Mina Bulbul Hossain

প্রবন্ধ:জাতীয় চেতনায় বিবেকের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বইমেলা-২০২৬
—ড, মিনা বুলবুল হোসাইন

ফেব্রুয়ারির বাতাসে আবারও ভেসে আসে ভাষার অমোঘ আহ্বান। একুশ কেবল ইতিহাসের পৃষ্ঠা নয়; অগোছালো অক্ষরের জয়গান এটি আমাদের নৈতিক স্পন্দন, আত্মপরিচয়ের নীরব উচ্চারণ। আর বইমেলা—সে যেন সেই স্পন্দনের দৃশ্যমান রূপ; শব্দের মেলা, চিন্তার উৎসব, বিবেকের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ।

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমরা যখন বইমেলার দিকে তাকাই, তখন প্রশ্ন জাগে—এটি কি কেবল বাণিজ্যিক আয়োজন, নাকি জাতীয় চেতনার ধারাবাহিক বহনকারী এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন? একুশের চেতনাকে যদি আমরা সত্যিই মননে ধারণ করি, তবে বইমেলা আমাদের কাছে হয়ে ওঠে আত্মসমালোচনার আয়না এবং পুনর্জাগরণের অনুশীলনক্ষেত্র।

একুশের চেতনা: স্মৃতি থেকে দায়িত্বে

একুশ আমাদের শিখিয়েছে ভাষার মর্যাদা রক্ষা মানে মানবিক মর্যাদা রক্ষা। ১৯৫২-এর আত্মত্যাগ কেবল ভাষার প্রশ্ন ছিল না; তা ছিল স্বকীয়তা, আত্মমর্যাদা ও ন্যায়ের পক্ষে অটল থাকার শপথ। আজকের বাংলাদেশে সেই শপথকে নতুন করে পাঠ করতে হয়—শিক্ষায় মানোন্নয়ন, মতপ্রকাশের শালীন স্বাধীনতা, জ্ঞানচর্চার প্রসার এবং সংস্কৃতির মুক্ত বিকাশের মধ্য দিয়ে।

মননে একুশের চেতনা মানে কেবল স্মরণসভা নয়; এটি প্রতিদিনের আচরণে সততা, গবেষণায় নিষ্ঠা, প্রকাশে দায়িত্ববোধ। ভাষার শুদ্ধতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন চিন্তার শুদ্ধতা। শব্দের অপচয় নয়—শব্দের মাধ্যমে নির্মাণ।

বইমেলা ২০২৬: মূল্যায়নের কয়েকটি দিক

১. পাঠকের অংশগ্রহণ ও পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন
ডিজিটাল যুগে বইমেলা কি পাঠকের কাছে এখনও অনিবার্য? ২০২৬-এ দেখা যাচ্ছে—তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু গভীর পাঠের চর্চা কি সমানতালে বৃদ্ধি পেয়েছে? বই কেনা আর বই পড়ার মধ্যে যে দূরত্ব, সেটি কমানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

২. গবেষণাধর্মী ও মানসম্মত প্রকাশনা:
একুশের চেতনা ধারণ করতে হলে বইমেলায় শুধু জনপ্রিয়তা নয়, প্রয়োজন মানসম্পন্ন গবেষণা, প্রামাণ্য ইতিহাস, নীতিনির্ভর বিশ্লেষণ ও সৃজনশীল সাহিত্য। প্রকাশনার সংখ্যা নয়—গুণগত উৎকর্ষই হওয়া উচিত প্রধান সূচক।

৩. সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অন্তর্ভুক্তি:
বইমেলা কেবল লেখক-প্রকাশকের নয়; এটি পাঠক, গবেষক, শিল্পী ও চিন্তাবিদদের সম্মিলিত সংলাপের স্থান। আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, তরুণ লেখকদের প্ল্যাটফর্ম—এসবের মধ্যেই একুশের চেতনা প্রাণ পায়।

৪. বাণিজ্যিকতা বনাম মূল্যবোধ:
বইমেলার বাণিজ্যিক সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ; তবে তা যেন মূল্যবোধকে গ্রাস না করে। একুশের চেতনা আমাদের শেখায়—সংস্কৃতি কখনও কেবল পণ্যে পরিণত হতে পারে না; এটি আত্মার বিনিয়োগ।

চেতনার ধারাবাহিকতা: আমাদের করণীয়:

মননে একুশের চেতনা বাঁচিয়ে রাখতে হলে—
পরিবারে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে;
শিক্ষাঙ্গনে মুক্ত চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে;
লেখককে হতে হবে দায়িত্বশীল, পাঠককে হতে হবে সমালোচনামূলক;
রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে জ্ঞানচর্চার অবাধ পরিসর।

একুশ আমাদের বিভাজন শেখায় না; শেখায় ঐক্য। বইমেলা সেই ঐক্যের সাংস্কৃতিক প্রতীক—যেখানে বিভিন্ন মত, মতাদর্শ ও সৃজনশীলতা এক ছাদের নিচে মিলিত হয়।

২০২৬ সালের বইমেলার মূল্যায়ন তাই কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ। আমরা কি সত্যিই একুশকে মননে ধারণ করছি? আমরা কি ভাষার মর্যাদা রক্ষায় প্রতিদিনের জীবনে সৎ? আমরা কি বইকে কেবল অলংকার নয়, আলোকবর্তিকা হিসেবে গ্রহণ করছি?

যদি উত্তর খুঁজতে চাই, তবে বইমেলার প্রাঙ্গণেই তার সূচনা। কারণ বই কেবল জ্ঞানের বাহক নয়; এটি জাতীয় চেতনার ধারক।

একুশের চেতনা মননে ধারণ করে, বইমেলার পবিত্র প্রাঙ্গণ থেকে আমরা আবারও উচ্চারণ করি—
শব্দ হবে শুদ্ধ, চিন্তা হবে মুক্ত, আর বাংলাদেশ হবে জ্ঞান ও মানবিকতার আলোকিত ভূমি।

ড. মিনা বুলবুল হোসাইন — সময়, সংকট ও চেতনার অন্তর্লিখিত এক সংবেদনশীল প্রবন্ধকার।

Comment