বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী বি.এফ. স্কিনার বলেন যে , “শিক্ষা হলো তা-ই যা অবশিষ্ট থাকে, যখন আমরা যা শিখেছি তার সবটুকুই ভুলে যাই।” আপাতদৃষ্টিতে এই উক্তিটি একটি ধাঁধার মতো মনে হতে পারে। যদি আমরা যা শিখেছি তা-ই ভুলে যাই, তবে অবশিষ্ট আর কী থাকে? কিন্তু এই গভীর উক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত শিক্ষার সারমর্ম। শিক্ষা কেবল তথ্য মুখস্থ করা বা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়; এটি হলো মানুষের চিন্তাচেতনা এবং আচরণের এক স্থায়ী পরিবর্তন।
তথ্যের সঞ্চয় বনাম চেতনার বিকাশ
আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রায়শই তথ্য আহরণকে (Information Gathering) শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষার্থীরা কয়েক বছর ধরে প্রচুর ঐতিহাসিক তারিখ, গাণিতিক সূত্র এবং বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা মুখস্থ করে। কিন্তু কয়েক বছর পর বা কর্মজীবনে প্রবেশের পর দেখা যায়, সেই তথ্যের একটি বড় অংশই মস্তিষ্ক থেকে মুছে গেছে। স্কিনার এখানেই একটি সূক্ষ্ম বিভাজন রেখা টেনেছেন।
তথ্য (Information): এটি হলো সাময়িক। এটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমাদের মস্তিষ্কে থাকে, যেমন কোনো পরীক্ষার আগে।
শিক্ষা (Education): এটি হলো সেই প্রক্রিয়ার ফল যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে রূপ দেয়। তথ্য হারিয়ে গেলেও এই দৃষ্টিভঙ্গিটি থেকে যায়।
একজন শিক্ষার্থী স্কুলে জটিল কোনো জ্যামিতিক উপপাদ্য শিখেছে। দশ বছর পর হয়তো সে সেই উপপাদ্যের প্রতিটি ধাপ নির্ভুলভাবে বলতে পারবে না। কিন্তু সেই উপপাদ্যটি সমাধান করতে গিয়ে সে যে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা অর্জন করেছিল, সেটি তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে থেকে যাবে। স্কিনারের মতে, এই ‘বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা’ই হলো প্রকৃত শিক্ষা।
অভ্যাসের পরিবর্তন ও আচরণবাদ
বি.এফ. স্কিনার ছিলেন একজন আচরণবাদী (Behaviorist)। তার মতে, শিক্ষা হলো আচরণের পরিবর্তন। আমরা যখন কোনো কিছু শিখি, তখন আসলে আমাদের পরিবেশের সাথে প্রতিক্রিয়া দেখানোর ধরণ বদলে যায়।
যখন কোনো শিশু একটি ভাষা শেখে, সে শুরুতে অনেক ব্যাকরণ এবং শব্দ মুখস্থ করে। বড় হওয়ার পর সে হয়তো সেই প্রাথমিক ব্যাকরণের নিয়মগুলো সচেতনভাবে মনে রাখে না, কিন্তু সে অনর্গল কথা বলতে পারে। তার চিন্তা প্রকাশের যে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেটিই হলো শিক্ষার সেই অবশিষ্টাংশ। এখানে ব্যাকরণের সূত্রগুলো হলো সেই ‘ভুলে যাওয়া অংশ’, আর সাবলীলভাবে কথা বলার ক্ষমতা হলো ‘শিক্ষা’।
শিক্ষার স্থায়িত্ব এবং বিস্মৃতি
বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়াকে সাধারণত শিক্ষার শত্রু হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু স্কিনারের দর্শনে, বিস্মৃতি আসলে একটি ছাঁকুনি বা ফিল্টারের মতো কাজ করে। এটি অপ্রয়োজনীয় তথ্যের বোঝা সরিয়ে দিয়ে প্রকৃত জ্ঞানকে উজ্জ্বল করে তোলে।
১. চিন্তার শৃঙ্খলা (Discipline of Mind)
একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তির সাথে একজন সাধারণ মানুষের পার্থক্য কেবল তথ্যের ভাণ্ডারে নয়, বরং চিন্তার শৃঙ্খলায়। পড়াশোনা করার মাধ্যমে মস্তিষ্ক যে সুশৃঙ্খলভাবে চিন্তা করতে শেখে, তা কোনো বিশেষ বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। ইতিহাসের ছাত্র যদি সাল-তারিখ ভুলে যায়, তবুও ইতিহাসের কার্যকারণ সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতা তার মধ্যে থেকে যায়। এটিই তাকে যে কোনো সামাজিক সমস্যা বুঝতে সাহায্য করে।
২. অভিযোজন ক্ষমতা (Adaptability)
