মহাবিশ্বের বিশালতা এবং এর অসীম রহস্য সবসময়ই মানবমনকে আবিষ্ট করে রেখেছে। আমরা যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাই, তখন মূলত আমরা অতীতের দিকে তাকাই। আলোর নির্দিষ্ট গতির কারণে আমরা নক্ষত্রদের সেই রূপে দেখি, যে রূপে তারা হাজার বা কোটি বছর আগে ছিল। কিন্তু এই কোটি কোটি নক্ষত্রের ভিড়ে এমন একটি নক্ষত্র আছে যা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো ধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল। নাম তার HD 140283, যা সাধারণ মহলে ‘মেথুসেলাহ’ (Methuselah) নামে পরিচিত।
মেথুসেলাহ: নামের সার্থকতা ও পরিচয়
বাইবেলে বর্ণিত দীর্ঘজীবী চরিত্র ‘মেথুসেলাহ’-এর নামানুসারে এই নক্ষত্রটির নামকরণ করা হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় HD 140283। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৯০ আলোকবর্ষ দূরে লিরা (Libra) নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত একটি সাব-জায়ান্ট (Sub-giant) নক্ষত্র। খালি চোখে একে দেখা না গেলেও সাধারণ টেলিস্কোপের সাহায্যে এর অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব। এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮,০০,০০০ মাইল বেগে মহাকাশে ছুটে চলছে।
এই নক্ষত্রটি কেন বিশেষ? কারণ এটি আমাদের পরিচিত প্রায় সব নক্ষত্রের চেয়ে আলাদা। এর বয়স এতই বেশি যে এটি মহাবিশ্বের প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রদের ঠিক পরের সারিতেই অবস্থান করে। একে বলা হয় ‘পপুলেশন-২’ (Population II) নক্ষত্র।
মহাবিশ্বের বয়সের সাথে সংঘাত: একটি বৈজ্ঞানিক ধাঁধা
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম মেথুসেলাহ নক্ষত্রের বয়স নির্ণয় করার চেষ্টা করেন, তখন এক অভাবনীয় তথ্য সামনে আসে। প্রাথমিক হিসেবে দেখা যায় যে, এই নক্ষত্রটির বয়স প্রায় ১৬ বিলিয়ন বছর।
এখানেই তৈরি হয় চরম বিতর্ক। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতে, বিগ ব্যাং (Big Bang) বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে। এখন প্রশ্ন হলো, মহাবিশ্বের বয়স যদি ১৩.৮ বিলিয়ন বছর হয়, তবে ১৬ বিলিয়ন বছরের পুরনো একটি নক্ষত্র সেখানে কীভাবে থাকতে পারে? একটি সন্তান কি তার মায়ের চেয়ে বয়সে বড় হতে পারে?
এই বৈজ্ঞানিক প্যারাডক্সটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কয়েক দশক ধরে ভাবিয়ে তুলেছিল। কেউ কেউ বলতে শুরু করেছিলেন যে মহাবিশ্বের সৃষ্টির তত্ত্ব বা বিগ ব্যাং তত্ত্বে হয়তো কোনো বড় ধরনের গলদ আছে।
রহস্যের সমাধান: হাবল টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ
এই জটিল রহস্য সমাধানের জন্য ২০১৩ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের (Hubble Space Telescope) তথ্য ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে নক্ষত্রটির দূরত্ব, উজ্জ্বলতা এবং এর ভেতরে থাকা রাসায়নিক উপাদানের বিশ্লেষণ করেন।
নতুন এই গবেষণায় দেখা যায় যে, নক্ষত্রটির বয়স প্রকৃতপক্ষে ১৪.২৭ বিলিয়ন বছর। যদিও এই সংখ্যাটিও ১৩.৮ বিলিয়নের চেয়ে কিছুটা বেশি, তবে এর সাথে একটি ‘মার্জিন অফ এরর’ বা ভুলের মাত্রা যুক্ত ছিল, যা প্রায় ৮০০ মিলিয়ন বছর। অর্থাৎ, নক্ষত্রটির বয়স ১৩.৫ থেকে ১৫ বিলিয়ন বছরের মধ্যে যেকোনো কিছু হতে পারে। এর ফলে এটি মহাবিশ্বের বয়সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এই ভেবে যে, মেথুসেলাহ মহাবিশ্বের চেয়ে বয়সে বড় নয়, বরং মহাবিশ্বের জন্মের একদম শুরুর দিকে এটি গঠিত হয়েছিল।
মেথুসেলাহ নক্ষত্রের গঠন ও বৈশিষ্ট্য
মেথুসেলাহ নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের মতো নয়। এটি কেন এত প্রাচীন, তা বোঝার জন্য এর গঠন বিশ্লেষণ করা জরুরি:
