হেডি লামার এবং Wi-Fi, Bluetooth,GPS

হেডি লামার Wi-Fi, Bluetooth,GPS

১৯৪০-এর দশকের হলিউডের ঝলমলে আলোয় হেডি লামার ছিলেন এক অনন্য রূপালী পর্দার দেবী — লাস্যময়ী, অপার্থিব সুন্দরী এবং রহস্যময়ী। অ্যালজিয়ার্স (Algiers) এবং স্যামসন অ্যান্ড ডেলাইলা (Samson and Delilah)-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের বিমোহিত করেছিল, যার ফলে তিনি ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী’ তকমা লাভ করেন। কিন্তু সেই গ্ল্যামার, সাতটি বিয়ে, নানা বিতর্ক এবং স্টুডিও চুক্তির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ মেধাবী মস্তিষ্ক। যখন বিশ্ব তাঁকে কেবল একজন অভিনেত্রী হিসেবেই দেখছিল, তখন হেডি লামার নীরবে এমন এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছিলেন যা একদিন ওয়্যারলেস বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে: ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং স্প্রেড স্পেকট্রাম (Frequency-hopping spread spectrum)।

১৯৪২ সালে আধুনিক ঘরানার সুরকার জর্জ অ্যান্থেইল-এর সাথে মিলে তিনি একটি ‘গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা’র (Secret Communication System) পেটেন্ট করেন। এটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের জ্যামিং বা সংকেত বাধা এড়িয়ে মিত্রশক্তির টর্পেডোকে নিরাপদে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। সে সময় মার্কিন নৌবাহিনী এটিকে ‘অবাস্তব’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৫৯ সালে কোনো স্বীকৃতি ছাড়াই পেটেন্টটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কয়েক দশক পর, তাঁর প্রবর্তিত এই মূল ধারণাটিই ওয়াই-ফাই (Wi-Fi), ব্লুটুথ (Bluetooth), জিপিএস (GPS) এবং আমাদের আধুনিক বিশ্বের অগণিত ওয়্যারলেস প্রযুক্তির ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এটি সেই মহীয়সী নারীর এক অবিশ্বাস্য সত্য কাহিনী, যিনি ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন — অথচ যাঁকে প্রায় পুরোপুরি বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

ভিয়েনা থেকে হলিউড: রূপ, কেলেঙ্কারি এবং পলায়ন হেডউইগ ইভা মারিয়া কিসলার ১৯১৪ সালের ৯ নভেম্বর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ভিয়েনায় এক সচ্ছল ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যাংক পরিচালক, যিনি হেডিকে নিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হতেন এবং দৈনন্দিন যন্ত্রপাতির অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করে তাঁর মধ্যে কৌতূহল জাগিয়ে তুলতেন। অন্যদিকে তাঁর মা ছিলেন একজন পিয়ানোবাদক, যাঁর কাছ থেকে তিনি সংগীত ও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা অর্জন করেন।

মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় জয়ী হন। ১৬ বছর বয়সে অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিতে স্কুল ত্যাগ করেন এবং ১৯৩৩ সালের চেক-অস্ট্রিয়ান চলচ্চিত্র এক্সট্যাসি (Ecstasy)-তে অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসেন। চলচ্চিত্রটিতে তাঁর নগ্ন দৃশ্য এবং একটি কামোত্তেজক অভিনয় তৎকালীন সময়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। এটি তাঁকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিলেও ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেয় এবং নাৎসি জার্মানিসহ বেশ কয়েকটি দেশে চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করা হয়।

