাধ্যম দাবি করে—সে কিছুই জানে না, সে কেবল এক ধরনের বাহন।
উডাঁ সতর্ক করে দেন, এই ভানই সবচেয়ে অনৈতিক, কারণ এটি শোকাহত মানুষের আবেগকে কাজে লাগায়।
তিনি বলেন, মঞ্চে একই কৌশল দেখিয়ে তার ব্যাখ্যা দেওয়া আসলে সমাজের জন্য এক ধরনের সেবা—যা মানুষকে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তির ঢাল দেয়।
৫. লেখা ও স্লেটের “অলৌকিকতা”
উডাঁ তথাকথিত “স্পিরিট রাইটিং”-এর রহস্যও উন্মোচন করেন। যেখানে বন্ধ স্লেটে মৃত স্বজনের বার্তা দেখা যায় বলে দাবি করা হতো, সেখানে ব্যবহৃত হতো—
- আগে থেকে লেখা স্লেট: অন্ধকারে খালি স্লেট বদলে প্রস্তুত স্লেট এনে ফেলা।
- লুকানো চক: আংটির সঙ্গে বা নখের নিচে ছোট চক লুকিয়ে রেখে, টেবিলের নিচে স্লেট ধরে রেখে দ্রুত কিছু লিখে ফেলা।
সক্রেটিসের আবক্ষ মূর্তি – জীবন্ত মস্তক
এই অধ্যায়ে রবার্ট-উডাঁ এমন এক ভেলকির বর্ণনা দেন, যা প্রথম দর্শনে জীববিজ্ঞানের সমস্ত নিয়মকেই অস্বীকার করে বলে মনে হয়। মঞ্চের মাঝখানে একটি ছোট, তিন পায়ের টেবিলের ওপর বসানো রয়েছে দার্শনিক সক্রেটিসের একটি আবক্ষ মূর্তি। চারপাশে কোনো পর্দা নেই, ভারী কোনো বাক্স বা আলমারিও নেই। দর্শকরা টেবিলের নিচে ও চারদিকে স্পষ্টভাবে দেখতে পান। তবু সেই পাথরের মতো দেখতে মূর্তিটি হঠাৎই জীবন্ত হয়ে ওঠে—চোখ মেলে তাকায় এবং দর্শকদের প্রশ্নের জবাব দেয় মানুষের মতো বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে।
১. মঞ্চস্থ উপস্থাপনা
এই ভেলকির আসল শক্তি ছিল এর খোলামেলা বিন্যাসে। রবার্ট-উডাঁ খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন—কোনো বস্তুর চারপাশে যত বেশি খোলা জায়গা থাকবে, তত কম সন্দেহ জাগবে। তাই তিনি সক্রেটিসের মূর্তিটিকে একটি চিকন, তিন পায়ের টেবিলের ওপর বসান। এতে ভারী কাপড় বা লুকোনোর জায়গার সুযোগই থাকে না।
মূর্তিটি দর্শকদের সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথনে লিপ্ত হয়। তার উত্তরগুলো এতটাই তাৎক্ষণিক ও বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ যে বোঝাই যায়—এটি কোনো আগে থেকে বানানো যান্ত্রিক পুতুল নয়, বরং যেন এক চিন্তাশীল জীবন্ত সত্তা।
২. অপটিক্যাল রহস্য: “A-ফ্রেম” আয়না
এই ভেলকির মূল কৌশলটি ছিল সমতল আয়নার নিখুঁত ব্যবহার।
বিন্যাস:
টেবিলের তিনটি পায়ের মাঝখানে দুটি অত্যন্ত চকচকে আয়না বসানো হয়। উপর থেকে দেখলে আয়নাগুলো “V” আকারে মিলিত হয়।
প্রতিফলন:
এই আয়নাগুলো ঠিক ৪৫ ডিগ্রি কোণে স্থাপন করা ছিল। মঞ্চের পাশের পর্দা ও মেঝের নকশা এবং রং ছিল একেবারে একই। ফলে আয়নাগুলো পাশের দিকের দৃশ্যকে প্রতিফলিত করত। সামনে বসা দর্শকদের কাছে সেই প্রতিফলনটি মনে হতো যেন টেবিলের ফাঁক দিয়ে মঞ্চের পেছনের অংশ দেখা যাচ্ছে।
ফলাফল:
আয়নার পেছনে তৈরি হওয়া ত্রিভুজাকার একটি গোপন স্থান সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যেত। দর্শকদের চোখে সেটি ছিল ফাঁকা জায়গা, অথচ সেখানে বাস্তবে কিছু লুকিয়ে ছিল।
