বিনয়ী কৌশল

বিনয়ী কৌশল

The Neurotic Personality of Our Time – Karen Horney (1937)

‘উম্ব এনভি’ (Womb Envy) বা গর্ভ-ঈর্ষা হলো ক্যারেন হর্নির প্রস্তাবিত একটি মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব, যা সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘পেনিস এনভি’ (penis envy) তত্ত্বের সরাসরি পালটা জবাব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পুরুষরা নারীদের সন্তান ধারণ করা এবং নতুন জীবন সৃষ্টি করার জন্মগত ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঈর্ষা অনুভব করে। হর্নি মনে করতেন যে, প্রতিটি নারী এবং পুরুষের মধ্যেই সৃজনশীল এবং উৎপাদনশীল হওয়ার একটি সহজাত তাড়না থাকে। নারীরা প্রাকৃতিকভাবে গর্ভধারণ এবং সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে তাদের এই সৃজনশীলতার তাড়না খুব স্বাভাবিক ও অভ্যন্তরীণভাবে পূরণ করতে পারে।

কিন্তু পুরুষদের যেহেতু সন্তান জন্মদান এবং লালন-পালন করার এই জৈবিক ক্ষমতা নেই, তাই তারা এই অপূর্ণতার ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাহ্যিক উপায়ে সাফল্যের দিকে তীব্রভাবে ধাবিত হয়। পুরুষরা কর্মক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য, সমাজে আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তাদের এই শারীরিক অক্ষমতার ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করে।

হর্নি আরও যুক্ত করেন যে, সমাজে নারীরা কেবল তাদের স্বাভাবিক “অস্তিত্ব” বা মাতৃসত্তার মাধ্যমেই নিজেদের অবস্থান পূর্ণ করতে পারে; অন্যদিকে, পুরুষদের সমাজে নিজেদের পুরুষত্ব প্রমাণ করার জন্য প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম, উপার্জন এবং সাফল্য অর্জন করতে হয়। শারীরিক কাঠামোর পরিবর্তে এই সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক মানসিক চাপগুলোই মূলত পুরুষদের মনস্তত্ত্বকে রূপ দেয়।

ক্যারেন হর্নি মানসিক উদ্বেগ বা ‘বেসিক অ্যাংজাইটি’ মোকাবেলার জন্য মানুষের আচরণকে তিনটি প্রধান নিউরোটিক ট্রেন্ড বা কৌশলে ভাগ করেছেন,। একজন সুস্থ মানুষ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই তিনটি কৌশলই নমনীয়ভাবে ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু একজন নিউরোটিক ব্যক্তি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কৌশলের ওপর অতিমাত্রায় ও অনমনীয়ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন,।

এই তিনটি প্রধান নিউরোটিক ট্রেন্ড নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. মানুষের দিকে ধাবিত হওয়া বা বিনয়ী কৌশল (Moving Toward People / Compliance):

  • আচরণ: এই ধরনের ব্যক্তিরা নিরাপত্তাহীনতা দূর করার জন্য অন্যদের ভালোবাসা, অনুমোদন এবং ঘনিষ্ঠতা পাওয়ার চেষ্টা করে,। তারা নিজেদের ইচ্ছাকে অবদমিত করে এবং অন্যদের খুশি করার জন্য অতিরিক্ত বিনয়ী ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে,। তারা যে কোনো ধরণের সংঘাত বা বিবাদ এড়িয়ে চলে এবং জীবনের সমস্ত দায়িত্ব নেওয়ার জন্য একজন নিয়ন্ত্রণকারী সঙ্গীর খোঁজ করে,।
  • মূল বিশ্বাস: এদের অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক লজিক হলো— “যদি আমি যথেষ্ট স্নেহশীল ও বাধ্য থাকি, বা অন্যরা যদি আমাকে ভালোবাসে, তবে কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না”,।

২. মানুষের বিরুদ্ধে ধাবিত হওয়া বা আক্রমণাত্মক কৌশল (Moving Against People / Aggression):

  • আচরণ: এই কৌশল গ্রহণকারী ব্যক্তিরা চারপাশের পৃথিবীটাকে একটি বৈরী এবং প্রতিযোগিতামূলক স্থান হিসেবে বিবেচনা করে। তারা নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করতে ভয় পায় এবং অন্যদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য ও ক্ষমতা বিস্তারের মাধ্যমে নিজেদের নিরাপদ রাখতে চায়,। এরা প্রায়শই অহংকারী, প্রতিরক্ষামূলক এবং অন্যদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার বা শোষণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বীকৃতি ও সাফল্য অর্জন করতে মরিয়া থাকে,।
  • মূল বিশ্বাস: এদের অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক লজিক হলো— “যদি আমার হাতে ক্ষমতা থাকে এবং আমি নিয়ন্ত্রক হিসেবে যথেষ্ট শক্তিশালী হই, তবে কেউ আমাকে আঘাত করতে পারবে না”,।