১৮ বছর বয়সে তিনি ইউরোপের অন্যতম ধনী অস্ত্র নির্মাতা ফ্রেডরিখ ‘ফ্রিটজ’ ম্যান্ডল-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি মুসোলিনি এবং হিটলারের অস্ত্র সরবরাহকারী ছিলেন। সেই বিবাহিত জীবন ছিল এক দুঃস্বপ্ন। ম্যান্ডল ছিলেন অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণকামী এবং ঈর্ষাপরায়ণ; তিনি এক্সট্যাসি-র সমস্ত কপি কিনে ফেলার চেষ্টা করেন এবং হেডির অভিনয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু এই দাম্পত্য জীবন লামারকে এক অমূল্য সুযোগ করে দিয়েছিল: সামরিক প্রযুক্তির উচ্চস্তরে প্রবেশাধিকার। তিনি এমন সব বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন যেখানে প্রকৌশলীরা রেডিও-নিয়ন্ত্রিত টর্পেডো এবং শত্রুপক্ষের সিগন্যাল জ্যামিং সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি মন দিয়ে শুনতেন, তথ্যগুলো আত্মস্থ করতেন এবং নিজের মতো করে ভাবতে শুরু করতেন।

১৯৩৭ সালে বছরের পর বছর অসুখী জীবন কাটানোর পর লামার পলায়নের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এক পরিচারিকার ছদ্মবেশ ধারণ করে এক নৈশভোজের আসর থেকে পালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত লন্ডন হয়ে ‘নরমান্ডি’ জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান। সেই জাহাজেই তাঁর দেখা হয় এমজিএম (MGM) স্টুডিওর প্রধান লুই বি. মেয়ারের সাথে। মেয়ার তাঁর রূপে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে চুক্তিবদ্ধ করেন। যদিও মেয়ারের দেওয়া প্রথম কম অর্থের প্রস্তাবটি হেডি নাটকীয়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে চলে গিয়েছিলেন, পরে মেয়ার তাঁকে আরও ভালো শর্তে নিতে বাধ্য হন।

মেয়ার তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন হেডি লামার (প্রয়াত নির্বাক চলচ্চিত্রের তারকা বারবারা লা মারের নামানুসারে) এবং তাঁকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে চার্লস বোয়ারের বিপরীতে তাঁর আমেরিকান ডেবিউ চলচ্চিত্র অ্যালজিয়ার্স তাঁকে রাতারাতি মহাতারকায় পরিণত করে। এরপর তিনি ক্লার্ক গেবল ও ক্লডেট কোলবার্টের সাথে বুম টাউন, স্পেনসার ট্র্যাসির সাথে টরটিলা ফ্ল্যাট সহ ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সাফল্য ছিল সেসিল বি. ডিমিলের স্যামসন অ্যান্ড ডেলাইলা (১৯৪৯), যেখানে তিনি ডেলিলা চরিত্রে ভিক্টর ম্যাচিউরের বিপরীতে এক মোহময়ী নারী হিসেবে পর্দায় ঝড় তুলেছিলেন।

কিন্তু এই খ্যাতি তাঁকে খুব একটা আত্মতৃপ্তি দিতে পারেনি। হলিউডের অগভীর চিত্রনাট্য আর স্টুডিও সিস্টেমের ধরাবাঁধা নিয়মে লামার হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। তিনি অর্থবহ কিছু করতে চেয়েছিলেন—বিশেষ করে যখন ইউরোপে যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছিল।

সেই উদ্ভাবন: একজন সুরকার, একটি পিয়ানো রোল এবং একটি অসাধারণ ধারণা ১৯৪০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকাকালীন লামারের সাথে জর্জ অ্যান্থেইল নামক এক খ্যাপাটে আমেরিকান সুরকারের পরিচয় হয়। ১৯২৪ সালে তাঁর অবাস্তবধর্মী (avant-garde) কাজ ব্যালে মেকানিক (Ballet Mécanique)-এর জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন, যেখানে ১৬টি প্লেয়ার পিয়ানো, বৈদ্যুতিক ঘণ্টা এবং বিমানের প্রপেলারকে একসাথে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়েছিল। তাঁরা দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। একদিন রাতের খাবারের টেবিলে আলোচনায় লামার রেডিও-নিয়ন্ত্রিত টর্পেডোগুলোর দুর্বলতা নিয়ে তাঁর হতাশা প্রকাশ করেন। সিঙ্ক্রোনাইজড মেকানিক্যাল সিস্টেমে অ্যান্থেইলের দক্ষতা একটি নতুন ধারণার জন্ম দেয়।

