Walden Two – B.F. Skinner (1948)
ওয়াল্ডেন টু: বি.এফ. স্কিনারের আচরণবাদী স্বপ্ন – একটা সমাজ যেখানে শাস্তি নেই, তবু সবাই সুখী
এই রকম একটা সমাজ যেখানে কেউ কাউকে জোর করে কিছু করায় না, তবু প্রত্যেকে স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করে? যেখানে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শেখে ধৈর্য, সৃজনশীলতা আর আনন্দ—কোনো লাঠি বা ভয় ছাড়াই? যেখানে দিনের কাজ মাত্র চার ঘণ্টা, অথচ কেউ অলস নয়, সবাই সৃষ্টিশীল আর সন্তুষ্ট?
১৯৪৮ সালে বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী বি.এফ. স্কিনার তাঁর উপন্যাস ওয়াল্ডেন টু-এ ঠিক এমন একটা ইউটোপিয়ার ছবি এঁকেছেন। হেনরি ডেভিড থোরোর ওয়াল্ডেন-এর নামানুসারে নামকরণ করা এই বইটি শুধু একটা গল্প নয়—এটা আচরণবাদের (বিহেভিয়রিজম) আলোয় গড়া একটা বৈজ্ঞানিক স্বপ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝে স্কিনার বলতে চেয়েছেন: “মানুষের সমস্যার সমাধান সম্ভব—যদি আমরা বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে আচরণকে আকার দিই।”
স্কিনার কে এবং কেন এই বই?
বি.এফ. স্কিনার ছিলেন ২০শ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মনোবিজ্ঞানীদের একজন। তাঁর ‘অপারেন্ট কন্ডিশনিং’ তত্ত্ব বলে—আমাদের আচরণ পরিবেশের পুরস্কার (পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট) দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ইঁদুরের খাঁচায় বেল টিপলে খাবার পেলে ইঁদুর বারবার বেল টেপে। স্কিনার বললেন, মানুষও তাই। শাস্তি নয়, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ওয়াল্ডেন টু তাঁর এই আইডিয়াকে সমাজের স্কেলে প্রয়োগ করার চেষ্টা। বইটি প্রকাশের সময় অনেকে বলেছিলেন, “এটা তো সায়েন্স ফিকশন!” আজকের দিনে অ্যাপ্লায়েড বিহেভিয়র অ্যানালিসিস, নাজ থিওরি বা সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম দেখে আমরা বুঝি—এটা আর কল্পনা নয়।
গল্পের সারাংশ: একটা অদ্ভুত সফর
বইয়ের নায়ক অধ্যাপক বারিস (Burris) এবং তাঁর চার বন্ধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটা গ্রামীণ এলাকায় যান। সেখানে তাঁদের পুরনো বন্ধু টি.ই. ফ্রেজিয়ার (স্কিনারের আত্মপ্রতিচ্ছবি) তৈরি করেছেন ‘ওয়াল্ডেন টু’—প্রায় এক হাজার মানুষের একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সম্প্রদায়। ফ্রেজিয়ার তাদের ঘুরিয়ে দেখান কীভাবে এই সমাজ চলে।
এখানে কোনো টাকা নেই। আছে ‘লেবার ক্রেডিট’। কাজ যত কঠিন, ক্রেডিট তত বেশি। সবাই দিনে গড়ে চার ঘণ্টা কাজ করে। বাকি সময় পড়াশোনা, শিল্প, খেলা, গান। রান্নাঘরের ডিশওয়াশিং মাত্র দু’জনের কাজ! শিশুরা জন্ম থেকেই বিশেষভাবে লালিত-পালিত হয়। প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা শেখানো হয়। সাত বছর বয়স পর্যন্ত তারা আলাদা খায়, যাতে প্রাপ্তবয়স্কদের অভ্যাস তাদের প্রভাবিত না করে। পরিবার আছে, কিন্তু সম্প্রদায়ই তাদের আসল পরিবার।
শাসন? নির্বাচন নেই। কয়েকজন ‘প্ল্যানার’ (বিজ্ঞানী) সমাজের নিয়ম ঠিক করেন, কিন্তু তারা নিজেরা বেশি ক্ষমতা ভোগ করেন না। সবকিছু পরীক্ষামূলক—কোনো নিয়ম কাজ করছে কি না, তার ফলাফল দেখে বদলে ফেলা হয়। কেউ অসন্তুষ্ট হলে কাউন্সেলর আছে। অপরাধ? প্রায় নেই। কারণ আচরণকে আগে থেকেই এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যে খারাপ আচরণের সুযোগই হয় না।
কৌতূহল জাগানো প্রশ্নগুলো
স্কিনারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: “ফ্রি উইল কি সত্যিই আছে?” তিনি বলেন, আমাদের আচরণ পরিবেশের দ্বারা নির্ধারিত। তাহলে কেন সেই পরিবেশকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভালো করব না? কেন শাস্তি দিয়ে মানুষকে ‘সংশোধন’ করব, যখন ইতিবাচক পুরস্কার দিয়ে তাকে স্বাভাবিকভাবে ভালো করে তোলা যায়?
ওয়াল্ডেন টু-তে কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক উপদেশ নেই। সবকিছু বৈজ্ঞানিক। ফ্রেজিয়ার বলেন, “আমরা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করি না—আমরা তাদের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করি।”
সমালোচনা: স্বর্গ নাকি নরক?
বইটি প্রকাশের পর থেকেই ঝড় তুলেছে। অনেকে বলেছেন, এটা তো টোটালিটারিয়ান দুঃস্বপ্ন! মানুষের স্বাধীনতা কোথায়? একজনের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করলে সে কি আর মানুষ থাকে? সমালোচকরা বলেন, এটা ‘বিহেভিয়রাল ডিক্টেটরশিপ’। কিন্তু স্কিনারের সমর্থকরা উল্টো প্রশ্ন করেন—আজকের সমাজে কি আমরা সত্যিই স্বাধীন? টাকা, বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া কি আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে না?
বাস্তবে ওয়াল্ডেন টু অনেককে অনুপ্রাণিত করেছে। আমেরিকায় ‘টুইন ওকস’ (Twin Oaks) এবং আরও কয়েকটা কমিউন এই বইয়ের আদলে গড়ে উঠেছে। তারা আজও চলছে।
লেখক – মাধব রায়