৩. মানুষ থেকে দূরে সরে যাওয়া বা বিচ্ছিন্ন কৌশল (Moving Away from People / Withdrawal):

  • আচরণ: আবেগীয় আঘাত, প্রত্যাখ্যান বা সংঘাত এড়াতে এই ধরণের ব্যক্তিরা নিজেদের অন্যদের থেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেয়,। তারা স্বাধীনতা, স্বনির্ভরতা এবং একাকীত্বের ওপর অতিরিক্ত জোর দেয়,। এরা সাধারণত কারো সাহায্য নিতে চায় না এবং যেকোনো ধরণের আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা বা নির্ভরশীলতা এড়িয়ে কঠোর সীমানা বজায় রাখে। তাছাড়া, সমালোচনার হাত থেকে বাঁচতে তারা প্রায়শই নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে নিখুঁত (perfectionist) হওয়ার চেষ্টা করে।
  • মূল বিশ্বাস: এদের অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক লজিক হলো— “যদি আমার কাউকে প্রয়োজন না হয় বা আমি সবার থেকে দূরে থাকি, তবে কেউ আমাকে আঘাত করতে পারবে না”,।

হর্নির মতে, এই কৌশলগুলো মূলত শৈশবের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় সামাল দেওয়ার একটি উপায় হিসেবে শুরু হয়,। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এগুলো যখন অতিমাত্রায় অনমনীয় হয়ে যায়, তখন তা মানুষের আসল সত্তাকে (real self) হারিয়ে ফেলে এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক ও মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।

শৈশবের ‘বেসিক অ্যাংজাইটি’ কীভাবে নিউরোসিস তৈরি করে?

ক্যারেন হর্নির মতে, নিউরোসিসের মূলে কোনো জৈবিক প্রবৃত্তি বা যৌনতার ভূমিকা নেই, বরং এর প্রধান কারণ হলো শৈশবের ‘বেসিক অ্যাংজাইটি’ বা মৌলিক উদ্বেগ। শৈশবের এই মানসিক উদ্বেগ ধাপে ধাপে কীভাবে পরবর্তীতে নিউরোসিসের জন্ম দেয়, তা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ত্রুটিপূর্ণ অভিভাবকত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা: বেসিক অ্যাংজাইটির সূত্রপাত হয় শৈশবে পিতামাতার অবহেলা, উদাসীনতা, স্নেহের অভাব, অতিরিক্ত সুরক্ষা, পক্ষপাতিত্ব, বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মতো আচরণের কারণে। হর্নির মতে, এখানে পিতামাতার উদ্দেশ্যের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুর নিজস্ব উপলব্ধি বা দৃষ্টিভঙ্গি। পিতামাতা হয়তো মনে করতে পারেন তারা শিশুকে শাসন করার জন্য সঠিক কাজ করছেন, কিন্তু শিশু যদি তা প্রত্যাখ্যান বা শীতলতা হিসেবে অনুভব করে, তবে তার মনে গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।

২. অসহায়ত্ব ও একাকীত্বের অনুভূতি: এই ত্রুটিপূর্ণ এবং স্নেহহীন পরিবেশের কারণে শিশু নিজেকে একটি বৈরী এবং হুমকিপূর্ণ পৃথিবীতে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, অসহায়, তাৎপর্যহীন এবং একাকী মনে করতে শুরু করে। এই গভীর অসহায়ত্ব এবং ভীতি থেকেই মূলত ‘বেসিক অ্যাংজাইটি’ জন্ম নেয়।

৩. মৌলিক বৈরিতা (Basic Hostility) এবং অবদমন: অবহেলা ও স্নেহের অভাবের কারণে শিশুর মনে পিতামাতা বা চারপাশের জগতের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভ বা ‘মৌলিক বৈরিতা’ তৈরি হয়। কিন্তু যেহেতু শিশুটি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল এবং পিতামাতার ওপর নির্ভরশীল, তাই সে তার এই ক্ষোভকে প্রকাশ করতে ভয় পায় এবং তা অবদমিত (repress) করে রাখে। এই অবদমিত ক্ষোভ শিশুর অসহায়ত্বের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং উদ্বেগের একটি দুষ্টচক্র (vicious circle) তৈরি করে, যেখানে উদ্বেগ এবং বৈরিতা একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে।

