লড়াই করা উচিৎ হবে ?  তৃতীয় অধ্যায়

লড়াই করা উচিৎ হবে ? দ্বিতীয় অধ্যায়

মনুষ্যত্বের ইতিহাসে যুদ্ধ এক কালো অধ্যায়। আদিম সমাজ থেকে আধুনিক সভ্যতা—প্রতিটি বাঁকে আমরা যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে শেষ পর্যন্ত আমরা কী অর্জন করেছি? আজ যখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অসীম প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে আছি, তখন যুদ্ধের গুরুত্ব এবং এর অসারতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

বিজয়ের ভ্রম: এলিনর রুজভেল্টের দর্শন
“গত যুদ্ধে কেউ জেতেনি, আর আগামী যুদ্ধেও কেউ জিতবে না।” — এলিনর রুজভেল্ট

এলিনর রুজভেল্টের এই উক্তিটি যুদ্ধের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুর সত্যকে তুলে ধরে। আমরা যখন ‘জয়’ বা ‘পরাজয়’ শব্দগুলো ব্যবহার করি, তখন আমরা সাধারণত রাজনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রের কথা ভাবি। কিন্তু লজিক্যালি চিন্তা করলে, যুদ্ধে যে পক্ষ ‘জয়ী’ হয়, তাদেরও কি অপূরণীয় ক্ষতি হয় না?

যুক্তি (Logic): অর্থনীতিতে একটি শব্দ আছে ‘অপারচুনিটি কস্ট’। যুদ্ধের পেছনে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, তা দিয়ে মানবজাতির ক্ষুধা, রোগ এবং অশিক্ষা দূর করা সম্ভব ছিল। তাই জয়ী দেশটিও আসলে হারায় তার উন্নয়ন ও শান্তির সম্ভাবনা।

আবেগ (Emotion): একজন মা যখন তার সন্তানকে হারান, তখন সেই সন্তান কোন পক্ষের সৈনিক ছিল তা গৌণ হয়ে যায়। শোকের কোনো জাতীয়তা নেই।

শিক্ষা: জয় মানে কেবল শত্রু বিনাশ নয়; জয় মানে যদি নিজের অস্তিত্বের ক্ষয় হয়, তবে সেই জয় পরাজয়ের চেয়েও ভয়াবহ।

মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করা হয় তার ‘বিবেক’ এবং ‘যুক্তি’ দিয়ে। কিন্তু যখন আমরা আলোচনার টেবিল ছেড়ে রণক্ষেত্রে নামি, তখন আমরা আমাদের সেই শ্রেষ্ঠত্ব হারাই।

বিশ্লেষণ: যখন কোনো সমস্যার সমাধান কূটনীতি বা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে করা যায় না, তখনই মানুষ অস্ত্রের আশ্রয় নেয়। স্টেইনবেকের মতে, এটি আমাদের বিবর্তিত মস্তিষ্কের পরাজয়। আমরা যখন পেশিশক্তিকে প্রাধান্য দিই, তখন আমরা আসলে আমাদের আদিম পশুপ্রবৃত্তিতে ফিরে যাই।

যুদ্ধ কোনো দৈব ঘটনা নয়; এটি কিছু মানুষের লোভের ফসল।

ব্যক্তিত্ব বনাম সমষ্টি: ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, অধিকাংশ যুদ্ধের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু নেতার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা ক্ষমতা দখলের ইচ্ছা দায়ী ছিল। সাধারণ মানুষ যারা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেয়, তাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ সেখানে থাকে না।

মানসিক বুস্ট: আমাদের মনে রাখতে হবে যে, অন্যের ক্ষতি করে বড় হওয়ার নাম সাফল্য নয়। সত্যিকারের লিডারশিপ বা নেতৃত্ব হলো সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতাই উন্নতির শ্রেষ্ঠ পথ।

আধুনিক প্রেক্ষাপট: আজ আমরা অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের মুনাফা দেখি। কিন্তু বিনিময়ে আমরা হারাই হাজার হাজার নিরপরাধ প্রাণ। সভ্যতা যদি বর্বরতাকে পুঁজি করে এগোতে চায়, তবে সেই সভ্যতা টিকবে না।

“যুদ্ধ কোনো অ্যাডভেঞ্চার নয়। এটি একটি রোগ।” — আতোয়ান দ্য স্যান্ত একজ্যুপেরি

অনেক সময় তরুণ প্রজন্ম বা উগ্র জাতীয়তাবাদ যুদ্ধকে বীরত্ব বা অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু একজ্যুপেরি, যিনি নিজে একজন পাইলট ছিলেন, তিনি একে ‘রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সংক্রমণ: ঘৃণা একটি রোগের মতো যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন এটি মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে গ্রাস করে ফেলে। টাইফয়েড বা কলেরার মতো যুদ্ধও জনপদ উজাড় করে দেয়।

রোগের যেমন চিকিৎসা প্রয়োজন, যুদ্ধের প্রতিকার হলো সহনশীলতা এবং শিক্ষা। আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে বুস্ট করতে হবে যাতে আমরা ঘৃণার ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারি।

১. লজিক্যাল ভিউ: যুদ্ধ মানেই নেতিবাচক সম্পদ সৃষ্টি। এটি পরিবেশ ধ্বংস করে, মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ঋণের বোঝা তৈরি করে।
২. ইমোশনাল ভিউ: যুদ্ধের ট্রমা বা মানসিক আঘাত বংশপরম্পরায় বয়ে বেড়াতে হয়। এক যুদ্ধের ক্ষত শুকাতে কয়েক দশক সময় লাগে।

আপনার চারপাশের ছোটখাটো কলহ বা বিবাদও যুদ্ধের একটি ক্ষুদ্র রূপ। যখনই আপনি কারো সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন, নিজেকে প্রশ্ন করুন— “আমি কি এখানে একজন চিন্তাশীল প্রাণী হিসেবে জয়ী হতে চাই, নাকি পশুর মতো কেবল জেদ বজায় রাখতে চাই?”

আগামী যুদ্ধের বিজয়ী হিসেবে কোনো দেশ বা জাতি থাকবে না; যদি পারমাণবিক বা প্রযুক্তিগত যুদ্ধ হয়, তবে পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে শুধু ছাই। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত “অস্ত্রের চেয়ে মস্তিষ্ক শক্তিশালী” এই মন্ত্রে বিশ্বাস করা।

জীবনকেও একটি রণক্ষেত্র মনে না করে একটি বাগান হিসেবে দেখা উচিৎ। অন্যের ক্ষতি করে নয়, বরং অন্যের সাথে মিলেমিশে যে উন্নতি, তাই হলো প্রকৃত বিজয়। বীরত্ব যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বীরত্ব লুকিয়ে আছে ঘৃণা জয় করার সাহসে।

মানসিক শক্তিই আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। একে ধ্বংসের কাজে নয়, সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা দরকার ।

ক্ষমা করা দুর্বলতা নয়, এটি মানসিক উচ্চতার লক্ষণ।

আলোচনা সবসময় কামানের গোলার চেয়ে বেশি কার্যকর।

শান্তি কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি পথ যা আমাদের প্রতিদিন হাঁটতে হবে।

লেখক – মাধব রায়

Comment