The Principles of Psychology – William James (1890)
জেমসকে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানের জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়, যিনি চেতনাকে একটি অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ বা “স্ট্রিম অফ কনশাসনেস” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর তত্ত্বে প্র্যাগমাটিজম বা উপযোগবাদ এবং ফাংশনালিজমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মানুষের আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া কীভাবে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে তা ব্যাখ্যা করে। গ্রন্থটিতে অভ্যাস গঠন, আবেগ, এবং ইচ্ছাশক্তির মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে যা আজও প্রাসঙ্গিক। এছাড়া এই সূত্রগুলো মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা এবং আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ওপর জেমসের গভীর প্রভাবের কথা তুলে ধরে। বর্তমান সময়ে তাঁর কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য পুরনো মনে হলেও এর দার্শনিক ভিত্তি এবং মৌলিক ধারণাগুলো আজও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পাঠ করা হয়।
উইলিয়াম জেমসের স্ট্রিম অফ কনশাসনেস বা চেতনার প্রবাহ ধারণাটি কী?
উইলিয়াম জেমসের “স্ট্রিম অফ কনশাসনেস” (Stream of consciousness) বা “চেতনার প্রবাহ” হলো তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক রূপক, যা তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Principles of Psychology-তে প্রথম উপস্থাপন করেন। এর মাধ্যমে তিনি মানুষের চিন্তাভাবনা বা চেতনাকে একটি নিরবচ্ছিন্ন এবং প্রবহমান নদীর সাথে তুলনা করেছেন।
জেমসের মতে, চেতনাকে কোনো খণ্ডিত অংশ বা আলাদা আলাদা ভাবনার “শৃঙ্খল” (chain) বা “ট্রেন” (train) হিসেবে বর্ণনা করা সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর মতে, চেতনা এমন কোনো বিষয় নয় যাকে টুকরো টুকরো করা যায়; বরং এটি জোড়াবিহীন এবং সর্বদা প্রবহমান। তাই একে বর্ণনা করার জন্য “নদী” বা “প্রবাহ” রূপকটিই সবচেয়ে স্বাভাবিক এবং একে “চিন্তার প্রবাহ” বা “চেতনার প্রবাহ” বলা উচিত।
তাঁর মতে, চেতনার এই প্রবাহের পাঁচটি মূল বৈশিষ্ট্য রয়েছে: ১. ব্যক্তিগত (Personal): প্রতিটি চিন্তাই কোনো না কোনো ব্যক্তিগত চেতনার অংশ। ২. নিরন্তর পরিবর্তনশীল (Constantly Changing): মানুষের চিন্তাভাবনা সর্বদা পরিবর্তনশীল। জেমস বিশ্বাস করতেন যে, একটি চিন্তা একবার চলে গেলে তা কখনোই হুবহু একইভাবে ফিরে আসে না; অর্থাৎ কোনো মানুষ ঠিক একই চিন্তা বা ধারণা দ্বিতীয়বার অবিকল একইভাবে অনুভব করতে পারে না। ৩. ধারাবাহিক বা নিরবচ্ছিন্ন (Sensibly Continuous): একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত চেতনার ভেতরে চিন্তা সবসময়ই নিরবচ্ছিন্ন থাকে, এতে কোনো ফাটল বা বিভাজন থাকে না। ৪. স্বাধীন বস্তুর সাথে সম্পর্কিত (Deals with independent objects): এটি সর্বদা নিজের বাইরের বস্তুগুলোর সাথে সম্পর্কিত থাকে এবং সেগুলোকে তুলে ধরে। ৫. নির্বাচনমূলক (Selective): চেতনা সবসময়ই কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি আগ্রহী থাকে এবং ক্রমাগত কিছু জিনিস গ্রহণ করে ও অন্যগুলোকে বর্জন করে।
জেমসের এই ধারণার আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:
- বিশ্রাম ও উড্ডয়ন (Flights and Perchings): জেমস চেতনার এই প্রবাহের গতিকে একটি পাখির জীবনের সাথে তুলনা করেছেন, যা ‘উড্ডয়ন’ এবং ‘বিশ্রাম’-এর পর্যায়ক্রম নিয়ে গঠিত। চেতনার বিশ্রামের জায়গাগুলোকে তিনি “Substantive parts” বা মূল অংশ বলেছেন, যেখানে আমাদের মন কোনো একটি ধারণায় স্থির হয়। আর উড্ডয়নের জায়গাগুলোকে তিনি “Transitive parts” বা পরিবর্তনশীল অংশ বলেছেন, যা মূলত বিভিন্ন চিন্তার মধ্যকার সম্পর্ক নির্দেশ করে এবং আমাদের একটি উপসংহার থেকে আরেকটি উপসংহারে নিয়ে যায়।
- ফ্রিঞ্জ বা মানসিক আভা (Fringe or Halo): জেমস বলেছেন যে, আমাদের মনের প্রতিটি সুনির্দিষ্ট চিন্তা বা ছবি একটি মুক্ত প্রবাহ দ্বারা বেষ্টিত থাকে। প্রতিটি চিন্তার চারপাশে একটি “fringe” (প্রান্ত) বা “halo” (আভা) থাকে, যা সেই চিন্তার অর্থ, কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় যাচ্ছে—এই অনুভূতিগুলোকে ধারণ করে।
- চেতনার উদ্দেশ্য: জেমসের ফাংশনালিজম (Functionalism) তত্ত্ব অনুযায়ী, এই প্রবহমান চেতনার মূল কাজ হলো মানুষকে তার পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করা এবং তার বেঁচে থাকা (survival) নিশ্চিত করা। চেতনা একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া হিসেবে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে আমাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে।
উইলিয়াম জেমসের মতে আমাদের মন বা চেতনা কোনো স্থির বা বিচ্ছিন্ন বস্তুর সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি গতিশীল, ব্যক্তিগত এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ যা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও অর্থের জন্ম দেয়।
জেমস-ল্যাঞ্জ আবেগ তত্ত্ব কীভাবে আমাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করে?