৩. জীবন্ত অভিনেতা
এই অদৃশ্য ত্রিভুজাকার জায়গার ভেতরেই লুকিয়ে থাকত একজন জীবন্ত মানুষ—সাধারণত ছোটখাটো ও ছিপছিপে গড়নের কোনো অভিনেতা বা সহকারী।
অবস্থান:
অভিনেতা বসে থাকত পা ভাঁজ করে বা হাঁটু গেড়ে। তার মাথা টেবিলের ওপর করা একটি ছিদ্র দিয়ে বের হতো। সেই ছিদ্রের চারপাশে বিশেষভাবে তৈরি একটি কলার থাকত, যা দেখতে পাথরের মূর্তির গলার অংশের মতো লাগত।
মেকআপ:
অভিনেতার মুখে লাগানো হতো নিস্তেজ, পাথরের রঙের গ্রিজপেইন্ট। উনিশ শতকের তীব্র মঞ্চ আলোর নিচে এই রঙ মানুষের ত্বকের স্বাভাবিক গঠনকে সম্পূর্ণ আড়াল করে দিত, ফলে মুখটি সত্যিই পাথরের মূর্তির মতো দেখাত।
৪. প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ: “ঘোস্টিং” সমস্যা
রবার্ট-উডাঁ একজন পেশাদার শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আয়না ব্যবহারের নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেছেন।
আয়নার সংযোগস্থল:
দুটি আয়না যেখানে মিলিত হতো, সেই জায়গাটি একেবারেই অদৃশ্য হতে হতো। সামান্য ফাঁক বা ধার চোখে পড়লেই পুরো ভেলকি ভেঙে যেত।
ধুলো ও আঙুলের ছাপ:
গ্যাসলাইট ও কয়লার ধুলোর যুগে আয়নাগুলো পরিষ্কার রাখা ছিল ভীষণ কঠিন। একটি ছোট দাগও আয়নায় ভেসে উঠত, যেন ফাঁকা বাতাসে ঝুলে থাকা কোনো চিহ্ন।
আলোর ভারসাম্য:
মঞ্চের পাশের পর্দা (যা আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছিল) এবং পেছনের অংশের আলো একেবারে সমান হতে হতো। সামান্য আলোর তারতম্য হলেই দর্শক বুঝে ফেলত—ওটা আসলে প্রতিফলন।
৫. “সক্রেটীয়” সংলাপ: চিত্রনাট্যের গুরুত্ব
রবার্ট-উডাঁ জোর দিয়ে বলেন, আয়নার যান্ত্রিক কৌশল ছিল ভেলকির মাত্র অর্ধেক। বাকি অর্ধেক নির্ভর করত অভিনেতার অভিনয়ের ওপর।
যিনি সক্রেটিসের চরিত্রে অভিনয় করতেন, তাকে ইতিহাস, দর্শন ও সমসাময়িক ঘটনাবলি সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হতো, যাতে চরিত্রটি বিশ্বাসযোগ্য থাকে।
দর্শকদের সঙ্গে এই কথোপকথন ছিল এক ধরনের মানসিক নোঙর। মানুষ কথাবার্তায় এতটাই মগ্ন হয়ে পড়ত যে তারা আর কৌশল খুঁজতে চাইত না। এটিই মানসিক বিভ্রান্তির উৎকৃষ্ট উদাহরণ—মস্তিষ্ককে এমন এক ধাঁধায় ব্যস্ত রাখা, যাতে সে বাস্তবের খুঁটিনাটি খুঁজে দেখার সুযোগ না পায়।
এই ভেলকিটিই আজকের ভূতুড়ে বাড়ি বা জাদু অনুষ্ঠানে দেখা “প্লেটে রাখা জীবন্ত মাথা” ধরনের নানা কৌশলের পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ধ্বনিবিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর প্রভাব – অদৃশ্য শব্দের বিজ্ঞান
এই অধ্যায়ে রবার্ট-উডাঁ এমন এক অভিনব জাদুপ্রভাবের বর্ণনা দিয়েছেন, যা সাধারণভাবে “ম্যাজিক বেল” বা “ক্রিস্টাল কাস্কেট” নামে পরিচিত। এতে একটি স্বচ্ছ কাঁচের ঘণ্টা বা ছোট স্ফটিকের বাক্স খুবই সূক্ষ্ম, প্রায় অদৃশ্য রেশমি সুতো বা পাতলা তারে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ঘণ্টাটি ঘরের মাঝখানে থাকে—দেয়াল, আসবাব কিংবা অন্য কোনো কিছুর সংস্পর্শ থেকে সম্পূর্ণ দূরে। তবু বিস্ময়করভাবে, জাদুকরের প্রশ্নের উত্তরে সেই ঘণ্টা নিজে থেকেই বেজে ওঠে, যেন কোনো অদৃশ্য হাত তাকে নাড়াচাড়া করছে।
