“চোর”
দাঁড়ান। আপনাকে সার্চ করা হবে।
না, একদম নড়বেন না… প্লিজ।
“প্লিজ,” বলল বটে, কিন্তু সে যেন আদেশের মতো আওয়াজ করল।
আমি জানি সার্ট ইন করার জায়গায় কৌটোটা আটকে আছে। কিন্তু ওরা বুঝলো কি করে!
আমি দুহাত তুলে হাতাচ্ছি। চোখ বন্ধ রাখবো কি করে? অবধারিতভাবেই কৌটোটা বেরিয়ে এলো।
এই সেন্ট্রাল এ.সি করা রুমেও আমি ঘামছি। চোখের জল আটকাতে পারছি না। বড় খতমের দোয়া, ইউনুস শব্দটা মনে পড়ছে। আর কিছু না।
তুকুনের মুখ ভাসছে চোখে। অনিমার কান্না শুনতে পাচ্ছি।
“কি বলবেন এখন?”
“আমি চোর নই।”
“তাই নাকি? এখন পুলিশ আসুক।”
“প্লিজ… এটা করবেন না। ছবি তুলছেন কেন?”
ওরা যেন আমাকে কোনো চিড়িয়া মনে করছে। দাঁড় করিয়ে রেখে ফোন করছে, হাসছে।
আমার মাথা ফাঁকা, বোধ শূন্য।
আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? হয়তো, পাগল হওয়ার আগে এমনই লাগে…
পিঠে সজোরে ধাক্কা সামলাতে না পেরে আমি সেল্ফের গায়ে পড়লাম।
কতক্ষণ এভাবে গেছে মনে নেই।
হঠাৎ একজন লোক এল। সুগন্ধির নরম ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। ওনার পেছনে পুলিশও দেখা গেল।
আমার তেষ্টা লাগল। পানি চাইলাম। কিছু সময়ে এক সময় ও দিল। তারপর ঝটকায় আমাকে হাতকড়া পরালো।
সুপারশপের সামনে থেকে ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে গেল।
আমার ফোনটা হাতিয়ে নিয়েছিল, এখন আর দরকার মনে হচ্ছে না। কাকেই কি বলব? বরং যা খুশি হোক আমাকে।
পুলিশ অফিসার হেসে বলল,
“আগে কখনো ধরা পড়েন নাই, তাই না? কতদিন ধরে এভাবে চলছে? এমন কাঁচা কাজ কেও করে?”
তিনি ব্যঙ্গ করে হেসে উঠলেন। আমার একটাই প্রশ্ন—
“দুধের কৌটো কেন?”
“তুকুনের জন্য।”
“কে? আপনার কি হয়?”
“ও… আমার বাচ্চা।”
“বুঝলাম, কিন্তু চুরি করতে গেলেন কেন?”
আমি ধপ করে বসে, পায়ে ধরে বললাম,
“বাচ্চাটা দুই দিন ধরে না খেয়ে আছে। আপনি আমাকে যা খুশি করুন, কিন্তু বাচ্চাটার দুধের ব্যবস্থা করুন।”
হঠাৎ অফিসারের মুখের হাসি নিভে গেল।
সম্পূর্ণ অন্য রকম লাগল। তিনি দুহাতে আমাকে তুলে দাঁড় করালেন।
আমার হাতে সেই কৌটোটা ধরে দিয়ে বললেন,
“বাসায় ফিরে যান। কিছু ফর্মালিটিজ আছে, সেগুলো সারতে হবে। আর এটি আপনার ফোন।”
ওনার গা থেকে যেন আলো ছড়িয়ে পড়লো। আমি মুগ্ধ হয়ে বলতে শুরু করলাম—
“কোভিডের সময় আমার চাকরি চলে গেছে। অনেক খুঁজেও আর চাকরি জোগাড় করতে পারিনি। দুই মাস আগে বাচ্চা হয়েছে। সিজারিয়ান, সব টাকা খরচ হয়ে গেছে। বাচ্চার মা খেতে পায়নি, ক্ষিদে কাঁদছে। তাই আমি…”
আমি আর বলতে পারলাম না।
পরদিন, প্রথম শ্রেণীর একটি জাতীয় দৈনিকে ফলাও করে খবর প্রকাশ পেল—
একজন বেকার বাবা, সন্তানের জন্য দুধের কৌটো নিতে গিয়ে ধরা পড়েছেন।
একজন পুলিশ অফিসার ফেসবুকে লিখেছেন। মুহূর্তেই বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ বাবাটার পরিচয় জানতে চাইছে। অনেকেই তাকে চাকরির সুযোগ দেবেন বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।
কিন্তু আমি শুধু ভাবছি—পুলিশের শেষ কথাটা – “বাবা কি চোর হতে পারেন?”আমার ছবি ও দেয়নি, সবচেয়ে বড় কথা – আমার সন্তান খেতে পেয়েছে।
Rayhana yeasmin
Comment
