Sneha Ghanteswari

Sneha Ghanteswari

শিরোনাম: মনুষ্যত্বের অবক্ষয়
কলমে- স্নেহা ঘণ্টেশ্বরী

অরুণাভর দামী স্মার্টফোনে তখন হাজারটা নোটিফিকেশন। অফিসের ইমেইল, বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে হাসাহাসি আর ফেসবুকের নিউজফিডে দেশ-বিদেশের খবর। সিগন্যালে গাড়ি থামতেই জানলার কাঁচে টোকা পড়ল। বছর আষ্টেকের একটা ছেলে, হাতে কয়েকটা রজনীগন্ধার তোড়া।

অরুণাভ কাঁচ না নামিয়েই হাতের ইশারায় না করে দিল। ফোনের স্ক্রিনে তখন সে একটা পোস্ট পড়ছে—”বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সপ্তাহ”। সে খুব আবেগের সাথে একটা বড় কমেন্ট লিখল মানুষের নিষ্ঠুরতা নিয়ে। অথচ কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির মুখের করুণ আর ক্ষুধার্ত চাহনি তার নজরে এল না। এটাই আজকের ডিজিটাল সমাজের সবচেয়ে বড় পরিহাস। আমরা স্ক্রিনের ওপারে থাকা অচেনা মানুষের কষ্টে ব্যথিত হই, কিন্তু পাশের রক্ত-মাংসের মানুষের অভাব দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে যাই।

রাস্তার ওপারে ধুলোবালির মধ্যে পড়ে থাকা একটা আধভাঙা রেডিওতে গান বাজছে—”মানুষ মানুষের জন্য”। গানটা যেন ধুলোয় ঢাকা ফুটপাতের মানুষগুলোর জন্য এক নিষ্ঠুর উপহাস। সমাজটা এখন অদ্ভুত এক প্রতিযোগিতায় মত্ত। দামী রেস্তোরাঁয় খাবারের ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় না দিলে যেন পেট ভরে না, অথচ সেই রেস্তোরাঁর বাইরে ডাস্টবিনের পাশে বসে থাকা মানুষটার জন্য বিন্দুমাত্র করুণাও অবশিষ্ট নেই।

অরুণাভ গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে গেল। তার কাছে উন্নয়ন মানে শহরের আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাট আর চওড়া রাস্তা। সে বুঝতেই পারল না, এই চকচকে সভ্যতার ভিড়ে আসলে রোজ ‘মনুষ্যত্ব’ হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই শিক্ষিত হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মানুষ হতে ভুলে যাচ্ছি।

সিগন্যাল পেরিয়ে অরুণাভ আবার ফোনে মগ্ন হলো। বাইরের জগতটা ধুলোর আস্তরণেই ঢাকা পড়ে রইল। হয়তো আমাদের বিবেকও এখন ওই ধুলোর মতোই মলিন হয়ে গেছে, যা চোখের সামনে থাকলেও আমরা আর দেখতে পাই না।

Comment