১. স্বচ্ছতার শক্তি
রবার্ট-উডাঁ প্রথমেই একটি মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক সত্য ব্যাখ্যা করেন—স্বচ্ছতা মানেই সততা। দর্শক যখন কাঠের তৈরি কোনো বাক্স দেখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা গোপন খোপ বা যন্ত্রের সন্দেহ করে। কিন্তু যখন তারা দেখে, একটি পুরোপুরি স্বচ্ছ কাঁচের ঘণ্টা শুধু একটি সুতোয় ঝুলছে, তখন তাদের মনে হয়—এখানে কিছু লুকোনোর জায়গাই নেই। মানুষের এই মানসিক প্রবণতাকেই উডাঁ কাজে লাগিয়েছিলেন। কাঁচ ও রেশমের মতো “সবচেয়ে সৎ” উপকরণ ব্যবহার করে তিনি লুকিয়ে ফেলেছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি।
২. প্রযুক্তিগত রহস্য: টেলিগ্রাফের নীতি
এই “বিস্ময়কর প্রভাব” আসলে তড়িৎচুম্বকত্বের এক প্রাথমিক ব্যবহার।
ঝুলন্ত ব্যবস্থা: যে রেশমি সুতোটি দেখা যেত, সেটি শুধু সুতো ছিল না। এর ভেতরে লুকিয়ে থাকত দু’টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, নিরোধক-ঢাকা তামার তার—নতুন আবিষ্কৃত টেলিগ্রাফে ব্যবহৃত তারের মতোই।
হাতুড়ি ব্যবস্থা: কাঁচের ঘণ্টার ওপরের অংশে বা স্ফটিক বাক্সের ঢাকনায় গোপনে বসানো থাকত একটি ক্ষুদ্র তড়িৎচুম্বক এবং ছোট ধাতব হাতুড়ি।
বিদ্যুৎ বর্তনী: এই তারগুলো ছাদ বেয়ে ওপরের ঘর বা মেঝের নিচ দিয়ে মঞ্চের আড়ালে থাকা একটি গোপন স্থানে পৌঁছাত, যেখানে একজন সহকারী বসে থাকত ব্যাটারি (গ্যালভানিক পাইল) ও টেলিগ্রাফ কী নিয়ে।
৩. পরিবেশনা: হ্যাঁ, না, এবং “আত্মা”
সহকারী যখন টেলিগ্রাফ কী চাপত, তড়িৎচুম্বক সক্রিয় হয়ে হাতুড়িটিকে টেনে নিত, আর সেটি কাঁচে আঘাত করত।
একবার ঘণ্টা বাজলে অর্থ “হ্যাঁ”, দুইবার বাজলে অর্থ “না”।
তারগুলো এতটাই সূক্ষ্ম এবং যন্ত্রপাতি এতটাই ছোট ছিল যে দর্শক সরাসরি ঘণ্টার দিকে তাকিয়েও কেবল স্বচ্ছ কাঁচ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেত না। উডাঁ ইচ্ছাকৃতভাবে ঘণ্টা থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়াতেন, যাতে প্রমাণ হয় তিনি সেটি স্পর্শ করছেন না। এতে দর্শকের সন্দেহ জাদুকরের দিক থেকে সরে গিয়ে অদৃশ্য “আত্মা” বা রহস্যময় শক্তির দিকে চলে যেত।
৪. স্মৃতিনির্ভর সমন্বয় (In-Memory Sync)
এই অধ্যায়ের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে জাদুকর ও সহকারীর নিখুঁত সমন্বয়ের কথা। সহকারী অনেক সময় অন্য ঘরে বা মঞ্চের অনেক ওপরে লুকিয়ে থাকত। তাই জাদুকরের প্রশ্ন স্পষ্টভাবে শোনা তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