৪. অতিরঞ্জিত প্রতিরক্ষামূলক কৌশল (Exaggerated Coping Patterns): শৈশবের এই তীব্র উদ্বেগ এবং ভীতি সামাল দেওয়ার জন্য শিশু কিছু অবাস্তব এবং বাধ্যতামূলক আচরণগত কৌশল তৈরি করে। সময়ের সাথে সাথে এই কৌশলগুলোই হর্নির বর্ণিত ১০টি ‘নিউরোটিক প্রয়োজন’ (neurotic needs)-এ পরিণত হয়, যা মূলত ভয় কাটানোর এক একটি ব্যর্থ ও আত্ম-বিধ্বংসী চেষ্টা। মানুষ এই প্রয়োজনগুলোকে মেটানোর জন্য তিনটি প্রধান কৌশল বেছে নেয়: মানুষের দিকে ধাবিত হওয়া (বিনয় বা বশ্যতা), মানুষের বিরুদ্ধে ধাবিত হওয়া (আগ্রাসন) এবং মানুষ থেকে দূরে সরে যাওয়া (বিচ্ছিন্নতা)।

৫. অনমনীয়তা এবং ‘আসল সত্তা’ থেকে বিচ্ছিন্নতা: একজন মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এই তিনটি কৌশলই নমনীয়ভাবে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু শৈশবের বেসিক অ্যাংজাইটি সমাধান না হলে, ব্যক্তি যেকোনো একটি নির্দিষ্ট কৌশলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ও অনমনীয় (rigid) হয়ে পড়েন, যার ফলে তার স্বাভাবিক সম্পর্কগুলো ব্যাহত হয়। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে সে তার স্বাভাবিক ‘আসল সত্তা’ (real self) হারিয়ে ফেলে এবং একটি কাল্পনিক ‘আদর্শ সত্তার’ (idealized self) অবাস্তব ও নিখুঁত প্রত্যাশা পূরণে মরিয়া হয়ে ওঠে।

এভাবেই শৈশবের নিরাপত্তাহীনতা থেকে সৃষ্ট বেসিক অ্যাংজাইটি মোকাবেলার জন্য তৈরি করা ভুল এবং অনমনীয় প্রতিরক্ষা কৌশলগুলোই মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি করে, যা চূড়ান্তভাবে নিউরোসিসের রূপ নেয় ।

হরনির মতে আদর্শ সত্তা এবং আসল সত্তার মধ্যে পার্থক্য কী?

ক্যারেন হর্নির মতে “আসল সত্তা” (Real self) এবং “আদর্শ সত্তা” (Idealized self)-এর মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:

আসল সত্তা (The Real Self):

  • এটি হলো একজন মানুষের প্রকৃত রূপ বা সম্ভাবনা (genuine potential), যেখানে তার নিজস্ব আসল অনুভূতি, ইচ্ছা এবং সক্ষমতাগুলো অবস্থান করে।
  • একটি সুস্থ ও সহায়ক পরিবেশে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই আসল সত্তার দিকে বিকশিত হয়। এতে মানুষের ব্যক্তিগত বিকাশ, সুখ, ইচ্ছাশক্তি এবং প্রতিভা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা থাকে, এবং এর পাশাপাশি কিছু সাধারণ সীমাবদ্ধতা বা স্বাভাবিক ত্রুটিও থাকে।
  • মানসিক সুস্থতা বলতে বোঝায় এই আসল সত্তার সাথে যুক্ত থাকা এবং একে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে দেওয়া।

আদর্শ সত্তা (The Idealized Self):

  • এটি হলো একজন ব্যক্তির সম্পর্কে একটি অবাস্তব, অতিমানবীয় এবং কাল্পনিক রূপ, যেখানে সে মনে করে যে তাকে পুরোপুরি নিখুঁত, অত্যন্ত শক্তিশালী, সর্বদা সফল এবং চরম যৌক্তিক “হওয়া উচিত”।
  • এটি কোনো স্বাস্থ্যকর লক্ষ্য নয়; বরং এটি নিজের ভেতরের নিরাপত্তাহীনতা ও অক্ষমতার গভীর অনুভূতিগুলো ঢাকতে তৈরি করা একটি কাল্পনিক প্রতিরক্ষা কৌশল।
  • সমাজ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় একজন মানুষের কেমন হওয়া উচিত, যা ব্যক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই অবাস্তব আদর্শ সত্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

পার্থক্য ও মূল সংঘাত: একজন নিউরোটিক বা মানসিক উদ্বেগে ভোগা ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই দুই সত্তার মধ্যে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বা বিভাজন তৈরি হয়। যেহেতু “আদর্শ সত্তা”র প্রত্যাশাগুলো এতটাই অবাস্তব থাকে যে বাস্তবে তা পূরণ করা কখনোই সম্ভব হয় না, তাই নিউরোটিক ব্যক্তি প্রতিনিয়ত ব্যর্থতা অনুভব করেন। এই অবাস্তব মানদণ্ডে পৌঁছাতে না পারার কারণে তিনি তার সাধারণ সীমাবদ্ধতাসহ “আসল সত্তা”কে নিজের শত্রু মনে করতে শুরু করেন। এর ফলে আসল সত্তাটি ধীরে ধীরে একটি অবমূল্যায়িত বা “ঘৃণিত সত্তায়” (despised self) পরিণত হয়, এবং ব্যক্তি ভুলবশত এই ঘৃণিত রূপটিকেই নিজের ‘আসল রূপ’ বলে ধরে নেন।