স্কিনারের মতে, শিক্ষা আমাদের নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। আমরা ক্লাসরুমে যা শিখি, বাস্তব জীবনে তার হুবহু প্রয়োগ খুব কমই ঘটে। কিন্তু শেখার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা যে ‘শেখার কৌশল’ (Learning how to learn) রপ্ত করি, সেটি আমাদের সারাজীবন সাহায্য করে। তথ্য ভুলে গেলেও এই কৌশলটি আমাদের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে যায়।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে স্কিনারের দর্শন
বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে, যেখানে সব তথ্য হাতের নাগালে, সেখানে স্কিনারের এই উক্তিটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আজ তথ্য মুখস্থ করার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এখন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তথ্যের বিশ্লেষণ এবং প্রয়োগ।
সৃজনশীলতা: কোনো নির্দিষ্ট সূত্র মনে রাখার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সূত্রের মূল ভাবটি ব্যবহার করে নতুন কিছু তৈরি করা।
সমালোচনাধর্মী চিন্তা: শিক্ষা আমাদের শেখায় কোনটি সত্য এবং কোনটি ভ্রান্ত তা বিচার করতে। এই বিচারের ক্ষমতাটি শিক্ষার একটি স্থায়ী অংশ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্যে ঠাসা সিলেবাস দেওয়া নয়, বরং তাদের মধ্যে এমন গুণাবলী তৈরি করা যা তথ্য হারিয়ে গেলেও টিকে থাকবে। একজন ডাক্তার হয়তো তার প্রথম বর্ষের এনাটমির প্রতিটি ছোট হাড়ের নাম ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু রোগীর প্রতি তার সহমর্মিতা এবং রোগের মূল কারণ খোঁজার যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি অর্জন করেছেন, সেটিই তার আসল শিক্ষা।
বিস্মৃতির প্রয়োজনীয়তা কেন?
মস্তিষ্কের একটি সীমাবদ্ধ ক্ষমতা আছে। যদি আমরা ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত পড়া প্রতিটি লাইন হুবহু মনে রাখতাম, তবে আমাদের মস্তিষ্ক তথ্যের ভারে অচল হয়ে পড়ত। বিস্মৃতি আমাদের মস্তিষ্ককে জায়গা করে দেয় নতুন এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গ্রহণ করার জন্য।
শিক্ষার প্রক্রিয়ায় আমরা যা কিছু পড়ি, তা আমাদের অবচেতন মনে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়। এটি অনেকটা পাথরের ওপর দিয়ে জল বয়ে যাওয়ার মতো। জল হয়তো বয়ে চলে যায় (ভুলে যাওয়া তথ্য), কিন্তু পাথরটি ঘর্ষণের ফলে যে মসৃণ রূপ পায় (শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব), তা স্থায়ী।
বি.এফ. স্কিনারের এই দর্শন আমাদের শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে শিক্ষা শেষ হয়ে যায় না। বরং শিক্ষা হলো সেই নির্যাস যা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে মিশে থাকে।
আমরা যখন কোনো বই পড়ি বা কোনো ক্লাস করি, তখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই বিষয়ের মূল মর্মার্থ বা ফিলোসফিকে গ্রহণ করা। তথ্যের খুঁটিনাটি একদিন হারিয়ে যাবেই, এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু সেই তথ্যের মধ্য দিয়ে আমরা যে মূল্যবোধ, বিচারবুদ্ধি এবং সহনশীলতা অর্জন করব, তাই হবে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
শিক্ষা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি রূপান্তর। এই রূপান্তরটি তখনই সার্থক হয় যখন মানুষ তার শিক্ষার কারিগরি দিকগুলো ভুলে গিয়েও একজন প্রকৃত ‘শিক্ষিত’ মানুষ হিসেবে সমাজে বিচরণ করতে পারে। স্কিনারের সেই ‘অবশিষ্টাংশ’ই আসলে একজন মানুষের মেরুদণ্ড, যা তাকে জীবনের কঠিনতম সময়েও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে শক্তি জোগায়।
“Education survives when what has been learnt has been forgotten.” – B.F. Skinner
লেখক – মাধব রায়