উডাঁ এখানে “ধ্বনি নল” বা লম্বা ফাঁপা পাইপ ব্যবহারের কথা বলেন, যা দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে রাখা থাকত। এগুলো এক ধরনের আদিম ইন্টারকমের মতো কাজ করত। এর মাধ্যমে সহকারী দর্শকের প্রশ্ন শুনে ঠিক সময়ে “আত্মার” উত্তর দেওয়ার সংকেত দিতে পারত।
৫. প্রযুক্তিগত সমস্যার মোকাবিলা
১৮৫০-এর দশকের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে উডাঁকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
তারের ভঙ্গুরতা: তার এত পাতলা হতে হতো যাতে চোখে না পড়ে, আবার এতটাই মজবুত হতে হতো যাতে ঘণ্টার ওজন ধরে রাখতে পারে এবং বিদ্যুৎ পরিবহণে পুড়ে না যায়।
অবশিষ্ট চুম্বকত্ব: কখনো কখনো বিদ্যুৎ বন্ধ করার পরও হাতুড়ি চুম্বকের সঙ্গে লেগে থাকত। উডাঁ এই সমস্যার সমাধান করেন একটি ক্ষুদ্র স্প্রিং বা বিশেষ ধরনের নরম লোহার কোর ব্যবহার করে। এর ফলে ঘণ্টার শব্দ হতো পরিষ্কার ও আলাদা।
৬. মানসিক “তৃতীয় হাত”
অধ্যায়ের শেষে উডাঁ ব্যাখ্যা করেন, শব্দ মানুষের মনে দৃষ্টির চেয়ে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। চোখে দেখা কোনো কৌশল একটি ধাঁধার মতো মনে হয়, কিন্তু ফাঁকা জায়গা থেকে ভেসে আসা শব্দ মানুষের কাছে বুদ্ধিমান কোনো সত্তার উপস্থিতি বলে মনে হয়। ঘণ্টাকে যখন তিনি একটি “কণ্ঠস্বর” দিলেন, তখন দর্শক যন্ত্র খোঁজা বন্ধ করে একটি চরিত্রের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
আয়না ও ভীতির শিল্প
এই অধ্যায়ে রবার্ট-উডাঁ তাঁর অন্যতম ভয়াবহ ও বিস্ময়কর বিভ্রম কৌশল “দ্য স্ফিংক্স” সম্পর্কে বিশদে আলোচনা করেছেন। এই জাদুতে মঞ্চে একটি ছোট কিন্তু কারুকার্যখচিত বাক্স রাখা হয়, যা থাকে তিন পায়ের একটি হালকা টেবিলের উপর। জাদুকর বাক্সটি খুলতেই দর্শকের সামনে প্রকাশ পায় একটি মানুষের মাথা—যার সঙ্গে কোনো শরীর নেই। সেই মাথা চোখ মেলে তাকায়, চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে এবং দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে। দৃশ্যটি সহজ, অথচ গভীরভাবে ভীতিকর।
১. “খোলা” মঞ্চ-নকশা
এই কৌশলের সাফল্য নির্ভর করে দর্শকের এই বিশ্বাসের উপর যে তারা টেবিলের নিচের সবকিছু পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছে। রবার্ট-উডাঁ জোর দিয়ে বলেছেন, টেবিলটি অবশ্যই অত্যন্ত সরু ও হালকা দেখতে হবে। যদি টেবিলটি আলমারি বা বাক্সের মতো লাগে, তবে জাদুর প্রভাব সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
মাত্র তিনটি পাতলা পা ব্যবহার করে তিনি দর্শকের মনে এক ধরনের “দৃশ্যমান স্বচ্ছতা” তৈরি করেন, যা তাদের সন্দেহকে আগেই নিস্তেজ করে দেয়।
২. অপটিক্যাল রহস্য: সমকোণ প্রতিফলন
এই বিভ্রমের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে আয়নার নিখুঁত ব্যবহারে।
“V” আকৃতির বিন্যাস
টেবিলের তিনটি পায়ের মাঝখানে দুটি আয়না বসানো হয়। এই দুটি আয়না মাঝের পায়ে এসে মিলিত হয় এবং দর্শকের দিকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে থাকে। ফলে আয়নাগুলি মিলিয়ে একটি “V” আকৃতি তৈরি করে।