১. ধাতব স্বল্পতা (Metal-poor): জ্যোতির্বিজ্ঞানে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামের চেয়ে ভারী যেকোনো উপাদানকে ‘ধাতু’ বলা হয়। মেথুসেলাহ নক্ষত্রে লোহার পরিমাণ সূর্যের তুলনায় মাত্র ১ শতাংশ। এর থেকে বোঝা যায় যে, এটি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছিল যখন মহাবিশ্বে ভারী উপাদান তৈরি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটেনি।
২. জ্বালানি নিঃশেষের পর্যায়: এটি বর্তমানে তার জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর কেন্দ্রের হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে, যার ফলে এটি একটি লোহিত দানব (Red Giant) নক্ষত্রে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
৩. উচ্চ গতিবেগ: মেথুসেলাহ নক্ষত্রটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চলাচল করে। এটি আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way) আদি বাসিন্দা নয়, বরং এটি হয়তো কোনো ছোট ছায়াপথ থেকে এসেছিল যা কোটি কোটি বছর আগে আমাদের ছায়াপথের সাথে মিশে গেছে।
মহাবিশ্বের আদিম ইতিহাস এবং মেথুসেলাহ
বিগ ব্যাং-এর পর মহাবিশ্ব যখন অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল, তখন কেবল হাইড্রোজেন এবং সামান্য হিলিয়াম গ্যাস বিদ্যমান ছিল। সেই আদিম গ্যাস থেকেই তৈরি হয়েছিল ‘পপুলেশন-৩’ (Population III) নক্ষত্রগুলো। এই নক্ষত্রগুলো ছিল বিশাল এবং অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। কয়েক কোটি বছর জ্বলার পর তারা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের (Supernova) মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায় এবং মহাবিশ্বে প্রথমবারের মতো অক্সিজেন, কার্বন ও লোহার মতো উপাদান ছড়িয়ে দেয়।
মেথুসেলাহ সম্ভবত সেই পপুলেশন-৩ নক্ষত্রদের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হওয়া প্রথম দিকের পপুলেশন-২ নক্ষত্র। তাই একে নিয়ে গবেষণা করা মানে মহাবিশ্বের একদম শৈশবকাল সম্পর্কে জানা।
কেন এই নক্ষত্রটি গুরুত্বপূর্ণ?
মেথুসেলাহ কেবল একটি উজ্জ্বল বিন্দু নয়, বরং এটি একটি ‘টাইম ক্যাপসুল’। এর গুরুত্ব অপরিসীম কারণ:
মহাবিশ্বের প্রসারণের হার: মহাবিশ্ব কত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে (Hubble Constant), তা নির্ণয় করতে মেথুসেলাহ-এর মতো প্রাচীন নক্ষত্রদের সঠিক বয়স জানা প্রয়োজন।
নক্ষত্র বিবর্তন: একটি নক্ষত্র কীভাবে জন্ম নেয়, কোটি কোটি বছর বেঁচে থাকে এবং মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, তার আদর্শ উদাহরণ হলো এই নক্ষত্রটি।
অন্ধকার শক্তি (Dark Energy): মহাবিশ্বের বয়স এবং নক্ষত্রের বয়সের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ব্যবধান, তা আমাদের ‘ডার্ক এনার্জি’ এবং মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে ধারণা দিতে সাহায্য করে।
মেথুসেলাহ বা HD 140283 আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা এক অতি প্রাচীন এবং রহস্যময় মহাবিশ্বের অংশ। এটি যখন জন্মেছিল, তখন না ছিল আমাদের পৃথিবী, না ছিল আমাদের সূর্য। এমনকি আমাদের ছায়াপথটিও তখন সম্পূর্ণ গঠিত হয়নি।
আজ যখন আমরা মেথুসেলাহ-এর দিকে তাকাই, আমরা দেখি মহাবিশ্বের সেই আদিম ঊষালগ্নকে। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে হয়তো ভবিষ্যতে আমরা আরও প্রাচীন কোনো নক্ষত্র খুঁজে পাব, কিন্তু মেথুসেলাহ সবসময়ই জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি প্রমাণ করে যে মানুষের কৌতূহল এবং গবেষণার মাধ্যমে আমরা এমনকি মহাবিশ্বের জন্মলগ্নের রহস্যও উন্মোচন করতে পারি।
এই নিবন্ধটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। মহাবিশ্বের রহস্য বুঝতে হলে আমাদের এমন আরও অনেক প্রাচীন নক্ষত্র এবং দূরবর্তী ছায়াপথ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। মেথুসেলাহ কেবল শুরু, শেষ নয়।