হর্নির মতে, বাহ্যিক এই অবাস্তব আদর্শ সত্তার চাপ ও বিভ্রম থেকে মুক্ত হয়ে নিজের আসল ও স্বাধীন সত্তাকে মেনে নেওয়ার ওপরই মানুষের প্রকৃত মানসিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে।

‘উচিত-এর স্বৈরাচার’ কীভাবে একজন মানুষের মানসিক শান্তি নষ্ট করে?

ক্যারেন হর্নির মতে, ‘উচিত-এর স্বৈরাচার’ (Tyranny of the Shoulds) হলো এক ধরনের কঠোর, নিখুঁত এবং অবাস্তব অভ্যন্তরীণ দাবি, যা একজন মানসিক উদ্বেগে ভোগা ব্যক্তি তার কাল্পনিক ‘আদর্শ সত্তা’ (idealized self)-কে টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের ওপর চাপিয়ে দেয়। এটি মূলত নিম্নলিখিত উপায়ে একজন মানুষের মানসিক শান্তি পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়:

১. অবাস্তব পূর্ণতার চাপ ও আত্ম-তিরস্কার: এই স্বৈরাচারী অভ্যন্তরীণ কণ্ঠস্বর ব্যক্তিকে প্রতিনিয়ত নির্দেশ দেয় যে তাকে সবদিক থেকে নিখুঁত, অত্যন্ত শক্তিশালী, সর্বদা সফল বা সীমাহীন দয়ালু “হতেই হবে”। যেহেতু এই কঠোর এবং অবাস্তব মানদণ্ডগুলো বাস্তবে পূরণ করা কখনোই সম্ভব হয় না, তাই ব্যক্তি বারবার ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতা থেকে তার মনের ভেতর তীব্র আত্ম-সমালোচনা এবং নিজেকে ঘৃণা করার প্রবণতা (despised self) তৈরি হয়, যা তার মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়।

২. আবেগীয় দোলক বা যন্ত্রণাদায়ক মানসিক ওঠানামা: ‘উচিত-এর স্বৈরাচার’-এর কারণে ব্যক্তি একটি চরম যন্ত্রণাদায়ক আবেগীয় দোলকের (pendulum swing) মধ্যে আটকে পড়ে। যখন সে মনে করে যে সে তার ‘উচিত’ মানদণ্ডগুলো কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারছে, তখন সে এক ধরনের অবাস্তব অহংকার বা স্ফীত আত্মবিশ্বাসে ভোগে। কিন্তু যখনই সে অবধারিতভাবে এই মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে চরম অযোগ্য ভেবে হীনম্মন্যতায় ভেঙে পড়ে।

৩. ‘আসল সত্তা’ (Real Self) হারিয়ে ফেলা: এই অবাস্তব ‘উচিত’ বা ‘কী হওয়া উচিত’-এর পেছনে ছুটতে গিয়ে ব্যক্তি তার নিজস্ব আসল অনুভূতি, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনাগুলোকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। হর্নির মতে, এটি একটি বড় ট্র্যাজেডি, কারণ ব্যক্তি তার কাল্পনিক আদর্শ রূপ রক্ষা করতে এবং ব্যর্থতার জন্য নিজেকে তিরস্কার করতেই এত বেশি সময় ও শক্তি ব্যয় করে যে, সে নিজের বাস্তব সত্তাকে বিকশিত হওয়ার কোনো সুযোগই দেয় না।

৪. আত্ম-স্বীকৃতির অভাব ও অন্তহীন ‘মহিমার সন্ধান’: এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ ব্যক্তিকে একটি অন্তহীন, ক্লান্তিকর এবং হতাশাজনক ‘সার্চ ফর গ্লোরি’ (search for glory) বা মহিমার সন্ধানে লিপ্ত করে। এর ফলে সে কখনোই তার সাধারণ সীমাবদ্ধতাসহ নিজের আসল রূপটিকে মেনে নিতে বা প্রকৃত আত্ম-স্বীকৃতি (genuine self-acceptance) অর্জন করতে পারে না।

সংক্ষেপে, ‘উচিত-এর স্বৈরাচার’ একজন মানুষকে তার বাস্তব সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমন এক কাল্পনিক ও অসম্ভব লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে কোনো অর্জনই তাকে শান্তি দিতে পারে না এবং সে ক্রমাগত নিজের ভেতরেই একটি অন্তর্ঘাতমূলক যুদ্ধে লিপ্ত থাকে।

লেখক – মাধব রায়

Comment