একটানা পটভূমি
মঞ্চের মেঝে ও দেয়াল একই নকশার কাপড় বা কার্পেটে ঢাকা থাকে—সাধারণত হীরক বা চেক ডিজাইনের। ৪৫ ডিগ্রি কোণের কারণে আয়নায় মঞ্চের পাশের অংশ প্রতিফলিত হয়, কিন্তু দর্শকের চোখে তা মঞ্চের পেছনের অংশেরই স্বাভাবিক সম্প্রসারণ বলে মনে হয়।
অদৃশ্য আশ্রয়
এই বিন্যাসে আয়নার পেছনে একটি ত্রিভুজাকার ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। সেখানেই সহকারী আরামে বসে থাকে। তার শরীর সম্পূর্ণ লুকানো থাকে, শুধু মাথাটি টেবিলের ছিদ্র দিয়ে উঠে এসে বাক্সের ভিতরে দেখা যায়।
৩. বাক্সের মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা
মাথাটি সরাসরি টেবিলের উপর না রেখে বাক্সের ভিতরে রাখার পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।
- আবিষ্কারের নাটকীয়তা: বাক্সের ঢাকনা খুলে মাথা “আবিষ্কার” করার মুহূর্তটি দর্শকের মনে প্রবল নাটকীয় উত্তেজনা তৈরি করে।
- সীমার আড়াল: বাক্সের প্রান্ত মাথা ও টেবিলের সংযোগস্থল ঢেকে রাখে, যেখানে আসলে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে থাকে।
- আলো ও ছায়া: বাক্সের ভিতরের হালকা ছায়া মেকআপের সূক্ষ্ম অংশগুলো আড়াল করে, ফলে বিচ্ছিন্ন মাথার ভ্রম আরও বাস্তব মনে হয়।
৪. কারিগরি নিখুঁততা: সংযোগরেখার সমস্যা
এই কৌশলের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো দুটি আয়নার মাঝখানে তৈরি হওয়া উল্লম্ব সংযোগরেখা।
মাঝের পায়ের ব্যবহার
টেবিলের সামনের মাঝের পাটি এমনভাবে বসানো হয় যে সেটিই আয়নার সংযোগস্থল ঢেকে দেয়। ফলে দর্শক কখনোই কাঁচের প্রান্ত দেখতে পায় না।
নকশার নিখুঁত মিল
মেঝের নকশা যদি এক চুলও এদিক-ওদিক হয়, তবে প্রতিফলনে অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে যাবে। রবার্ট-উডাঁ লিখেছেন, প্রতিটি প্রদর্শনের আগে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ও চক হাতে নিয়ে মাপজোক করতেন, যাতে জ্যামিতিতে কোনো ত্রুটি না থাকে।
৫. অভিনয়: গম্ভীর চরিত্র
এই বিভ্রমে হাস্যরসের কোনো স্থান নেই। জাদুকরকে হতে হয় গম্ভীর, প্রায় ধর্মীয় আচার পালনের মতো সংযত।
সহকারী—অর্থাৎ “মাথা”—কেও কথা বলতে হয় শূন্য, দূরবর্তী স্বরে, যেন সে কোনো অজানা জগত থেকে কথা বলছে।
দর্শক যদি হাসে, তবে জাদু ভেঙে যায়। কিন্তু যদি তারা বিস্ময় ও হালকা ভয়ে নীরব হয়ে যায়, তবে আয়নার বিজ্ঞান আর প্রশ্নের মুখে পড়ে না।
৬. “খালি” প্রমাণ
কৌশলের শেষে জাদুকর বাক্সটি বন্ধ করে টেবিল সরিয়ে নেন বা মুহূর্তের মধ্যেই বাক্সটি খালি দেখান। সহকারী সহজেই মাথা নামিয়ে আয়নার আড়ালে সরে যায়।
এই দ্বিগুণ প্রমাণ—আগে মাথা দেখা, পরে শূন্যতা—দর্শকের মনে অসম্ভবের ধারণাকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রোটিয়ান ক্যাবিনেট – অদৃশ্য হওয়ার জ্যামিতি