কেমন হয় যদি টর্পেডো নিয়ন্ত্রণকারী রেডিও সিগন্যালটি একটি নির্দিষ্ট গোপন প্যাটার্ন অনুযায়ী দ্রুত ডজনখানেক ভিন্ন ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে ‘হপ’ (hop) বা স্থানান্তরিত হতে থাকে? ঠিক যেন পিয়ানো রোলে পরিবর্তিত হতে থাকা সুরের নোটের মতো। এর ফলে শত্রু যদি সিগন্যাল জ্যাম করার চেষ্টাও করে, তবে তারা কখনোই জানতে পারবে না ঠিক কোন মুহূর্তে কোন ফ্রিকোয়েন্সিটি লক্ষ্য করতে হবে। কেবল টর্পেডো এবং তার নিয়ন্ত্রকের কাছেই সেই একই ‘স্কোর’ বা বিন্যাসটি থাকবে।

তাঁরা দুজনে মিলে এই ধারণাটিকে আরও পরিশীলিত করেন। এই সিস্টেমে ৮৮টি ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের কথা ভাবা হয়—যা একটি পিয়ানোর মোট কি (key)-এর সংখ্যার সমান। এটি নিয়ন্ত্রিত হতো প্লেয়ার পিয়ানোর মতো ছিদ্রযুক্ত কাগজের রোলের মাধ্যমে। প্রেরক জাহাজ এবং গ্রাহক টর্পেডো—উভয় ক্ষেত্রেই রোলগুলো হুবহু এক হতে হতো, যাতে নিখুঁত সিঙ্ক্রোনাইজেশন নিশ্চিত হয়।

১০ জুন, ১৯৪১ সালে তাঁরা লামারের তৎকালীন বৈবাহিক নাম হেডি কিসলার মার্কি এবং জর্জ অ্যান্থেইল-এর নামে পেটেন্টের আবেদন করেন। ১৯৪২ সালের ১১ আগস্ট তাঁদের সেই ‘সিক্রেট কমিউনিকেশন সিস্টেম’ (U.S. Patent 2,292,387) পেটেন্টটি অনুমোদিত হয়।

ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং স্প্রেড স্পেকট্রাম কীভাবে কাজ করে (সহজ ব্যাখ্যা): একটি মাত্র নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে সিগন্যাল পাঠানোর পরিবর্তে (যা সহজেই শনাক্ত ও জ্যাম করা যায়), ট্রান্সমিটারটি একটি পূর্বনির্ধারিত ছদ্ম-এলোমেলো (pseudorandom) ক্রম অনুসারে একটি বিস্তৃত ব্যান্ডের মধ্যে দ্রুত ক্যারিয়ার ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করে। রিসিভারও ঠিক একই তালে তাল মিলিয়ে ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করতে থাকে। ফলে কোনো জ্যামার সিগন্যালটি পরিষ্কার ফ্রিকোয়েন্সিতে সরে যাওয়ার আগে তার খুব সামান্য অংশেই বাধা দিতে পারে। এর ফলাফল হলো এমন একটি সিগন্যাল যা আটকানো বা বিঘ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন, এবং যা রেডিও তরঙ্গের পরিধিকেও অত্যন্ত দক্ষভাবে ব্যবহার করতে পারে।