জেমস-ল্যাঞ্জ আবেগ তত্ত্ব আমাদের আবেগ এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যকার সাধারণ ধারণাকে সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। প্রচলিত বা সাধারণ জ্ঞান অনুযায়ী, আমরা কোনো ঘটনা দেখে প্রথমে মনে আবেগ অনুভব করি এবং তারপর আমাদের শরীর সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখায় (যেমন: আমরা আমাদের ভাগ্য হারালে দুঃখ পাই এবং তারপর কাঁদি, অথবা আমরা ভাল্লুক দেখে ভয় পাই এবং তারপর দৌড় দিই)। কিন্তু উইলিয়াম জেমস এবং কার্ল ল্যাঞ্জের প্রস্তাবিত এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আবেগ হলো আমাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়ার ফলাফল।
এই তত্ত্বটি আমাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং আবেগের সম্পর্ককে একটি নির্দিষ্ট ধারাক্রম বা সিকোয়েন্সের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে: ১. উদ্দীপক বা ঘটনা (Stimulus/Event): প্রথমে একটি বাহ্যিক ঘটনা ঘটে, যেমন—হঠাৎ জঙ্গলের পথে একটি ভাল্লুক দেখতে পাওয়া। ২. শারীরিক প্রতিক্রিয়া (Physiological Response): ঘটনাটি উপলব্ধি করার সাথে সাথে শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখায়। যেমন: হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, পেশী শক্ত হওয়া, ঘামতে শুরু করা বা কাঁপতে থাকা। ৩. পরিবর্তন উপলব্ধি (Perception of Changes): স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের (autonomic nervous system) ফিডব্যাকের মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত এই শারীরিক পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়। ৪. আবেগের অভিজ্ঞতা (Emotional Experience): মস্তিষ্ক যখন এই শারীরিক সংবেদনগুলোকে ব্যাখ্যা করে, তখনই আমাদের মনে নির্দিষ্ট আবেগ (যেমন—ভয়, আনন্দ বা রাগ) তৈরি হয়।
এই তত্ত্বের সবচেয়ে যুগান্তকারী দিক হলো এর ‘বডি-ফার্স্ট’ (Body-First) বা শরীর-প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি। এই তত্ত্ব প্রমাণ করে যে, আমাদের শরীরে যে অনুভূতিগুলো হয় তা আবেগের কারণে সৃষ্ট কোনো প্রতিক্রিয়া নয়, বরং শারীরিক অনুভূতিগুলোই আবেগের মূল উপাদান।
জেমসের নিজের বিখ্যাত উক্তি অনুযায়ী, আমরা কাঁদি বলে আমাদের দুঃখ হয়, আমরা আঘাত করি বলে আমরা রেগে যাই, আমরা কাঁপি বলে আমরা ভয় পাই—এমনটা কখনোই নয় যে, আমরা দুঃখিত, রাগান্বিত বা ভীত হওয়ার কারণে কাঁদি, আঘাত করি বা কাঁপি।
জেমস আরও যুক্তি দেন যে, কোনো উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটার পর যদি আমাদের শরীরে কোনো শারীরিক পরিবর্তন না ঘটে বা কোনো শারীরিক প্রতিক্রিয়াই না থাকে, তবে সেই ঘটনাটি উপলব্ধি করাটা কেবলই একটি জ্ঞানীয় (cognitive) ব্যাপার হতো। শারীরিক প্রতিক্রিয়া ছাড়া সেই পরিস্থিতিটি হতো একেবারেই ফ্যাকাশে, বর্ণহীন এবং আবেগের উষ্ণতাহীন।
জেমস-ল্যাঞ্জ তত্ত্ব অনুসারে শারীরিক প্রতিক্রিয়াই মূলত মানসিক আবেগের জন্ম দেয়; মন আগে আবেগ অনুভব করে শরীরকে নির্দেশ দেয় না, বরং শরীর আগে প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং সেই প্রতিক্রিয়ার অনুভূতি থেকেই মনের ভেতর আবেগের সৃষ্টি হয়।
লেখক – মাধব রায়