এই অধ্যায়ে রবার্ট-উডাঁ আয়না-নির্ভর দৃষ্টিভ্রম থেকে সরে এসে শারীরিক ছদ্মবেশ ও কাঠামোগত প্রকৌশলের দিকে দৃষ্টি দেন। প্রোটিয়ান ক্যাবিনেট দেখতে লম্বা, আলমারির মতো একটি কাঠামো—চারটি সরু পায়ের ওপর দাঁড়ানো, যাতে দর্শকরা নিচটা “পরিষ্কার” দেখতে পায়। বাইরে থেকে মনে হয় ভেতরের জায়গা খুবই সীমিত, অথচ এই ক্যাবিনেটের ভেতরেই একাধিক মানুষ লুকোতে পারে, স্থান বদলাতে পারে, এমনকি একেবারে অদৃশ্যও হয়ে যেতে পারে।
১. “ভিজুয়াল ইকোনমি”-র নীতি
রবার্ট-উডাঁ ব্যাখ্যা করেন—মানুষের চোখ বস্তুটির বাইরের মাপ আর ভেতরের গভীরতার সম্পর্ক ঠিকমতো হিসেব করতে পারে না। প্রোটিয়ান ক্যাবিনেট ইচ্ছে করেই বাইরে থেকে যতটা পাতলা দেখায়, ভেতরে আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি জায়গা লুকিয়ে রাখে।
ফ্রেমিং: বাইরের প্রান্তে মোটা অলংকৃত ছাঁচ এবং ভেতরে সামান্য ঢোকানো দেওয়াল ব্যবহার করে শিল্পী কয়েক ইঞ্চি জায়গা “চুরি” করেন—যা দর্শকের মস্তিষ্ক ধরতেই পারে না।
উচ্চতা: চারটি চিকন পায়ের ওপর ক্যাবিনেট তোলার ফলে মেঝের নিচে ফাঁদ থাকার সন্দেহ উড়ে যায়। দর্শকের দৃষ্টি বাধ্য হয়ে বাক্সের ভেতরের দিকেই আটকে থাকে—যেখানেই শিল্পী আসলে প্রস্তুত থাকেন গোপন রহস্য লুকোতে।
২. গোপন কৌশল: দোলনকারী “V” আকৃতির পেছন
আগের অধ্যায়ের স্ফিংক্সে যেখানে আয়না ব্যবহৃত হয়েছিল, প্রোটিয়ান ক্যাবিনেটে প্রায়শই ব্যবহৃত হয় যান্ত্রিক ডাবল-ব্যাক বা “V” আকৃতির পার্টিশন।
যন্ত্রকৌশল: ক্যাবিনেটের ভেতরটা একটানা আয়তাকার ঘর নয়। পেছনের কোণায় দুটি প্যানেল হিঞ্জে আটকানো থাকে, যা ভেতরের দিকে ঘুরে এসে “V” আকৃতি তৈরি করে।
ছদ্মবেশ: এই প্যানেলগুলোর পেছনের দিক ক্যাবিনেটের ভেতরের পাশের দেওয়ালের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে রঙ করা। প্যানেলগুলো “V” অবস্থায় এলে, তাদের পেছনে তৈরি ত্রিভুজাকৃতি ফাঁকে সহকারী লুকিয়ে পড়ে।
প্রকাশ: খোলা দরজার সামনে দাঁড়ানো দর্শকের চোখে কোণাকুণি প্যানেলগুলো সমতল পেছনের দেওয়ালই মনে হয়। নিয়ন্ত্রিত আলো ও ম্যাট (অ-প্রতিফলক) রঙ গভীরতার ক্ষতিটুকু সম্পূর্ণ আড়াল করে দেয়।
৩. রূপান্তর (মেটামরফোসিস)
এই ক্যাবিনেট ব্যবহার করে কীভাবে “মেটামরফোসিস” প্রদর্শনী করা হয়, তা উডাঁ বিশদে জানান।
প্রথমে ব্যক্তি ‘A’ ক্যাবিনেটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে।
এরপর সে দ্রুত “V” প্যানেলের পেছনে সরে যায়।
ব্যক্তি ‘B’, যিনি শুরু থেকেই প্যানেলের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন, মূল অংশে বেরিয়ে আসেন।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলতেই দর্শক দেখে—মানুষ বদলে গেছে।
এই রূপান্তরের প্রাণ হলো গতি। উডাঁ জোর দিয়ে বলেন, সহকারীকে নীরবে ও দ্রুত চলার জন্য একেবারে অ্যাক্রোবেটের মতো চটপটে হতে হবে।
৪. “খোলা দরজা” প্রতারণা
এই অধ্যায়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল কৌশলগুলোর একটি হলো ধারাবাহিক উন্মোচন। জাদুকর প্রথমে বাম দরজা খুলে দেখান—ফাঁকা। বন্ধ করেন। তারপর ডান দরজা খুলে দেখান।