লামার এবং অ্যান্থেইল তাঁদের এই উদ্ভাবনটি বিনামূল্যে মার্কিন নৌবাহিনীকে ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাঁদের প্রতিক্রিয়া ছিল হতাশাজনক। নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ১৯৪০-এর দশকের ভ্যাকুয়াম টিউব এবং প্লেয়ার পিয়ানোর ভারী যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি এই মেকানিজমটি এতটাই বড় এবং ভারী যে তা টর্পেডোর ভেতরে বসানো অসম্ভব। তাঁরা ব্যঙ্গ করে লামারকে পরামর্শ দেন যে, তিনি বরং তাঁর রূপকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের বন্ড বিক্রি করে দেশের সেবা করেন।

তিনি ঠিক তা-ই করেছিলেন। যুদ্ধের সময় তিনি অন্যতম সফল সেলিব্রেটি বন্ড বিক্রেতা হয়ে ওঠেন এবং সেনাদের মনোবল চাঙ্গা করে ও মঞ্চে পারফর্ম করে কয়েক মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেন। এদিকে তাঁর সেই ঐতিহাসিক পেটেন্টটি নথিপত্রের স্তূপে ধুলো জমতে থাকে।

স্বীকৃতির দীর্ঘ পথ যুদ্ধের পর লামার অভিনয় চালিয়ে গেলেও তাঁর ক্যারিয়ারের জৌলুস কমতে শুরু করে। তিনি মোট ছয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তিন সন্তানের জননী হন। ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল দুবার চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার (যদিও পরে অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়) এবং তাঁর বিতর্কিত আত্মজীবনী এক্সট্যাসি অ্যান্ড মি (Ecstasy and Me) (১৯৬৬), যা নিয়ে অনেক মামলা-মোকদ্দমা হয়েছিল।

কয়েকজন প্রকৌশলী ছাড়া তাঁর এই উদ্ভাবনের কথা বিশ্বের কাছে প্রায় অজানাই থেকে গিয়েছিল। ১৯৫৯ সালে পেটেন্টটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ১৯৬০-এর দশকে ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের পর ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং সিস্টেমের ব্যবহারিক প্রয়োগ অবশেষে সম্ভবপর হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটের সময় মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোর মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগের জন্য প্রথম স্প্রেড-স্পেকট্রাম প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে। আশির ও নব্বইয়ের দশকের মধ্যে লামার এবং অ্যান্থেইলের সেই অগ্রগামী নীতিগুলো বেসামরিক প্রযুক্তিতে জায়গা করে নেয়।

ব্লুটুথ (Bluetooth): জনাকীর্ণ ২.৪ গিগাহার্টজ (GHz) ব্যান্ডে সিগন্যালের পারস্পরিক সংঘর্ষ এড়াতে এটি ‘অ্যাডাপ্টিভ ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং স্প্রেড স্পেকট্রাম’ ব্যবহার করে।

ওয়াই-ফাই (Wi-Fi): ওয়াই-ফাই স্ট্যান্ডার্ডসমূহ (বিশেষ করে প্রাথমিক ৮০২.১১ সংস্করণ এবং এর মূল স্প্রেড-স্পেকট্রাম দর্শন) স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার জন্য একই ধরনের কৌশলের ওপর নির্ভরশীল।

জিপিএস (GPS): জিপিএস স্যাটেলাইটগুলো নিখুঁত অবস্থান নির্ণয় এবং জ্যামিং প্রতিরোধে স্প্রেড-স্পেকট্রাম সিগন্যালিং ব্যবহার করে।

আধুনিক সেলুলার নেটওয়ার্ক: সিডিএমএ (CDMA) এবং এর পরবর্তী প্রজন্মের নেটওয়ার্কগুলো মূলত বিস্তৃত ব্যান্ডউইথের মধ্যে সংকেত ছড়িয়ে দেওয়ার এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে।