গোপন প্যানেলগুলো পর্দার মতো এদিক-ওদিক সরিয়ে সহকারী যেন জাদুকরের নড়াচড়াকে “ঘিরে” চলে।
বামে তাকালে সহকারী ডানে সরে যায়, ডানে তাকালে বামে। ফলে মনে হয় পুরো ক্যাবিনেটটাই ফাঁকা—যদিও সহকারী পুরো সময় ভেতরেই ছিল।
৫. আলো ও “ছায়া অঞ্চল”
উনিশ শতকের গ্যাসলাইটে আলো কাঁপত, ছায়া পড়ত। উডাঁ সতর্ক করেন—ক্যাবিনেটের ভেতরের আলো এমন হতে হবে যাতে কোণে কোনো ছায়া না জমে। কোনো গোপন দরজা আর দেওয়ালের সংযোগস্থলে ছায়া পড়লেই ভ্রম ভেঙে যায়। তাই তিনি ম্যাট রঙ ও বিশেষ টেক্সচারের পরামর্শ দেন, যা আলো শুষে নিয়ে যান্ত্রিক ধারগুলো ঢেকে রাখে।
৬. “প্রোটিয়ান” দর্শন
উডাঁর মতে, এই ক্যাবিনেট শারীরিক বিভ্রান্তির এক অনন্য পাঠ। এখানে শুধু মানুষ লুকোনো হয় না; লুকোনো হয়—মানুষ লুকোনোর সম্ভাবনাই। চারদিক থেকে দেখানো, নিচটা খোলা রেখে দেখানো—সব মিলিয়ে দর্শকের যুক্তিবোধের সামনে এক অদৃশ্য দেয়াল দাঁড় করানো হয়। তাই শেষ মুহূর্তে সহকারীর আবির্ভাব একেবারে অলৌকিক বলে মনে হয়।
ড্যাভেনপোর্ট ব্রাদার্সের কীর্তি: সেঁয়ান্সের বিজ্ঞান
এই অধ্যায়ে রবার্ট-উডাঁ ১৮৬০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা “স্পিরিট ক্যাবিনেট” প্রদর্শনীর ভেতরের সত্য উন্মোচন করেছেন। সাধারণ দর্শক যেখানে প্রেতাত্মা দেখত, সেখানে উডাঁ দেখেছেন মানবদেহের গঠন ও পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম। তাঁর দৃষ্টিতে ড্যাভেনপোর্ট ভাইরা কোনো অলৌকিক মাধ্যম নন; বরং তারা তাদের সময়ের সবচেয়ে দক্ষ “পালিয়ে যাওয়ার শিল্পী” বা এস্কেপ আর্টিস্ট।
১. প্রস্তুতি পর্ব: “কমিটি” এবং গিঁটের খেলা
ড্যাভেনপোর্ট ভাইদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দর্শকদের সরাসরি অভিনয়ে যুক্ত করা। তারা মঞ্চে একদল সন্দেহপ্রবণ দর্শক—যাদের বলা হতো “কমিটি অব স্কেপ্টিকস”—আমন্ত্রণ জানাত। এই কমিটির সদস্যরাই ভাই দু’জনকে চেয়ারে বসিয়ে বড় কাঠের ক্যাবিনেটের ভেতরে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিত।
নিরাপত্তার ভ্রান্ত ধারণা:
দর্শকেরা যত জটিল গিঁট দিত, এমনকি মোম দিয়ে সিল করত, ততই তারা নিশ্চিত হতো যে কোনোভাবেই মুক্ত হওয়া অসম্ভব। কিন্তু রবার্ট-উডাঁ দেখান, বাস্তবে উল্টোটা ঘটত—গিঁট যত জটিল, ভাইদের পক্ষে মুক্ত হওয়া তত সহজ।
“ঢিলা জায়গা”-র গোপন কৌশল:
বাঁধার সময় বিশেষ কিছু পেশি টানটান করে রাখা বা হাত নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে ক্রস করে রাখার মাধ্যমে তারা দড়ির ভেতরে অদৃশ্য একটু ঢিল তৈরি করত। ক্যাবিনেটের দরজা বন্ধ হওয়ার পর একটি গভীর নিশ্বাস বা কবজির সামান্য মোচড়ই চলাচলের জন্য যথেষ্ট হতো।
২. “আত্মা”-র আবির্ভাব
দরজা বন্ধ হতেই ক্যাবিনেটের ভেতর তাণ্ডব শুরু হতো। ঘণ্টা বাজত, জানালা দিয়ে ট্যাম্বোরিন ছুড়ে ফেলা হতো, গিটার নিজে নিজেই বাজতে শুরু করত।
বাস্তবতা কী ছিল:
দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরা সেই “ঢিলা” লুপ থেকে হাত বের করে নিত। ভেতরটা অন্ধকার থাকায় তারা সহজেই বাদ্যযন্ত্র ধরতে, বাজাতে এবং ছুড়ে ফেলতে পারত। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আবার দড়ির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিত—দরজা খোলার ঠিক আগে।
“ভৌতিক হাত”:
মাঝের দরজার ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে সাদা, ফ্যাকাশে হাত বেরিয়ে দর্শকদের দিকে নাড়ানো হতো। উডাঁ জানান, এগুলো আসলে তাদের নিজের হাতই—কখনো সাদা পাউডার মাখা, কখনো হালকা রঙের গ্লাভস পরা—যাতে অল্প আলোয় হাতগুলো অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়।
৩. “টম-ফুলস নট”
এই অধ্যায়ে রবার্ট-উডাঁ গিঁটের কারিগরি দিক ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি একটি বিশেষ স্লিপ-নটের কথা বলেন, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন “টম-ফুলস নট”। বাইরে থেকে এটি শক্ত করে বাঁধা মনে হলেও, আসলে এটি স্লাইড করা ফাঁসের মতো কাজ করে।
ড্যাভেনপোর্ট ভাইরা দড়ি বাঁধার কৌশলে ছিলেন অতুলনীয়। শণ আর রেশমি দড়ির ঘর্ষণ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ছিল যে কোনো নাবিকের চেয়েও গভীর।
সমমিতির নিখুঁততা:
এক ভাই আরেক ভাইকে সাহায্য করে ঠিক আগের মতোই নিজেকে আবার বেঁধে ফেলতে পারত, যাতে কমিটি ফিরে এসে কোনো পার্থক্য খুঁজে না পায়।
৪. শব্দ ও মনস্তত্ত্বের আড়াল
উডাঁ উল্লেখ করেন, ক্যাবিনেট শুধু লুকানোর জায়গা ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের শব্দবাক্স।
ট্যাম্বোরিন ও ঘণ্টার উচ্চ শব্দ ভাইদের চলাফেরার ধাক্কা বা দড়ির সরে যাওয়ার শব্দ ঢেকে দিত।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে, তারা দর্শকদের বিশ্বাসের এক পরীক্ষা নিত। “আত্মা” আসার আগে ও পরে গিঁট পরীক্ষা করতে দিয়ে তারা দর্শকদের এক যুক্তির ফাঁদে ফেলত—গিঁট যদি একই থাকে, তবে নিশ্চয়ই প্রেতাত্মা কাজ করেছে। উডাঁ দেখান, আসল রহস্য লুকিয়ে আছে মাঝখানের সময়ে, যখন দরজা বন্ধ থাকে।
৫. “ময়দা পরীক্ষা”-র প্রতারণা
কখনো কখনো তারা প্রমাণ হিসেবে হাতে ময়দা ধরে রাখত। দরজা খোলার পর যদি ময়দা হাতে থাকে, তবে নাকি প্রমাণ হয় যে হাত নড়েনি।
উডাঁ এই কৌশল ভেঙে দেন। ভাইরা ময়দা গোপন পকেটে ফেলে কাজ সেরে নিত, তারপর অন্য একটি লুকানো থলি থেকে নতুন করে ময়দা নিয়ে হাতে রাখত। এটি ছিল বুদ্ধিমান সন্দেহপ্রবণদের ধরার জন্য দ্বিতীয় স্তরের প্রতারণা।
৬. নৈতিক সমালোচনা
অধ্যায়ের শেষে রবার্ট-উডাঁ এক বিরল নৈতিক অবস্থান নেন। তিনি ড্যাভেনপোর্ট ভাইদের কারিগরি দক্ষতার প্রশংসা করলেও, তাদের কৌশলকে “অলৌকিক” বলে দাবি করার তীব্র নিন্দা করেন। তাঁর মতে, প্রকৃত জাদুকর হওয়া উচিত “সৎ প্রতারক”—যিনি দর্শককে জানান যে এটি বিনোদনের জন্য করা কৌশল, বিশ্বাসপ্রবণ মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে কাজে লাগানো নয়।