যদিও লামার একাই ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথ আবিষ্কার করেননি—পরবর্তীতে এনসিআর (NCR), সিএসআইআরও (CSIRO) এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা এর ব্যবহারিক প্রয়োগকে আরও উন্নত করেছিলেন—তবে তাঁর ১৯৪২ সালের পেটেন্টটিই ছিল নিরাপদ যোগাযোগের জন্য ‘ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং স্প্রেড স্পেকট্রাম’-এর প্রথম স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত নিদর্শন। তিনি এমন একটি বীজ বপন করেছিলেন, যা থেকে আজকের নির্ভরযোগ্য এবং বিঘ্নহীন ওয়্যারলেস প্রযুক্তির বিশাল ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে।

শেষবেলার প্রাপ্তি ও সম্মান ১৯৯৭ সালে ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন লামার এবং অ্যান্থেইলকে ‘পায়োনিয়ার অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করে। ২০১৪ সালে—তাঁর মৃত্যুর চৌদ্দ বছর পর—তাঁকে ন্যাশনাল ইনভেন্টরস হল অব ফেম-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে তিনি টমাস এডিসন এবং রাইট ব্রাদার্সের মতো কিংবদন্তিদের পাশে স্থান পান। ভিয়েনায় তাঁর নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয় এবং একটি গ্রহাণুর নাম রাখা হয় ‘৩২৭৩০ লামার’। ২০১৫ সালে তাঁর ১০১তম জন্মদিনে গুগল একটি ‘ডুডল’ তৈরি করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানায়। ২০১৭ সালের ডকুমেন্টারি বম্বশেল: দ্য হেডি লামার স্টোরি নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর এই অসামান্য প্রতিভাকে তুলে ধরে।

২০০০ সালের ১৯ জানুয়ারি ৮৫ বছর বয়সে ফ্লোরিডায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ভস্মের একাংশ ভিয়েনার অরণ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বাকি অংশ ২০১৪ সালে পূর্ণ সম্মানের সাথে ভিয়েনার সেন্ট্রাল সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়।

এক অবিনশ্বর উত্তরাধিকার হেডি লামার তাঁর দেওয়া ধারণা থেকে তৈরি হওয়া বিলিয়ন ডলারের শিল্পগুলো থেকে কখনও একটি ডলারও রয়্যালটি পাননি। তিনি একবার বলেছিলেন, যে কোনো চলচ্চিত্রের চেয়েও তিনি তাঁর এই উদ্ভাবনের জন্য বেশি গর্বিত। এমন এক যুগে যখন কারিগরি ক্ষেত্রে নারীদের খুব কমই গুরুত্ব দেওয়া হতো, তখন তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে সৌন্দর্য এবং মেধা একে অপরের পরিপন্থী নয়—এবং একজন শরণার্থী অভিনেত্রীও চাইলে বড় বড় বিশেষজ্ঞদের চেয়েও প্রখর চিন্তাশক্তি রাখতে পারেন।

প্রতিবার যখন আপনি আপনার ফোনটিকে ওয়াই-ফাইয়ের সাথে সংযুক্ত করেন, ব্লুটুথ হেডফোন ব্যবহার করেন, জিপিএস-এ নিজের অবস্থান পরীক্ষা করেন বা কেবল কোনো বিঘ্ন ছাড়াই ওয়্যারলেস যোগাযোগ উপভোগ করেন, তখন জানবেন যে আপনি এমন এক ধারণার সুফল ভোগ করছেন যা ১৯৪০ সালে একজন সুরকারের সাথে রাতের খাবার খাওয়ার সময় হলিউডের এক রূপালি পর্দার তারকা প্রথম পরিকল্পনা করেছিলেন।

হেডি লামারের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মেধা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকেও প্রকাশ পেতে পারে—এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলো মাঝে মাঝে এমন সব মানুষের কাছ থেকে আসে যাদের নিয়ে পৃথিবী সবচেয়ে কম আশা রাখে।

তিনি কেবল গ্ল্যামারের প্রতীকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেই জাদুর নেপথ্যের কারিগর, যা আজ আমাদের সবাইকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে।

হেডি লামার এবং  Wi-Fi, Bluetooth,GPS
Comment